গগন হরকরা যার গানের সুরে আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি
গগন হরকরা যার গানের সুরে আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি
গগন হরকরা যার ভাল নাম গগনচন্দ্র দাস। তবে গগন হরকরা নামেই তিনি ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন। নামের সাথে হরকরা শব্দটা কি কারনে যুক্ত হল বা তিনি নিজেই যুক্ত করেছিলেন। হরকরা অর্থ কি? কোন পেশাকে বুঝায় এর একটু বলি। হরকরা মানে হলো সংবাদবাহক। যে চিঠি বা অন্যান্য বার্তা বহন করে। এই শব্দটি "ডাক হরকরা" এর অংশ হিসেবে বেশি ব্যবহৃত হয়। যার অর্থ পোস্টম্যান বা ডাক পিয়ন। যে এক ডাকঘর থেকে অন্য ডাকঘরে চিঠি বা অন্যান্য জিনিসপত্র বহন করে বা বাড়িতে বাড়িতে বিলি করে। এটি একসময় ব্রিটিশ এবং পাকিস্তান আমলে গুরুত্বপূর্ণ পেশা ও ভূমিকা পালন করত। কবিতার লাইনেও বলা যায় রানার ছুটেছে তাই ঝুম্ঝুম্ ঘন্টা বাজছে রাতে রানার চলেছে খবরের বোঝা হাতে, রানার চলেছে, রানার ! রানার হচ্ছে হরকরা। গগনচন্দ্র দাস যার ডাক নাম গগন তাঁর পেশা ছিলো চিঠি বিলি করা বা হরকরার কাজ। তিনি শিলাইদহ ডাকঘরে চিঠি বিলির কাজ করতেন। সেই থেকে সেই কারনেই নামের শেষে হরকরা। ইতিহানে স্থান করে নেওয়া গগন হরকরা।
গগন হরকরা চিঠি বিলি করা পেশার সাথে ছিলেন একজন কৃষক। এই দুইটি পেশা থেকে বুঝায় কঠিন পরিশ্রমি একজন ছিলেন। এর বাহিরে তাঁর সাধনার থেকে তিনি ছিলেন একজন কবিয়াল, লোক সঙ্গীত শিল্পী, গীতিকার এবং একজন মনে প্রাণে বাউল। শুভ জন্মের সঠিক সালটা জানা যায়নি তবে আনুমানিক ১৮৪৫ইং বলা হয়। জন্ম স্থান কসবা, গোবরখালী গ্রাম, শিলাইদহ, কুমারখালী, কুষ্টিয়া। পিতা মাতার নাম এবং পরিচয় পাওয়া যায়নি। তবে জানা যায় তাঁর এক ছেলে ছিল যার নাম কিরণ চন্দ্র দাস। ঠিক একই ভাবে তাঁর গানের শুরু এবং দীক্ষার বিষয়টাও ইতিহাসে উঠে আসে নাই। তবে এতটুকু জানা যায় ফকির লালন সাঁইয়ের সাথে তাঁর সম্পর্ক্য পরিচয় ছিলো। ফকির লালন সাঁই তাঁকে এবং তাঁর গানকে পছন্দ করতেন। ঠিক একইভাবে কাঙাল হরিনাথ, মীর মোশারফ হোসেন এবং কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথেও বিশেষ অন্তরঙ্গতা ছিল।
কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর সাথে গগন হরকরার পরিচয়ের একটা গল্প আছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পারিবারিক জমিদারি দেখাশোনার জন্য শিলাইদহ ও শাহজাদপুরে নিয়মিত যাতায়াত করতেন। এই সময়ে তিনি বাউল গানের প্রতি গভীর আকর্ষণ অনুভব করতে শুরু করেন। লালন, গোসাঁই গোপাল, ফিকিরচাঁদ, সর্বক্ষেপী বোষ্টমী, গোসাঁই রামলালের মতো অসংখ্য বাউলের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। বাউল-ফকিরদের গান কবিকে এক অন্য এক সুরের জগতে নিয়ে যেত। এসব তিনি নিজেই বলেছেন। কবি গুরুর সাথে গগন হরকরার পরিচয় হয় এভাবে, কবি বজরার ছাদে বসে পদ্মার অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করছিলেন। সেই সময় শিলাইদহ ডাকঘরের ডাক হরকরা গগন আপন মনে গান গাইতে গাইতে পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। গানটি শুনে কবি মুগ্ধ হয়ে হরকরাকে ডেকে পাঠান। গ্রামের মানুষ তাকে গগন হরকরা নামে চেনে। কিন্তু তিনি কবির কাছে পরিচয় দিয়েছিলেন গগনচন্দ্র দাস পুরো নামটা বলে। সেই দিন থেকেই কবির সাথে গগন হরকরার একটি সুসম্পর্ক্য তৈরি হয়। রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে আসলে গগন হরকরাকে ডেকে পাঠাতেন। তাঁর কাছে তাঁর নিজের এবং ফকির লালন সাঁইয়ের গান শুনতেন। কবি তার তার বন্ধু ও গুণীজনদের জন্য কুঠিবাড়িতে প্রায়ই গানের অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন। সে সব অনুষ্ঠানে গগন হরকরাও থাকতেন।
কবি গুরুর সাথে এই অন্তরঙ্গতার কারনেই গগন হরকরা জড়িয়ে আছেন আমাদের জাতীয় সংগীতের সাথে ইতিহাস হয়ে। তাঁর রচিত ও সুরে গাওয়া আমি কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যে রে’ গানটি শুনে মুগ্ধ হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ।এবং তাঁকে গগন হরকরার গানটি প্রভাবিত করে। পরবর্তীতে গগন হরকরার সেই সুরেই কবি রচনা করেন আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি। যে গানটি আমাদের জাতীয় সংগীত আমাদের বাংলাদেশিদের অহংকার। কিছু রাজাকার আর পাপিস্থানের বীজদের এই গানটি নিয়ে এলার্জি এখন আছে এবং থাকবে। রবীন্দ্রনাথ গগণের নাম ও তার গানের বিষয়ে তার প্রবন্ধ An Indian Folk Religion এ উল্লেখ করেন। সেখানে আমি কোথায় পাবো তারে গানটির উল্লেখ করে রবীন্দ্রনাথ বলেন, The first Baul song, which I chanced to hear with any attention, profoundly stirred my mind.
আমি কোথায় পাবো তারে আমার মনের মানুষ যে রে
হারায়ে সেই মানুষে তার উদ্দেশে বেড়াই ঘুরে
আমি বেড়াই ঘুরে দেশ বিদেশে
কোথায় পাবো তারে আমার মনের মানুষ যে রে।
লেগে সেই হৃদয় শশী সদা প্রাণ হয় উদাসী
পেলে মন হতো খুশি দিবা-নিশি দেখতাম নয়ন ভরে
ও তার প্রেমানলে মরছি জ্বলে নিভাই কেমন করে
মরি হায় হায় রে ও তার প্রেমানলে মরছি জ্বলে নিভাই কেমন করে
ও তার বিচ্ছেদে প্রাণ কেমন করে দেখনা তোরা
ও রে দেখনা তোরা হৃদয় চিরে
কোথায় পাবো তারে আমার মনের মানুষ যে রে।
দেবো তার তুলনা কি যার প্রেমে সবাই যে সুখী
হেরিলে জুড়ায় আঁখি সামান্যে কি দেখিতে পারে তারে!
তারে যে দেখেছে সেই মজেছে ঠাই দিয়ে সংসারে।
ও সে না জানি কুহক জানে
অলক্ষ্যে মন চুরি করে, কটাক্ষে মন চুরি করে;
কোথায় পাবো তারে আমার মনের মানুষ যে রে।
কুলো মান সব গেলো রে তবু না পেলাম তারে
প্রেমের লেশ নাই অন্তরে তাইতে মরি দেখা দেয় না সে যে
ও তার বসত কোথা না জেনে তাই গগন ভেবে মরে
মরি হায় হায় রে ও তার বসত কোথা না জেনে তাই গগন ভেবে মরে
যদি সেই মানুষের হদিস জানিস কৃপা করে
ব্যথার ব্যথি হয়ে বলে দে রে
কোথায় পাবো তারে আমার মনের মানুষ যে রে।
হারায়ে সেই মানুষে তার উদ্দেশে বেড়াই ঘুরে
আমি বেড়াই ঘুরে দেশ বিদেশে
কোথায় পাবো তারে আমার মনের মানুষ যে রে
আমি কোথায় পাবো তারে আমার মনের মানুষ যে রে।
Read on mobile