সৈয়দপুরের ঐতিহাসিক চিনি করা চিনি মসজিদ : প্রাচীন স্থাপত্যের অনিন্দ্য সুন্দর নিদর্শন

বাংলাদেশের প্রাচীন মসজিদসমূহ শুধু ধর্মীয় কেন্দ্র নয় এগুলো দেশটির ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক ও স্থাপত্যিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রাচীন নগরী বা নদী তীরবর্তী শহর এবং গ্রামীণ অঞ্চলে থাকা মসজিদগুলোতে দেশের মুসলিম ইতিহাসের শিল্প স্থাপত্য এবং ধর্মচর্চার প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যায়। প্রাচীন মসজিদগুলোতে মোগল সুলতানি ও স্থানীয় স্থাপত্যশৈলীর সমন্বয়ে তৈরি হয়েছিল। এসব মসজিদ দেশের ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। আজকে থাকছে উত্তরের চিনি করা মসজিদ চিনি মসজিদের কথা।


বাংলাদেশের প্রাচীন শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো নীলফামারীর সৈয়দপুর। ছোট একটি শহর হলেও এখানকার স্থাপত্য এবং ঐতিহ্য পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। বিশেষ করে স্থানীয়রা এবং দেশের অন্যান্য প্রান্ত থেকে আগত দর্শনার্থীদের জন্য সৈয়দপুরের ইসলামবাগ এলাকায় অবস্থিত চিনি মসজিদ যা অন্য নামে পরিচিত চীনা মসজিদ। এক অনিন্দ্য সুন্দর মসজিদ। মসজিদটির সৌন্দর্যই এর প্রধান আকর্ষণ। মোগল স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত এই মসজিদের দেয়ালগুলোতে রয়েছে বিস্ময়কর চিনামাটির নকশা যা সূর্যের আলোতে ঝিকমিক করে দীর্ঘ দূর থেকেও দর্শনীয় মনে হয়। দেয়ালে খোদাই করা ফুল ফুলের টব চাঁদ তারা এবং প্রাকৃতিক দৃশ্যের কারুকাজ দেখে যে কেউ মুগ্ধ হতে বাধ্য। মসজিদের মেঝে তৈরি করা হয়েছে মার্বেল পাথর দিয়ে যা স্থাপত্যের দৃঢ়তা ও সৌন্দর্য উভয়ই বৃদ্ধি করেছে।

চিনি মসজিদ

১৮৬৩ সালে স্থানীয় ধনাঢ্য ব্যবসায়ী হাজী বাকের আলী ও হাজী মুকু প্রথমে ছন ও বাঁশ ব্যবহার করে মসজিদটি নির্মাণ করেন। শুরুতে এটি ছিল একটি ক্ষুদ্র কাঠের স্থাপনা। পরবর্তীতে মুসল্লিদের সংখ্যা বাড়ায় মসজিদটি টিন ও শন দিয়ে প্রসারিত করা হয়। এরপর ১৯২০ সালে স্থানীয় উদ্যোগে হাজী হাফিজ আবদুল করিম নিজেই নকশা তৈরি করে মসজিদটি স্থায়ী পাকা কাঠামোয় রূপান্তর করার উদ্যোগ নেন। কলকাতা থেকে আনা ২৪৩টি মার্বেল পাথর এবং বগুড়ার একটি সিরামিক কারখানার ২৫ টন ভাঙা কাপ পিরিচ ব্যবহার করে মসজিদটির দেয়ালে অনন্য কারুকাজ করা হয়। গাঁথুনিতে ব্যবহার করা হয় চুন ও সুরকি এবং অনেকেই স্বেচ্ছাশ্রমে এই নির্মাণে অংশ নেন। প্রথম পাকা মসজিদটির আয়তন ছিল ৩৯ বাই ৪০ ফুট।

চিনি মসজিদ

পরবর্তীতে ১৯৬৫ সালে মসজিদের দক্ষিণ অংশে আরও ২৫ ফুট সম্প্রসারণ করা হয়। বর্তমানে মসজিদটির মূল ভবনে তিনটি বড় গম্বুজ এবং মোট ৪৮টি মিনার রয়েছে। উত্তর ও দক্ষিণ প্রান্তে দুটি বড় ফটক। দক্ষিণ অংশে অজুখানা মসজিদে একসঙ্গে প্রায় ১,২০০ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য দেয়ালে চিনামাটির থালার ভগ্নাংশ ও কাঁচের টুকরা বসানো হয়। এই পদ্ধতিকে বলা হয় চিনি করা বা চিনি দানার কাজ করা। এখান থেকেই মসজিদের নামকরণ হয়েছে চিনি মসজিদ বা চীনা মসজিদ। এর নকশা করেছেন মো. মোখতুল ও নবী বক্স। মসজিদের দেয়ালে অঙ্কিত রয়েছে ফুলদানি ফুলের ঝাড় গোলাপ ফুল একটি বৃত্তে ফুল চাঁদ তারাসহ নানা চিত্র। মার্বেল পাথরের ব্যবহার এবং ঝিকমিক চিনি কারুকাজ একত্রে মসজিদটিকে করেছে দেশের মধ্যে অনন্য।

চিনি মসজিদ

সৈয়দপুর রেলস্টেশন থেকে পূর্ব-উত্তর দিকে ২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছানো যায় চিনি মসজিদে। সৈয়দপুর বিমানবন্দর ও কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে। পর্যটকরা এখানে আসেন শুধু নামাজ আদায় করতে নয় বরং এর শিল্পকলা ও স্থাপত্য সৌন্দর্য দেখার জন্য। মসজিদের প্রশাসন পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থাও করেছেন। তবে বর্তমানে মুসল্লির সংখ্যা বৃদ্ধি এবং অর্থের সীমাবদ্ধতার কারণে স্থান সংকুলানের সমস্যা দেখা দিয়েছে। স্থানীয় মসজিদ কমিটি ও পৌরসভা সমস্যার সমাধানের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। সরকারি উদ্যোগে চিনি মসজিদ সংরক্ষণ করা উচিত কারন মসজিদটি শুধু ধর্মীয় স্থান নয় এটি সৈয়দপুরের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক।

চিনি মসজিদ

চিনি মসজিদ ২০০ বছরের ইতিহাসে আজও প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এটি বাংলাদেশের মসজিদ স্থাপত্যের গর্ব এবং ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। লোকমুখে শোনা যায়, শঙ্কু নামের জনৈক হিন্দু রাজমিস্ত্রী দৈনিক ১০ আনা মজুরিতে মসজিদের নির্মাণ কাজ নতুনভাবে শুরু করেন। স্থানীয় এলাকাবাসী স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে তাকে সাহায্য করতে থাকে।

চিনি মসজিদ

চিনি মসজিদ ভ্রমণের সেরা সময় শীতকাল অর্থাৎ নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত। এ সময় আবহাওয়া ঠান্ডা ও আরামদায়ক থাকে যা ভ্রমণের জন্য আদর্শ। ঢাকা থেকে নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনে সরাসরি সৈয়দপুরে পৌঁছানো যায়। ট্রেনের ভাড়া তুলনামূলকভাবে কম এবং যাত্রাও আরামদায়ক। চাইলে গাবতলী, কলেজগেট ও মহাখালী থেকে সৈয়দপুরগামী এনা, হানিফ, শ্যামলী, নাবিল ও এস আলমসহ বিভিন্ন বাস সার্ভিসেও যাওয়া যায়। সময় সাশ্রয়ের জন্য বিমানযোগেও সৈয়দপুরে পৌঁছানো যায়। বিমানে মাত্র ৩০ থেকে ৪০ মিনিটেই গন্তব্যে পৌঁছে দেয়।

চিনি মসজিদ

ঢাকা থেকে নিলফামারী পৌছালে চিনি মসজিদে পৌঁছানো বেশ সহজ। চিনি মসজিদ অবস্থিত নীলফামারী সদর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে সৈয়দপুর উপজেলার ইসলামবাগ এলাকায়। নীলফামারী জেলা শহর থেকে সড়কপথে সৈয়দপুরে আসা যায় স্থানীয় বাস বা সিএজিতে। এ ছাড়া রেলপথে ভ্রমণকারীরা সৈয়দপুর রেলওয়ে স্টেশনে নেমে সেখান থেকে রিকশা বা অটোরিকশায় চিনি মসজিদে যেতে পারেন। স্টেশন থেকে মসজিদের দূরত্ব প্রায় ২ কিলোমিটার।

চিনি মসজিদ

সৈয়দপুরে ভ্রমণের সময় আরামদায়ক আবাসনের জন্য বেশ কিছু ভালো হোটেল রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো দিয়াজ হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টস, যা উত্তরা ইপিজেড এলাকায় অবস্থিত (সৈয়দপুর, নীলফামারী-৫৩০০, বাংলাদেশ)। এছাড়াও নীলফামারী ও সৈয়দপুর শহরে বিভিন্ন মানসম্মত হোটেল পাওয়া যায়। আপনার বাজেট ও পছন্দ অনুযায়ী অ্যাপোল হোটেল, বনফুল (সৈয়দপুর রোড), অবকাশ (এবাদত প্লাজা) কিংবা নাভানা আবাসিক হোটেল-এ অবস্থান করতে পারেন। এসব হোটেলে নিরাপদ পরিবেশ, উন্নত রুম সার্ভিস ও স্থানীয় খাবারের ভালো ব্যবস্থা রয়েছে।

চিনি মসজিদ

--- বাউল পানকৌড়ি
কাঠের কারুকাজে কাঠ মসজিদ--Click to Read
সুলতানি স্থাপত্যের নিদর্শন বাবা আদম মসজিদ--Click to Read
দিল্লির শাহী জামে মসজিদের নকশার অনুকরণে এক মাত্র মসজিদ---Click to Read






Read on mobile

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url