বাংলার শিল্প-ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাঁরা কেবল ছবি আঁকেননি বরং একটি জাতির আত্মপরিচয় নির্মাণ করে গেছেন। শেখ মোহাম্মদ সুলতান বা এস. এম. সুলতান তেমনই একজন শিল্পী। যাঁর ক্যানভাসজুড়ে ছড়িয়ে আছে বাংলার মাটি, মানুষ আর প্রকৃতির এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন। নড়াইলের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি, যিনি ছোটবেলায় পরিচিত ছিলেন লাল মিয়া নামে, পরবর্তীতে হয়ে ওঠেন বিশ্ব দরবারে স্বীকৃত এক কিংবদন্তি শিল্পী। সুলতানের ছবির সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর আঁকা কৃষকদের দেহ। বাস্তবে আমাদের দেশের কৃষক রুগ্ন, কৃশকায়, অভাব আর পরিশ্রমে জীর্ণ। কিন্তু সুলতানের তুলিতে সেই একই কৃষক হয়ে ওঠে মহাকায়, বলিষ্ঠ, প্রায় দেবতুল্য শক্তির প্রতীক। এই বৈপরীত্যই তাঁকে অন্য সব শিল্পী থেকে আলাদা করেছে।
তিনি বাস্তবতাকে অস্বীকার করেননি, বরং প্রশ্ন তুলেছিলেন যাঁরা আমাদের অন্ন জোগান, তাঁরা কেন এত অবহেলিত, এত ক্ষীণ থাকবেন? তাঁর শিল্পকর্ম যতটা না নান্দনিকতার প্রকাশ, তার চেয়ে বেশি এক সামাজিক দলিল, যেখানে প্রতিটি রেখা, প্রতিটি রং এক গভীর মানবিক বার্তা বহন করে। সুলতান নিজে যেভাবে গ্রামীণ জীবনযাপন করেছেন, প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থেকেছেন, তা তাঁর শিল্পকর্মকে দিয়েছে এক বিরল সত্যতা—যা বইয়ের পাতা থেকে নয়, বরং সরাসরি মাটি থেকে উঠে আসা। এই লেখায় আমরা খুঁজে দেখব শিল্পী সুলতানের এই অনন্য দর্শনের শিকড়, তাঁর শিল্পচিন্তা, তাঁর ব্যক্তিজীবনের নানা দিক, এবং কৃষক সমাজের প্রতি তাঁর গভীর মমত্ববোধের নানা প্রকাশ।
রুগ্ন বাস্তবতা আর কল্পনার বলিষ্ঠতা
শিল্পী সুলতান নিজের মুখেই বলেছিলেন এক সাক্ষাৎকারে, আমাদের দেশের মানুষ বড়ই রুগ্ন ও কৃশকায়। এমনকি একেবারে খাঁটি কৃষকও রোগা, তার হালের গরু-বলদ দুটোও রোগা। অথচ তাঁর ছবিতে এই একই মানুষ হয়ে ওঠে বলিষ্ঠ, শক্তিশালী। তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, এটি তাঁর কল্পনার ব্যাপার মন থেকে যেভাবে তিনি এই মানুষদের ভালোবেসেছেন, ঠিক সেভাবেই তাদের ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন ক্যানভাসে। এই কল্পনার পেছনে লুকিয়ে আছে এক গভীর ঐতিহাসিক ও সামাজিক উপলব্ধি। সুলতান মনে করতেন, আমাদের দেশের কৃষক সম্প্রদায়ই একসময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত গড়ে দিয়েছিল। দেশের অর্থ-বিত্ত, খাদ্য, সম্পদ সবকিছুর জোগানদাতা এই কৃষকরাই। তাহলে যাঁরা এত কিছুর জন্মদাতা, তাঁরা কেন এত কৃশ, এত রুগ্ন থাকবেন? তাঁর অতিকায় ক্যানভাসের অতিকায় কৃষক-দেহ আসলে এই প্রশ্নেরই এক নীরব প্রতিবাদ। তিনি মনে করতেন, শ্রমজীবী এই মানুষদের বলিষ্ঠ হওয়াই উচিত, কারণ তাঁদের কাঁধেই দাঁড়িয়ে আছে সমগ্র সভ্যতা।
বাংলার মাটি, মানুষ ও প্রকৃতির ত্রয়ী
বাংলার মাটি, মানুষ আর প্রকৃতি এই তিনের সম্মিলনেই সুলতান খুঁজে পেয়েছিলেন জীবনের প্রকৃত শিকড়। তাঁর ক্যানভাসে মানুষ মানেই কৃষক, আর কৃষক মানেই শক্তি, শ্রম আর সৃষ্টির প্রতীক। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, এই মাটির মানুষরাই সভ্যতার প্রকৃত ভিত্তি। তাই তাঁর ছবিতে কৃষক কখনোই রুগ্ন নয়, বরং মহাকায়, বলিষ্ঠ ও প্রাণবন্ত। তাঁর তুলির প্রতিটি আঁচড়ে কৃষকের শরীর যেন হয়ে ওঠে এক মহাকাব্যের প্রতীক, যেখানে শ্রমই সৌন্দর্য, আর মাটি-ঘামই সৃষ্টির আসল শক্তি।
একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, তাঁর সমস্ত চিন্তা, মেধা ও শ্রম দিয়ে যা কিছু তিনি নির্মাণ করেন, তা কেবল মানুষের জন্য, জীবনের জন্য সুন্দর থেকে সুন্দরতম অবস্থার দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য। সুলতানের কাছে কৃষক কেবল একজন শ্রমজীবী মানুষ ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক জীবন্ত শক্তির প্রতিমূর্তি। শিল্পীর চোখে কৃষকের শুকনো শরীর আসলে সমাজে বিদ্যমান অসাম্যেরই প্রতীক যে অসাম্য তিনি নিজের শিল্পকর্মের মধ্য দিয়ে চ্যালেঞ্জ করতে চেয়েছেন।
মাটির সঙ্গে সংগ্রাম আর জীবনের প্রয়োজনীয় জোগান
সুলতান নিজের ছবির মানুষদের সম্পর্কে বলতেন, এরা হলো মাটির মানুষ। মাটির সঙ্গে নিরন্তর সংগ্রাম করেই এরা বেঁচে থাকে। তাঁর প্রশ্ন ছিল স্পষ্ট এই মানুষদের শরীর যদি শুকনো থাকে, মন যদি হয় রোগা, তাহলে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত বস্তু আসবে কোথা থেকে? তাঁর ভাষায়, এসবের জন্মদাতা তো তাঁদের হাতই। এই প্রশ্নের মধ্য দিয়েই সুলতান তাঁর শিল্পদর্শনের মূল সুরটি প্রকাশ করেছেন। তিনি কৃষকের দেহে খুঁজে পেয়েছিলেন এক অদৃশ্য প্রাণশক্তি। তাঁর যুক্তি ছিল শরীর যদি শুকনো ও শক্তিহীন হয়, তাহলে মাটির নিচে লাঙল এক ইঞ্চিও এগোবে না। তাই আসল ব্যাপারটি হলো শক্তি বা এনার্জি, যা কৃষকের শরীরে থাকা অপরিহার্য।
কৃষকের পেশি আর সভ্যতার ভিত্তি
শিল্পী সুলতান মনে করতেন, কৃষকের শরীরের গঠন আর আমাদের সাধারণ মানুষের শরীরের গঠন সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁর যুক্তি ছিল, কৃষকের পেশি যদি শক্তিশালী না হয়, তাহলে গোটা দেশ দাঁড়িয়ে থাকবে কার ওপর ভর করে? আজকের সমগ্র সভ্যতা আসলে সেই পেশিরই ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই কথাগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে সুলতানের শিল্পদর্শনের সারমর্ম তাঁর ক্যানভাসে কৃষক শুধু চাষবাসই করে না, সে যেন সমগ্র পৃথিবীকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব বহন করে।
তাঁর আঁকা মহাকায় কৃষকের বলিষ্ঠ অবয়ব, নবান্নের দৃশ্য, ধান কাটার মুহূর্ত, জমি কর্ষণ, জেলেদের মাছ ধরা কিংবা গ্রামীণ নারীর দৈনন্দিন জীবন প্রতিটি ছবিতেই ফুটে ওঠে একই বার্তা: শ্রমজীবী মানুষই এই ভূখণ্ডের প্রকৃত নায়ক। সুলতানের ক্যানভাসে সোনালি আঁশ পাটের ক্ষেত থেকে শুরু করে ফসলের বিস্তীর্ণ মাঠ, কৃষকের পেন্সিল ড্রইং থেকে গ্রামীণ জীবনের খুঁটিনাটি সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে বাংলার এক সম্পূর্ণ জীবন্ত দলিল।
রঙ, রেখা আর গ্রাম-বাংলার জীবনবোধ
সুলতানের শিল্পকর্ম শুধু কৃষকের দেহ নিয়েই সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর ক্যানভাসে বারবার ফিরে এসেছে গ্রাম-বাংলার নানা দৃশ্য নবান্নের উৎসব, ধান কাটার কর্মব্যস্ততা, নদীতে জাল ফেলা জেলে সম্প্রদায়, পাটক্ষেতের সোনালি আঁশ, আর গ্রামীণ নারীর নিত্যদিনের সংগ্রাম। এই প্রতিটি দৃশ্যে তিনি এক ধরনের মহাকাব্যিক আবহ তৈরি করতেন, যেখানে সাধারণ মানুষের সাধারণ কাজও হয়ে উঠত অসাধারণ। তাঁর রঙের ব্যবহারেও ছিল এক ধরনের সাহসিকতা—গাঢ় বাদামি, মাটির রং, সবুজের নানা স্তর মিলেমিশে তৈরি করত এক জীবন্ত পরিবেশ, যেখানে মানুষ আর প্রকৃতি যেন একে অপরের সম্প্রসারণ।
তাঁর পেন্সিল ড্রইংগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। রং-তুলির পাশাপাশি তিনি অসংখ্য স্কেচ ও ড্রইং করেছেন, যেখানে কৃষকের অবয়ব, মুখাবয়বের কাঠিন্য, শরীরের গঠন নিয়ে তাঁর গভীর পর্যবেক্ষণ ফুটে উঠেছে। এই ড্রইংগুলো দেখলে বোঝা যায়, তাঁর চূড়ান্ত ক্যানভাসের পেছনে কতটা নিরলস অধ্যয়ন আর অনুশীলন কাজ করেছে। তিনি মানুষের শরীরের অ্যানাটমি নিয়ে নিজস্ব একটি দর্শন তৈরি করেছিলেন, যা প্রচলিত পশ্চিমা শিল্পশিক্ষার ধারা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
নড়াইলের বাড়ি ও শিল্পীর ব্যক্তিজীবন
নড়াইলের চিত্রা নদীর তীরে সুলতানের বাড়িটি আজ তাঁর স্মৃতি বহন করে চলেছে। এই বাড়িতেই তিনি কাটিয়েছেন জীবনের দীর্ঘ সময়, সেখানেই এঁকেছেন তাঁর অধিকাংশ বিখ্যাত ছবি। তাঁর জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত সাধারণ, প্রায় সন্ন্যাসীর মতো। তিনি প্রচলিত জাগতিক চাওয়া-পাওয়ার প্রতি কখনো আকৃষ্ট হননি, বরং নিজের চারপাশের মানুষ, পশুপাখি আর প্রকৃতির সঙ্গে গড়ে তুলেছিলেন এক গভীর সম্পর্ক। শোনা যায়, তিনি অসংখ্য পশুপাখি পুষতেন এবং শিশুদের নিয়ে গঠন করেছিলেন একটি শিশুস্বর্গ, যেখানে গ্রামের শিশুরা ছবি আঁকা শিখত। এই মানবিক দিকটিও তাঁর শিল্পীসত্তার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
নড়াইলের লাল মিয়া থেকে বিশ্বখ্যাত শিল্পী
এস. এম. সুলতানের জীবনযাত্রা নিজেই এক অনুপ্রেরণার গল্প। নড়াইলের সাধারণ ঘরের ছেলে লাল মিয়া থেকে তিনি হয়ে ওঠেন বিশ্বখ্যাত চিত্রশিল্পী এস. এম. সুলতান। এই দীর্ঘ যাত্রায় তিনি বাংলার মাটি ও মানুষকে যে সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছেন, শিল্পের ইতিহাসে তা সত্যিই বিরল। তিনি কখনো নগরকেন্দ্রিক চাকচিক্যময় জীবনের প্রতি আকৃষ্ট হননি, বরং বারবার ফিরে গেছেন নিজের শিকড়ের কাছে, গ্রামের মানুষদের কাছে, নদী-মাঠ-প্রকৃতির কাছে।
তাঁর শিল্পকর্ম আজ দেশের বিভিন্ন শিল্প ব্যাংক ও সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত আছে, যা প্রমাণ করে তাঁর কাজের গুরুত্ব কতটা গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী। তিনি কেবল একজন চিত্রশিল্পী ছিলেন না, ছিলেন এক দার্শনিক, যিনি রং আর তুলির মাধ্যমে সমাজের প্রতি নিজের দায়বদ্ধতা প্রকাশ করেছেন। জীবদ্দশাতেই তিনি পেয়েছিলেন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও একুশে পদকের মতো সম্মাননা, যা তাঁর শিল্পকর্মের গুরুত্বকে আরও প্রতিষ্ঠিত করে। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক শিল্প-সমালোচকদের দৃষ্টিও কেড়েছিল তাঁর ভিন্নধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি। পশ্চিমা শিল্পরীতির অনুকরণ না করে তিনি নিজের মাটি থেকে খুঁজে নিয়েছিলেন নিজস্ব একটি ভাষা, যা তাঁকে সমসাময়িক অন্য শিল্পীদের থেকে আলাদা করে তুলেছে। আজও শিল্প-শিক্ষার্থীরা তাঁর কাজ থেকে শেখেন কীভাবে নিজের শিকড়কে অস্বীকার না করেও বিশ্বমানের শিল্প সৃষ্টি করা যায়।
শিল্পী সুলতানের কৃষকের ক্যানভাস
(১)
(২)
(৩)
(৪)
(৫)
(৬)
(৭)
(৮)
(৯)
(১০)
(১১)
(১২)
(১৩)
(১৪)
(১৫)
(১৬)
(১৭)
(১৮)
(১৯)
(২০)
(২১)
(২২)
(২৩)
(২৪)
(২৫)
(২৬)
(২৭)
(২৮)
(২৯)
(৩০)
(৩১)
শিল্পে বিপ্লব ও মানবিক বার্তা
এস. এম. সুলতান কেবল ছবি আঁকেননি, তিনি ক্যানভাসে এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছেন। সাধারণ মানুষের রুগ্ন বাস্তবতাকে তিনি কখনো অস্বীকার করেননি, বরং তাদের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অসীম প্রাণশক্তিকে পৃথিবীর সামনে বড় করে তুলে ধরেছেন। তাঁর ছবির সেই বিশাল দেহের কৃষক আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় শ্রমজীবী মানুষের পেশিই আসলে আধুনিক সভ্যতার প্রকৃত ইঞ্জিন। আজও যখন আমরা সুলতানের আঁকা কৃষকদের দিকে তাকাই, তখন মনে হয় শ্রমিকই সুন্দর, কৃষকই শ্রেষ্ঠ। তাঁর প্রশ্ন, "ওরা এত রুগ্ন কেন, যারা আমাদের অন্ন জোগায়?" আজও সমান প্রাসঙ্গিক, সমান তীব্র। এই প্রশ্ন শুধু শিল্পের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়, এটি মানবতার প্রশ্ন, সাম্যের প্রশ্ন।
বাংলাদেশের শিল্প-ইতিহাসে সুলতান তাই কেবল একজন চিত্রকর নন, তিনি একজন চিন্তক, যিনি রং-তুলির মাধ্যমে সমাজকে আয়না দেখিয়েছেন। তাঁর কাজ আমাদের শিখিয়ে যায়, শিল্প কেবল সৌন্দর্যের প্রকাশ নয় এটি হতে পারে ন্যায়বিচার আর সাম্যের এক নীরব হাতিয়ারও। যতদিন বাংলার মাটিতে কৃষক ফসল ফলাবে, ততদিন সুলতানের ক্যানভাসের সেই মহাকায় কৃষক আমাদের মনে করিয়ে দেবে তাঁদের প্রাপ্য সম্মানের কথা। এই মহান শিল্পীর প্রতি রইল বাউল পানকৌড়ির পক্ষ থেকে শ্রদ্ধাঞ্জলি।































