এই মাটি, মৃত্তিকার গান হঠাৎ হারিয়ে যায়নিরাকার সন্ধ্যা বৃক্ষের ফোঁকড়ে বাঁধে বাসাকুলবতী কালোবাউ নদীজলে ধুয়ে ফেরে বাসন-কোসনহাওয়া কাঁপে হাওয়া, ঘাসের সান্নিধ্যে ঘুমোয়
বাংলাদেশের প্রখ্যাত অভিনেতা হুমায়ূন ফরীদি অভিনয়ের সকল শাখায় ছিলেন উজ্জ্বল নক্ষত্র। কবিতা আবৃত্তিতে খ্যাতি ছিলো সমান। কবিতা চর্চার কথা জানা যায়নি বা কোন লেখায় ঐ রকম প্রকাশ না পেলেও জানা যায় তাঁর লেখা একটি কবিতা মাসিক গণসাহিত্য পত্রিকার ১৩৮৫ সালের কার্তিক সংখ্যায় প্রকাশিত হয় (১৯৭৮ ইং)। তিনি যখন পর্দায় দাঁড়াতেন, তখন চরিত্রটি ছাপিয়ে তিনি নিজেই হয়ে উঠতেন প্রতিষ্ঠান।
তাঁর হাঁটা, কথা বলা কিংবা তীক্ষ্ণ দৃষ্টির জাদুতে মুগ্ধ হয়েছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। যাঁর অভিনয়ের ব্যপ্তি আকাশচুম্বী হলেও, তাঁর ভেতরের এক কবি সত্তার খবর হয়তো অনেকেরই অজানা। ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত তাঁর একটি কবিতা ‘ছায়া’ যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয় এই মাটির প্রতি তাঁর গভীর টানের কথা। আজ ২৯শে মে, বাংলার এই শক্তিমান অভিনেতার জন্মদিনে থাকলো তাঁর বর্ণাঢ্য জীবন ও সেই বিরল কবিতা নিয়ে বিশেষ নিবেদন।
হারিয়ে যাওয়া কাব্যস্মৃতি: মাসিক গণসাহিত্যে প্রকাশিত ‘ছায়া’
ছায়া
হুয়ায়ুন ফরীদি
এই মাটি, মৃত্তিকার গান হঠাৎ হারিয়ে যায়
নিরাকার সন্ধ্যা বৃক্ষের ফোঁকড়ে বাঁধে বাসা
কুলবতী কালোবাউ নদীজলে ধুয়ে ফেরে বাসন-কোসন
হাওয়া কাঁপে হাওয়া, ঘাসের সান্নিধ্যে ঘুমোয়
বিন্দুজলে স্বচ্ছন্দে সংসার সুখ নীচে যত টুনীর পায়ের
একা একা কিশোরীর স্নেহ-ডোবা চোখে ভর করে
দুপুরের নির্জন ভীতি নিসহায় উনুনে পড়ে জল
আমার ঘরের পাশে লম্বিত সুপুরীর গাছ
তবুও অপেক্ষা ক’রে পাশে মেঘে মেঘে ভিজে যায় বেলা
এই নদী ভেজে কাক ঘাটে বাঁধা নৌকোর
সুশীল পাটাতন; উচ্ছিষ্ট কচুরীর ফুল।
জন্ম ও শৈশব: নারিন্দা থেকে মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গন
১৯৫২ সালের ২৯ মে ঢাকার নারিন্দায় জন্মগ্রহণ করেন বাংলার এই কিংবদন্তি। ১৯৭০ সালে স্নাতক শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জৈব রসায়ন বিভাগে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে অংশ নেন মুক্তিযুদ্ধে। দেশ স্বাধীনের পর অর্থনীতি বিষয়ে ভর্তি হন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে।
মেধার স্বাক্ষর রাখেন প্রাতিষ্ঠানিক ফলাফলে। প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে স্নাতক সম্মান পরীক্ষা পাস করেন। বাংলাদেশের টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র দর্শকেরা তাঁকে বেশি চেনেন খলচরিত্রের একজন অসাধারণ অভিনেতা হিসেবে। তবে যেকোনো চরিত্রেই ছিলেন সপ্রতিভ।
মহাপ্রয়াণ ও শেষ শ্রদ্ধা
স্বাধীনতা-উত্তরকালে বাঙালির নিজস্ব অভিনয় আঙ্গিক নির্মাণে সেলিম আল দীন, নাসির উদ্দীন ইউসুফদের মতো নাট্যকার-পরিচালকদের পাশাপাশি তিনিও সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন গ্রাম থিয়েটার আন্দোলনের সঙ্গে। সপ্রতিভ অভিনয়ের জন্য খ্যাতি রয়েছে মঞ্চনাটকে; দিয়েছেন নির্দেশনাও। আশির দশক থেকে শুরু করে আমৃত্যু অভিনয় করেছেন টেলিভিশনের অনেক নাটকে।
অভিনয়ই ছিল তাঁর ধ্যানজ্ঞান। ছাত্রজীবনে যুক্ত হন ঢাকা থিয়েটারে। অভিনয়ের নেশা ছিল বাচিক শিল্পের আরেক মাধ্যম আবৃত্তিতেও। ২০১২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের এই শক্তিমান অভিনেতা মৃত্যুবরণ করেন। আমাদের তাঁর জন্মদিনের এই দিনে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি।
একনজরে হুমায়ূন ফরীদি
- নাম: হুমায়ূন ফরীদি।
- জন্ম: ২৯ মে ১৯৫২, চুয়ারিয়া গ্রাম, তুমুলিয়া ইউনিয়ন, কালীগঞ্জ উপজেলা, গাজীপুর জেলা।
- পিতা-মাতা: বাবা এটিএম নূরুল ইসলাম এবং মা বেগম ফরিদা ইসলাম (চার ভাই-বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়)।
- মাধ্যমিক: ইউনাইটেড ইসলামিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, মাদারীপুর (১৯৬৮)।
- উচ্চ মাধ্যমিক: চাঁদপুর সরকারি কলেজ।
- বিশ্ববিদ্যালয়: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জৈব-রসায়ন বিভাগে ভর্তি হলেও মুক্তিযুদ্ধের কারণে পড়াশোনা অসমাপ্ত থাকে। পরবর্তীতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
- মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ: ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
- অভিনয় জীবন শুরু: মাত্র ১২ বছর বয়সে (১৯৬৪ সালে) কিশোরগঞ্জের মহল্লার নাটক 'এক কন্যার জনক'-এ প্রথম অভিনয়।
- মঞ্চ: মাদারীপুরের শিল্পী নাট্যগোষ্ঠীর হয়ে 'ত্রিরত্ন' নাটকে 'রত্ন' চরিত্রের মাধ্যমে প্রথম দর্শকসমক্ষে আত্মপ্রকাশ। পরবর্তীতে ঢাকা থিয়েটারের সদস্য হিসেবে 'শকুন্তলা', 'ফণীমনসা', 'কীত্তনখোলা', 'কেরামত মঙ্গল', 'মুনতাসীর ফ্যান্টাসি' ও 'ভূত' নাটকে অভিনয়।
- টেলিভিশন: আতিকুল ইসলাম চৌধুরীর 'নিখোঁজ সংবাদ' নাটকের মাধ্যমে অভিষেক। তবে বাংলাদেশ টেলিভিশনের বিখ্যাত 'সংশপ্তক' নাটকে 'কানকাটা রমজান' চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও খ্যাতি অর্জন করেন।
- চলচ্চিত্র: ১৯৮৪ সালে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র 'হুলিয়া' এবং ১৯৮৫ সালে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র 'দহন'-এর মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক। তার অভিনীত অন্যান্য উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র হলো 'শ্যামল ছায়া', 'জয়যাত্রা', 'মাতৃত্ব' ইত্যাদি।
- ব্যক্তিগত জীবন: ব্যক্তিগত জীবনে দুবার বিয়ে করেন। প্রথম সংসারে তার 'শারারাত ইসলাম দেবযানী' নামে একটি মেয়ে রয়েছে। পরবর্তীতে অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফাকে বিয়ে করেন এবং ২০০৮ সালে তাদের বিবাহ-বিচ্ছেদ হয়।
- 'দহন' (১৯৮৫) চলচ্চিত্রের জন্য বাচসাস পুরস্কার (শ্রেষ্ঠ অভিনেতা)।
- 'মাতৃত্ব' (২০০৪) চলচ্চিত্রের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (শ্রেষ্ঠ অভিনেতা)।
- জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০ বছর পূর্তিতে বিশেষ সম্মাননা।
- ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক মরণোত্তর একুশে পদক (দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা)।
- মৃত্যু: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১২, ধানমন্ডি, ঢাকা (বয়স ৬০ বছর)।

.jpg)
