বাংলার বাদ্যযন্ত্র ডমরু: লোকসংস্কৃতির প্রাচীন সঙ্গী আজ বিলুপ্তির পথে
বাংলার লোকসংস্কৃতি হাজার বছরের ঐতিহ্য বহন করে। সেই সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে নানান ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র। সেসবের অনেকগুলো আজ বিলীন হওয়ার পথে। এদের মধ্যেই একটি অতিপরিচিত কিন্তু হারিয়ে যাওয়ার পথে থাকা বাদ্যযন্ত্রের নাম হলো ডমরু। প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র ডমরুর ইতিহাস, লোকসংস্কৃতিতে এর ভূমিকা, গঠন ও নির্মাণ প্রক্রিয়া এবং বিলুপ্তির কারণ নিয়েই আজকে কথা। ডমরু বাদ্যযন্ত্রটির আরেক নাম ডুগডুগি। ডমরু হলো ছোট আকারের এক ধরনের দ্বিমুখী পারকাশন বাদ্যযন্ত্র। সাধারণত দুই পাশে দুটি ছোট ঢাকনা আর মাঝখানে সরু কোমর। বাদ্যযন্ত্রটি হাতে নিয়ে ঝাঁকালে ভেতরের দুটি দড়িতে ঝুলে থাকা ছোট বলের মাথা দু’পাশে আঘাত করে রিদম তৈরি করে। এই ঝাঁকানোর তালেই ডমরুর চরিত্র অনবরত, দ্রুত, ঝমঝমে তাল। ছোট আকৃতির হলেও এর শব্দে থাকে এক ধরনের রহস্যময় স্পন্দন যা যুগ যুগ ধরে জারি-সারি, বাউল-মরমি গান, লোকাচার এবং বিভিন্ন আধ্যাত্মিক আচারে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ডমরু কিন্তু আমাদের শৈশবের বাদ্যযন্ত্র। সবার শৈশবের এই ডমরু জড়িত আছে। মেলা মানেই পিচ্চিদের এই ছোট বাদ্যযন্ত্রটি কিনে দেওয়া। তারপর টমটম গাড়ি, এইটাইও কিন্তু একটি বাদ্যযন্ত্র।
ডমরু হলো দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন পারকাশন (তালবাদ্য) বাদ্যযন্ত্র। এর উৎপত্তি ভারতীয় উপমহাদেশে প্রায় ২,৫০০–৩,০০০ বছর আগে। প্রাচীনগ্রন্থ, পূরাণ এবং লোককথায় এর উল্লেখ পাওয়া যায়। বাংলায় এটি বিশেষভাবে ছড়িয়ে পড়ে বাউল-ফকির, সাধক, জারি-সারি গানের শিল্পীদের মাধ্যমে। সবচেয়ে মজার তথ্য হল প্রাচীনকালের ডমরু এর সাথে বর্তমান কালের ডমরু এর আকৃতিগত কোন পার্থক্য নাই। এর মানে প্রথমে যেমন ছিলো এখন ঠিক তেমটিই আছে। বাংলাদেশে ডমরুর ব্যবহার একসময় ছিল লোকসঙ্গীত, পূজা-পার্বণ, শমন-গাজন, জারি-শারিতে, এবং বাউল-ফকিরদের দেহতত্ত্বমূলক গানেও। বিশেষ করে বাউল ও ফকির সম্প্রদায় তাদের আধ্যাত্মিক গানের তালে ডমরু ব্যবহার করতেন। গ্রামীণ জাদু–টোনা বা শমন সংস্কৃতিতে ডমরুর শব্দকে শক্তির আহ্বান মনে করা হতো। লোকনাট্য ও গাজনের শোভাযাত্রা ডমরুর তালের শব্দে জীবন্ত হয়ে উঠত। একসময় গ্রামীণ সমাজে ডমরু ছিল উৎসব আনন্দের সহজলভ্য বাদ্যযন্ত্র। শিশুরাও খেলনা হিসেবে এটি ব্যবহার করত। সময়ের বিবর্তনে গ্রামবাংলার সেই প্রাচীন ডুগডুগি আজ অনেকটাই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে । এখন শুধু বানরের খেলা আর কিছু হকারদের মাঝে এর ব্যবহার দেখায় যায়।
ডমরুর গঠন ও তৈরির কৌশল হচ্ছে ডমরু তৈরি হয় সম্পূর্ণ গ্রামীণ উপকরণ দিয়ে। কাঠ বা নারকেলের খোল আর দুই পাশে পশুর চামড়া। বাদ্যযন্ত্রের কোমর তৈরির জন্য দড়ি বা চামড়ার ফিতা আর তাল তৈরি করার জন্য দুই পাশে লাগানো ছোট বল। ডমরুর আকার অনেকটা বালু ঘড়ির মত বলা যায়। ডমরুর কাজ ছিল সহজ, কিন্তু শব্দ ছিল আশ্চর্য জোরালো এবং মনোযোগ আকর্ষণকারী। ডমরু হাতে ধরে হালকা কব্জির নড়াচড়ায় ঘুরানো হয়। ঘোরানোর সঙ্গে সঙ্গে গুটিগুলো ঝিল্লিতে আঘাত করে তাল তৈরি করে। এতে শিল্পী তালের গতি আওয়াজের তীব্রতা রিদম অনেক সহজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। এ যন্ত্রে জটিল তাল বাজানো না গেলেও এর রহস্যময় রিদম মানুষের মন খুব দ্রুত আকর্ষণ করে।
ডমরু বাংলাদেশের প্রায় সব অঞ্চলে কোনো না কোনোভাবে ব্যবহৃত হলেও নিচের জায়গাগুলোতে এটি বেশি জনপ্রিয় ছিল। কুষ্টিয়া লালন ও বাউল আখড়ার গানে। ময়মনসিংহ মরমি ও পীর দরবারধর্মী গান। সিলেট জারি-সারি ও আধ্যাত্মিক আচারে। পুরান ঢাকার রাস্তা-ঘাটের ভাঁড় ও গায়ক দলের হাতে যাত্রাপালা, লোকনাট্য, ভাঁড়ামি এবং পথশিল্পীদের মধ্যে। ডমরুর হারিয়ে যাওয়ার পেছনে রয়েছে কয়েকটি বড় কারণ বলা যায় স্বাভাবিক প্রথমেই আসে আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের দাপট। তারপর লোকসংগীতের ধারা কমে যাওয়া। বাউল-ফকির, জারি-সারি শিল্পীদের সংখ্যা কমে গেছে। অবশ্যই নির্মাতা কারিগরের অভাব এবং অনীহা। আর সবচেয়ে বড় কারন তরুণ প্রজন্মের অনাগ্রহ থাকাটা স্বাভাবিক এই আধুনিক যুগে।
ডমরু বাদ্যযন্ত্রটির একটি মিথ দিয়ে শেষ করি। ডমরু বাদ্যযন্ত্রটির উৎপত্তি প্রাক বৈদিক কালে হওয়া বলে জানা যায় প্রথমে সাধারণত হিন্দু ধর্ম এবং তিব্বতীয় বৌদ্ধ ধর্মে ব্যবহৃত হতো। কথিত আছে এই বাদ্যযন্ত্র মহাদেবের হাতের বাদ্য ছিল। অনেকে বিশ্বাস করেন ডমরুই প্রথম তাল-বাদ্য হিসেবে পরিচিত। প্রাচীন হিন্দু পুরাণে বলা হয়েছে ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি, ধ্বংস ও পুনঃসৃষ্টি সবই শিবের তাণ্ডবের সঙ্গে যুক্ত। শিবের হাতে থাকা ছোট্ট ডমরু হলো সেই মহাজাগতিক তালের প্রতীক। ডমরুর প্রতিটি স্পন্দনেই সৃষ্টি ও ধ্বংসের ছন্দ লুকানো। শিব যখন তাণ্ডব নৃত্য করেন ডমরুর শব্দ শূন্যতা থেকে নতুন জীবনের জন্ম দেয়। সেই তালে পাহাড় নদী, প্রাণী সবই জীবনের ছন্দ পায়। যখন ব্রহ্মাণ্ড শুধু ছিল একটি নিস্তব্ধ শূন্যতা। কোথাও শব্দ নেই কোথাও ত্রাণ নেই শুধু শান্ত অন্ধকার। তখনই মহাদেব শিবের আবির্ভাব হলো। তাঁর চোখে অগাধ জ্ঞান হাতে ধরণীকে নাড়ানো তাণ্ডবের শক্তি। শিব যখন প্রথমবার তাণ্ডব নৃত্য শুরু করলেন সাথে তাঁর হাতের ছোট্ট ডমরুটা বাজলো। ডমরুর দুই প্রান্ত ঘূর্ণন শুরু করল এবং প্রতিটি ঘূর্ণনের সাথে মহাজাগতিক ছন্দ তৈরি হলো। সেই ছন্দেই ধীরে ধীরে সৃষ্টি শুরু হলো পৃথিবী, নদী, পাহাড়, প্রাণী, মানুষ। ডমরুর শব্দে জীবন পেল সমস্ত কিছু। পুরাণে বলছে ডমরুর শব্দে শূন্যতা এবং পূর্ণতার এক অপূর্ব মিল থাকে যা জীবনের শুরু এবং শেষের প্রতীক।
ডমরু বাংলাদেশের সেই হারিয়ে যাওয়া বাদ্যযন্ত্র যার শব্দে লুকিয়ে আছে ঐতিহ্য, আধ্যাত্মিকতা আর গ্রামীণ জীবনের গল্প। আধুনিকতার চাপে যন্ত্রটি বিলীন হবার পথে চলে গেলেও আমরা চাইলে লিখে, শিখে, বাজিয়ে ও মানুষকে জানিয়ে সহজেই এটিকে আবার ফিরিয়ে আনতে পারি।
কবিতা-ঘন ঘোর বরিষণ মেঘ-ডমরু বাজে
কবি-কাজী নজরুল ইসলাম
ঘন ঘোর বরিষণ মেঘ-ডমরু বাজে
শ্রাবণ রজনী আঁধার।
বেদনা-বিজুরি-শিখা রহি রহি চমকে
মন চাহে প্রেম অভিসার।।
কোথা তুমি মাধব কোথা তুমি শ্যামরায়!
ঝরিছে নয়ন-বারি অঝোর ধারায়;
কদম-কেয়া-বনে ডাহুকী আনমনে
সাথি বিনা কাঁদে অনিবার।।
--- বাউল পানকৌড়ি
গগন হরকরা যার গানের সুরে আমার সোনার বাংলা---Click to Read
সাধক ভবা পাগলার গান---Click to Read
Read on mobile

