লালন সাঁইয়ের জীবনদর্শন, মানবতা ও ভক্তির প্রকাশ–সংগৃহীত গান ও গানের কথা : পর্ব-৩

লালন সাঁইয়ের জীবনদর্শন, মানবতা ও ভক্তির প্রকাশ–সংগৃহীত গান ও গানের কথা : পর্ব-৩

ফকির লালনের গান শুধু সঙ্গীত নয় এগুলো হলো জীবনের গভীর চেতনার প্রতিফলন। প্রতিটি গান আমাদের শেখায় কিভাবে প্রকৃত সুখ শান্তি ও মানবতা অর্জন করা যায় সাধনার অন্তর্দৃষ্টি এবং নিঃস্বার্থ প্রেমের মাধ্যমে। লালনের অমৃত বানী মানুষের অন্তরে লুকিয়ে থাকা মনের মানুষ কে চিনতে সাহায্য করে এবং আমাদের মনে করিয়ে দেয় জীবনকে বোঝার জন্য বাহ্যিক ধন-সম্পদ বা সামাজিক মর্যাদা নয় দরকার মানবতার উচ্চতম মূল্যবোধ।

এই ধারাবাহিক পর্বে উপস্থাপিত গানগুলো আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই শিক্ষা এবং প্রতিটি মানুষের মধ্যে লুকিয়ে আছে এক অপরিসীম মানবিক শক্তি। লালনের এই বার্তা আজও প্রাসঙ্গিক, যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সত্য, প্রেম এবং মানবিকতার পথে চলতে প্রেরণা দেয়।

 👉 পর্ব-৩ (২১ থেকে ৩০)

2️⃣1️⃣ মিলন হ‌বে কত দি‌নে 
2️⃣2️⃣ মানুষ ভজ‌লে সোনার মানুষ হ‌বি
2️⃣3️⃣ মানুষ মানুষ সবাই ব‌লে
2️⃣4️⃣ মধুর দেল দরিয়ায় ডুবে করো ফকিরি
2️⃣5️⃣ আমার আঁধার ঘরে জ্বলছে বাতি
2️⃣6️⃣ গু‌নে প‌ড়ে সার‌লি দফা 
2️⃣7️⃣ রসের রসিক না হলে 
2️⃣8️⃣ এমন মানব জনম আর কি হবে
2️⃣9️⃣ সময় গে‌লে সাধন হ‌বে না
3️⃣0️⃣ র‌বে না ধন জীবনও যৌবন


(২১)
অমৃত লালন বানী
মিলন হ‌বে কত দি‌নে

মিলন হবে কত দিনে
আমার মনের মানুষের সনে
চাতক প্রায় অহর্নিশি
চেয়ে আছি কালো শশী
হব বলে চরন-দাসী
ও তা হয় না কপাল-গুণে।
মেঘের বিদ্যুৎ মেঘেই যেমন
লুকালে না পাই অন্বেষণ
কালারে হারায়ে তেমন
ঐ রূপ হেরি এ দর্পনে।
যখন ও-রূপ স্মরন হয়
থাকে না লোক-লজ্জার ভয়
লালন ফকির ভেবে বলে সদাই
ঐ প্রেম যে করে সে জানে।।


(২২)
অমৃত লালন বানী
মানুষ ভজ‌লে সোনার মানুষ হ‌বি

মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপারে তুই মূল হারাবি
মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।
দ্বি-দলে মৃণালে
সোনার মানুষ উজলে
মানুষ-গুরুর কৃপা হলে
জানতে পাবি।
মানুষে মানুষ গাথা
দেখ না যেমন আলোক লতা
জেনে শুনে মুড়াও মাথা
জাতে উঠবি।
মানুষ ছাড়া মনরে আমার
দেখবি রে  শূন্যকার
লালন বলে মানুষ আকার
ভজলে চড়বি।৷


(২৩)
অমৃত লালন বানী
মানুষ মানুষ সবাই ব‌লে

আছে কোন মানুষের বসত কোন দলে
ওরে মানুষ মানুষ সবাই বলে। 
অযোনী সহজ সংস্কার
তারা কি সন্ধানে সাধক এত এবার
বড় অগম্ভু মানুষ লীলে ওরে সে মানুষ লীলে।
ভোজন সাধন নাহি জানি
কোথায় পাই সহজ কোথায় অযোনী
বেড়াই গোলে হরি বলে
ওরে হরিবোল বলে।
তিন মানুষের করণ বিচক্ষন
তারে জানলে হবে এক নিরূপণ
অধীন লালন পরলো গোলমালে 
মহা গোলমালে।।


(২৪)
অমৃত লালন বানী
মধুর দেল দরিয়ায় ডুবে করো ফকিরি

মধুর দেল দরিয়ায় ডুবে করো ফকিরি
ছাড় ফিকিরি করো ফকিরি হলো দিন আখেরি।
খোদার তখত বান্দার দেল যথায়
কোরানে বলেছে আপে খোদ খোদায়
আজাজিলের পর হলো খাতা
না বুঝে দেল গভীরি।
আগে জানতে হয় এই দেলের চৌদ্দ ঘর
আঠারো মোকাম চারিতে বিচার
লা-মোকামে সিংহাসন তাঁর
মাওলার নিজ আসন সেই পুরী।
দেল দরিয়ায় বলি ডুবারু যেজন হয়
আলখানার ভেধ সেই জানতে পায়
আলে আজব কাম দ্বিদলে বারাম
ফকির লালন খোঁজে বেড়ায় বাহিরই।।


(২৫)
অমৃত লালন বানী
আমার আঁধার ঘরে জ্বলছে বাতি

কী সন্ধানে যাই সেখানে
মনের মানুষ যেখানে
আঁধার ঘরে জ্বলছে বাতি
দিবা-রাতি নাই সেখানে।
যেতে পথে কাম নদীতে
পারি দিতে ত্রিবিণে
কত ধনীর ধারা যাচ্ছে মারা
পইড়ে নদীর তোর তুফানে।
রসিক যারা চতুর তারা
তারাই নদীর ধারা চিনে
উজান তরী যাচ্ছে বেয়ে
তারাই স্বরূপ সাধন জানে।
লালন বলে মইলাম জ্বলে
মইলাম আমি নিশি দিনে
মণিহারা ফনীর মতো
হারা হলাম পিতৃধনে।।


(২৬)
অমৃত লালন বানী
গু‌নে প‌ড়ে সার‌লি দফা 

গুণে পড়ে সারলি দফা
করলি রফা গোলেমালে
ভাবলিনে মন কোথা সে ধন
ভাজলি বেগুন পরের তেলে।
করলি বহু পড়াশোনা
কাজে কামে ঝলসে কানা
কথায় তো চিড়ে ভেজে না
জল কিংবা দুধ না দিলে।
আর কি হবে এমন জনম
লুটবি মজা মনের মতন
বাবার হোটেল ভাঙবে যখন
খাবি তখন কার বা শালে।
হায়রে মজা তিলে খাজা
খেয়ে দেখলিনে মন কেমন মজা
লালন কয় বেজাতের রাজা
হয়ে রইলাম কালে কালে।


(২৭)
অমৃত লালন বানী
 রসের রসিক না হলে 

রসের রসিক না হলে কে গো জানতে পায়
কোথা সে অটল রূপে বারাম দেয়৷।
শূন্য ভরে শয্যা করে
পাতাল পুরে
শরণ দেয়
অরসিক বেড়ায় ঘুরে
ঘোর ধাঁধায়।
মন-চোরা চোর
সেই সে নাগর
তালে আসে তালে যায়
উপর উপর খুঁজি
জীব সবাই।
মাটি ছেড়ে লাফ দিয়ে উঠে
আসমানে গিয়ে হাত বাড়ায়
অমনি সে পড়ে কাফের সেই খানায়
তাল পড় তাল ধর
তবে সব জানতে পার
লালন বলে উচা মানের কার্য নয়।।


(২৮)
অমৃত লালন বানী
এমন মানব জনম আর কি হবে

এমন মানব জনম আর কি হবে
মন যা কর ত্বরায় কর এই ভবে।
অনন্ত রূপ সৃষ্টি করলেন সাঁই
 মানবের উত্তম কিছুই নাই 
দেব দেবতাগণ করে আরাধন
জন্ম নিতে মানবে।
কত ভাগ্যের ফলে না জানি
 পেয়েছ এই মানব তরণী
বেয়ে যাও ত্বরায় তরী সুধারায়
যেন ভরা না ডোবে।
 মানুষে হবে মাধুর্য্য ভজন
তাইতে মানুষ রূপ গঠলেন নিরঞ্জন
এবার ঠিকিলে আর না দেখি কিনার
লালন কয় কাতর ভাবে।।


(২৯)
অমৃত লালন বানী
সময় গে‌লে সাধন হ‌বে না

দিন থাকিতে তিনের সাধন
কেন করলে না
সময় গে‌লে সাধন হ‌বে না।
জানো না মন খালে বিলে
থাকে না মীন জল শুকালে
কি হবে তার বাঁধাল দিলে
মোহনা শুকনা।
অসময়ে কেউ কৃষি করে
মিছামিছি খেটে মরে
গাছ যদিও হয় বীজের জোরে
ফল তো ধরে না।
অমাবস্যায় পূর্নিমা হয়
মহাযোগ সেই দিনে উদয়
লালন বলে তাহার সময়
 দণ্ড রয় না।।


(৩০)
অমৃত লালন বানী
র‌বে না ধন জীবনও যৌবন

মন আমার গেল জানা
রবে না এ ধন জীবন যৌবন
তবে রে কেন এত বাসনা
একবার সবুরের দেশে
বয় দেখি দম কষে
উঠিস নেরে ভেসে পেয়ে যাতনা।
যে করিল কালার চরণেরি আশা
জান না রে মন তাহার কি দশা
ভক্ত বলি রাজা ছিল তার সর্বস্ব ধন নিল
বামন রূপে প্রভু করে ছলনা।
প্রহ্লাদ চরিত্র দেখ দৈত্য ধামে
কত কষ্ট পেল সেই হরি নামে
তারে জলে ডুবালো অগ্নিতে পুড়ালো
তবু না ছাড়িল শ্রীনাম সাধনা।
কর্ণ রাজা ভবে বড় দাতা ছিল
অতিথি রূপে তার পুত্রকে নাশিল
কর্ণ অনুরাগী না হইলো দুঃখী
অতিথির মন করেন সান্ত্বনা।
রামের ভক্ত লক্ষ্মন ছিল সর্বকালে
শক্তিশেল হানিল তার বক্ষঃস্থলে
তবু রামচন্দ্রের প্রতি লক্ষ্মন না ছাড়িলেন ভক্তি
লালন বলে কর এই এ বিবেচনা ||



--- বাউল পানকৌড়ি

লালন সাঁইয়ের জীবনদর্শন, মানবতা ও ভক্তির প্রকাশ–পর্ব-২ --Click to Read
লালন কে নিয়ে লালনের গান--Click to Read
লালন সাঁইয়ের জীবনদর্শন, মানবতা ও ভক্তির প্রকাশ-পর্ব-১--Click to Read

Read on mobile

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url