সুফি সাধক শিতালং শাহের জীবন দর্শন আত্মার মুক্তির গান প্রকৃতিতে স্রষ্টার প্রতিচ্ছবি

সুফি সাধক শিতালং শাহের জীবন ও দর্শন আত্মার মুক্তির গান প্রকৃতিতে স্রষ্টার প্রতিচ্ছবি : 

“শিতালং নাম মোর গুনা বেশুমার
কৃপা যদি করে আল্লা করিম গফফার।
মোহাম্মদ সলিম উরফে দোষ গুণে মাজুর
জাহান বখশ আলী নাম পিতার মশহুর।
পরগণা চাপঘাট মোর পয়দায়িশ যেথায়
শ্রীগৌরি মৌজাতে, শিলচর খিত্তায়” 

শিতালং শাহ মরমি সাধক কবি এবং সুফি দার্শনিক। প্রকৃত নাম মোহাম্মদ সলিম উল্লাহ। সিলেট জেলার করিমগঞ্জ মহকুমার অন্তর্গত বদরপুর থানার খিত্তাশিলচর গ্রামে ১৮০৬ সালের মে মাসে জন্ম গ্রহণ করেন। পিতা মোহাম্মদ জাঁহা বখশ মুনশি এবং মাতার নাম সুরতজান বিবি। পিতা মোহাম্মদ জাঁহা বখশ মুনশি জন্মসূত্রে ছিলেন ঢাকা নবাব বংশের। জনশ্রুতি আছে বানিজ্য যাত্রায় নৌকা ডুবিতে খিত্তাশিলচরের জমিদার মীর মাহমুদের বাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং জমিদার সাহেব তার ব্যবহারে মুগদ্ধ হয়ে নিজ কন্যা সুরতজান বিবির সাথে বিয়ের ব্যবস্থা করেন। জমিদার মীর মাহমুদ তার জামাতকে তারিণীপুরে বেশ কিছু ভুসম্পত্তি দান করার কারনে এ অঞ্চলেই বসতি স্থাপন করেন এবং পরিবারিক জীবন যাপন শুরু করেন।


মোহাম্মদ সলিম উল্লাহ তারিণীপুর মক্তবে শিক্ষার হাতেখড়ি। মক্তবের পড়া শেষ করে আরবীতে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের জন্য গোলাপগঞ্জ উপজেলার ফুলবাড়ি আজিরিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হোন। সেখানে তিনি কোরান হাদিসের উপর উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং কোরান হাদিসের উপর উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন। বিশেষ করে মাদ্রাসার প্রধান উস্তাদ মুর্শিদ শাহ সুফি আব্দুল ওয়াহাব চৌধুরী এবং উস্তাদ আব্দুল কাহিরের কাছে বিশেষ আধ্যাত্মিক শিক্ষা লাভ করেন। মূলত তাঁর দীক্ষাগুরু ছিলেন শাহ সুফি আব্দুল ওয়াহাব চৌধুরী। শিতালং শাহের কথায়--

“শাহ আব্দুল আলী মোর পীর দস্তেগীর
হাছিল মুরাদ ছিলা বাতিনে জাহির
খুরশিদ কামিল শাহ আব্দুল ওহাব
তিনির প্রসাদে হেল ধেয়ানেতে লাভ।
দ্বিতীয় মুর্শিদ শাহ আব্দুল কাদির
শিশুকালে কেরামতি আছর জাহির
এই দুই সাহেবে লোরে রাখিয়া কৃপায়
ভেদ মর্ম শিক্ষা দিলা ওজ্জু নির্ঘায়”।

মাদ্রাসা শিক্ষা শেষ করে উস্তাদের খেদমতে অনেক দিন অবস্খান করেন। উস্তাদ শিস্যেকে শিতালং উপাধি প্রদান করেন। শিতালং ফারসী শব্দ যার অর্থ পায়ের গোঁড়ালির গোল হাড়। শিতালং শাহ তাঁর মুর্শিদ প্রদত্ত ফকিরী নাম গ্রহণ করেন এবং এই নামেই পরিচিত হয়ে উঠেন। এক পর্যায়ে উস্তাদের নির্দেশে নির্জনে সাধনার জন্যে লাউড়ের পাহাড়ে ও ভুবনের পাহাড়ে আত্মগোপন করে সাধনায় আত্মমগ্ন হন। দীর্ঘ ১২ বছর কঠোর সাধনার পর নির্জনতা ত্যাগ করে সংসারে প্রবেশ করেন মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করে এবং মানব কল্যাণের বাণী প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন। পাশাপাশি মরমি সংগীত রচনা করতে থাকেন । তাঁর গানসমূহ ‘মুশকিল তরান, ‘কিয়ামত নামা’ ও ‘বাগ বাউলা’ এই তিন খণ্ডে বিভক্ত। তাঁর ভক্ত মুরীদ ও স্বজনদের গান ছাপিয়ে প্রকাশ করতে নিষেধ করে যান। তাঁর লেখা অনেক গান সিলেট ও কাছাড়ের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্ষিপ্ত অবস্থায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে বলে মনে করা হয়। শিতালং শাহ মারিফতি গান রচনায় মানব দেহ তৈরির অপূর্ব কলাকৌশল, স্রষ্টা সৃষ্টি রহস্য ভেদ করে আধ্যাত্মিক সাধনার পুঁজি নিয়ে পার্থিব জগতকে পিছে ফেলে অভীষ্ট লক্ষ্যে ফিরে যায়।


সাধক শিতালং শাহ শরিয়তের অত্যন্ত বেশি অনুগত ছিলেন তবে সন্ন্যাসী ছিলেন না। আল্লাহর প্রেমে পাগল ছিলেন, তাই শরিয়ত অনুযায়ী এবাদত করে উপলব্ধি করিয়াছিলেন যে শরিয়তের বরখেলাফ চলিয়া মারিফত লাভ হয় না। যে পিয়াস তাঁর প্রাণে পয়দা হইয়াছিল, তাহা শুধু নামাজ রোজাতে তৃপ্তি আনিয়া দিতে পারিত না, তাঁহার চাওয়া ছিল আরো অনেক উচ্চ স্তরের জিনিস পাওয়ার জন্য, আল্লাহর কুদরত ও দিদার। তিনি শুধু নিজে শরিয়তের পাবন্দ ছিলেন না, তিনি এই কথাও উপলব্ধি করিতেন যে শরিয়তের বরখেলাফ চলিয়া মারিফত লাভ হইবার নয়। শরিয়তের নিয়ম মানিয়া চলিবার জন্য তিনি বারে বারে নামাজ রোজার তাগিদ দিয়াছেন তাঁহার লেখার মাধ্যমে প্রকাশ করেন। আল্লাহ তায়ালা আরবি ভাষার ৩০টি বর্ণমালার মাধ্যমে পবিত্র কোরআন শরীফ নাজিল করেছেন। আরবি হরফে মানব দেহের অঙ্গ সৌষ্ঠবের চমৎকার চিত্রায়ণ পাওয়া যায় শিতালং শাহের দেহতত্ত্বের গানে। নামাজের কথা বহু গানে প্রকাশ করেছেন জানা যায়। নানা তালে নামাজের গুণগান করিয়াছেন। ‘রাগ হকিকত‘ নমাজ গানে প্রকাশ করেন। পরমসত্তার সাথে বিরহ মিলনে আধ্যাত্মিকভাবের রূপক ব্যঞ্জনায় রাধাকৃষ্ণের প্রেমকে শিতালং শাহ প্রকাশ করেছেন। 


পারস্যের সুফিতত্ত্বের ভাবধারা ও শিতালং শাহের চিন্তা-চেতনার সাথে মিশে এক নবরূপে বিকশিত হয়। শেখ সাদির সুফিতাত্ত্বিক পঙক্তি; বারগে দরখজ্ঞানে সবুজ দর নজরে হুঁশিয়ার হর হরকে দপ্তর আস্ত মারিফতে ফিরদেগার। সবুজ বৃক্ষরাজির পত্র পল্লবের দিকে সতর্ক নির্দিষ্ট নিক্ষেপ করলে প্রতিটি পাতাই সৃষ্টিকর্তার দপ্তর মনে হবে। শিতালং শাহের গানে সে ব্যঞ্জনাই যেন মূর্ত হয়ে উঠে নবরূপ। বৃক্ষরাজি পত্রপল্লব, শাখা-প্রশাখা, লতাগুল্মের বৈচিত্র্য আল্লাহর সৃষ্টি রহস্যের অপার মহিমা প্রকাশিত হয়। আল্লাহ তাঁর নূর দিয়ে এসব বৃক্ষরাজিকে অপূর্ব সৌন্দর্যে সুশোভিত করে সৃজন করেছেন। বৃক্ষের ডালে ডালে আল্লাহর সিফত বিদ্যমান, প্রতিটি পত্রে আল্লাহর নিরানব্বই নামের জপমালা এবং পাতায় পাতায় আল্লাহর জিকিরের শোরগোল। ডালে ডালে বৃক্ষমূলে নবীর কালিমা শিতালং শাহের গানে আল্লাহ- রসূলের গুণকীর্তনে বৃক্ষরাজির নীরব নিমগ্র আরাধনার প্রকাশ পায়। 


শিতালং শাহ এর গানগুলোকে বিষয়ভিত্তিক ভাবনার নিরিখে বিভাজন করলে পাওয়া যায়; আল্লাহর প্রেম, রসুলের প্রেম, মুর্শিদি, মারিফতি, দেহতাত্ত্বিক, প্রেমতত্ত্ব ও নিগূঢ়তত্ত্ব। সূফীদর্শনের ওপর লিখিত তাঁর গানসমূহ ‘রাগ শিতালঙ্গী’ নামে পরিচিত। ১২শত পৃষ্ঠার সংঙ্গিত রচনা করেছেন ‘সিলেটী নাগরী’ লিপিতে। তাঁর লিখিত গ্রন্থ- ১. রাগ বাউল ২. কিয়ামত নামা ৩. মুশকিল তরান প্রভৃতি বই কিংবা পান্ডুলিপি নিয়ে দেশের খ্যাতনামা লেখক, গবেষক, কবি ও সাহিত্যিকরা কাজ করেছেন জানা যায়। 


-এক-
সুয়া উড়িলো উড়িলো
জীবেরও জীবন
সুয়া উড়িলো রে।
লা-মোকামে ছিলাই সুয়া
আনন্দিত মন,
ভবে আসি পিঞ্জিরাতে
হইলা বন্ধন।
পিঞ্জিরা থাকিয়া কইরলা
প্রেমেরও সাধন,
(হায় আল্লাহ) এখনো ছাড়িয়া যাইতে
না লাগে বেদন।
তুমি নিজ দেশে যাইবে পাখি
ফুরিলে মেয়াদ
তোমার পিঞ্জিরা রহিবে খালি
হইয়া বরবাদ।
লা-মোকামে যাওরে পাখী
করিয়া গমন,
(হায়রে) পিঞ্জিরা যে কান্দে তোর
প্রেমেরও কারণ।
শোনো শীতালং ফকিরে বলে
মনে আলাপন
আরে যাওয়ার সময়
যাও পাঙ্খি দিয়া দরশন।
সুয়া উড়িলো উড়িলো
জীবেরও জীবন
সুয়া উড়িলো রে।

-দুই-
‘বৃক্ষ সিজরাতুল একিন দরক্ত নবীন
নূর মোহাম্মদী বৃক্ষ সঙ্গে রাত্রি দিন
খালিছ নূরেতে বৃক্ষ অপূর্ব বরণ
নূরেতে ছিরজিয়া বৃক্ষ আল্লাহ নিরঞ্জন।

সিফত রব্বানী বৃক্ষ ডালে ডালে তুলয়
নিরানব্বই নাম জপে একেক প্রত্রয়।
পত্রয় পত্রয় আল্লাহু জিকির
ডালে ডালে বৃক্ষমূলে কালিমা নবীর।’

-তিন-
আলিফ হরফ দিয়া
নাক বানাইয়া
বে হরফে চক্ষু বানায়
সাহেব বিনোদিয়া।

তে হরফে তালু বানায়
আল্লা নিরঞ্জন,
ছে হরফে হইল জানো
মুখের গঠন।

ইয়া হরফে পায়ের এড়ি
দেখ, কত রং
ত্রিশ হরফে আদমছরত
কয় শিতালং”।

-চার-
“সে কথাই কি তিনি বলেছেন- 
‘কদম তলে বাঁশী বাজাও শুনিতে মধুর
বিরহিণী হইয়া ঝুরি শুনি মধুর সুর।
রসিক বন্ধুয়া তুমি গিরি প্রেম ধন 
প্রেমভাবে হইয়া মোরে দেও দরশন।
অন্তরে দগ্ধে প্রাণী প্রেমের অনল
কামনলে অংগ দেহে না হয় শিতল।
তর প্রেমভাবে মোর শোষিল পাঞ্জর
যোগিনীর বেশে ফিরি দেশ দেশান্তর।”

-পাঁচ-
“আমার দিন যায়রে বেহুশ মজিয়া
কি কাজে আইলাম ভবে না চাইলাম তলাইয়া
বনিজ করিতে আইলাম পরার ধন লইয়া
খুয়াইলাম পুঞ্জিপাতা কামনদী ডুবাইয়া
কত কত পুঞ্জিপাতা েগেছৈন খুয়ােইয়া
কাম নদীতে ছয় ডাকাইত সদায় থাকে বইয়া
বেপারি বেখিয়াল অইলে মাল নেয় লুটিয়া।
এই নদীতে শতধার কেমনে যাইতাম বাইয়া
ধরোগি মুর্শিদ রতন কামিল আলিম চাইয়া
বরাতের জোরে যদি মুর্শিদ যাও পাইয়া।
তছবি তহলিলে দিবা বাঁচার পথ বাতাইয়া
শিতালং ফকিরে কয় মনারে ভাইয়া
কামনদীর ফাড়ি শিখো মুর্শিদবাড়ি যাইয়া”।

-ছয়-
“ঢুঁড়িলে বন্ধুরে পাইবায়-আছইন বন্ধু ছিরিপুর
আগে ছিন মোহাম্মদী নূর
আদমের পেশানীতে আল্লাহ তা আলার কুদরতে গো
অতি হেফাজতে করি আমানত রাইখাছেন সেই নূর
সেই নূর না চিনিলে মারা যাইবায় দুই কূলে গো
মোহম্মদী নূর চিনিয়া বাদে চিন জাতি নূর।
ছিরিপুর দেশের মাঝে নানান রংগে বন্ধু সাজে গো
সিংহাসন মনিপুরে তার বাদে মোহাম্মদ পুর।।

মোহাম্মদ পুরের কাছে লাহুতের বাজার আছে গো
দিবানিশি সেই বাজারে হুহু শব্দ উঠে সুর
ছিরিপুরের দেশের মাছে রূপের ঘরে ঘন্টা েবাজে গো
ঘুর ঘুর সুরে ডমকা বাচে বাশী বাজে সুলতানপুর
রূপের ঘরে আজব লীলা চান্দের সনেব বন্ধের খেলা গো
এগো যে দেখাইছে রাজা হইছে মৃত্যু নাই তার জগৎপুর।।

অপরূপ সে বাজারে মউরে পেখম ধরেছে গো
হস্তি বাঘে খেলা করে শব্দ উড়ে আদমপুর
লা-হুতের বেপারি যারা চাবিপুরে থাকে তারা গো
অমূল্য রতন কিনিয়া  বান্ধিয়াছে কাম সমুদ্দুর
লা-হুতের বিকি কিনি হীরা লাল পরশ মনি গো
যাইতে পারে সে বাজারে যে থাকে আমনতপুর।
শীতালং ফকিরে বলে শাশুড়ি ননদের জালে গো
ডুবাইল আমার ভরা সাগর কামিনী পুর”। 

-সাত-
“ নাজির হইল সরে সয়ালে আলম
যত ইতি নবীগণ আওলাদে আদম,
আউয়ালে আখের যত আম্বিয়া আল্লার
নূর নবী মুহাম্মদ সবের সরদার।

আব্দুল্লাহ নামেতে পিতা নবী মোস্তফার
মোস্তফার নামেতে হইল বদন গুলজার,
নবীর খাতিরে তান খুলিল নছিব
আব্দুল্লাহ পিতা নামে আব্দুল মুত্তালিব।

আব্দুল মুত্তালিব ছিলো মক্কার খাদিম
তান পিতার নাম হয় আব্দুর হাসিম,
আব্দুল হাসিম সত্য মুত্তালিবের বাপ
হাসিমের পিতার নাম আব্দুল মনাফ।

এই চারি শুদ্ধ মোস্তফার জপ
উম্মতকে জানাইলা নূর মুহাম্মদ,
শিতালং ফকিরে কইন করমী গাফফার
সফাতে ভরসা নবী হাবীব আল্লার”।। 

-আট-
“ভবের বাজারে আছে দোকান সারি সারি
জাতে জাতে ধন লইয়া বসিছে পশারি
বাজারের চারি দোকান সবার পরধান
এ চারি দোকানে বিকে মাল বদখশান

পরথম দোকানে রাজপনথ খোলা
যে দোকানে লাগিআছে শরিয়তের তালা
দিতিআ দোকানে যেই করি আছে ছন্দি
জগত ছত্তআলে যত সেই দোকানে বন্দি

সেই দোকানে হইবে জগত উজালা
সে দোকানে লাগি আছে তরিকতের তালা
তিরতিয়া দোকানে আছে অতিশের চুলা
সে দোকানে লাগি আছে হকিকতের তালা

চতুরথ দোকানে বন্ধ আমানত পুনজি।
সে দোকানে লাগি আছে মারিফতের কুনজি 
শিতালং ফকিরে বলে হইয়া উদাস
খুলা না পাইলাম কুঞ্জ না পুরিল আশ”।

-নয়-
“বায়ান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলি
আদমের অজুদে
কৌশল করিয়া পয়দা
করিছে মাবুদে।

সুজন মুর্শিদের কাছে আছে
বেপারের পুঞ্জি
খুলিতে ঘরের তালা
হা হু হয় কুঞ্জি।

শিতালং ফকির কয়
দুনিয়া মহাস্থান,
মুশকিল তরানী হইলো
মউতে ঈমান”।

-দশ-
“এলাহি হায় হায়রে মাবুদ রহমান
এ দুঃখ সংকটে তুই মুস্কিল আছান

ভীষণ সংকট দেখি না দেখি উপায়
ভূমিতে রাখিয়া মাথা কান্দে নছুফায়।

ভীষণ সংকট আজি ঘটিল আমার
সংকটে পড়িয়া কান্দি ছত্তার ছত্তার।

রব্বুল আলম তুই গফুরুর রাহিম
ঘটিয়াছে আজি মোর মস্কিল আজিম

বেসমার পাপ মোর অন্তর সায়র
পাপ ক্ষেমা কর মোর কিরপার সাগর”।

-এগার-
“আমার দিন যায়রে বেহুশে মজিয়া
কি কাজে আইলাম ভবে না চাইলাম তলাইয়া
বনিজ করিতে আইলাম পরার ধন লইয়া
খুয়াইলাম পুঞ্জিপাতা কামানদী ডুবাইয়া
কত কত সাধুজ্ঞানী এই নদীতে আইয়া
কত কত পুঞ্জিপাতা গেছৈন খুয়াইয়া

কাম নদীতে ছয় ডাকাইত সদায় থাকে বইয়া
বেপারী বেখিয়াল অইলে মাল নেয় লুটিয়া।
এই নদীতে শতধার কেমনে যাইতাম বাইয়া।
ধরোগি মুর্শিদ রতন কামিল আলিম চাইয়া।
বরাতের জোরে যদি মুর্শিদ যাও পাইয়া
তছবি তহলিলে দিবা বাঁচার পথ বাতাইয়া।
শিতালং ফকিরে কয় মনারে ভাইয়া
কামনদীর ফাড়ি শিখো মুর্শিদবাড়ি যাইয়া”।

-বার-
গুণের সীমা নাই, নমাজেতে ভাই
মুশকিল তরিতে তরে, ও মনা ভাই, নামাজেতে ঠাই রে।
গুণের সীমা নাই ।

তকবির তহরিমা যবে করিবে স্মরণ
অঙ্গে যত পাপ তর রে, ও মনা ভাই
হইবে মোচন রে।

শিতালং ফকিরে মাঙ্গে কৃপা এলাহির ।
নমাজেতে চিত মোর রে, ও মনা ভাই,
‘থাকিতে হাজির রে ।

-তেরো-
“নামাজ পরম ধনরে নামাজ পরম ধন
আখেরে নামাজে হবে আনন্দিত মন
যেজন নামাজ পড়ে প্রেমভাবে মন
তাহার হৃদয় হবে নুরেরই রওশন। 

বেনামাজি কয়বরে ঠেকিবা মহাদায়
কাহহারের দৃষ্টি তারে করিবা আল্লায়
বেনামাজির উপরে হইবে আল্লাহর লান্নত
বাড়িতে থাকিবে তার আজাব শিদ্দত”। 

“নামাজ আজব চিজ নামাজ অমূল্য ধন
শিখরে ভাই নামাজের সাধন ॥
কেন আইলা এ রে এ ভবের মাঝ
এ ভবে আসিয়াআ না পড়লা এ নামাজ
কলেমা, নামাজ, রোজা করবে সাধন
নবিজির তরিকে কর আল্লাহর স্মরণ”।

-চৌদ্দ-
আল্লাহ প্রেমে পাগল 
সাধক শিতালং শাহ্ 
দুঃখ করিয়া বলিতেছেন, 
নামাজ পড়িয়াও তাঁহার মন 

তাহাতে মজিল না, 
তিনি চাহেন আল্লা প্রেম 
শুধু নামাজে সেই নিদারুণ
 পিয়াস মিটিল না”।

-পনেরো-
দিয়া প্রান, কুলমান-মন পাইলাম না সজনী
আমি হইলাম গো সই কূল কলংকিনী
আঁখি দিলাম রূপ দর্শন-কর্ণ দিলাম নাম শুনি
এগো রূপ দিলাম তার আঙ্গের বদল
প্রান দিলাম তার নিশানী।

তন ছূড়, মন ছূড়- ছূড় ঘরের বাসানি
এগো ফুটির কমল পুষ্প-সুগন্ধত মোহনী
শুনিয়াছি গুরুর মুখে এসব কাহিনী
এগো নারী লোকের না হয় দেখা মিছা আশা বঞ্চনী
জিজাসিতে নগরেতে বন্ধু আমার আসিবনি।

এগো একালেতে না হইলে দেখা পরকালে হইব নি
ও ভাই, চাতকীর মতো দিবস কিবা রজনী
এগো পরার পরার বেদন বুঝবনি প্রান সজনী
প্রেম তাপিত যে জন তাঁর হৃদয় আগুনি
এগো আলীঙ্গন দিয়া প্রভু শীতল কর পরানী।

শিতালং ফকিরে কইন শুন ওগো বিরাহিনী
এগো তোমার পীরিতের কাজে
জান করতাম কুরবানী।

-ষোল-
অপূর্ব কাহিনী মদিনা সুবর্ণের কারখানা
সুবৰ্ণে জড়িত পুরী সুবর্ণের অংগিনা।

মদিনার নিবাসী লোক পুরুষ কি জাননা
স্থানে স্থানে আরম্ভিল ইল্লাল্লাহু জপনা।

মিথ্যুকে না আছে লোক নিবাসিত মদিনা
কুকৰ্মেতে মতি নাই সত্যকর্মে ভাবনা।

পাছান পাছেতে কেহ করিতেছে সাধনা।
তাহলিল তাকরিয়ো হয় প্ৰেমভাবে দেওয়ানা।

শিতালং ফকিরে কয় না পুরিল কল্পনা
রওজা মোবারক মোর জিয়ারত হইল না।

-সতের-
অজ্ঞান মন, খুয়াইলায় মহাজনের ধন
এবে কি লইয়া গমন?
মনারে, আনিলায় মানিকের ভরা বেপারের কারণ
ভবের বাজারে আসি খুয়াইলায় ধন।

হাউছ, হিরছ, শুভ, লোভ ডাকাইত চারিজন
হুসাই, বুধাই, পারাদারে, করিয়া নিধন।
মনারে, চারি ডাকাইত মিলি করিল লুণ্ঠন
রাজপন্থে বসি এবে জুড়িছ কান্দন।

পানা কর মান্বুদ আল্লা, ঠেকছি বিপাকে এখন
কলিমার সাথে যেন হয় মোর মরণ।
শিতালং ফকির কান্দে ভাবি নিরঞ্জন
ছিরাত সংকটে পানা কর জানি অবোধ জন।।

-আঠার-
ঠগা খাইলাম রে ভাই বন্ধুয়ার বাজারে,
মাতিয়া বুলিয়া ঠগিয়া যার ধৈলাম না দুয়ারে ।

ঠগের হাট ঠগের বাজার ঠগের পসার
এবার না ধরিলে ঠগ ঠগবে বারে বার ।

দিনে ঠগে রাইতে ঠগে আর ঠগে কামে
অচেতন হইলে ঠগে আর ঠগে ঘুমে ।

ঠগ ধরা পড়িয়াছে ভাই বন্ধুয়ার বাজারে
চল যাই দেখে আসি মে ঠগেনি ঠগিয়েছে আমারে ।।

শিতালং ফকিরে কহে আল্লা নিরঞ্জন
ধরিতে না পাইলাম ঠগ হইয়া এক মন-গো ।

-উনিশ-
অন্তর আনলে দহে প্রাণে নাহি সহে 
হুরলোকের সম নহে নূরী লোকে কহে
প্রথম আদম ছফি আল্লার দরগায় 
আজ্ঞা ভঙ্গ করি তওবা কইলা একিদায়। 

গেহু ফল ভক্ষণেতে খলিফা আল্লার। 
তওবা করিলা কত হাজার হাজার 
আজ্ঞা ভঙ্গ করি গেহু করিলা ভক্ষণ 
ছিনিয়া রাখিল আল্লা লেবাছ পইরন। 

গন্ধম খাইলা নবী বিধির গঠন 
পায়খানা তলব হইল গলিজ কারণ। 
নূরপুরী তজল্লিত তরঙ্গের সাজ 
বেহেস্তে গলিজ নাই বউল বরাজ! 

মাংগিলা আদম হাওয়া বৃক্ষ শবিস্তান 
ঢাকিতে পুর্শিদা১০ অঙ্গ দেও পত্র দান। 
বৃক্ষতাণে শুনি এছা তাদের বচন 
ভাগিয়া চলিল দূরে হইয়া গমন! 

মাংগিতে লাগিলা পত্র দেহ বস্ত্রহীন 
কেহ নাহি দিলা পত্র দেখিয়া দুর্দিন। 
হুকুম করিলা আল্লা ফিরিশতা সকল 
বেহেশত হনে আদম হাওয়া কর বেদখল।

-বিশ-
আলিপের দিকে চাইওরে
দম গেলে দম আর পাবে না।

আব আতস খাক বাদ চারিচিজ দিয়া
এমন সুন্দর তনু বানাইল কানাইয়া।

নাহি দিল সোনা রূপা নাহি দিল শিশা
কেমনে গড়িল তনু মায়ে না পাইলা দিশা।

শিতালং ফকির কয় মনে বড় ভয়
আখেরে নি করবা শফা নবী পেগাম্বর।। 

-একুশ-
ও মন জঞ্জলিয়া
লাহুতের কুঞ্জি খুলো ইল্লাল্লা বলিয়া
মানুষ কুলে জন্ম হইল ভবেতে আসিয়া
করহ রঙ্গের হাট বাজার দেখিয়া।

যে করে রঙ্গের হাট আমানত রাখিয়া
বাছিয়া বাছিয়া কিনো বাজার দেখিয়া
রং বাজারে ঠগমেলা শুন মন দিয়া
সুলভে সদয় কিনো উছিলা ধরিয়া।

মানিক রতন কিনো হাটে প্রবেশিয়া
সোনাপুরে সোনাবিকে কিনরে চিনিয়া
দেখিবে চান্দের হাট নয়ন ভরিয়া
লাহুতে কলের কাম বাজার জুড়িয়া।

মারুতে ঘুরে কল মারুতে রুসিয়া
তথায় চান্দের রূপ দেখ নিরখিয়া
শিতালং ফকিরে বলে প্রবেশিয়া ছনিয়া
পুঞ্জি নাহি রাখা যায় লোভেতে মজিয়া।।

-বাইশ-
ওবা দয়াল আল্লাজী
ছিরাত সংকটে মোর তরাইবায় নি
আল্লাজী করিয়াছি বউত গুনাহ তোমার বেরাজি
শয়তানের ধুকায় পড়ি দায়ে ঠেকঠি আজি।

আল্লাজী শয়তানের ফেরেবে রৈলাম দুনিয়ার কামে মজি
চুলের হাকোম পুলাদের ধায় কেমনে পারৈতাম আজি
আল্লাজী দুনিয়া  দুনিয়া করিয়া মৈলাম কুবাই দুনিয়া আজি
বিপাকে পড়িয়া ডাকি তরাই লও আজি।

আল্লাজী গফুর রহীম তুই রহিমো রহমান
না অইছে না অইবো কেউ তোমার সমান
আল্লাজী ভবের মায়ায় মজি কইলাম রংঢং
বিপাকে পড়িয়া কান্দে ফকির শীতালং।।

-তেইশ-
কলিমা তৌহিদ শরিক নাই
লা শরিক নিরঞ্জন
শুদ্ধচিত্তে সাধিলে হয় দরশন।

হিদরে যার কলমা গুন নকসা যায় অনুগ্রহ
কালার সায়রে ভাসি উঠবো ভাসি নীল বরণ
মুর্শিদ যারে দয়া করবে কি যাবে দুজখে
সে পাবে তার মনির মন মুর্শিদ হবে দরশন।

মুনিপুর ইষ্টিশন রাসূল্লাহ টিকেট কাটে দমে দম
আগুনেতে বরজক ধরি সাধন করে নিরঞ্জন
শিতালং ফকিরে কয় কৃপায়েতে নিরঞ্জন
পুষ্পমাল্য গলে দিয়া রৌশনি দিব দরশন।।

-চব্বিশ-
কেন নিদয়া হইলায়রে বন্ধু ডাকিলে ডাক শুননা
পন্থ আগুলিলে রে বন্ধু একবার ফিরি চাও নারে
নিদয়া পাষাণ বন্ধুরে
বন্ধু বন্ধু ডাকি আমি দিন রজনী বইয়া
আংখির জলে যায়রে বন্ধু অভাগীর বুক ভাইয়ারে।

আমার কান্দন শুনিরে বন্ধু বিরখের পত্র ঝরে
অভাগী জানিয়া তুমি চাওনা একবার ফিরে
সবাই তোমায় দয়াল বলে কর্ণে আশি শুনি
মোর লাগি নিদয় কেনে অইলা গুণমনি।

তোর পিরিতে মরারে আমি না ছাড়িনু দিশা
জনম ভরিয়া রইবো আইবায় করি আশা
শিতালং ফকিরে বলে বন্ধু চিকন কালা
দয়া করি দরশন দিয়া বাঁচাও অবলা।।

-পঁচিশ-
চাইনারে বন্ধু তোর বেস্তখানা
তোমার নামেতে মোরে বানাও রে দেওয়ানা।

আমি তোমার তুমি আমার কেউ নাহি বেগানা
কোন নামে ডাকলে খুশি তুমি আমিতো জানি না।

তুমি প্রভু আমি গোলাম জগতে ঘোষনা
কোন নামে খুশি তুমি আমারে জানাও না।

শিতালং মাংগে বন্ধু তোমার কাছে পানা
চাইনা তোমার গোলাম হইতে চাইনা বেস্তখানা।।

-ছাব্বিশ-
জ্বলিয়াছে বিচ্ছেদের অনল, হারা হইলাম বুদ্ধি বল
বলবল বন্ধুয়ার কথা বল।

প্রাণের বন্ধু যাবে গো বলি সে তো আমার প্রাণে মাইল গো
এগো তবু তারে না দেখিলে ঝুরে আংখি টলমল।

কি করিমু কূলগো লাজে যাব আমি যোগীর সাজে গো
এগা যথায় গেলে মিলে তথায় যাব চল চল।

কেহই যদি দেখে গো শুনে বসিয়া থাকে ঘরের কোণে গো
এগো ঘরে আছে কাল ননদী মুখে আসে খলখল।

শিতালং ফকিরে বলে সাইক্ষাতে সংকট কালে গো
এগো বুকে নাই তোর দয়াময়া মুখে মধু গলগল।।

-সাতাশ-
তওবা কবুল হৈল আদম হাওয়ার
হায় হায় ইজ্জতে মোস্তফার
মাঙ্গিলা আদম সফি নামেতে তুই গফুর
দোষ ক্ষমা কর মোর খাতিরে হাবিব উল্লাহর।

মবারক না সবে দেখিলা মোস্তফায়
তখন কথা ছিল গোনা আদম হাওয়ায়
আদম হাওয়ার কৃপায় রব গফফার
কখশিস করিলা গোনা খাতিরে রসূলল্লাহর।

আদমকে ফরমাইল প্রেমভাবে পরওয়ার
নূর মোহাম্মদ হইবে আওলাদে তোমার
শিতালং ফকিরে কহে আমি দোষী গোনাগার
নবীর উসিলা বিনে গতি নাই আর।।

-আঠাশ-
তোরে লইয়া নিগুড়া বনে ললিত সুরে গান করি
দেশে আইলো নবীন কিশোরী।

তোর বাড়ি যাইতে বন্ধুরে ও বন্ধু রইছে করে ধাক ধাকি
তুমি আমার দয়াল বন্ধু ছিয়ের উপর ধর ছাত্তি।

তোর বাড়ি যাইতে বন্ধুরে ও বন্ধু খালায় নালায় পানি
এওতের দিমু লিলুয়া ঘোড় বর্ষায় দিমু নাও খানি।

মথুরিয়া হাটে গিয়া ও বন্ধু কিনিয়া আনলাম লাকুড়ি
এগো শুকনা কাষ্ঠের নাও বান্দাইয়া জলে ভাসায় সুন্দরী।

শিতালং ফকিরে কইন ওসই এখন আমি কি করি
এগো এ রঙ্গ সংসারের মাঝে হকির নামে বাস করি।।

-ঊনত্রিশ-
দয়াল বন্ধুয়াও হাসরে তরাইয়া লইও মোরে
আছানিতে রাখিও মোরে কয়বরের ভিতরে
তুমি তো দয়াল বন্ধু শুনি সবখানে
লা-তাখনাতু মির রাহমতুল্লাহ বলিয়াছে আপনার জবানে।

সর্ব শক্তিমান তুমি শুনি সবখানে
কতমতে কইছ তুমি ছুবে রহমানে
রাখো মারো সব করো তুমিই মহান 
জিল্লত মাঝে নাই আর কেউ করিতে আছান।

মূর্খমতি দুরাচার মুই অধম নাদান
ছকরাত কয়বর হাসরে করিও আছান
শিতালং ফকিরে বয় বন্ধ দয়াবান
হর অক্তে নাদান বান্দার রাখিও আমান।।

-ত্রিশ-
দয়াল বন্ধুয়াও হাসরে তরাইয়া লইও মোরে
আছানিতে রাখিও মোরে কয়বরের ভিতরে
তুমি তো দয়াল বন্ধু শুনি সবখানে
লা-তাখনাতু মির রাহমতুল্লাহ বলিয়াছে আপনার জবানে।

সর্ব শক্তিমান তুমি শুনি সবখানে
কতমতে কইছ তুমি ছুবে রহমানে
রাখো মারো সব করো তুমিই মহান 
জিল্লত মাঝে নাই আর কেউ করিতে আছান।

মূর্খমতি দুরাচার মুই অধম নাদান
ছকরাত কয়বর হাসরে করিও আছান
শিতালং ফকিরে বয় বন্ধ দয়াবান
হর অক্তে নাদান বান্দার রাখিও আমান।।

-একত্রিশ -
দেখ তোর সুয়ামি পদে দিয়া মন নারীগণ
দেখ তোর সুয়ামি পদে দিয়া মন।

ভাগ্যবতী সেই নারী তারার চরকায় বসতি
ও তারা অতি ভাগ্যমতী হায় হায়।

ওরে চরকার সনে তাল কাটিয়া নাল কাটিও অনুক্ষন
নারীগণ, দেখ তোর সুয়ামি পদে দিয়া মন।

নারীর সঙ্গতি গতি চরকা আর সুয়ামি
ও তারা ভজে দিবাযামী হায় হায়।

ওরে চরকার তালে হা হু জপি পাইয়া বসে সুয়ামির মন
নারীগণ দেখ তোর সুয়ামিপদে দিয়া মন।

শিতালং ফকিরে কয় সুতা বড় ধন
সুতায় গাঁথা যায় রতন হায় হায়।
ওরে চরকা হইতে মন ছাড়াইলে সুতা কাটে টনাটন
নারীগণ সুয়ামি পদে দিয়া মন।।

-বত্রিশ -
দেহের লীলা অসম্বব দেখলে হবে হাল বেলাল
দেখ মন তর হিদরে গোলে লাল।

রূপসিন্ধু যমুনার মাঝে বেরঙ্গে প্রানবন্ধু সাজে
যোগীলোকে গুলবনিতে রূপ হেরিয়া হয় বিহাল।

কলন্দরা কইল যেই রূপ সায়রে ডুবল সেই
রঙ্গ হেরিয়া তুষ্ট হয় জিন্দাকায়া চিরকাল।

রসিক তিরপুন্নির ঘাটে বিরাজে চান্দের হাটে গো
নামজপে সোনাপুরে নামে পংখি হীরালাল।

কাবা কাওছিন স্থলে হায়াত নদী বেগে চলে গো
এগো সেই নদীর জল ভক্ষিলে মৃত্যু নাই তার কোন কাল।

তিরপুন্নি উপর অংশে কুলসুম নদী উজান বৈসে গো
শীতল নদীর জল শুষিলে যম সাইক্ষাত সেই কাল
শিতালং ফকিরে বলে মনাগুণে পরান জ্বলে গো
এগো দিনত কুআচরনে কি গতি মোর পরকাল।।

-তেত্রিশ-
না লো সজনী আমি শুনি নাগর বিপিনে
বাজিল জয়ধ্বনি, উদাসিনী করি বংশীতে দিল টান।

প্রেম সুরে বাজায় বাঁশি ডাকে নাম ধরি
সন্ন্যাসী করিল মোরে মুকুন্দ মুরারি।

হাটে ঘাটে মাঠে ফিরি হইয়া কলঙ্কিনী
যথাতথা যাইমু শুনি বংশীর প্রেমিধ্বনি।

বৃন্দাবনে হয় শব্দ আংখিয়ে না হরি
পাঞ্জর শুষিল বংশীয়ে বিরহেতে ঝুরি।

কুঞ্জবনে বাজায় বাঁশি রনে চূড়ামণি
শব্দশুনি প্রাণ দহে জ্বলন্ত আগুনি।

রসপ্রেম প্রভু তুই অপূর্ব কাহিনী
বাঁশিতে আছয় বন্দী জগতের প্রাণী।

শিতালং ফকিরে কহে প্রেম গুনমণি
বিনা দরশনে হইল কলাঙ্কিনী দঃখিনী।।

-চৌত্রিশ-
নাইয়র বন্ধুয়াও আমি কার বারা বানি
ঝারিয়া না পাইলাম খুদ পচাইয়া পরাণি।

ঝারিতে ঝারিতে বারা সাধুভাই তনু কইলাম সারা
খুদ খাইবার আশে রইলাম না পাইলাম কুড়া।

ঝারিতে ঝারিতে আমার দিন তো গেল গইয়া
পেটে রইলো পেটোর জ্বালা কেমনে চলি পরান লইয়া।

শুতিলে না আসে নিদ্রা জাগি রইয়া রইয়া
পেটোর জ্বালার অগ্নি মোর জ্বলে ঘইয়া ঘইয়া।

পেটে নাই ভাত রে বন্ধু কাপড় নাই পিঠে
দেহার রক্ত পানি অইলো তুই বন্ধের পিরিতে।

শিতালং ফকিরে কয় বন্ধু দয়াময়
ছিরাত সংকটের ঘাটে যেনো দেখা হয়।।

-পঁয়ত্রিশ-
প্রেমের সাধন হইলনা
কুলমান হাঁর নিয়া অন্তর হইয়া গেল প্রিয়া গো
সেই দায় পরানী যায় বুঝি বুঝে না
বিরহিনী হইয়া ফিরি আইল মোর প্রাণেশ্বরী প্রাণ নিল
কোথায় রইলো কুলমান আর বাঁচে না।

যোগী রপ বেশ লইয়া দেখা দাও প্রাণ প্রিয়া গো
তোর দায় হায় হায় চিত্তে ধৈর্য মানে না
নিকুঞ্জ মন্দির ঘরে দেখা দেও প্রাণেশ্বরী গো
প্রাণ জ্বলে প্রেমানলে মন বাঞ্ছা পুরে না।

মনপ্রাণ নিল হরি কলঙ্কিনী জনম ভরি গো
প্রান প্রিয়া দেখা দিয়া অঙ্গ শীতল করনা
শিতালং ফকিরে বলে প্রেমের বিচ্ছেদ অনলে গো
যার দায় প্রাণি যায় সে বন্ধুয়া আইল না।।

-ছত্রিশ-
বচন বলয় শুদ্ধ সত্য বল রে
ও মন গুরু বচন পরিত্রান
সত্য কথা যেই কয় ধর্মভাবে মতি হয়
সুশীল মানুষ যেই মহন্ত যে গুন হয়।

বচন শুদ্ধ হয় যার লোকে হয় মান্য তার
ধর্ম কর্ম করে যত আচরণ শুদ্ধ পায়
সত্য কথা বলে যেই রব্বের পিয়ার সেই
জলে স্থলে ধন্যবাদ সকলে করয় তার।

সত্য ভাব যার যত হয় কটু কথা নাহি কয়
খুশি গমি শয্যায়েতে গুরু বাক্য হয় স্মরণ
হিংসুক লম্পট বৈরি ভিন্ন নারী প্রাণ কিশোরী
উপপতি হইয়া হবে রমনীর প্রাণ
শিতালং ফকিরে কয় সত্যভাবে মতি হয়
প্রেমভাবে নিরঞ্জন হৃদয়তে থাকে স্মরনে।।

-সাঁইত্রিশ-
বন্ধু স্বপনে যদি পাই
স্বপনে যদি পাইরে বন্ধু নয়নে লাগাই
চরণে শিয়রে রাখি রাখি হৃদয়ে বসাই।

বন্ধু বিরহের দেহা পুরিয়া হইল ছাই
পাইলে তোরে হেরিয়া রূপ অনল নিভাই রে
অন্বেষণ করিবে সই বন্ধুরে যদি পাই।

এক কুঞ্জে ভর করি ভজনে দাঁড়াই
গলেতে প্রেমের ডুরি বন্ধুরে বান্ধিয়া বেড়াই
যোগীরূপ ধারন করি ফিরি ঠাঁই ঠাইবন্ধুরে।

আসনে বসিয়া যদি পাই সে নিতাই
পদে ধরি যুগল ভুজে যৌবন লুটাইরে
প্রেমপুরে মথুরা পুরে বন্ধু তোরে চাইলাম ঠাঁই ঠাই
বৃন্দাবন কুঞ্জে ঢুঁড়ি না পাইলাম কানাই।

নিরলে আসনে বসি বন্ধরে যদি পাই
বিরহের আনল মোর বন্ধুরে শোনাই রে বন্ধু
শিতালং ফকিরে কহে বন্ধুরে যদি পাই
পদযুগে ভর করি চামর ঢুলাইর রে।।

-আটত্রিশ-
রংগিলা নাওয়ের মাঝি ও
নাওয়ের বাদাম টাইনে পাড়ি দিওনা
মৌলাজিয়ে বানায় নাও ঘনঘন গুড়া
সাড়ে তিন হাত দীর্ঘ সাওয়ের অংগে অংগে জোড়া।

মৌলাজির বানায়া নাও ঠেকিল বালুচরে
দাঁড়িমাঝি কোমর খেচে বাড়িত যাইতো কেমনো
মৌলাজির বানায় নাও মৌলাজির মূলধন।

ভাসাইলো ভবনদীতে বেপারের কারণ
শিতালং ফকিরে কয় ইয়া মৌলা ইয়া রছূল
ভবের জঞ্জালে আমি হারিছি দুই কূল।।

-ঊনচল্লিশ-
ভবের বাজারে আছে দুকান সারি সারি
জাতে জাতে ধন লইয়া বসিছে পশারি।
বাজারের চারি দুকান সবার প্রধান
এ চারি দুকানে মিলে মাল বদখশান।

পরথম দুকানে রাজপন্থ খোলা
যে দুকানে লাগিয়াছে শরিয়তের তালা।
দ্বিতীয় দুকানে যেই করিয়াছে ছন্দি
জগত ছত্রআলে যথ সেই দুকানে বন্দী।

সেই দুকানে হইবে জগণ উজালা
সে দুকানে লাগিয়াছে তরীকতের তালা
তিরতীয় দুকানে আছে আতসের চুলা
সে দুকানে লাগিয়াছে হকিকতের তালা

চতুরথ দুকানে বন্ধ আমানু পুনজি
সে দুকানে লাগিয়াছে মারিফাতের কুনজি
শীতালং ফকিরে বলে হইয়া উদাস
খোলা না পাইলাম কুঞ্জ না পুরিল আশ“।

-চল্লিশ-
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু জপরে সোনার ময়না
মন তুমি লা ইলাহা জপো।
মনরে চক্ষে তুমি যা দেখতেছ ভরিয়া দুনিয়াই
এ সকলের মাঝে মনরে আল্লা বিনে নাই।

মনরে যত দেখ ইষ্টরে কুটুম বাপো আর ভাই
সুখের সঙ্গতি সকল দুক্ষোর কালে নাই
মনরে দাদা দাদী মামু ফুফু মই কিবা মাই
ছকরাত মইয়তের কালে কেউরি সাধ্যি নাই।

মনের ধনকড়ি উপার্জন করি পালিলে সদাই
স্ত্রী পুত্র কন্যা কেহ সঙ্গের সাথী নাই
মনরে দম থাকিতে পরমাত্মীয় দম ডুবিলে নাই
কয়বরে কে হইবে সাথী ধুড়িয়া না পাই।

মনরে হুশ থাকিতে সন্ধান করো কেবা সঙ্গের সাথী
না হইলে সংকট কালে ঘটিবে দুর্গতি
শিতালং ফকির বলে মিছারে দুনিয়াই
সংকট বিপদের কালে আল্লা বিনে নাই।।



-- বাউল পানকৌড়ি
উকিল মুন্সির গানের সংকলন - লিলুয়া বাতাসে প্রাণ না জুড়ায় না জুড়ায় ---Click to Read


Read on mobile

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url