রেনেসাঁ ব্যান্ড : বাংলা ব্যান্ড সংগীতের নবজাগরণ ও সৃজনশীল যাত্রার কথা
রেনেসাঁ ব্যান্ড : বাংলা ব্যান্ড সংগীতের নবজাগরণ ও সৃজনশীল যাত্রার কথা
বাংলা ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে রেনেসাঁ এক বিশেষ অধ্যায় বিশেষ নাম। যারা গানকে নিছক বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে না দেখে এর মধ্যে খুঁজেছে সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং শিল্পের গভীরতা। আশির দশকে যখন ব্যান্ড মিউজিকের ধারা হেভি মেটাল ও রকের দিকে ঝুঁকছিল তখন রেনেসাঁ একজোট হয়ে স্রোতের বিপরীতে হাঁটার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা প্রাধান্য দেয় বাংলা গানের মূল ভিত্তি অর্থাৎ লিরিক্যাল ভ্যালু (গানের কথা) ও মেলোডি (সুর) কে। নব্বইয়ের রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ, প্রেম, সমাজ সবকিছুই তারা সুরে বেঁধেছেন অনন্য মেলোডিতে।
রেনেসাঁ ব্যান্ড ১৯৮৫ সালে গঠিত হয়। ব্যান্ডটির প্রথম দিকের সদস্য ছিলেন নকীব খান, ফয়সাল সিদ্দিকি বগী, পিলু খান , কাজী হাবলু, মোটো ও মামুন। শুরুতে তাদের ব্যান্ডের কোনো নাম ছিল না। প্রথম শো করেন নাম ছাড়াই। এর কিছুদিন পরে বাংলাদেশ টেলিভিশনের ঝলক অনুষ্ঠানে সুযোগ আসে তাদের গান করার। তখন ব্যান্ডের নাম দরকার হয়। সবাই তখন ব্যান্ডের নামের জন্য ফরাসি শব্দ রেনেসাঁ বেছে নেয়। যার বাংলা অর্থ নবজাগরণ। ব্যান্ডের উদ্দেশ্য ছিল বাংলা গানকে ব্যান্ডের গান হিসেবে বাঁচিয়ে রাখা এবং গানের মাধ্যমে সমাজের প্রতি একটি বার্তা দেওয়া। প্রতিষ্ঠার তিন বছর পর ১৯৮৮ সালে রেনেসাঁ তাদের প্রথম অ্যালবাম প্রকাশ করে। যা তাদের সংগীতজগতে স্থায়ী অবস্থান তৈরি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ব্যান্ড ১৯৮৫ সালে গঠিত হয়ে আজকে ২০২৫ পর্যন্ত ৪০ বছরে মোট চারটি অ্যালবাম আমাদের উপহার দিয়েছে। চারটিই কালজয়ী হয়েছে। আগামাীতে নতুন কোন অ্যালবাম আসলে এই লেখা যোগ করা হবে। রেনেসাঁ ব্যান্ডের বর্তমান লাইন আপ- নকীব খান,পিলু খান, ইমরান রহমান, রেজাউর রহমান, কার্তিক এবং কাজী হাবলু ।
🟦 রেনেসাঁ (১৯৮৮) 🟦
রেনেসাঁ ব্যান্ডটি প্রথম অ্যালবাম প্রকাশ করে সেলফ টাইটেল রেনেসাঁ নামে ১৯৮৮ সালে। অসাধারণ এক অ্যালবাম। প্রতিটি গান কথা সুর অসাধারন। প্রথম গানটিই ছিল ভালো লাগে জোছনা রাতে। আহা ভালো লাগে জোছনা রাতে মেঘ হয়ে আকাশে ভাসতে। গানের সৃষ্টির গল্পটাও সুন্দর। কোন এক পত্রিকায় পড়েছিলাম। এই গানের গীতিকার একজন ডাক্তার। নামা মোহাম্মদ আরিফ এবং নকীব খানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কোন একদিন ট্রেনে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় ফেরার পথে চারদিকে নেমে আসে রাত। শান্ত জোছনাতে আকাশজুড়ে মেঘ ভাসছে কখনো চাঁদের গায়ে পড়ছে আবার সরে যাচ্ছে। সেই মায়াবী দৃশ্য দেখেই সৃষ্টি ভালো লাগে জোছনা রাতে, মেঘ হয়ে আকাশে ভাসতে। নকীব খান সুর বসাতে থাকেন। ঢাকা পৌছাতে পৌছাতে ট্রেনেই বাংলা ব্যান্ডের ইতিহাসের এক কালজয়ী গানের সৃষ্টি হয়ে যায়।
ভালো লাগে জোৎস্না রাতে
মেঘ হয়ে আকাশে ভাসতে
ধানের শীষে বাতাস হয়ে
কিষানীর মন ছুঁয়ে যেতে
ভালো লাগে রোদ হয়ে
ঐ পাখির ডানা ছুঁয়ে খেলতে....
অ্যালবামের আরেক শক্তিশালী গান আচ্ছা কেন মানুষগুলো এমন হয়ে যায়। এটাই ছিল ব্যান্ড রেনেসাঁর প্রথম রেকর্ড করা গান। আজকের দিনে ফিউশন শব্দটি খুব পরিচিত কিন্তু সেই সময়ই নকীব খান এই গানে ওয়েস্টার্ন কম্পোজিশনের সঙ্গে ঢোল ও দোতারার মেলবন্ধন ঘটিয়ে দুর্দান্ত এক ফিউশন তৈরি করেছিলেন। এই গানটির গীতিকারও ছিলেন ডাক্তার মোহাম্মদ আরিফ। সুর নকিব খান এবং পিলু খান।
আচ্ছা কেন মানুষগুলো এমন হয়ে যায়
চেনাজানা মুখগুলো সব কেমন হয়ে যায়
দিন বদলের খেলাতে, মন বদলের মেলাতে
মানুষগুলো দিনে দিনে, বদলে কেন যায়.....
ডাক্তার মোহাম্মদ আরিফ এর লেখা আরেকটা বিখ্যাত গান ছিলো ও নদীরে তুই যাস কোথায় রে। নকির খানের সুর ও কন্ঠে অসাধারন।
ও নদীরে তুই যাস কোথায় রে
কলকলাইয়া ছলছলাইয়া
কোন সাগরে
যাস যেথা নে না তুই আমারে...
চিত্রশিল্পী কবি এবং বাংলাদেশের প্রখ্যাত প্রচ্ছদ শিল্পী খালিদ আহসান (জন্ম ৬ নভেম্বর ১৯৫৭- মৃত্যু ২২ মার্চ ২০২১) এর লেখা দুইটি গান ছিলো রানওয়ের মাটি ছুঁয়ে। সুর নকীব খান এবং কণ্ঠ দিয়েছিলেন মামুন। আরেকটি ছিল ঘুম নেই, ঘুম হারা। অসাধারণ মেলোডিয়াস দুটি গান। এছাড়াও অ্যালবামটিতে চারটি মৌলিক ইংরেজি গান ছিল। এর মধ্যে দুটি গেয়েছেন ও সুর করেছেন ফয়সাল সিদ্দিকি বগী। আর ব্যান্ড সদস্য ওমর খালেদ রুমীর দুটি। Temporary Love, Rock N' Renaissance, No One But You আর Happy Feeling. অন্যান্য গান গুলো হচ্ছে- ছোট্রো বেলার সাথী, এই সব ভাল লাগে, বৃষ্টির লেখা কবিতা ও শুভলং। সারগাম থেকে প্রকাশিত / সারগাম ১২৭ (127) এই অ্যালবামের প্রতিটি গানই মেলোডিভিত্তিক একটি ধারা যা রেনেসাঁ তাদের পুরো সঙ্গীতযাত্রায় ধরে রেখেছে। অ্যালবাম প্রকাশের পর ব্যান্ডটি পুরোপুরি সার্থক হয়। এভাবেই ১৯৮৮ সালের ‘রেনেসাঁ’ অ্যালবাম বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
🟦 তৃতীয় বিশ্ব (১৯৯৩) 🟦
রেনেসাঁ সবসময় বক্তব্যপ্রধান গান করে এই ধারণাকে সবচেয়ে শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে তাদের দ্বিতীয় অ্যালবাম তৃতীয় বিশ্ব। সমসাময়িক সমাজ, তৃতীয় বিশ্বের বাস্তবতা ও মানবিক সংকটকে কেন্দ্র করে অ্যালবামটি সাজানো হয়। অ্যালবামের টাইটেল গান তৃতীয় বিশ্ব। তৃতীয় বিশ্ব এমনি এক বিস্ময় বানায় না অস্ত্র তবুও শস্ত্র ওরা মরণ খেলায় বড়ো অভ্যস্ত। কিংবদন্তি গীতিকার শহীদ মাহমুদ জঙ্গীর লেখা এবং সুর কণ্ঠ পিলু খান। এইতো গেল টাইটেল গানের কথা। এই অ্যালবামের জগৎশ্রেষ্ঠ এক গান আছে। যার নাম হৃদয় কাদামাটির কোনো মূর্তি নয়। বাংলা ব্যান্ডের ইতিহাসে অন্যতম সেরা জনপ্রিয় এবং প্রিয় একটি গান। এরও গীতিকার কিংবদন্তি গীতিকার শহীদ মাহমুদ জঙ্গী। নকীব খানের সুর ও এ গানের কন্ঠ হচ্ছে
ফয়সাল সিদ্দিকি বগী। তাঁর গায়কিটা অসাধারণ অতুলনীয়। গানটিতে ক্যারিবিয়ান ও আফ্রিকান রিদমের সঙ্গে দেশীয় ট্রাম্পেট ও খঞ্জনির ব্যবহার আলাদা মাত্রা দেয়। লোকগীতির আবহ থাকলেও এর কথায় রয়েছে আধুনিকতা।
হৃদয় কাদা মাটির কোন মূর্তি নয়
মূর্তি নয়
আঘাত দিলেই ভেঙে যাবে
মন উড়ন্ত কোন বেলুন নয়
বেলুন নয়
হুল ফোটালেই চুপসে যাবে।
শুকনো মাঠে ফুল ফোটানো সারাবেলার খেলা
শূন্যতার মাঝে গড়ি বীনিসূতোর মালা
বুকের মাঝে ভালোবাসা থাকবে জীবনময়।
অন্তর্চক্ষু খোলা রাখি সবই আমি দেখি
সাধ্যি কার এই ভূবনে দেবে আমায় ফাঁকি
বুকের মাঝে ভালোবাসা থাকবে জীবনময়।।।
এই অ্যালবামের আরেকটি কালজয়ী গান আজ যে শিশু পৃথিবীর আলোয় এসেছে আমরা তার তরে একটি সাজানো বাগান চাই। বাংলাদেশের ইতিহানে শিশু অধিকার নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ একটি গান। প্রতিটি শিশুর বাঁচার মতো বাঁচার অধিকার আছে এই বার্তা তুলে ধরতেই তৈরি এই গান। কিংবদন্তি গীতিকার শহীদ মাহমুদ জঙ্গী লেখা এবং পিলু খানের সুর ও কণ্ঠে এটি অন্যতম শক্তিশালী গান।
আজ যে শিশু
পৃথিবীর আলোয় এসেছে
আমরা তার তরে একটি
সাজানো বাগান চাই
আজ যে শিশু
মায়ের হাসিতে ভেসেছে
আমরা চিরদিন সেই হাসি
দেখতে চাই......
প্রখ্যাত গীতিকার আসিফ ইকবালের চিরদিনই ভাবতে পারো চিরদিনই ভাবতে পারো একটি মানুষ বাসবে ভাল তোমাকে। পিলু খানের কন্ঠে এই গানটাও অসাধান এক মেলোডি। এই অ্যালবামের আরেকটি প্রিয় এবং চমৎকার একটি গান হচ্ছে চৌকিদার। বেজ গিটারিস্ট মোটো কন্ঠে গানটা আমার সেই স্কুল সময় থেকেই খুব প্রিয়। গীতিকার আসিফ ইকবাল।
গহনকালা নিশির আন্ধার
আরে কে যায় কে যায় কে যায়
পায়ের আওয়াজ শুনি তাহার
গাঁয়ের বাতাস কাপে থরথর
লন্ঠন হাতে আর লাঠি নিয়ে
চলে গাঁয়ের চৌকিদার....
গীতিকার সেজান মাহমুদের লেখা জানালা খুলে দেখি ওপাড়ার ঝাঁকড়া চুলের সেই শান্ত যুবক মিছিলের পুরোভাগে দাঁড়িয়ে। নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনের চিত্র ফুটে ওঠে আরেকটি গানে। এই গানটি এরশাদ পতনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল কনসার্টে প্রথম পরিবেশনা করে রেনেসাঁ। অন্যান্য গান গুলো হচ্ছে- সুখ তুমি রঙধনু /শহীদ মাহমুদ জঙ্গী লেখা। বেঁচে থাকা/আসিফ ইকবাল লেখা। আমার যা কিছু আছে-গীতিকার আব্দুল্লাহ আল মামুন। এই দিনতো রবেনা- গীতিকার কবি চিত্রশিল্পী খালিদ আহসান। আর দেশত যাইও, নীল ছোঁয়া। তৃতীয় বিশ্ব’ অ্যালবামটি ১৯৯৩ সালে প্রকাশ করেছিল মিউজিক এশিয়া পরে আবার প্রকাশ করে সঙ্গীতা।
🟦 একাত্তরের রেনেসাঁ (১৯৯৮) 🟦
একাত্তরের রেনেসাঁ, রেনেসাঁ ব্যান্ডের অন্যতম ঐতিহাসিক ও আবেগময় অ্যালবাম। এটি প্রকাশিত হয় ১৯৯৮ সালে কিন্তু এর যাত্রা শুরু হয়েছিল আরও আগে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গানগুলো নতুনভাবে উপস্থাপনের আকাঙ্ক্ষা থেকে। ১৯৯৫ সালে রেনেসাঁ শিল্পকলা একাডেমিতে একটি বিশেষ কনসার্ট আয়োজন করে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গানগুলো ব্যান্ড ফরম্যাটে পরিবেশন করে। এই উদ্যোগ গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি আক্কু চৌধুরীকে। তিনি এবং অন্য ট্রাস্টিরা বিশেষ করে মুনতাসীর মামুন, রেনেসাঁকে উৎসাহ দিয়েছিলেন এই গানগুলো নতুন প্রজন্মের কাছে হারিয়ে যাচ্ছে। তোমরাই এগুলো ফিরিয়ে আনতে পারবে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মূল কথা ও সুর অবিকল রেখে রেনেসাঁ নতুন করে গানগুলোর কম্পোজিশন তৈরি করে। এই কাজে তাদের সবচেয়ে বড় সহায় ছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সংগীত পরিচালক সমর দাস। গান তৈরি হয়ে গেলে রেনেসাঁ দল তাঁকে শোনাতো আর তিনি ওকে দেওয়ার পরই তা ফাইনাল করা হতো। অ্যালবামের মোড়ক উন্মোচন করেন সমর দাস এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা আমাদের পপ সম্রাট আজম খান । একাত্তরের রেনেসাঁ’ তে স্থান পায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনেক ঐতিহাসিক সব গান।
শোনো একটি মজিবরের থেকে
পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে
জয় বাংলা, বাংলার জয়
কারার ওই লৌহ কপাট
ভেবো না গো মা তোমার ছেলেরা
বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা
বাঁধ ভেঙে দাও
হাজার বছর পরে
আমরা সবাই বাঙালি
নোঙর তোল তোল
এ ছাড়া আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন জানানো শিল্পীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রেনেসাঁ ইংরেজিতে গেয়েছেন জর্জ হ্যারিসনের Bangladesh, Bangladesh আর জোয়ান বায়েজের Story of Bangladesh. অ্যালবামটি প্রকাশ করে জি–সিরিজ। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর সংগ্রহ করে দেয় আদি লিরিকস ও আদি সুর। বলা যায় একাত্তরের রেনেসাঁ শুধু একটি অ্যালবাম নয়। একটি প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে মুক্তিযুদ্ধের গান পৌঁছে দেওয়ার সেতুবন্ধন হয়ে ওঠে।
🟦 একুশ শতকে রেঁনেসা (২০০৪) 🟦
একুশ শতকের রেনেসাঁ, ব্যান্ড রেনেসাঁর চতুর্থ অ্যালবাম। যা প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। নতুন শতাব্দীর প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই অ্যালবামে বাংলা গানের ঐতিহ্যকে আধুনিকতার ছোঁয়ায় পুনর্গঠিত করা হয়েছে।অ্যালবামের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল দেশীয় সুরের সঙ্গে স্যাক্সোফোন, ট্রাম্পেট, ট্রোম্বোন, বাঁশি ও হারমোনিকার মতো ইন্সট্রুমেন্টের দারুণ সমন্বয়। এতে তৈরি হয়েছে এক অনন্য মেলোডিক ও ফিউশনধর্মী সাউন্ড। বিশ্ববিখ্যাত সাক্সোফোন বাদক ট্রাভিস জেনকিনস যিনি এই অ্যালবামে সাক্সোফোন বাজিয়ে এক অনন্য মাত্রা যোগ করেন। রেনেসাঁর প্রায় সব অ্যালবামের মতো এখানেও রয়েছে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান। ননাইয়া ননাইয়া কতা কই এর গীতিকার শহীদ মাহমুদ জঙ্গী। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সম্মান জানাতে রেনেসাঁ দিনাজপুর থেকে সাঁওতাল শিল্পীদের আমন্ত্রণ জানায়। তাঁদের ভাষায় দুটি গান অ্যালবামে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যা অ্যালবামটিকে আরও সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় করেছে। গানগুলো একুশ শতকের ভাবনা সময় পরিবর্তন ও মানবিকতা নিয়ে রচিত। পুরো অ্যালবামে গুণগত মান সুরের শুদ্ধতা এবং আধুনিক এক অ্যালবাম। গীতকার আসিফ ইকবালের লেখা তুমি আজ বন্ধু যাবে আমার সাথে, নকীব খানের কন্ঠে অ্যালবামের সবচেয়ে জনপ্রিয় গান। গীতিকার শহীদ মাহমুদ জঙ্গী লেখা হে বাংলাদেশ পিলু খানের কন্ঠে অন্যরকম একটি গান।
হে বাংলাদেশ
তোমার বয়স হল কত?
এখনো হেলে আছ একদিকে।
যেন যে কোন সময় ভেঙ্গে পড়বে।।
হে বাংলাদেশ
কখন দাঁড়াবে শক্ত হয়ে...
কখন দাঁড়াবে নিজ পায়ে।
ফয়সাল সিদ্দিকী বগির কন্ঠে আলাল দুলাল গানটি একটি নস্টালজিয়া করে তুলে। পপ সম্রাট গুুর আজম খানের ঐ গানটার কথা মনে করিয়ে দেয়। গানটির গীতিকা ডা. সালাউদ্দিন সজল। এই অ্যালবামে গান গীতিকার আসিফ ইকবাল এর লেখা চারটি গান আছে। তুমি কি আজ বন্ধু, স্বপ্ন ভরা সুর, রাজনীতির ফিউশন কত যে পথ ঘুরে ঘুরে। কত যে পথ ঘুরে ঘুরে ইমরান স্যারের গাওয়া খুব প্রিয় একটা গান।
কত যে পথ ঘুরে ঘুরে
বিকেলের রোদ্র মেখে দূরে
ব্যস্ততাকে ফেলে চূড়ে
জমিয়ে শুধু আড্ডা মেরে
একটু ছুটি খুঁজে নেওয়া.....
একুশ শতকে গ্রাম বাংলা গানটির গীতিকার ফেরদৌস হোসেন ভূঁইয়া কথায় নকীব খানে কন্ঠে গানটিও অসাধারন। গীতিকার জুলফিকার রাসেল একটি গান জানি বলতে পারো। গীতিকার হেনা ইসলামের জানিনাতো বুকে আমার আর East Of The Atoll বিশ্ববিখ্যাত সাক্সোফোন বাদক ট্রাভিস জেনকিনস এর লেখায় ফয়সাল সিদ্দিকি বগী একটি মৌলিক ইংলিশ ট্রাক। আর দুটি সাওতাল শিল্পীদের ফিউশন। চারটি অ্যালবামের মধ্যে একুশ শতকের রেনেসাঁ নিঃসন্দেহে সবচেয়ে সমৃদ্ধ ও তাদের সৃষ্টিগুলোর অন্যতম একটি। বাংলাদেশের আঞ্চলিক সংস্কৃতি সাউন্ড বহু সংস্কৃতির যন্ত্রসংগীত আর নতুন শতকের সৃজনশক্তি
সব একসঙ্গে মিলেছে রেনেসাঁর নিজস্ব স্বাদে।
রেনেসাঁর যাত্রা শুরু থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের একটি ব্যান্ডের সংগীতভুবনে ধারাবাহিক পরীক্ষা নিরীক্ষা সৃজনশীলতা ও দায়িত্ববোধের এক অবিচল পথচলা। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান পুনর্গঠনের মতো ঐতিহাসিক উদ্যোগ হোক কিংবা আঞ্চলিক সুরকে বিশ্বসংগীতের পরিসরে তুলে ধরা প্রতিটি কাজ করেছে গভীর সম্মান ও নিষ্ঠার সঙ্গে। বিদেশি যন্ত্রশিল্পীদের অংশগ্রহণ বা আধুনিক ইন্সট্রুমেন্টের দক্ষ ব্যবহার সবই প্রমাণ করে যে রেনেসাঁ কেবল একটি ব্যান্ড নয় এটি বাংলা ব্যান্ডের নবজাগরণ ও সৃজনশীল যাত্রার শুরুর কথা। তাদের প্রতিটি অ্যালবাম একেকটি সময়ের দলিল। সুরের ভেতর লুকানো সামাজিক বার্তা ও মানবিক মূল্যবোধের পাঠ। পরিবর্তনের স্রোতে থেকেও তারা মেলোডি, আবেগ ও শুদ্ধ সংগীতধারাকে ধরে রেখেছে। নতুন প্রজন্মের কাছে ভালো সংগীত সঠিক বার্তা এবং দেশ সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ পৌঁছে দেওয়াই ছিল তাদের লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যেই রেনেসাঁ আজও সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে আছে। সময় বদলায় কিন্তু রেনেসাঁর সুর ও আদর্শ চিরকালীন।
--- বাউল পানকৌড়ি
নিলয় দাস এক গিটার সাধকের নাম---Click to Read
কনসার্ট ফর ফাইটার্স ২০০৫ এবং একজন সঞ্জীব চৌধুরী--Click to Read
সমাজের প্রতিচ্ছবি আর প্রতিবাদের সুর: বাংলা ব্যান্ড ইতিহাসের সেরা দশটি গান--Click to Read
Read on mobile
