কাঠের কারুকাজে কাঠ মসজিদ- পিরোজপুর মঠবাড়িয়ার মমিন মসজিদ
কাঠের কারুকাজে কাঠ মসজিদ- পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার মমিন মসজিদ
পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার বুড়িরচর গ্রামে আছে কাঠের কারুকাজে নির্মিত এক মসজিদ। যে মসজিদটির নাম মমিন মসজিদ। অবশ্যই বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী মসজিদগুলোর মধ্যে অন্যতম। স্থানীয়ভাবে কাঠ মসজিদ নামেই পরিচিত। ১৯১৩ সালে মৌলভি মমিন উদ্দিন আকনের তত্ত্বাবধানে নির্মিত এই মসজিদ শত বছরেরও বেশি সময়, আজকের সময় ধরলে ১১২ বছর ধরে টিকে আছে। অনিন্দ্য সুন্দর তার কারুকার্য এবং নকশা। মসজিদটিতে শাল, সেগুন এবং লোহা কাঠ ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি লোহার পেরেক ব্যবহার না করে কাঠ ব্যবহার করা হয়েছে। কাঠের শলাকায় করে কাঠের দলক দিয়ে কাঠামোকে শক্ত করতে জোড়া দিতে।
মসজিদের মূল আকৃতি ২৪ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১৮ ফুট প্রস্থের। ভেতরে পর্যাপ্ত আলোবাতাসের জন্য পাটাতনের মাঝখানে একটি দোচালা টিনের ছাউনি রয়েছে। মসজিদের উত্তর ও দক্ষিণ দিকে দুটি করে আর পূর্ব ও পশ্চিমে চারটি করে জানালা রয়েছে। পূর্বদিকে একটিমাত্র প্রবেশদ্বার যার ওপর কারুকার্যখচিত দুটি দরজা এবং আরবি ক্যালিগ্রাফি দেখা যায়। এই বৈচিত্রময় ক্যালিগ্রাফি মসজিদটির সৌন্দর্য ও স্বতন্ত্রতা আরও বৃদ্ধি করেছে।
মঠবাড়িয়ার বুড়িরচর গ্রামের তরুণ ধর্মপ্রাণ মমিন উদ্দিন আকনের বাসার আশেপাশে মসজিদ না থাকায় একটু দূরের মসজিদে নামাজ পড়তে যেতে হতো। বিষয় বিবেচনায় নিজের জায়গায় নিজের বাসার পাশে একটি মসজিদ তৈরির উদ্যোগ নেন। প্রথমদিকে তিনি ইটের মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা করলেও পরে স্থানীয় কাঠের ঐতিহ্য কে সম্মান ভালবেসে তিনি সিদ্ধান্ত নেন পুরো মসজিদটি কাঠ দিয়ে তৈরি করবেন। সে সময় বুড়িরচর গ্রাম ছিল কাঠ ও ফলগাছে পরিপূর্ণ। এই প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে মমিন উদ্দিন আকন মসজিদের নকশায় অন্তর্ভুক্ত করেন পাতা, ফুল ও আনারসের মতো ফলের মোটিফ। কাঠের ওপর এসব কারুকাজে ব্যবহৃত হয়েছিল প্রাকৃতিক রং। তিনি নিজে ইসলামিক চারুলিপি ও আরবি ক্যালিগ্রাফিতে পারদর্শী ছিলেন জানা যায়। যা মসজিদের অলংকরণে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। মসজিদের প্রবেশদ্বার ও মেহরাবে দেখা যায় চমৎকার আরবি লিপির নকশা রয়েছে। ১৯১৩ সালে মমিন উদ্দিন আকন স্বরূপকাঠি এলাকা থেকে ২১ জন দক্ষ কারিগর এবং বার্মা ও চট্টগ্রাম থেকে সংগ্রহ করেন সেগুন ও লোহা কাঠ। ২১ জন কারিগর টানা সাত বছর পরিশ্রম করে এই মসজিদ নির্মাণ সম্পন্ন করেন বলে জানা যায়। মসজিদের পুরো পরিকল্পনা, নকশা ও নির্মাণকাজের তত্ত্বাবধানে ছিলেন নিজেই মমিন উদ্দিন আকন। মসজিদটি মনে মত করে তৈরি করতে খরচ হয় অনেক সে সময়ের প্রায় ১৫-২০ হাজার টাকা। মমিন উদ্দিন আকন নিজেই মৌলভী ছিলেন। তার নাম পরে মৌলভী মমিন উদ্দিন আকন নামেই ইতিহাসে স্থান পেয়েছে।
২০০৩ সালের ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০০৮ এবং ২০২১ সালে খুলনা জাদুঘরের আওতায় মসজিদটির কিছু সংস্কার করা হয়েছে। তবে মসজিদটি সম্পূর্ণভাবে সংরক্ষণ করতে হলে এর উপরে একটি ছাদ দেওয়া উচিত বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। এতে কাঠগুলো সুরক্ষিত থাকবে এবং বৃষ্টি বা ঝড়ের প্রভাবে ক্ষয় হবে না। এখন বইপত্র তো আর না নেট থেকে গুগুল করে জানা যায় বিশ্বের ইতিহাসে এ ধরনের কাঠের মসজিদ একসময় কাশ্মীরে ছিল। ১৮৮৫ সালের ভূমিকম্পে সেটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। এখন বর্তমান এই সময়ে তাহলে মঠবাড়িয়ার মমিন মসজিদই আজ দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র জীবন্ত কাঠের মসজিদের মর্যাদায় গৌরব সম্মানের নিদর্শন হিসেবে টিকে আছে। ঐতিহ্য স্থাপনাটি টিকে থাকুক আর হাজার বছর।
ঢাকা থেকে খুব সহজেই যাওয়া যায়। আপনি চাইলে সময় নিয়ে অলস ভ্রমনে দেখে আসতে পারেন। অনিন্দ্য সুন্দর ছোট এই কাঠের মসজিদটি। পদ্মা সেতুর কারনে খুব সহজে এবং অল্প সময়ে পিরোজপুর পৌছানো যায়। ইচ্ছে হলে যেতে পারেন লঞ্চে করে। সদরঘাট থেকে রাজদূত, আচল, হিমাচল ও পারাবত লঞ্চে পিরোজপুরের হুলারহাট ঘাটে নামুন। তারপর স্থানীয় যানবাহনে মঠবাড়িয়া মমিন মসজিদ যাওয়া যায় সহজেই। আর বরিশাল হয়ে গেলে রুপাতলি বাসস্ট্যান্ড থেকে মঠবাড়িয়াগামী বাসে তুষখালি নামতে হয়। তারপর রিকশায় মসজিদে পৌঁছানো যায়। পিরোজপুরের মিষ্টি খুবই বিখ্যাত দুটি দোকানের নাম বলছি এক দুলালের দধি ভান্ডারের রসগোল্লা ও রসমালাই আর দুই ঋতুপর্ণা মিষ্টান্ন ভান্ডারের রসমনজুরি।
মঠবাড়িয়ার এই কাঠের মসজিদ শুধু স্থাপত্যের নিদর্শন নয়, এটি ইতিহাস ও ধর্মীয় চেতনার একটি জীবন্ত সাক্ষী। শতবর্ষেরও বেশি সময় পেরিয়েও মসজিদটি তার সৌন্দর্য এবং ঐতিহ্য ধরে রেখেছে, যা আজকের প্রজন্মের জন্যও সমানভাবে অনুপ্রেরণার উৎস।