কবি শামসুর রাহমানের কবিতায় লালন ভাবধারা- শহুরে বাউল হাঁটে একাকী নিজের পথে

কবি শামসুর রাহমানের কবিতায় লালন ভাবধারা- শহুরে বাউল হাঁটে একাকী নিজের পথে: 

বাংলা আধুনিক কবিতার অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রাহমান। তাঁর সৃজনশীলতার ভেতর দিয়ে নগরজীবনের বাস্তবতা, মানবিক বোধ এবং আত্মানুসন্ধানকে মিলিয়ে নির্মাণ করেছেন এক নতুন কাব্য জগৎ। তাঁর কবিতায় মানবতার চেতনা যেমন প্রবল তেমনি আছে আধ্যাত্মিক অন্বেষণ ও মুক্তির আকুলতা। এই অন্বেষণের ধারায় তিনি গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছেন লালন ফকিরের বাউল দর্শন থেকে। লালনের গান ও ভাবধারা শামসুর রাহমানের কবিতায় এসেছে বহুবার। শহুরে মানুষও হয়ে ওঠে এক বাউল, আত্মার সন্ধানী পথিক। রৌদ্র করোটি কাব্য গ্রন্থে লালনের গান কবিতায় কবি লালনের গানে খুঁজে পান এক গভীর মানবিক ও আত্মিক আহ্বান। সে গানের ধ্বনি স্তব্ধ সায়রে ফোটায় নিবিড় অজস্র শতদল। শৈশবের স্মৃতি, প্রকৃতি, প্রেম সব মিলেমিশে লালনের গানের মতোই কবির চেতনাকে করে তোলে বিশুদ্ধ । কবি যেন বুঝতে পারেন লালনের গান হলো মানুষের মনের মুক্তির সুর। তিনি শহরের প্রতিযোগিতা ও কৃত্রিমতার বিপরীতে দাঁড় করান বাউল দর্শনের সরলতা ও স্বাধীনতা। তাঁর অন্তরের বাউল তাঁকে শেখায় প্রকৃত স্বাধীনতার যেখানে মানুষ মনের মানুষকে খোঁজে নিজের ভেতরে বাহিরে নয়। কবি উপলব্ধি করেছেন লালনের মানবধর্ম ও মুক্তির দর্শনকে আধুনিক নগরজীবনের সঙ্গে মেলাতে পেরেছেন। তিনি হয়ে উঠেছেন এক শহুরে বাউল যিনি নগরের ধুলোর ভেতরেও শোনেন লালনের গান।


কাব্য গ্রন্থ: রৌদ্র করোটিতে
কবিতা- লালনের গান
প্রকাশ কাল- ১৯৬৩

যখন তোমার বাহুর বাসরে
মগ্ন ছিলাম চন্দ্রিত চন্দ্রায়,
আলো-আঁধারির চকিত সীমায়,
লালনের গান দূর হতে এলো ভেসে।
সে গানের ধ্বনি স্তব্ধ সায়রে
ফোটায় নিবিড় অজস্র শতদল।
ধুলোয় উধাও সে গানের কলি
গ্রামছাড়া পথে মনের মানুষ খোঁজে।

শৈশব-গাঁথা জামতলা আর
কনক দুপুরে শ্রাবণ দিঘির ডুব,
ঘোরলাগা ভোর, অভিজ্ঞ সাঁঝ-
সবি আছে বুঝি স্মৃতির অভ্রে ডুবে।

কে আসে ঘাসের স্তব্ধ সবুজে
নীরবে নগ্ন শুভ্র চরণ ফেলে?
সে-যে সেই গান স্পন্দনে যার
আঁধারেও চির মনের মুকুল জ্বলে।

অবচেতনার গহন ধারায়
তারাময় মনে জাগে স্বপ্নের পলি।
একটি চাঁপার বিন্দুতে মেশে
সব দ্বন্দ্বের ঘূর্ণিত অবসান।

সে গানের সুর জীবনে ঝরায়
জুঁই-চামেলির অরূপ সুরভি আজও
অস্তরাগের ধ্যানী বাসনায়
জ্বলে ওঠে ক্কীণ দীপ্ত চন্দ্রকলা।

কাল মন্থনে চেতনায় জাগে
অতীতের দ্বীপ, স্মৃতির প্রবালে লাল।
বর্তমানের মুক্ত আধারে
ভবিষ্যতের দীপাবলি ওঠে ভেসে।

সে-গানের ধ্বনি ফিরে ফিরে আসে
মর্ত্যজীবীর রঙিন ধুলোর পথে-
তারই মাধুর্যে ঋতুতে ঋতুতে
রৌদ্রছায়ায় শান্ত বাগানে বাঁচি।

সে-গান আমার বৈশাখী দিনে
যাত্রী-প্রাণের তৃষ্ণার সরোবর।
তারই টানে চলি বাকাচোরা পথে-
লালনের গান স্মৃতির দোসর সে-যে।
----------------------------
কাব্য গ্রন্থ: কৃষ্ণপক্ষে পূর্ণিমার দিকে
কবিতা- লালনের টানে
প্রকাশ কাল- ২০০৪

কোনো এক উদাস বিকেলে, মনে হয়, তোমার পড়ার ঘর
থেকে সাংকেতিক এক প্রগাঢ় ভাষায়
তোমাকে দূরের
সবুজ মাঠের দিকে যেন কেউ ডেকে নিয়ে গিয়েছিল। তুমি
নিজের ভেতরে স্বপ্ন-জাগানিয়া এক আলোড়ন
টের পেয়ে তাকালে চৌদিকে বিস্ময়ের ঝলসানি-লাগা চোখে।

মনে শূন্যতার সাদা প্রভাবে নিজেই যেন হেঁটে
হেঁটে সামনের কিছু প্রাপ্তির আশায় বুঝি পা দুটি সচল
রাখলে অনেকক্ষণ আরও। দূর থেকে
ভেসে আসে দোতারার সুর।

সমুখে ক্রমশ ফুটে ওঠে একজন পক্ককেশ বাউলের
মুখ আর গীত, ক্ষণকাল পরে তার
গীতসুধা যায় থেমে তোমার উদ্দীপ্ত পদধ্বনি বেজে উঠতেই আর খুব কাছে
গিয়ে বলো তুমি ‘দৃষ্টিহারা
আপনি, অথচ বোঝা গেল বিলক্ষণ কী প্রখর
উজ্জ্বল নজর আপনার’।

বাইরের দৃষ্টি নয়, অন্তরের চোখে দেখে নিই
দেখান যা সাঁই,’ বলে তিনি গাইতে গাইতে
গেলেন মিলিয়ে পথে গোধূলিতে। চমকিত তুমি
অতি দ্রুত পা চালিয়ে পৌঁছে গেলে ভিন্নরূপে আপন ভুবনে।
----------------------------
কাব্য গ্রন্থ: ভাঙাচোরা চাঁদ মুখ কালো করে ধুঁকছে
কবিতা-  শহুরে বাউল হাঁটে
প্রকাশ কাল- ২০০৩

না, আমি ইঁদুর-দৌড়ে শরিক হবো না, কারো কোনো
প্ররোচনা কিংবা ছলাকলা
পারবে না আমাকে নামাতে সেই হুড়োহুড়ি, সেই পড়ি-মরি
নির্লজ্জ খেলায়। হেঁটে যাবো
একান্ত নির্জন প্রতিযোগীহীন পথে। ভোলা মন যা চাইবে
যখন, করবো সেই কাজ মহানন্দে তখন-কখনো
বটের ছায়ার বসে দেখবো পাখির
কোমল প্রণয়লীলা, কখনো-বা ভাসমান দেঘ।

না, আমি ইঁদুর-দৌড়ে নেই। যে উদাস
বাউলের ডেরা
অন্তরে আমার, সে আমাকে একতারা
বাজিয়ে শোনাবে গীতিমালা, দেবে তুলে
আমার ইচ্ছুক হাতে অরূপ ছিলিম, চতুর্দিকে
চকিতে উঠবে নেচে আরশি নগর। কে আমার
মনের মানুষ ব’লে খোলা পথে হেঁটে যাবো একা,
ব্যাকুল ডাকবো তারে, পাবো না উত্তর। একতারা
বেজে চলে পথের ধুলোয় আর গাছের পাতায়, মেঘলোকে;
শহুরে বাউল হাঁটে একাকী নিজের পথে, যেতে হবে হেঁটে।
----------------------------
কাব্য গ্রন্থ: সৌন্দর্য আমার ঘরে
কবিতা- পাগলা বাবুলের গান
প্রকাশ কাল- ১৯৯৮

গেরুয়া বসনধারী পাগলা বাবুল
যখন বাউল গান গায় গভীর তন্ময়তায়
একতারা বাজিয়ে, আঙুলে
ফুটিয়ে সুরের বনফুল
নেচে-নেচে, ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে
পাগড়ি-বাঁধা মাথা
ছেঁউড়িয়া, ফরিদপুরের গঞ্জ-গ্রামে,
শহর ঢাকার শিল্পকলা একাডেমি
আর রমনার বটমূলে
আবার লালন সাঁই আসরে নামের পুরোদমে।

পাগলা বাবুল গলা ছেড়ে গান গাইলেই আমার অন্তরে
দীঘির বৈকালী ঘাটে গ্রাম্য বধূটির
কলস ভাসানো,
নতুন শস্যের ঘ্রাণ, ক্ষেতের আইল,
পথের রঙিন ধুলো, নিঃসঙ্গ লোকের পথ হাঁটা,
ডুরে শাড়ি-পরা কিশোরীর কাঁচা আম খাওয়া,
ভাসমান নৌকা আর ঘুঘুর উদাস
ডাক জেগে ওঠে। মনে হয়,
নিঝুম মহীন শাহ ভরা নদীর ধরনে মাথা নাড়ছেন।
এবং পাগলা বাবুলের একতারা
যখন সুনীল আকাশকে ছুঁতে চায়,
ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে মাথা আর নেচে-নেচে
যখন সে অগণন মানুষের মাঝে মানুষের গান গায়
আমি শুদ্ধ আলোর ভিতরে যাত্রা করি।
----------------------------
কাব্য গ্রন্থ: ছায়াগণের সঙ্গে কিছুক্ষণ
কবিতা- অনঙ্গ বাউল
প্রকাশ কাল- ১৯৯৭

একজন বাউলের গান আমাকে দু’টুকরো করে
বিকেলের গৈরিক আলোয়- এক টুকরো প’ড়ে থাকে
বাস্তবের ধূসর মাটিতে, এক খণ্ড আসমানি
হাটে খুঁজে ফেরে তন্ন তন্ন ক’রে হারানো মানিক।

নক্ষত্রের করিডর দিয়ে হেঁটে যাই, নীলিমার
রেণু সমুদয় গায়ে লাগে এবং আমাকে করে
আলিঙ্গন উদার সপ্তর্ষি। কামিজের খুঁটে লাগে
টান, আর আমার বিবাগী অংশ মর্ত্যে নেমে আসে।

চাঁড়ালের দল কবিতার আর দর্শনের বই
পোড়ায় হুল্লোড় ক’রে, সারা গায়ে মাখে ভস্মরাশি,
শোণিত-তৃষ্ণায় উন্মাদের মতো ছোটে দিগ্ধিদিক।
প্রশান্ত নদীর কাছে, বৃক্ষের নিকট প্রজ্ঞা ভিক্ষা
চাই, পাখি দেখি আর ছিন্ন মস্তক এ রুদ্র কালে
গান বাঁধে আমার ভেতরকার অনঙ্গ বাউল।


--- বাউল পানকৌড়ি
হাফিজুর রহমান বাবুল থেকে লালন সাধক বাউল পাগলা বাবুল সাঁই --Click to Read

Read on mobile

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url