মহাভারতের সেই প্রাচীন ‘পঞ্চপাণ্ডব’ শব্দটিকে বাঙালি বারবার ভালোবেসে ধার করেছে নিজেদের যুগের সেরা নায়কদের বরণ করে নিতে। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের হাত ধরে যে ‘পঞ্চকবি’র সৃষ্টি হয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতায় আমরা পেয়েছি জীবনানন্দ-বুদ্ধদেব বসুর কবিতার ‘পঞ্চপাণ্ডব’।
আবার স্বাধীন বাংলাদেশে পপ মিউজিকের জোয়ার এনেছেন আজম খান-ফিরোজ সাঁইদের ‘পঞ্চরত্ন’। মাঠ কাঁপিয়েছেন মাশরাফি-সাকিবের ক্রিকেটের ‘পঞ্চপাণ্ডব’ আর সমাজ-সংস্কৃতিকে নাড়িয়ে দিয়েছেন হুমায়ূন আহমেদ ও হুমায়ূন আজাদের মতো ‘পঞ্চ হুমায়ূন’।
আজকের এই বিশেষ লেখায় আমরা বাঙালির ইতিহাস ও সংস্কৃতির সেই ৫টি বিখ্যাত ‘পঞ্চক’ বা পাঁচজনের দল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব, যারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে বাঙালির জয়যাত্রা নিশ্চিত করেছেন। আসুন ফিরে দেখা যাক আমাদের ইতিহাসের সেই সোনালী অধ্যায়গুলোকে।
বাংলা সাহিত্যের পঞ্চকবি
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১)
- দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (১৮৬৩–১৯১৩)
- রজনীকান্ত সেন (১৮৬৫–১৯১০)
- অতুলপ্রসাদ সেন (১৮৭১–১৯৩৪)
- কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬)
পঞ্চকবি বলতে বাংলা সাহিত্যের সেই পাঁচজন কবিকে বোঝায় যাঁরা শুধু কবিতাই রচনা করেননি। একই সঙ্গে গীতিকার, সুরকার ও গায়ক হিসেবেও অসামান্য অবদান রেখেছেন। বাংলা গান ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে তাঁদের অবদান অনন্য।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১): পঞ্চকবির তালিকায় তিনি প্রধান ও শীর্ষস্থানীয়। তাঁর সৃষ্টি ‘রবীন্দ্রসংগীত’ বাংলা সংস্কৃতির প্রাণ। তিনি একাধারে সাহিত্যিক, দার্শনিক এবং নোবেলজয়ী কবি।
- দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (১৮৬৩–১৯১৩): যিনি ডি. এল. রায় নামে বেশি পরিচিত। তাঁর দেশাত্মবোধক গান (যেমন: ‘ধনধান্য পুষ্পভরা আমাদের এই বসুন্ধরা’) এবং ঐতিহাসিক নাটকগুলো বাংলা সাহিত্যে অনন্য। তাঁর গানগুলোকে ‘দ্বিজেন্দ্রগীতি’ বলা হয়।
- রজনীকান্ত সেন (১৮৬৫–১৯১০): কবি ও কান্তকবি হিসেবে পরিচিত। তাঁর ভক্তিমূলক ও নীতিমূলক গান (যেমন: ‘তুমি নির্মল কর মঙ্গল করে মলিন মর্ম মুছে দাও’) বাঙালি হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন করে নিয়েছে। তাঁর গান ‘কান্তগীতি’ নামে পরিচিত।
- অতুলপ্রসাদ সেন (১৮৭১–১৯৩৪): তিনি মূলত একজন আইনজীবী হলেও তাঁর রচিত গানগুলো বাংলা সংগীতে এক নতুন মাত্রা যোগ করে। বাংলায় প্রথম ‘ঠুমরি’ ও ‘গজল’ ঘরানার গান আমদানির কৃতিত্ব তাঁর। তাঁর গান ‘অতুলপ্রসাদী’ নামে পরিচিত (যেমন: ‘মোদের গরব, মোদের আশা, আ-মরি বাংলা ভাষা!’)।
- কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬): আমাদের জাতীয় কবি এবং ‘বিদ্রোহী কবি’। তিনি বাংলা গানে এক বিশাল বৈচিত্র্য নিয়ে আসেন। তাঁর রচিত হামদ, নাত, শ্যামাসংগীত, গজল এবং দেশাত্মবোধক গান বা ‘নজরুলগীতি’ বাংলা সংগীতের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।
বাংলা সংগীতে ও সাহিত্যে তাঁদের গুরুত্ব
এই পাঁচজন কবি বাংলা ভাষার ভাব প্রকাশকে গান ও কবিতার মাধ্যমে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তাঁদের প্রধান গুরুত্বগুলো হলো:
- বৈচিত্র্যময় সুরের ধারা: উচ্চাঙ্গ সংগীত (Classical), কীর্তন, বাউল, ভাটিয়ালি এবং পশ্চিমা সুরের মিশ্রণে তাঁরা বাংলা গানকে সমৃদ্ধ করেছেন।
- দেশপ্রেমের চেতনা: ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় এই কবিদের লেখা গান ও কবিতা বাঙালিকে ভীষণভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
- আধ্যাত্মিকতা ও মানবতাবাদ: ঈশ্বরভক্তি থেকে শুরু করে মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও সাম্যের বাণী ফুটে উঠেছে এই পাঁচজন কবির লেখনীতে।
বাংলা সাহিত্যে পঞ্চপান্ডব
- বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮ - ১৯৭৪)
- জীবনান্দ দাশ (১৮৯৯ - ১৯৫৪)
- সুধীন্দ্রনাথ দত্ত (১৯০১ - ১৯৬০)
- বিষ্ণু দে (১৯০৯ - ১৯৮২)
- অমিয় চক্রাবরতী (১৯০১ - ১৯৮৭)
বাংলা সাহিত্যে ‘পঞ্চপাণ্ডব’ বলতে মহাভারতের কুন্তীপুত্র পাঁচ ভাইকে বোঝানো হয় না। ত্রিশের দশকের (১৯৩০-এর দশক) পাঁচজন অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং আধুনিকতাবাদী কবিকে নির্দেশ করে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অসামান্য ও সর্বগ্রাসী প্রভাব থেকে বের হয়ে বাংলা কবিতায় সম্পূর্ণ নতুন, আধুনিক, বাস্তববাদী এবং আন্তর্জাতিক চেতনার জন্ম দিয়েছিলেন এই পাঁচজন কবি। তাঁদের সামষ্টিক প্রয়াসই বাংলা কবিতায় ‘আধুনিকতা’র ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে।
- জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯–১৯৫৪): তাঁকে বলা হয় ‘রূপসী বাংলার কবি’ বা ‘নির্জনতার কবি’। প্রকৃতির রূপায়ণে এবং মানুষের ভেতরের একাকীত্ব ফুটিয়ে তুলতে তিনি ছিলেন অতুলনীয়।
- অমিয় চক্রবর্তী (১৯০১–১৯৮৬): তিনি ছিলেন একাধারে কবি এবং রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য-সচিব। তাঁর কবিতায় গভীর দার্শনিকতা, মননশীলতা এবং বিশ্বনাগরিক চেতনার প্রকাশ ঘটেছে।
- সুধীন্দ্রনাথ দত্ত (১৯০১–১৯৬০): তাঁকে ‘ধ্রুপদী (Classical) চেতনার কবি’ বলা হয়। শব্দের কঠোর ও নিখুঁত বুনন এবং প্রগাঢ় বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তার জন্য তিনি বিখ্যাত।
- বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮–১৯৭৪): তিনি শুধু কবিই ছিলেন না, ছিলেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংগঠক। তাঁর সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকা আধুনিক কবিদের অবদানের প্রধান মঞ্চ হয়ে উঠেছিল।
- বিষ্ণু দে (১৯০৯–১৯৮২): মার্ক্সীয় দর্শন ও সমাজতান্ত্রিক চেতনায় বিশ্বাসী কবি। তাঁর কবিতায় পুরাণ, ইতিহাস এবং সমকালীন রাজনীতির এক অপূর্ব মিশ্রণ দেখা যায়।
বাংলা সাহিত্যে তাঁদের অবদান ও গুরুত্ব
রবীন্দ্র-পরবর্তী যুগে বাংলা কবিতাকে নতুন রূপ দেওয়ার পেছনে এই পাঁচজন কবির ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য।বাংলা কবিতাকে মধ্যযুগীয় বা রক্ষণশীল ধ্যানধারণা থেকে মুক্ত করে আধুনিক মনস্ক ও বিশ্বমানের করে তোলার পেছনে এই ‘পঞ্চপাণ্ডব’এর অবদান চিরস্মরণীয়।
তাঁরা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী বিপ্লবের নাম তাঁদের প্রধান অবদানগুলো হলো:
- রবীন্দ্র-বলয় থেকে মুক্তি: রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিকতা ও রোমান্টিকতার বাইরে গিয়ে তাঁরা জীবনের জটিলতা, হতাশা, ক্লান্তি ও নাগরিক জীবনের রূঢ় বাস্তবতাকে কবিতায় তুলে আনেন।
- বিশ্বসাহিত্যের প্রভাব: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপীয় সাহিত্য আন্দোলন (যেমন: টি. এস. এলিয়টের আধুনিকতাবাদ, পরাবাস্তববাদ বা Surrealism) দ্বারা তাঁরা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন এবং তা বাংলা কবিতায় প্রয়োগ করেন।
- নতুন শব্দ ও ছন্দ: তাঁরা কবিতার চিরাচরিত ছন্দ ও উপমাকে ভেঙে নতুন শব্দচয়ন, গদ্যছন্দ এবং মনস্তাত্ত্বিক রূপকের ব্যবহার শুরু করেন।
বাংলাদেশের পপ মিউজিকের পঞ্চরত্ন
- আজম খান (১৯৫০–২০১১)
- ফিরোজ সাঁই (১৯৫২–১৯৯৫)
- ফকির আলমগীর (১৯৫০–২০২১)
- পিলু মমতাজ (১৯৫৩–২০১১)
- ফেরদৌস ওয়াহিদ
বাংলাদেশের পপ ও আধুনিক গণসংগীতের জগৎ নিয়ে কথা বলতে গেলে যাদের নাম সবার আগে আসে, তাঁরা হলেন পপ সংগীতের ‘পঞ্চরত্ন’। ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের পর, স্বাধীন বাংলাদেশে পশ্চিমা পপ মিউজিকের সাথে দেশীয় লোকসংগীতের মেলবন্ধন ঘটিয়ে যে তরুণরা এক তুমুল বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন, এই পাঁচজন ছিলেন তার অগ্রনায়ক।
- আজম খান (১৯৫০–২০১১): তিনি শুধু একজন গায়কই ছিলেন না, ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধের পর তিনি ‘উচ্চারণ’ ব্যান্ড গঠন করে বাংলা পপ মিউজিকের সূচনা করেন। তাঁর ‘রেললাইনের ঐ বস্তিতে’, ‘ওরে সালেকা ওরে মালেকা’, ‘আলালাল ও দুলাল’ গানগুলো তৎকালীন তরুণ সমাজকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ রকিং স্টাইলে তুলে ধরে তিনি হয়ে ওঠেন বাংলার ‘পপ সম্রাট’।
- ফিরোজ সাঁই (১৯৫২–১৯৯৫) বাংলা পপ ধারায় লোকসংগীত বা ফোক গানের এক অপূর্ব মিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন ফিরোজ সাঁই। তাঁর কণ্ঠের শক্তি এবং পরিবেশনা ছিল অসাধারণ। ‘ইস্কুল খুইলাছেরে মওলা’, ‘এক সেকেন্ডের নাই ভরসা’-র মতো সুফি ও আধ্যাত্মিক ভাবধারার গানগুলোকে পপ স্টাইলে গেয়ে তিনি অসম্ভব জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
- ফকির আলমগীর (১৯৫০–২০২১) তিনি ছিলেন একাধারে পপ ও গণসংগীতের কিংবদন্তি। ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠী ও গণসংগীতের পটভূমি থেকে আসা ফকির আলমগীর পপ ধারার সংগীতেও সমান সফল ছিলেন। তাঁর কণ্ঠে ‘ও সখিনা গেছস কি ভুইলা’ গানটি ইতিহাসের অন্যতম জনপ্রিয় একটি গান। দেশের সাধারণ মানুষ, শ্রমিক ও রিকশাচালকদের জীবন নিয়ে গান গেয়ে তিনি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
- পিলু মমতাজ (১৯৫৩–২০১১) এই পঞ্চরত্নের একমাত্র নারী রত্ন এবং বাংলাদেশের পপ সংগীতের সম্রাজ্ঞী। প্রখ্যাত সুরকার মমতাজ আলী খানের মেয়ে পিলু মমতাজ তাঁর চমৎকার কণ্ঠ, দারুণ পারফরম্যান্স এবং আধুনিক ধারার গান দিয়ে সে সময় একচেটিয়া রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর গাওয়া ‘মায়ের মতো আপন কেহ নাই’ বা ‘খাজাবাবার দরবারে’ গানগুলো শ্রোতাদের হৃদয়ে আজও দাগ কেটে আছে।
- ফেরদৌস ওয়াহিদ: পঞ্চরত্নের অন্যতম চনমনে ও স্টাইলিশ গায়ক। পশ্চিমা পপ ধারার সাথে তাঁর গায়কি ছিল দারুণ মানানসই। ‘মামুনিয়া’, ‘আগে যদি জানতাম রে বন্ধু’, ‘এমন একটা মন পাইলাম না’ গানগুলোর মাধ্যমে তিনি তরুণদের ক্রেজে পরিণত হন। তাঁর চমৎকার পারফরম্যান্স স্টাইল পরবর্তী প্রজন্মের পপ তারকাদের গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে।
বাংলাদেশের সংগীতে তাঁদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব
এই পাঁচজন শিল্পী শুধু গানই গাননি, তাঁরা স্বাধীন বাংলাদেশের আধুনিক সংগীতের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন:
- নতুন ধারার প্রবর্তন: রবীন্দ্র, নজরুল বা ক্ল্যাসিকাল গানের চেনা বলয় ভেঙে গিটার, ড্রামস আর কি-বোর্ডের ঝংকারে তাঁরা বাংলা গানকে আধুনিক ও বৈশ্বিক রূপ দেন।
- মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সমাজ সংস্কার: আজম খান বা ফকির আলমগীরের মতো শিল্পীরা তাঁদের গানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং সমাজের অবহেলিত মানুষের কথা তুলে ধরেছেন।
- ব্যান্ড সংগীতের ভিত্তিপ্রস্তর: আজকের বাংলাদেশের যে সমৃদ্ধ ব্যান্ড মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি (এলআরবি, মাইলস, জেমস বা বর্তমানের তরুণ ব্যান্ডগুলো), তার মূল অনুপ্রেরণা ও ভিত্তি তৈরি হয়েছিল এই পঞ্চরত্নের হাত ধরেই।
বাংলাদেশের ক্রিকেটে পঞ্চ পান্ডব
- মাশরাফি বিন মর্তুজা: ‘দ্য লিডার’ (অধিনায়ক)
- সাকিব আল হাসান: ‘দ্য লিজেন্ড’ (অলরাউন্ডার)
- তামিম ইকবাল: ‘দ্য ড্যাশিং ওপেনার’
- মুশফিকুর রহিম: ‘দ্য ডিপেন্ডেবল’
- মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ: ‘দ্য সাইলেন্ট কিলার’
বাংলাদেশের ক্রীড়াজগতে বিশেষ করে ক্রিকেটে ‘পঞ্চপাণ্ডব’ শব্দটি একটি সোনালী অধ্যায়ের নাম। ২০০০-এর মাঝামাঝি থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রায় দেড় দশক ধরে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে টেনে নিয়ে গেছেন পাঁচজন মহাতারকা: মাশরাফি বিন মর্তুজা, সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম এবং মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ।
ক্রিকেটের বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে একটি সমীহ জাগানিয়া দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পেছনে এই পাঁচজনের অবদান রূপকথার মতো। বাংলাদেশ ক্রিকেটের এই ‘পঞ্চপাণ্ডব’ এবং দেশের ক্রিকেটে তাঁদের ঐতিহাসিক অবদান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
মাশরাফি বিন মর্তুজা: ‘দ্য লিডার’ (অধিনায়ক)
তাঁকে বলা হয় বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ পথপ্রদর্শক ও সফলতম অধিনায়ক। দুই হাঁটুতে সাত-সাতবার অস্ত্রোপচার নিয়েও বুক চিতিয়ে লড়াই করা এই ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’ দলের সবাইকে এক সুতোয় বেঁধেছিলেন।
তাঁর নেতৃত্বেই বাংলাদেশ ২০১৫ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল, ২০১৭ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনাল এবং টানা বড় বড় ওয়ানডে সিরিজ জয়ের গৌরব অর্জন করে। তিনি ছিলেন এই পঞ্চপাণ্ডবের মূল চালিকাশক্তি।
সাকিব আল হাসান: ‘দ্য লিজেন্ড’ (অলরাউন্ডার)
ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার এবং বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় পোস্টার বয়। ব্যাট ও বল হাতে বছরের পর বছর ধরে ক্রিকেটের তিন সংস্করণেই বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারের শীর্ষস্থান ধরে রেখেছিলেন তিনি।
২০১৯ বিশ্বকাপে তাঁর মহাকাব্যিক পারফরম্যান্স (৬০৬ রান ও ১১ উইকেট) বিশ্বক্রিকেটে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। যেকোনো পরিস্থিতিতে ম্যাচ জেতানোর অনন্য ক্ষমতা তাঁকে দলের সবচেয়ে বড় অস্ত্রে পরিণত করেছিল।
তামিম ইকবাল: ‘দ্য ড্যাশিং ওপেনার’
বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সফলতম ওপেনার এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দেশের পক্ষে সর্বোচ্চ রানের মালিক। একটা সময় যখন বাংলাদেশ পাওয়ার-প্লে-তে রান তুলতে হিমশিম খেত, তখন তামিম এসে বোলারদের ওপর চড়াও হওয়া শেখান।
ক্রিকেটের তিন সংস্করণেই সেঞ্চুরি করা দেশের একমাত্র ব্যাটার তিনি। তাঁর লড়াকু মানসিকতা (যেমন: এশিয়া কাপে ভাঙা হাত নিয়ে ব্যাটিংয়ে নামা) দেশের ক্রিকেট ইতিহাসে রূপকথা হয়ে আছে।
মুশফিকুর রহিম: ‘দ্য ডিপেন্ডেবল’
উইকেটরক্ষক-ব্যাটার মুশফিকুর রহিমকে বলা হয় দলের সবচেয়ে পরিশ্রমী এবং নির্ভরযোগ্য ক্রিকেটার। মিডল অর্ডারে তিনি বহুবার দলের বিপর্যয়ে হাল ধরেছেন বলেই তাঁর নাম হয়ে যায় ‘মিস্টার ডিপেন্ডেবল’।
টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের পক্ষে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি করার কৃতিত্ব তাঁরই। উইকেটের পেছনে ও সামনে তাঁর নিবেদন পরবর্তী প্রজন্মের ক্রিকেটারদের জন্য এক বড় উদাহরণ।
মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ: ‘দ্য সাইলেন্ট কিলার’ (ফিনিশার)
নেপথ্যে থেকে নীরবে নিজের কাজটা করে যাওয়ার অনন্য দক্ষতার কারণে তাঁকে বলা হয় ‘সাইলেন্ট কিলার’। ২০১৫ বিশ্বকাপে ব্যাক-টু-ব্যাক সেঞ্চুরি করে ইতিহাস গড়া রিয়াদ দলের ব্যাটিং অর্ডারের শেষ দিকে একজন নির্ভরযোগ্য ‘ফিনিশার’ হিসেবে অসংখ্য ম্যাচ জিতিয়েছেন।
প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ঠান্ডা মাথায় ম্যাচ শেষ করার অদম্য ক্ষমতার কারণে তিনি দলের অতি গুরুত্বপূর্ণ এক রত্ন ছিলেন।
বাংলাদেশ ক্রিকেটে তাঁদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব
এই পাঁচজন ক্রিকেটার কেবল মাঠের পারফরম্যান্সেই অবদান রাখেননি, তাঁরা দেশের ক্রিকেট সংস্কৃতিকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছিলেন:
- ‘মিনোজ’ বা ‘ছোট দল’ তকমা মোচন: একসময় বাংলাদেশকে ক্রিকেট বিশ্বে দুর্বল দল ভাবা হতো। এই পাঁচজন মিলে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ড, ভারত, পাকিস্তান ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো পরাশক্তিদের হারিয়ে বাংলাদেশকে সমকক্ষ দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
- জয়ের মানসিকতা তৈরি: পরাজয়ের বৃত্ত থেকে বের করে দলকে যেকোনো পরিস্থিতি থেকে জেতার আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছেন তাঁরা।
- ভবিষ্যতের অনুপ্রেরণা: শান্ত, লিটন, মিরাজদের মতো বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের ক্রিকেটাররা এই পঞ্চপাণ্ডবকে দেখেই বড় হয়েছেন এবং বিশ্বমঞ্চে বুক চিতিয়ে লড়াই করার সাহস পাচ্ছেন।
বাংলাদেশের পঞ্চ হুমায়ূন
- হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী (১৯২৮–২০০১)
- হুমায়ূন আহমেদ (১৯৪৮–২০১২)
- হুমায়ূন আজাদ (১৯৪৭–২০০৪)
- হুমায়ূন ফরিদী (১৯৫২–২০১২)
- এস এম আহমেদ হুমায়ুন (১৯৩৬–১৯৯৯)
বাংলাদেশের ইতিহাস, সাহিত্য, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা এবং অভিনয়ের জগতে ‘হুমায়ূন’ নামধারী এই পাঁচজন ব্যক্তিত্ব নিজ নিজ ক্ষেত্রে একেকজন সূর্য। কেউ দেশের ক্রান্তিকালের কাণ্ডারি, কেউ শব্দের জাদুকর, কেউ আপসহীন দ্রোহী, কেউ অভিনয়ের ঈশ্বর, আবার কেউ ছিলেন মননশীল সাংবাদিকতার পথিকৃৎ।
হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী (১৯২৮–২০০১) দূরদর্শী কূটনীতিবিদ
তিনি ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কূটনীতিবিদ, জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার এবং একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ভারতের দিল্লিতে বাংলাদেশ মিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে বিশাল ভূমিকা রাখেন।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অবদান: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর, তাঁর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে জার্মানিতে নিজের সরকারি বাসভবনে আশ্রয় দিয়ে তাঁদের জীবন রক্ষা করেছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। ১৯৮৬ সালে তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন, যা বাংলাদেশের জন্য এক গৌরবময় অধ্যায়।
হুমায়ূন আহমেদ (১৯৪৮–২০১২): কথাসাহিত্যের জাদুকর
বাঙালি পাঠককে নতুন করে বই পড়তে শিখিয়েছেন যিনি, তিনি হুমায়ূন আহমেদ। তিনি একাধারে কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতা। মিসির আলি, হিমু, শুভ্রর মতো কালজয়ী চরিত্র সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি বাংলা সাহিত্যের ধারা বদলে দেন। তাঁর রচিত মধ্যবিত্ত জীবনের সুখ-দুঃখের গল্প আর ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘আজ রবিবার’-এর মতো নাটকগুলো ঢাকাকে স্তব্ধ করে রাখত। তাঁর নির্মিত ‘আগুনের পরশমণি’ বা ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ চলচ্চিত্রগুলো বাংলা সিনেমার ইতিহাসে মাইলফলক।
হুমায়ূন আজাদ (১৯৪৭–২০০৪): প্রথাবিরোধী ও আপসহীন বুদ্ধিজীবী
তিনি ছিলেন একাধারে ভাষাবিজ্ঞানী, কবি, ঔপন্যাসিক এবং সমালোচক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এই অধ্যাপককে বলা হয় বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে সাহসী প্রথাবিরোধী লেখক। সমাজ, ধর্ম, রাজনীতি এবং পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে তাঁর কলম ছিল ধারালো ও আপসহীন।
তাঁর ‘নারী’, ‘ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইল’, ‘সব কিছু ভেঙে পড়ে’ বইগুলো সমাজকে তীব্রভাবে ঝাঁকুনি দিয়েছিল। ২০০৪ সালে একুশে বইমেলা থেকে ফেরার পথে ধর্মান্ধ মৌলবাদী গোষ্ঠীর নৃশংস হামলার শিকার হন এই মুক্তমনা চিন্তাবিদ।
হুমায়ূন ফরিদী (১৯৫২–২০১২): অভিনয়ের ঈশ্বর
তাঁকে বলা হয় বাংলাদেশের অভিনয় জগতের এক অবিনশ্বর জাদুকর। মঞ্চ, টেলিভিশন নাটক কিংবা চলচ্চিত্র—যেখানেই পা রেখেছেন, নিজের অভিনয় প্রতিভা দিয়ে চরিত্রকে জীবন্ত করে তুলেছেন।
‘সংশপ্তক’ নাটকে তাঁর ‘কানকাটা রমজান’ চরিত্রটি বাঙালি কোনোদিন ভুলবে না। খলনায়ক বা নায়ক—যেকোনো চরিত্রকে ছাপিয়ে পর্দায় শুধুই হুমায়ূন ফরিদী রাজত্ব করতেন। তাঁর গলার আওয়াজ, বাচনভঙ্গি এবং চোখের অভিব্যক্তি ছিল অভিনয়ের এক পাঠশালা।
এস এম আহমেদ হুমায়ুন (১৯৩৬–১৯৯৯): মননশীল সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক
এই পঞ্চকের অন্যতম নিভৃতচারী কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের উচ্চমার্গীয় ও মননশীল সাংবাদিকতার এক পুরোধা ব্যক্তিত্ব। দৈনিক ‘আজাদী’ এবং ‘দৈনিক বাংলা’র মতো প্রথম সারির পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন।
তাঁর ক্ষুরধার প্রবন্ধ, সাহিত্য সমালোচনা এবং কলামগুলো ছিল সমাজ ও সংস্কৃতির নিখুঁত দর্পণ। প্রচারবিমুখ এই মানুষটি তাঁর লেখনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের তরুণ সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিকদের জন্য এক আধুনিক চিন্তার দুয়ার খুলে দিয়েছিলেন।
শেষ কথা
সময়ের চাকা ঘুরেছে, যুগের পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু বাঙালির যৌথ প্রতিভায় ইতিহাস গড়ার এই গৌরবময় ঐতিহ্য কখনো ম্লান হয়নি। বিংশ শতাব্দীর শুরুর ‘পঞ্চকবি’ কিংবা তিরিশের দশকের ‘পঞ্চপাণ্ডব’ যেভাবে বাঙালির চিন্তার জগৎকে আধুনিক করেছিলেন।
ঠিক তেমনি স্বাধীনতার পর ‘মিউজিক পঞ্চরত্ন’ আমাদের সংস্কৃতিকে দিয়েছিলেন মুক্তির আনন্দ। আর একবিংশ শতাব্দীতে এসে ক্রিকেটের ‘পঞ্চপাণ্ডব’ বিশ্বমঞ্চে বাঙালির বীরত্বগাথা নতুন করে লিখেছেন, যার সমান্তরালে ‘পঞ্চ হুমায়ূন’ তাঁদের মেধা দিয়ে সমৃদ্ধ করেছেন আমাদের রাষ্ট্র, সাহিত্য ও সমাজকে।
এই পাঁচজন মানুষের একেকটি দল আসলে আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বাঙালি যখনই একসঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছে, তখনই ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে। নিজ নিজ ক্ষেত্রে এই কিংবদন্তিদের অবদান বাঙালি জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ রাখবে।
