ফকির লালনের গানে রাসুল চরিত- দেখা দিয়ে ওহে রাসূল ছেড়ে যেও না

 ফকির লালনের গানে রাসুল চরিত- দেখা দিয়ে ওহে রাসূল ছেড়ে যেও না: 

ফকির লালনের গান শুধুমাত্র সাধনার সঙ্গীত নয় এটি মানব জীবনের আধ্যাত্মিক নৈতিক ও প্রেমময় দিককে প্রকাশ করে। তার গানে নবী বা রাসূল এর চিত্র দেখা যায় একেবারে অন্তরের দিক থেকে যেখানে বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতা নয় সত্য প্রেম ও মানবতার আলোকে নবীর চরিত্র ফুটে ওঠে। শিরোনামে যেমন বলা হয়েছে দেখা দিয়ে ওহে রাসূল ছেড়ে যেও না মূলত লালনের অন্তরদৃষ্টি বোঝায়। যেখানে নবী শুধুই বাহ্যিক চরিত্র নয়, বরং মানব হৃদয়ের অন্তরে সত্য ও প্রেমের দিশারি। এই গান আমাদের কি শেখায়। শেখায় নবীর আদর্শ অনুসরণ শুধু বাহ্যিক ইবাদত শুধু নয় অন্তরের সত্য সন্ধান প্রেমময়তা ও নবীর প্রতি আমাদের ভক্তি ভালবাসার প্রকাশ। ভু‌লো না মন কা‌রো ভোলে ওরে রাসু‌লের দিন সত‌্য মান ডাক সদাই আল্লা ব‌লে। 

লালনের এই দৃষ্টিভঙ্গি আজও আমাদের জীবনযাত্রায় প্রাসঙ্গিক। যেখানে আমরা অন্তরে নবীকে চিনি তাঁর শিক্ষা মেনে সত্য ও প্রেমের পথে চলতে শিখি। এই উপলব্ধিকে কেন্দ্র করে আজকের লেখায় আমরা লালনের কয়েকটি গানের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবার চেষ্টা করেছি। যা অন্তরের নবীর অনুসরণ ও মানবজীবনের নৈতিক শিক্ষাকে ফুটিয়ে তুলতে সাহায্য করবে।

(১) অমৃত লালন বানী
শুনি নবির অঙ্গে জগৎ পয়দা হয়

সেই যে আকার কী হল তার কে করে নির্ণয়
শুনি নবির অঙ্গে জগৎ পয়দা হয়।
আব্দুল্লার ঘরেতে বলো সেই নবির জন্ম হলো
মূল দেহ তার কোথায় ছিলো কারে শুধায়।
কী রূপে নবির জন্ম যুক্ত হন
আবহায়াত তার নাম লিখেছে
হাওয়া নাই সেথায়
শুনি নবির অঙ্গে জগৎ পয়দা হয়। 
একজনে দুই কায়া ধরে
কেউ পাপ কেউ পুণ্যি করে
কী হবে তার রোজ হাসরে নিকাশের বেলায়
শুনি নবির অঙ্গে জগৎ পয়দা হয়। 
নবির ভেদ পেলে এক ক্রান্তি
ঘুচে যেত মনের ভ্রান্তি
দৃষ্টি হত আলেকপান্তি
লালন ফকির কয়।


(২) অমৃত লালন বানী 
রাসু‌লের দিন সত‌্য মান ডাক সদাই আল্লা ব‌লে

ভুলো না মন কারো ভোলে
রাসুলের দিন সত্য মান ডাক তারে আল্লা বলে।
খোদা প্রাপ্তি মূল সাধনা
রাসুল বিনা আর কেউ জানে না
জাহের বাতুন উপাসনা
রাসুল হইতে প্রকাশিলে।
অপরকে বুঝাইতে তামাম
করেন রাসুল জাহেরা কাম
বাতুনে মশগুল মুদাম
কারো কারো জানাইলে।
দেখাদেখি সাধিলে যোগ
বিপদ ঘটবে বাড়িবে রোগ
যে জনা হয় শুদ্ধ সাধক
নবিজির ফরমানে চলে।
যেরূপ মুরশিদ সেইরূপ রাসুল
ইহাতে নেই কোন ভুল
সিরাজ সাঁই কয় লালন কি কুল
পাবি মুরশিদ না ভজিলে।।


(৩) অমৃত লালন বানী 
রাসুলকে চিনলে পরে খোদা চিনা যায়

রূপ ভাড়ায়ে দেশ বেড়িয়ে
চলে গেলেন দয়াময়
রাসুলকে চিনলে পরে
খোদা চিনা যায়। 
জন্ম যাহার এই মানবে
ছায়া তার পড়ে নাই ভূমে
দেখ দেখি মন বর্তমানে
কে এলো এই মদিনায়।।
পথে ঘাটে রাসুলেরে
মেঘে যেমন ছায়া ধরে
দেখ দেখি মন লেহাজ করে
জীবের কি সেই দরজা হয়।।
 আহাম্মদ নাম লিখিতে
মিম হরফ কয় নফি করতে
সিরাজ সাই কয় লালন তোকে
কিঞ্চিতও নজির দেখায়।।


(৪) অমৃত লালন বানী 
দেখা দিয়ে ওহে রাসূল ছেড়ে যেও না

তোমার মতো দয়াল বন্ধু আর পাবো না
দেখা দিয়ে ওহে রসুল
ছেড়ে যেও না
তুমি তো খোদার দোস্ত
অপারের কান্ডারী সত্য
তোমা বনে পারের লক্ষ্য
আর দেখা যায় না
আমরা ছিলাম বনবাসী
করে গেলে মদিনাবাসী
তোমা হতে জ্ঞান পেয়েছি
আছি সান্ত্বনা
আসমানী এক আইন দিয়ে
আমাদের সব আনলেন রাহে
এখন মোদের ফাঁকি দিয়ে
ছেড়ে যেও না
তোমা বিনে এরূপ শাসন
কে করবে আর দীনের কারণ
লালন বলে আর তো এমন
বাতি জ্বলবে না।।


(৫) অমৃত লালন বানী 
মক্কর উল্লার মক্কর কে বুঝিতে পারে

মক্কর উল্লার মক্কর কে বুঝিতে পারে
আপনি আল্লাহ্ আপনি নবী
আপনি আদম নাম ধরে
পরোয়ার দিগার মালিক সবার
ভবের ঘাটে পারের কান্ডার
তাতে করিম রহিম নাম তার
প্রকাশ সংসারে
কোরান বলেছেন খাঁটি
অলিয়েম মুর্শিদ নামটি
আহাদে আহাম্মদ সেটি
মিলে কিঞ্চিৎ নজরে
আলিফ যেমন লামে লুকায়
আদম রূপ তেমনি দেখায়
লালন বলে ভাব জানতে হয়
মুর্শিদের জবান ধরে।।


(৬) অমৃত লালন বানী 
দিল মক্কার ভেদ না জানিলে মক্কায় হজ্জ্ব হবে কি সে

দিল মক্কার ভেদ না জানিলে
তার হজ্জ্ব হয় কি সে রে
কি সে আর বুঝাই মন তোরে
দিল মক্কা খোদ কুদরতি কাম
খোদ খোদা দেয় তাতে বারাম
সেই জন্য হয় দিল মক্কা নাম
সর্ব সংসারে
এক দিল যার জিয়ারত হয়
হাজার হাজী তার তুল্য নয়
কিতাবেতে সাফ লেখা যায়
তাই তো বলি রে
মানুষের মক্কা গঠন
মানুষে তাই করে ভজন
লালন কয়, আদি মক্কা কেমন
চিনবি কি করে।।


(৭) অমৃত লালন বানী 
নবীর ডঙ্কা বাজে এবার শহর মক্কা মদিনে

নবীর ডঙ্কা বাজে এবার
শহর মক্কা মদিনে
আয় গো যাই নবীর দ্বীনে
অমূল্য দোকান খুলেছেন নবী
যে ধন চাইবি, সে ধন পাবি
বিনা কড়ির ধন, সেধে দেয় এখন
না লইলে আখেরে পস্তাবি মনে
তরিক দিচ্ছেন নবী জাহের বাতেনে
যথাযোগ্য লায়েক জেনে।
রোজা আর নামাজ, ব্যাক্ত এহি কাজ -
নবীর সঙ্গে ইয়ার ছিল চারিজন
চারজনকে দিলেন চারমতে যাজন
নবী বিনে পথে - গোল হল চারমতে
লালন বলে যেন সে গোলে পড়িস নে।।


(৮) অমৃত লালন বানী 
যে প্রেমে তে আল্লাহ নবি মেরাজ করেছে

নিগূঢ় প্রেম কথাটি তাই আজ আমি
শুধাই কার কাছে।
যে প্রেমেতে আল্লাহ নবি মেরাজ করেছে।।
মেরাজ সে ভাবেরই ভুবন
গুপ্ত ব্যক্ত আলাপ হয়রে দুইজন।
কে পুরুষ আকার কে প্রকৃতি 
তার শাস্ত্রে প্রমাণ কি রেখেছে।।
কোন প্রেমের প্রেমিকা ফাতেমা
করেন সাঁই কে পতি ভজনা।
কোন প্রেমের দায় ফাতেমাকে সাঁই
মা বোল বলেছে।।
কোন প্রেমে গুরু হয় ভবতরী
কোন প্রেমে শিষ্য হয় কাণ্ডারি।
না জেনে লালন প্রেমের উদ্দীপন
পিরিত করে মিছে।।


(৯) অমৃত লালন বানী 
পারে কে যাবি নবির নৌকাতে আয়

পারে কে যাবি নবির নৌকাতে আয়।
রূপকাষ্ঠের নৌকাখানি নাই ডুবার ভয়।।
বেসরা নেয়ে যারা তুফানে যাবে মারা একই ধাক্কায়।
কি করবে বদর গাজী থাকবে কোথায়।।
নবি না মানে যারা
মোয়াহেদ কাফের তারা এই দুনিয়ায়।
ভজনে তার নাই মজুরী দলিলে ছাপ লেখা যায়।।
যেহি মুর্শিদ সেইতো রাসুল
ইহাতে নাই কোন ভুল,
খোদাও সে হয়।
লালন কয় না এমন কথা কোরানে কয়।।


(১০) অমৃত লালন বানী 
সদাই বল‌রে মন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ

সদাই বল‌রে মন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ
আইন ভেজিলেন রাসুলুল্লাহ
সদাই বল‌রে মন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ
লা ইলাহা নফি যে হয়
ইল্লালাহ সেই দ্বীন দয়াময়
নফি এজবাত ইহারে কয়
এহি তো এবাদতুল্লাহ
নামের সহিত রূপ
ধিয়ানে রাখিয়া জপো
বেনিশানায় যদি ডাকো
চিনবি কি রূপ কে আল্লাহ
লা শরিক জানিয়া তাকে
জপ কালাম দেলে মুখে
মুক্তি পাবি থাকবি সুখে
দেখবি রে নূর তাজেল্লা
বলেছেন সাঁই আল্লাহ নূরি
এই জেকেরের দরজা ভারি
সিরাজ সাঁই তাই কয় ফুকারি
শোন রে লালন বেলিল্লাহ।।


(১১) অমৃত লালন বানী 
নবী দি‌নের রাসূল  এই নাম ভুল ক‌রি‌লে পড়‌বি ফ্যা‌রে

এই নাম ভুল ক‌রি‌লে পড়‌বি ফ্যা‌রে
হারা‌বি দুই কূল নবী দি‌নের রাসূল 
খোদার ও ম‌সগুল নবী দি‌নের রাসূল।
নবি আউলে আল্লার নূর
দুওমেতে তওবার ফুল
ছিয়মেতে ময়নার গলার হার;
চৌঠমেতে নূর ছিতারা
পঞ্চমে ময়ূর।
পাঞ্জাগানা নামাজ পড়ে
সেজদা দেয় সে গাছের পরে
সেই না গাছের ঝরে পড়ে ফুল
সেই ফুলেতে মৈথুন করে
দুনিয়া করলেন স্থুল ॥
আহাদে আহাম্মদ বর্ত
জেনে কর তাহার অর্থ
হয় না যেন ভুল
লালন বলে ভেদ না জেনে
হ’লাম নামা-কুল।

(১২) অমৃত লালন বানী 
রাসূল নাম নিলে বড়ই সুখে থাকি

রাসূল নাম নিলে বড়ই সুখে থাকি
রাসূল রাসুল বলে ডাকি।
মক্কায় গিয়ে হজ্ব করিয়ে
রাসূলের রূপ নাহি দেখি
মদিনাতে গিয়ে রাসুল
মরেছে তার রওজা দেখি
রাসূল রাসুল বলে ডাকি।
হায়াতুল মুরসালিন বলে
কোরা-আনেতে লেখা দেখি
দীনের রাসূল মারা গেলে
কেমন করে দুনিয়ায় থাকি
রাসূল রাসুল বলে ডাকি।
কুল গেল কলঙ্ক হ’ল
আর কিছু নাই দিতে বাকি
দরবেশ সিরাজ সাঁই কয় অবোধ লালন
রাসূল চিনলে আখের পাবি
রাসূল রাসুল বলে ডাকি।।



--- বাউল পানকৌড়ি
লালন কে নিয়ে লালনের গান--Click to Read
সাধক বাউল পাগলা বাবুল সাঁই--Click to Read
লালন সাধক আব্দুল লতিফ শাহ ফকির : লালন গান--Click to Read

Read on mobile

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url