লালন কে নিয়ে লালনের গান- আত্মচেতনা, মানবতা ও সত্যের দৃষ্টি লালন চরিত

 লালন কে নিয়ে লালনের গান- আত্মচেতনা, মানবতা ও সত্যের দৃষ্টি লালন চরিত

ফকির লালন সাঁই কি শুধু একজন সাধক বা গীতিকার। সহজ ভাষায় উত্তর আপনার ভুল। কারন লালন ফকির তিনি ছিলেন এক যুগান্তকারী চিন্তাশীল মানুষ যিনি নিজের জীবন ও সাধনার ভেতর থেকে মানুষ ধর্ম ও আত্মার সত্য সন্ধান করেছিলেন। তাঁর গানে তিনি নিজেকেই প্রশ্ন করেছেন আমি কে? আমার জাত বা ধর্ম কী? এই আত্মসন্ধানী প্রশ্ন থেকেই জন্ম নিয়েছে এমন সব গান যেখানে লালন নিজেকে নতুন চোখে দেখেছেন। সমাজের ভেদরেখা ভেঙে দিয়ে বলতে চেয়েছেন মানুষই সবচেয়ে বড় ধর্ম।

এই লেখায় লালন ফকিরের সেই গানগুলো থাকছে যেখানে তিনি নিজে ধর্ম ও মানবতাকে নতুন চোখে দেখেছেন। সহজ ভাষায় বলা যায় আত্মবিশ্লেষণমূলক বা আত্মপরিচয়মূলক গান বা বানী। আরেকটু বলে রাখি ফকির লালন সাঁই বা অন্যান্য মরমি সূফি সাধক যারা ছিলেন তাঁরা তো আর খাত কলম চায়ের কাপ চায়ের ফ্লাক্স সাথে নিয়ে আয়োজন করে বসে গান বা বানী লিখেন নাই। তাঁদের বেশির ভাগ গান বা বানীর জন্ম হয়েছে আশে পাশের ভক্ত অনুরাগী শিষ্য বা অন্য কারো না কারো প্রশ্ন জানতে চাওয়ার জিজ্ঞেসার থেকে। এর চমৎকার একটা উদাহারন দেই। হয়তো কেউ ফকির লালন সাঁইকে প্রশ্ন করেছিলেন সৃষ্টিকর্তা কেন আমার সাথে এরকম করলো। ফকির লালন সাঁই এর উত্তর দিয়েছিলেন সাঁই লীলা বুঝবি ক্ষ্যাপা কেমন করে। আরেকটা বলা যায় শিষ্য বা ভক্তদের কারো প্রশ্ন থেকেই বলেছিলেন-

আমি লালন একই শিরে
ভাই বন্ধু নাই আমার জোড়ে।
ভুগেছিলাম পক্সজ্বরে
মলম শাহ্‌ করেন উদ্ধার।।


-(১)-
লো‌কে ব‌লে লালন ফ‌কির কোন জা‌তের ছে‌লে 
বজলু শাহ ফকির

ওরে কারে কিবা বলি ওরে
কারে কিবা বলি ওরে
দিশে না মেলে
লোকে বলে লালন ফকির
কোন জাতের ছেলে।
এক দণ্ড জড়ায়ে ধরে
এক একেশ্বর সৃষ্টি করে
আগাম-নিগম চরাচরে
ভিন্ন জাত  বলে।
হয় কেমনে জাতির প্রমাণ
হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিস্টান
জাত বলিতে কি হয় বিধান
শাস্ত্র খুঁজিলে।
হয় কেমনে জাতির বিচার 
এক এক দেশে এক এক আচার
লালন কয় জাত ব্যবহার
গিয়াছি ভুলে।।


-(২)-
সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে
আব্দুর রাজ্জাক ফকির

লালন বলে জাতের কি রূপ
দেখলাম না দুই নজরে
সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে।
সুন্নত দিলে হয় মুসলমান
নারীর তবে কি হয় বিধান
বামন চিনি পৈতায় প্রমাণ
বামনী চিনি কিসে রে।
কেউ মালায় কেউ তসবি গলে
তাইতে কি জাত ভিন্ন বলে
আসা কিংবা যাওয়া কালে
জাতের চিহ্ন রয় কারে।
জগৎ জুড়ে জেতের কথা,
গৌরব করে যথা তথা
লালন সে জেতের ফাতা
ঘুচিয়াছে সাধ বাজারে।।


-(৩)-
সবে বলে লালন হিন্দু কি যবন
মনসুর ফকির

সবে বলে লালন হিন্দু কি যবন
ফকির লালন বলে
আমি আমার
না জানি সন্ধানী।
একই ঘাটে আসা যাওয়া
একই পাটনী দিচ্ছে খেওয়া
ভবে কেউ খায় না কাউরি ছোঁয়া
ভিন্ন জল কোথায় পাই।
বিবিদের নাই মুসলমানী
পৈতা নাই যার সেও তো বামনী
দেখো রে ভাই দিব্যজ্ঞানে
লালন তেমনি জাত একখান।


-(৪)-
জাত গে‌লো জাত গে‌লো ব‌লে
শাহজাহান মুন্সি

জাত গেল জাত গেল বলে
সত্য প‌থে কেউ নয় রাজি
সবই দেখি মন তা না না না।
আসবার সময় কি জাত ছিলে
এসে তুমি কি জাত নিলে
যাবার বেলায় কি জাত হবে
ভেবে একবার তা বলো না।
ব্রাহ্মণ চন্ডাল চামার মুচি
একই জলে সকল শুচি
দেখে শুনে হয় না রুচি
যমে তো কাউকে ছাড়বে না।
গোপনে যে বেশ্যার ভাত খায়
তাতে ধর্মের কী ক্ষতি হয়
লালন বলে জাত কারে কয়
এই ভ্রম তো গেল না। 


-(৫)-
গুরু তুমি পতিত পাবন পরম ঈশ্বর

গুরু তুমি পতিত পাবন পরম ঈশ্বর
অখন্ড মন্ডলাকারং ব্যাপ্তং যেন চরাচর।
ব্রহ্মা বিষ্ণু শিব তিনে
ভজি তোমায় নিশিদিনে
জানি গুরু তোমা বিনে
তুমি গুরু পারাপার।
ভজে যদি না পাই তোরে
কি দোষ দিবো তোমায় গুরু
দুটি নয়ন তোমার উপরে
তুমি গুরু যা করো  এবার।
আমি লালন একই শিরে
ভাই বন্ধু নাই আমার জোড়ে
একদিন ভুগেছিলাম পক্সজ্বরে
ভুগেছিলাম পক্সজ্বরে
দরবেশ সিরাজ সাঁই করিলেন উদ্ধার।।


--- বাউল পানকৌড়ি
ফকির লালন সাঁইয়ের গানে চাতক পাখি --Click to Read

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url