কবি শামসুর রাহমানের কবিতায় শহীদ নূর হোসেন: বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়

স্বৈরাচার নীপাত যাক
গণতন্ত্র মুক্তি পাক

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে শহীদ নূর হোসেন এক অমর নাম। ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মিছিলে বুকে "স্বৈরাচার নিপাত যাক" এবং পিঠে "গণতন্ত্র মুক্তি পাক” স্লোগান লিখে রাজপথে নেমে আসা সেই তরুণ আজ স্বাধীনচেতা মানুষের প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে আছে। নূর হোসেনের আত্মত্যাগ কবিদের কলমে পেয়েছে অমরত্ব। বিশেষ করে জাতীয় কবি শামসুর রহমান তাঁর কবিতায় এই তরুণ শহীদের রক্তের অগ্নি থেকে গণজাগরণের আলো ছড়িয়ে দিয়েছেন। এই লেখায় কবি শামসুর রহমানের শহীদ নূর হোসেনকে নিয়ে লেখা তিনটি কবিতা থাকছে। কবিতার ভাষায় প্রতিবাদ স্বপ্ন আর গণতন্ত্রের চেতনা জীবন্ত হয়ে উঠেছে।


বুক তার বাংলাদেশের হদয়
শামসুর রাহমান

সারারাত নূর হোসেনের চোখে এক ফোটা ঘুমও
শিশিরের মতো
জমেনি, বরং তার শিরায় শিরায়
জ্বলেছে আতশবাজি সারারাত, কী এক ভীষণ
বিস্ফোরণ সারারাত জাগিয়ে রেখেছে
ওকে, ওর বুকে ঘন ঘন হরিণের লাফ,
কখনো অত্যন্ত ক্ষিপ্র জাগয়ার তাকে
প্রতিদ্বন্বী ভেবে জ্বলজ্বলে
চোখে খর তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে,
এতটুকু ঘুমোতে দেয়নি।

কাল রাত ঢাকা ছিলো প্রেতের নগরী,
সবাই ফিরেছে ঘরে সাত তাড়াতাড়ি । চতুর্দিকে
নিস্তব্ধতা ওৎ পেতে থাকে,
ছায়ার ভেতরে ছায়া, আতঙ্ক একটি
কৃষ্ণাঙ্গ চাদরে মুড়ে দিয়েছে শহরটিকে আপাদমস্তক ।
মাঝে-মাঝে কুকুরে ডাক নৈঃসঙ্গ্যক।
আরো বেশি তীব্র ক'রে তোলে
প্রহরে প্রহরে, নূর হোসেনের চোখে
খোলা পথ ওর
মোহন নগ্নতা নিয়ে আমন্ত্রণ জানায় দুর্বার । অন্ধকার
ঘরে চোখ দুটো অগ্নিঘেরা জানালা,
কব্জিতে তার দপদপ করে ভবিষ্যত।

এমন সকাল তার জীবনে আসেনি কোনোদিন,
মনে হয় ওর; জানালার কাছে পাখি
এরকম সুর
দেয়নি ঝরিয়ে এর আগে, ডালিমের
গাছে পাতাগুলি আগে এমন সতেজ
কখনো হয়নি মনে । জীবনানন্দের
কবিতার মায়াবী আঙুল
তার মনে বিলি কেটে দেয়। অপরূপ সূর্যোদয়,
কেমন আলাদা,
সবার অলক্ষ্যে নূর হোসেনের প্রশস্ত ললাটে
আকা হ'য়ে যায়,
যেন সে নিভীক যোদ্ধা, যাচ্ছে রণাঙ্গনে।

উদোম শরীরে নেমে আসে রাজপথে, বুকে পিঠে
রৌদ্রের অক্ষরে লেখা অনন্য শ্লোগান,
বীরের মুদ্রায় হাটে মিছিলের পুরোভাগে এবং হঠাৎ
শহরে টহলদার ঝাঁক ঝাঁক বন্দুকের সীসা
নূর হোসেনের বুক নয় বাংলাদেশের হৃদয়
ফুটো ক'রে দেয়; বাংলাদেশ
বনপোড়া হরিণীর মতো আর্তনাদ করে, তার
বুক থেকে অবিরল রক্ত ঝরতে থাকে, ঝরতে থাকে।


একজন শহীদের মা বলছেন
শামসুর রাহমান

যাকে দশ মাস দশ দিন পেটে ধরেছি, এখন
সে কোথায়? পুড়িয়ে আমার বুক এই
পোড়া দেশটিকে ভালোবেসে,
ভালোবেসে শাপলা-শালুক, খালবিল, মাছরাঙা
সোমত্ত নদীর বাঁক, দোয়েলের শিস,
দিগন্ত সবুজ-করা টিয়াদের ঝাঁক,
যৌবনের প্রফুল্ল সকালে
ঝরে গ্যাছে । এখন কোথায় ওর হাড়গোড় সার
হচ্ছে ক্ষেতে স্বপ্নময় শস্য হবে বলে
আমি তা জানি না।

সময় কাটতো ওর রাশি রাশি বই পড়ে, খুব
রাত করে ঘুমোতো সে, কখনো কখনো
কণ্ঠে ওর নক্ষত্রের মতো
ফুটতো কী সব কথা, যা ছিলো আমার
বোধের ওপারে । বলতো সে
মাঝে মাঝে, “রাতে স্বপ্নে দেখি
ফুটেছে গোলাপ এক বুকের ভেতরে
মা, তোমার মমতার মতো । তোমার মুখেই দেখি
প্রতিদিন স্বদেশের মুখ এবং যখন তুমি
ঘর ঝাট দাও, ভাবি সরাচ্ছো জঞ্জাল এ-দেশের ।'
মৃত্যু তার, বলে ওরা, করেছে আমাকে মহীয়সী,
আরো কত কথা বলা হয়
যা শুনে আমার মাথা গর্বে দূরের আকাশ ছুঁতে
পারে লহমায়।
নিজস্ব দুঃখের চেয়ে গৌরব অনেক বড়, এই
অলঙ্কৃত ভান নিয়ে দ্রুত ক্ষয়ে যাওয়া
কী দুঃসহ, আমি ছাড়া বুঝবে কে আর পৃথিবীতে?
আমার এ-শৃন্য বুক পোড়ো বাড়ি, যাতে
লক্ষ্মীপেচা ডেকে ওঠে ঘোর মধ্যরাতে, ক্লান্ত লাগে,
দেয় না ঘুমোতে কিছুতেই ফণীমনসার খোঁচা।

যে তন্বীকে ভাবতো সে স্বপ্নের একান্ত সহচরী,
তার দুটি হাতে মেহেদীর ছোপ লাগার আগেই
একটি শিকারী বাজ ওকে
করেছে হনন,
কেননা সে চেয়েছিলো গণতন্ত্র মুক্তি পাক লিখে
বুকে, স্বৈরাচারী শাসকের পতন ঘোষণা করে
হেঁটে যাবে রাজপথে, মাথা তার ছোঁবে
আকাশের মেঘলা খিলান। এখন সে জীবনের সাজ-পরা
কিংবদন্তি, কিন্ত আমি কী করবো এই
কিংবদন্তি নিয়ে? স্বপ্নে-দেখা কী নির্দয়
গোলাপ ফুটেছে দ্যাখো, দ্যাখো দেশবাসী
তরতাজা যৌবনের বুকে!

হয়তো ভবিষ্যতে অনেকেই
তার কথা বলে দিব্যি মাতাবে শ্রোতার ভিড় আর
করবে এমন কেউ কেউ উচ্চারণ
ওর নাম, হোমরা-চোমরা তারা, যারা
তার কথা বলছে শুনলে সে আবার অকস্মাৎ
জিন্দা হয়ে পতাকার মতো হাত তুলে
জনসভা পণ্ড করে জানাবে তুমুল প্রতিবাদ,
ওদের মুখোশ-আটা ভণ্ড মুখে দেবে ছুড়ে থুথু, শুধু থুথু।।


আলো-ঝরানো ডানা
শামসুর রাহমান

রোজকার মতো আজো আমার ঘুম ভাঙলো
ভোরবেলা । হাওয়ার সঙ্গে নারকেল গাছের পাতার খেলা
দেখলাম দুচোখ ভরে । একটা পাখি
এসে নাচানাচি শুরু করলো ডালে, শিস্ও দিলো
দু-একবার ৷ এই মুহূর্তে মনে হলো, কোনো শোক নেই
পৃথিবীতে; কোনো হতাশা অথবা
বিক্ষোভের কারণের কথাও মনে করতে পারলাম না। চারদিকের
শোভা আমাকে রাখলো আচ্ছন্ন করে।

এই মুহূর্তে স্তোত্র রচনা করতে পারি গাছের পাতায়
মিশে-যাওয়া রোদের, পাখির শিসের বিষয়ে । বাথরুমে
ট্যাপ থেকে টপটপানো পানি, আলনায় ঝোলানো
উপহার-পাওয়া পাঞ্জাবি, ফ্যানের হাওয়ায় ওড়া
পেঙ্গুইনের আধ-পড়া পেপার ব্যাকের স্তরতি গাইতে পারি।

আমার পক্ষে অসম্ভব নয় হদয়জোড়া
ভালবাসা জয়, সামনের দিকে প্রসারিত
নির্জন পথ কিংবা সেই মন-কেমন-করা ঘর, যেখানে
আমার প্রিয়তমা বসত করে, গুন গুন করে গান গায়,
যেখানে ঝরে যায়
অনেক অপূর্ণ আকাঙ্খার মুকুল, রুক্ষ জমিনে
ফুটে-ওঠা স্মিত ফুল, তার কপালে লুটিয়ে-পড়া চুল, ওর
দ্বিধা-জড়ানো খানিক দাড়িয়ে থাক । সিড়ির ধাপে
আমার মায়ের মুখের সোনালি বিহ্বলতার
স্তব রচনা করা।

আমার যে-মেয়ে বিদেশে গোছাচ্ছে সংসার, যাকে
দীর্ঘকাল দেখিনে, কিংবা সেই ছেলে, যাকে মৃত্যু ছিনিয়ে
নিয়ে গেছে আমার বুকের
পাজর খসিয়ে তাদের নিয়ে বিধুর কিছু লেখার
বেদনা আমি সইতে পারি সহজেই । দুজনের
মধ্যে যে চিরকালীন দূরত্ব বিদ্যমান, তাকে সরিয়ে
ফেলার ব্যর্থতা অন্ধকারে আবৃত বৃষ্টির দিন যে তোলপাড়
সৃষ্টি করে মনের গহনে, যে বুলবুলি কোনোদিন
এসে বসবে না আমার ঘরের ঘৃলঘুলিতে,
এসব কথাও মঞ্জরিত হতে পারে আমার খাতার পাতায় ।
কিন্তু আজ ভোরেবেলা আমি নিজেকে সরিয়ে
নিচ্ছি এসব থেকে । আজ বৃক্ষ, পাথর আর
নক্ষত্রের স্তবগান গাইবো না । আমি উচ্চারণ করবো
সেই মানুষটির নাম, যাকে আমি
কোনোদিন দেখিনি অথচ মনে হয় দীর্ঘকাল সে
জড়িয়ে আছে আমার দিন যাপনে,
আমার নিভৃত স্বপ্নে, যে আমার সঙ্গে কথা বলে বার বার
অন্তরঙ্গ কণ্ঠস্বরে । তার ঠোটের নড়া, হাসি
এবং চোখের আগুন আমার মুখস্থ,
অথচ তাকে কোনোদিন চোখেও দেখিনি।

এইতো আমি দেখছি পুরাকালের বীরের ভঙ্গিতে
কোন্‌ দুর্বার ইঙ্গিতে সে কোনো ভোজসভায় নয়,
হেটে হচ্ছে ধুন্দুমার যুদ্ধক্ষেত্রে, স্পষ্ট দেখছি সে
ছুটে চলেছে উদোম গায়ে । মেঘের গর্জনের মতো
সাহস আর অন্তহীন দেশপ্রেম ছাড়া
তার কোনো অস্ত্র নেই। সে ছুটে চলেছে শত্রুদের
নির্মম ব্যুহের ভেতরে । তার যাত্রা ছিলো
ফিরে না আসার মহিমা-খচিত |
ওর মা কাতর কণ্ঠে মিনতি জানিয়েছিলেন,
নূর নূর, বাছা আমার, আয় ফিরে আয়।
কিন্তু সে ফিরে আসেনি । ফিরে আসার জন্যে
অমন করে কেউ কোথাও যায় না
বুনো বরাহের দঙ্গলে।
বর্ষীয়ান পিতা, যিনি বাহান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিতে
পা রেখেছিলেন ঢাকার মাটিতে,
তিনি “নূর নূর বলে ডাকেন, কিন্তু এক থমথমে নিস্তব্ধতা ছাড়া
তিনি কোনো সাড়া পান না। তিনি এই পাথুরে
শহরের উপেক্ষিত
দরিদ্র মন্ডলীর একজন, অথচ তাঁর মাথায়
জ্বলজ্বলে সোনার মুকুট, যা পরিয়ে দিয়েছে
তাঁর হৃদয়ের নূর। সেই মুকুটের দিকে তাকানোর
সময় কোথায় এই নষ্ট শহরের?

দু'দুটো বর্ষা বিদায় নিয়েছে বাংলাদেশকে ধুইয়ে,
কিন্তু আমি সত্যি দেখতে পাচ্ছি, নেকড়ের দাঁতের মতো
বুলেটে ঝাঝরা এ যুবার বুকের রক্ত প্রবল
বর্ধার অবিরল জলও রাজপথ আজো
মুছে ফেলতে পারেনি । প্রবালের মতো জ্বলছে চাপ চাপ
রক্ত আর দেখছি ওর দুই কাধে।
গজিয়ে উঠেছে আলো-ঝরানো ডানা । আমাদের
চোখ কখনো কখনো ঝলসে ওঠে সেই আলোয় ।
না, তাকে ওরা হত্যা করতে পারেনি । তা হলে
কে অমন আলো-ঝরানো এক জোড়া
ডানা নিয়ে উড়ে যাচ্ছে মেঘে মেঘে, হেঁটে চলেছে
রাজপথে? ওর চোখে নক্ষত্রের নীড়, বাহুতে
অনির্বাণ বরাভয় ৷ নূর, নূর, নূর হোসেন বলে
ডাকছে রাজপথ, নদীনালা, গাছপালা, নীলকণ্ঠ
বাংলাদেশ । কখন আবার দশমিক
ওলট পালট করে জেগে উঠবে নতুন যৌবন?


নূর হোসেন (১৯৬১–১০ নভেম্বর ১৯৮৭) ছিলেন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক অমর শহীদ। যিনি স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামে নিজের জীবন উৎসর্গ করে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার ঝাটিবুনিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া নূর হোসেন দারিদ্র্যের কারণে অষ্টম শ্রেণির পর পড়াশোনা ছেড়ে গাড়িচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং পরবর্তীতে ঢাকা জেলা আওয়ামী মোটর চালক লীগের প্রচার সম্পাদক হিসেবে রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর বিএনপি ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আয়োজিত স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের দিনে তিনি বুকে-পিঠে সাদা রঙে লিখেছিলেন “স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক” যা পরিণত হয় গণতন্ত্রের প্রতীকে। সেদিন ঢাকা জিপিওর সামনে পুলিশের গুলিতে নূর হোসেনসহ আরও দুইজন নিহত হন। তার এই আত্মত্যাগে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে যা ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনে এরশাদের পতনের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ সুগম করে। পরবর্তীতে জিরো পয়েন্টের নামকরণ হয় শহীদ নূর হোসেন চত্বর। ১৯৯১ সালে প্রকাশিত হয় তার স্মারক ডাকটিকিট এবং ১০ নভেম্বর সরকারিভাবে শহীদ নূর হোসেন দিবস হিসেবে পালিত হতে থাকে। নূর হোসেন আজ বাংলাদেশের গণতন্ত্রের সংগ্রামের এক অনন্ত প্রেরণার প্রতীক। আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।


--- বাউল পানকৌড়ি
কবি শামসুর রাহমানের কবিতায় লালন ভাবধারা--Click to Read
বঙ্গবন্ধু পদ্মা মেঘনা যমুনায় আর কবিতায়--Click to Read


Read on mobile

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url