বাংলাদেশের অভিনয়জগতের ইতিহাসে এমন কিছু শিল্পীর নাম চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে, যাঁদের উপস্থিতি একটি প্রজন্মের সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ হয়ে আছে। হুমায়ূন ফরীদি সেই বিরল শিল্পীদের একজন। মঞ্চ, টেলিভিশন কিংবা চলচ্চিত্র অভিনয়ের প্রতিটি মাধ্যমে তিনি নিজের অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তাঁর সংলাপ বলার ভঙ্গি, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, শরীরী ভাষা এবং চরিত্রের গভীরে পৌঁছে যাওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা তাঁকে শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেতা নয়, বরং বাংলা অভিনয়ের এক অনন্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে। বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেশের জন্য তাঁর অবদান যেমন গৌরবের, তেমনি একজন শিল্পী হিসেবে তিনি বাংলা সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছেন তাঁর অসামান্য সৃষ্টিশীলতা দিয়ে। হুমায়ূন ফরীদিকে আমরা সাধারণত একজন শক্তিমান অভিনেতা, মঞ্চকর্মী কিংবা আবৃত্তিশিল্পী হিসেবেই চিনি। কিন্তু তাঁর সৃজনশীলতার আরেকটি নীরব অধ্যায় আজও অনেকের অজানা। কবিতা রচনার সঙ্গে তাঁর নাম খুব একটা উচ্চারিত হয় না, এমনকি এ বিষয়ে তেমন কোনো তথ্যও প্রচলিত নেই। অথচ ১৯৭৮ সালে (বাংলা ১৩৮৫ সালের কার্তিক সংখ্যা) মাসিক গণসাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাঁর লেখা একটি কবিতা ‘ছায়া’।
গ্রামীণ প্রকৃতি, মাটি, নদী, নিঃসঙ্গতা ও মানুষের অন্তর্লোককে ঘিরে লেখা এই কবিতাটি যেন তাঁর সংবেদনশীল শিল্পীমনের আরেকটি অজানা জানালা খুলে দেয়। আজ ২৯ মে, এই কিংবদন্তি অভিনেতার জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করার পাশাপাশি আমরা ফিরে দেখতে চাই তাঁর বহুমাত্রিক সৃজনজীবন। অভিনয়ের অবিস্মরণীয় পথচলা, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ, নাট্যচর্চা এবং সেই সঙ্গে বহুদিনের আড়ালে থাকা বিরল কবিতা ‘ছায়া’ সব মিলিয়ে এই নিবেদন একজন শিল্পী হুমায়ূন ফরীদিকে নতুন করে আবিষ্কারের একটি ছোট্ট প্রয়াস।
কিংবদন্তি হুমায়ূন ফরীদি: জন্ম ও শৈশব
হুমায়ূন ফরীদি ১৯৫২ সালের ২৯ মে ঢাকার নারিন্দায় জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব ও কৈশোরের একটি বড় অংশ কেটেছে মাদারীপুরে। ১৯৭০ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জৈব-রসায়ন বিভাগে ভর্তি হন। কিন্তু ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পড়াশোনা স্থগিত রেখে সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে অংশ নেন। স্বাধীনতার পর তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন এবং অসাধারণ কৃতিত্বের সঙ্গে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
- অভিনয়ের জগতে এক অনন্য প্রতিষ্ঠান
হুমায়ূন ফরীদিকে বাংলাদেশের দর্শক সবচেয়ে বেশি মনে রেখেছেন তাঁর শক্তিশালী খলচরিত্রগুলোর জন্য। তবে তিনি কখনোই একটি নির্দিষ্ট চরিত্রে সীমাবদ্ধ ছিলেন না। নায়ক, খলনায়ক, চরিত্রাভিনেতা কিংবা মঞ্চশিল্পী প্রতিটি ভূমিকাতেই তিনি ছিলেন অনন্য। পর্দায় তাঁর হাঁটা, সংলাপ বলার ভঙ্গি এবং তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দর্শকের মনে আলাদা ছাপ ফেলেছিল। চরিত্রকে জীবন্ত করে তোলার অসাধারণ ক্ষমতাই তাঁকে বাংলা অভিনয়ের ইতিহাসে একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে।
- ঢাকা থিয়েটার ও গ্রাম থিয়েটার আন্দোলন
ছাত্রজীবনেই তিনি যুক্ত হন ঢাকা থিয়েটার-এর সঙ্গে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের নিজস্ব নাট্যভাষা নির্মাণে সেলিম আল দীন ও নাসির উদ্দীন ইউসুফদের সঙ্গে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। গ্রাম থিয়েটার আন্দোলনের অন্যতম অগ্রপথিক হিসেবেও তাঁর অবদান স্মরণীয়। তিনি শুধু অভিনয়ই করেননি, নাট্যনির্দেশনাতেও রেখেছেন দক্ষতার স্বাক্ষর।
- টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে উজ্জ্বল পথচলা
টেলিভিশনে তাঁর অভিষেক ঘটে আতিকুল ইসলাম চৌধুরীর ‘নিখোঁজ সংবাদ’ নাটকের মাধ্যমে। তবে বিটিভির জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘সংশপ্তক’-এ ‘কানকাটা রমজান’ চরিত্রে অভিনয় করে তিনি ঘরে ঘরে পরিচিতি লাভ করেন। চলচ্চিত্রে তাঁর যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৪ সালের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘হুলিয়া’ দিয়ে। পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে ১৯৮৫ সালে ‘দহন’-এর মাধ্যমে। পরে ‘শ্যামল ছায়া’, ‘জয়যাত্রা’, সহ অসংখ্য চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি নিজের অনন্যতা প্রমাণ করেন।
- ব্যক্তিগত জীবন
ব্যক্তিগত জীবনে হুমায়ূন ফরীদি দুইবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। প্রথম সংসারে তাঁর একটি কন্যাসন্তান রয়েছে শারারাত ইসলাম দেবযানী। পরে তিনি অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফাকে বিয়ে করেন। ২০০৮ সালে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়।
- পুরস্কার ও সম্মাননা
তাঁর অভিনয়জীবনের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি অর্জন করেন অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা। বাচসাস পুরস্কার (শ্রেষ্ঠ অভিনেতা) দহন (১৯৮৫), জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (শ্রেষ্ঠ অভিনেতা) মাতৃত্ব (২০০৪), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিশেষ সম্মাননা। ২০১৮ সালে মরণোত্তর একুশে পদক।
- মহাপ্রয়াণ
২০১২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি মাত্র ৬০ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যু বাংলা অভিনয়জগতের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তবে তাঁর অভিনয়, আবৃত্তি এবং এই বিরল কবিতা আজও তাঁকে নতুনভাবে আবিষ্কার করার সুযোগ করে দেয়।
হারিয়ে যাওয়া কাব্যস্মৃতি: মাসিক গণসাহিত্যে প্রকাশিত ‘ছায়া’
এই মাটি, মৃত্তিকার গান হঠাৎ হারিয়ে যায়
নিরাকার সন্ধ্যা বৃক্ষের ফোঁকড়ে বাঁধে বাসা
কুলবতী কালোবাউ নদীজলে ধুয়ে ফেরে বাসন-কোসন
হাওয়া কাঁপে হাওয়া, ঘাসের সান্নিধ্যে ঘুমোয়
বিন্দুজলে স্বচ্ছন্দে সংসার সুখ নীচে যত টুনীর পায়ের
একা একা কিশোরীর স্নেহ-ডোবা চোখে ভর করে
দুপুরের নির্জন ভীতি নিসহায় উনুনে পড়ে জল
আমার ঘরের পাশে লম্বিত সুপুরীর গাছ
তবুও অপেক্ষা ক’রে পাশে মেঘে মেঘে ভিজে যায় বেলা
এই নদী ভেজে কাক ঘাটে বাঁধা নৌকোর
সুশীল পাটাতন; উচ্ছিষ্ট কচুরীর ফুল।
একনজরে হুমায়ূন ফরীদি
- নাম: হুমায়ূন ফরীদি।
- জন্ম: ২৯ মে ১৯৫২, চুয়ারিয়া গ্রাম, তুমুলিয়া ইউনিয়ন, কালীগঞ্জ উপজেলা, গাজীপুর জেলা।
- পিতা-মাতা: বাবা এটিএম নূরুল ইসলাম এবং মা বেগম ফরিদা ইসলাম (চার ভাই-বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়)।
- মাধ্যমিক: ইউনাইটেড ইসলামিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, মাদারীপুর (১৯৬৮)।
- উচ্চ মাধ্যমিক: চাঁদপুর সরকারি কলেজ।
- বিশ্ববিদ্যালয়: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জৈব-রসায়ন বিভাগে ভর্তি হলেও মুক্তিযুদ্ধের কারণে পড়াশোনা অসমাপ্ত থাকে। পরবর্তীতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
- মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ: ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
- অভিনয় জীবন শুরু: মাত্র ১২ বছর বয়সে (১৯৬৪ সালে) কিশোরগঞ্জের মহল্লার নাটক 'এক কন্যার জনক'-এ প্রথম অভিনয়।
- মঞ্চ: মাদারীপুরের শিল্পী নাট্যগোষ্ঠীর হয়ে 'ত্রিরত্ন' নাটকে 'রত্ন' চরিত্রের মাধ্যমে প্রথম দর্শকসমক্ষে আত্মপ্রকাশ। পরবর্তীতে ঢাকা থিয়েটারের সদস্য হিসেবে 'শকুন্তলা', 'ফণীমনসা', 'কীত্তনখোলা', 'কেরামত মঙ্গল', 'মুনতাসীর ফ্যান্টাসি' ও 'ভূত' নাটকে অভিনয়।
- টেলিভিশন: আতিকুল ইসলাম চৌধুরীর 'নিখোঁজ সংবাদ' নাটকের মাধ্যমে অভিষেক। তবে বাংলাদেশ টেলিভিশনের বিখ্যাত 'সংশপ্তক' নাটকে 'কানকাটা রমজান' চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও খ্যাতি অর্জন করেন।
- চলচ্চিত্র: ১৯৮৪ সালে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র 'হুলিয়া' এবং ১৯৮৫ সালে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র 'দহন'-এর মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক। তার অভিনীত অন্যান্য উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র হলো 'শ্যামল ছায়া', 'জয়যাত্রা', 'মাতৃত্ব' ইত্যাদি।
- ব্যক্তিগত জীবন: ব্যক্তিগত জীবনে দুবার বিয়ে করেন। প্রথম সংসারে তার 'শারারাত ইসলাম দেবযানী' নামে একটি মেয়ে রয়েছে। পরবর্তীতে অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফাকে বিয়ে করেন এবং ২০০৮ সালে তাদের বিবাহ-বিচ্ছেদ হয়।
- 'দহন' (১৯৮৫) চলচ্চিত্রের জন্য বাচসাস পুরস্কার (শ্রেষ্ঠ অভিনেতা)।
- 'মাতৃত্ব' (২০০৪) চলচ্চিত্রের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (শ্রেষ্ঠ অভিনেতা)।
- জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০ বছর পূর্তিতে বিশেষ সম্মাননা।
- ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক মরণোত্তর একুশে পদক (দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা)।
- মৃত্যু: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১২, ধানমন্ডি, ঢাকা (বয়স ৬০ বছর)।
এক অনন্য শিল্পীর উত্তরাধিকার
হুমায়ূন ফরীদিকে আমরা সাধারণত একজন অসামান্য অভিনেতা হিসেবেই স্মরণ করি। কিন্তু তাঁর ১৯৭৮ সালে মাসিক গণসাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত কবিতা ‘ছায়া’ আমাদের সামনে তুলে ধরে তাঁর আরেকটি অজানা পরিচয় এক সংবেদনশীল কবিমানসের। অভিনয়ের পাশাপাশি সাহিত্য ও শিল্পবোধের এই নীরব প্রকাশ প্রমাণ করে, তিনি ছিলেন বহুমাত্রিক সৃজনশীলতার এক উজ্জ্বল প্রতিভা। বাংলা সংস্কৃতিতে হুমায়ূন ফরীদির অবদান শুধু মঞ্চ, টেলিভিশন কিংবা চলচ্চিত্রে সীমাবদ্ধ নয়; তাঁর জীবন, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ, নাট্যচর্চা এবং শিল্পের প্রতি নিবেদন তাঁকে অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেছে। জন্মদিনে এই মহান শিল্পী, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিরল কবিসত্তার প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা। তাঁর কর্ম ও সৃষ্টি আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন ১. হুমায়ূন ফরীদি কে ছিলেন?
উত্তর: হুমায়ূন ফরীদি ছিলেন বাংলাদেশের কিংবদন্তি অভিনেতা, বীর মুক্তিযোদ্ধা, মঞ্চশিল্পী ও আবৃত্তিশিল্পী।
প্রশ্ন ২. হুমায়ূন ফরীদির কবিতা ‘ছায়া’ কোথায় প্রকাশিত হয়েছিল?
উত্তর: ‘ছায়া’ কবিতাটি ১৯৭৮ সালে (বাংলা ১৩৮৫ সালের কার্তিক সংখ্যা) মাসিক গণসাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
প্রশ্ন ৩. হুমায়ূন ফরীদি কি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন?
উত্তর: হ্যাঁ। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন।
প্রশ্ন ৪. হুমায়ূন ফরীদির সবচেয়ে জনপ্রিয় টেলিভিশন চরিত্র কোনটি?
উত্তর: বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় ধারাবাহিক সংশপ্তক-এ ‘কানকাটা রমজান’ চরিত্রে অভিনয় করে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
প্রশ্ন ৫. হুমায়ূন ফরীদি কোন জাতীয় সম্মাননা পেয়েছেন?
উত্তর: তিনি ২০১৮ সালে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত হন এবং মাতৃত্ব চলচ্চিত্রের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।

.jpg)
