পদ্মা তখন ছিল অন্যরকম। এখনকার মতো শান্ত, ক্লান্ত নদী নয় সে ছিল উদ্দাম, খরস্রোতা, যেন নিজের ভেতরে একটা যৌবনের আগুন নিয়ে বইত। সেই উত্তাল পদ্মার বুকেই একদিন মানুষ স্বপ্ন দেখেছিল লোহার এক সেতুর, যা জুড়ে দেবে উত্তরবঙ্গকে দক্ষিণের সঙ্গে, কলকাতাকে অসম-ত্রিপুরার সঙ্গে। সেই স্বপ্নই একদিন রূপ নিয়েছিল হার্ডিঞ্জ ব্রিজ নামেপাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশী থেকে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা পর্যন্ত বিস্তৃত এক রেলসেতুতে, যা আজও বাংলাদেশের দীর্ঘতম রেলসেতু হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
পাকশী রেলস্টেশনের ঠিক দক্ষিণে দাঁড়িয়ে থাকা এই সেতুর অপর প্রান্ত ভেড়ামারা। পদ্মার দুই তীরকে রেলপথে যুক্ত করে সেতুটি উত্তরবঙ্গ আর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগে যে ভূমিকা রেখে চলেছে, তার কোনো তুলনা নেই। আজকের দিনে পাকশী আর হার্ডিঞ্জ ব্রিজ যেন একে অপরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য এই সেতুকে ঘিরেই পাকশী পরিচিতি পেয়েছে ইতিহাসের এক জীবন্ত রেলশহর হিসেবে।
এই সেতু কেবল ইট-লোহার এক স্থাপনা নয়। এ যেন একটা জীবন্ত ইতিহাসের বই, যার পাতায় পাতায় লেখা আছে ঔপনিবেশিক শাসনের গল্প, চব্বিশ হাজার শ্রমিকের ঘাম আর পরিশ্রমের কথা, মুক্তিযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী স্মৃতি, আর শতাব্দী পেরিয়েও নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক অদম্য জেদ। প্রায় এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এই সেতু দেখেছে কত শাসক আসে, কত শাসক যায় ব্রিটিশ থেকে পাকিস্তান, পাকিস্তান থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ। তবুও সে অবিচল, অটুট। আজ চলুন, এই লালরঙা সেতুর গায়ে হাত বুলিয়ে শুনে আসি তার শতবর্ষের গল্প।
হার্ডিঞ্জ ব্রিজ নির্মাণের প্রয়োজন কেন হয়েছিল
গল্পের শুরু ১৮৮৯ সালে। তৎকালীন অবিভক্ত ভারত সরকার তখন উপলব্ধি করল, অসম, ত্রিপুরা, নাগাল্যান্ড আর উত্তরবঙ্গের সঙ্গে কলকাতার যোগাযোগ আরও সহজ করা দরকার। পদ্মার ওপর একটা সেতুই হতে পারে তার সমাধান। কিন্তু স্বপ্ন দেখা আর তা বাস্তবায়ন করার মধ্যে দূরত্ব বিশাল প্রায় উনিশ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল সেই মঞ্জুরি পেতে। অবশেষে ১৯০৮ সালে অনুমোদন মেলে, আর দায়িত্ব বর্তায় ব্রিটিশ প্রকৌশলী রবার্ট উইলিয়াম গেইলসের কাঁধে এমন এক কাজ, যার স্বীকৃতিতে পরে তাঁকে "স্যার" উপাধিতে ভূষিত করা হয়। সেতুর নকশা আঁকেন স্থপতি আলেকজান্ডার মেয়াডোস রেন্ডেল, আর নির্মাণের ভার নেয় ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান ব্রেথওয়েইট অ্যান্ড কার্ক।
১৯০৯ সালে শুরু হয় জরিপের কাজ। গেইলস বুঝেছিলেন, উত্তাল পদ্মার বুকে সেতু দাঁড় করানো সহজ কাজ নয় আগে প্রয়োজন নদীকে বাঁধার। তাই ১৯১০-১১ সাল জুড়ে চলল শুধু বাঁধ নির্মাণের কাজ। বড় বড় পাথর আর মাটি মিশিয়ে নদীর দুই তীরে প্রায় পনেরো কিলোমিটার জুড়ে তৈরি হলো সেই বাঁধ এমন এক কৌশল, যা একশ বছর পরও অক্ষত রয়ে গেছে, যেন একটি পাথরও এখনও নড়েনি নিজের জায়গা থেকে।
এক দুঃসাহসিক নির্মাণযজ্ঞ: ২৪ হাজারের বেশি শ্রমিকের ঘাম
১৯১২ সালে শুরু হয় মূল সেতুর কাজ গাইড ব্যাংক তৈরি আর গার্ডার বসানো। এই বিশাল কর্মযজ্ঞে যুক্ত হয়েছিলেন প্রায় চব্বিশ হাজার চারশো শ্রমিক, যাদের অধিকাংশই ছিলেন বাঙালি। তাদের নিরলস শ্রমের বিনিময়ে পাকশীতে গড়ে উঠেছিল এক নতুন জনপদ ব্রিটিশদের জন্য বাংলো-কটেজ, আর তার আশপাশে দোকানপাট, কলকারখানা, বাজার। একটা গোটা জনজীবনের চেহারাই বদলে গিয়েছিল সেতু নির্মাণের সেই কয়েক বছরে। শোনা যায়, গেইলস নিজে প্রায় এক কিলোমিটার দূরের বাংলো থেকে দূরবীন হাতে নজর রাখতেন নির্মাণকাজের ওপর।
একটি বড় অবকাঠামো শুধু নদীর ওপর দাঁড়ায় না, তার চারপাশের জনজীবনও বদলে দেয়। সেতু নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গে পাকশী ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ রেলকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। রেলপথের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য, মানুষের চলাচল আর স্থানীয় অর্থনীতিতেও পরিবর্তন আসে। অর্থাৎ হার্ডিঞ্জ ব্রিজ শুধু দুটি তীরকে যুক্ত করেনি এটি মানুষের জীবনযাত্রার মধ্যেও তৈরি করেছিল নতুন সংযোগ। পাঁচ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর, ১৯১৫ সালে শেষ হয় নির্মাণকাজ। সেতুর দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় প্রায় ১,৭৯৮ মিটার বা ১.৮ কিলোমিটার, তার ওপর বসানো হয় পনেরোটি স্প্যান আর দুটি ব্রডগেজ রেললাইন।
নাম কেন হলো ‘হার্ডিঞ্জ ব্রিজ’-কে করেছিলেন ব্রিজের নকশা-লেগেছিল কত টাকা
হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নকশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ব্রিটিশ প্রকৌশলী ও স্থপতি আলেকজান্ডার মেইডোস রেন্ডেল। নির্মাণকাজে যুক্ত ছিল ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান ব্রেথওয়েইট অ্যান্ড কির্ক। সেতুটির প্রকৌশল পরিকল্পনায় তৎকালীন সময়ের উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল। পদ্মার মতো প্রবল স্রোতের নদীর ওপর দীর্ঘ রেলসেতু নির্মাণের জন্য সেতুর ভিত্তি, পিয়ার, গার্ডার এবং নদীর প্রবাহ সবকিছু বিবেচনায় নিতে হয়েছিল। হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ১৫টি প্রধান স্টিল ট্রাস স্প্যান রয়েছে। পুরো সেতুর দৈর্ঘ্য প্রায় ১.৮ কিলোমিটার।
সেতুটির নামকরণ করা হয় তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের নামে। চার্লস হার্ডিঞ্জ ১৯১০ থেকে ১৯১৬ সাল পর্যন্ত ভারতের ভাইসরয় ছিলেন। সেতুটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনও তিনি নিজেই করেন। এ কারণেই পদ্মার ওপর নির্মিত এই বিশাল রেলসেতু ইতিহাসে ‘হার্ডিঞ্জ ব্রিজ’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। স্থানীয়ভাবে এটি পাকশী ব্রিজ নামেও পরিচিত।
হার্ডিঞ্জ ব্রিজ নির্মাণে তৎকালীন হিসেবে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৩ কোটি ৫১ লাখ ৩২ হাজার ১৬৪ ভারতীয় রুপি। আজকের অর্থমূল্যে সেই পরিমাণ কল্পনা করাও কঠিন। তবে শুধু অর্থের হিসাব দিয়ে এই সেতুর মূল্য বোঝা সম্ভব নয়। কারণ এর পেছনে ছিল দীর্ঘ পরিকল্পনা, হাজার হাজার মানুষের শ্রম এবং ব্রিটিশ আমলের অন্যতম বড় প্রকৌশল উদ্যোগ।
১৯১৫: পদ্মার বুক দিয়ে ছুটল প্রথম ট্রেন
দীর্ঘ নির্মাণযজ্ঞের পর আসে সেই বহু প্রতীক্ষিত দিন। ১৯১৫ সালের ১ জানুয়ারি হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ওপর দিয়ে প্রথম পরীক্ষামূলক ট্রেন চলাচল করে ঈশ্বরদী থেকে খুলনার দিকে। এরপর আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ৪ মার্চ, ১৯১৫ সালে সেতুটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন লর্ড হার্ডিঞ্জ নিজে, ফিতা কেটে।
সেদিন শুধু একটি সেতুর উদ্বোধন হয়নি। পদ্মার দুই তীরের মানুষের জন্য খুলে গিয়েছিল যোগাযোগের এক নতুন দরজা। ট্রেনের চাকা যখন প্রথমবারের মতো সেতুর ওপর দিয়ে এগিয়ে গেল, তখন হয়তো কেউ ভাবেনি এই ইস্পাতের কাঠামো একদিন এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকবে।
সেতু নির্মাণে তৎকালীন হিসেবে খরচ হয়েছিল প্রায় ৩ কোটি ৫১ লাখ ৩২ হাজার ১৬৪ ভারতীয় রুপি। আজকের অর্থমূল্যে সেই পরিমাণ কল্পনা করাও কঠিন। তবে শুধু অর্থের হিসাব দিয়ে এই সেতুর মূল্য বোঝা সম্ভব নয় কারণ এর পেছনে ছিল দীর্ঘ পরিকল্পনা, হাজার হাজার মানুষের শ্রম, আর ব্রিটিশ আমলের অন্যতম বড় প্রকৌশল উদ্যোগ।
হার্ডিঞ্জ ব্রিজের স্থাপত্য ও প্রকৌশল-এক শতাব্দী ধরে টিকে থাকার বিস্ময়
হার্ডিঞ্জ ব্রিজের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য এর বিশাল ইস্পাত ট্রাস কাঠামো। সেতুটিতে রয়েছে ১৫টি প্রধান স্টিল ট্রাস স্প্যান এবং এগুলোকে ধারণ করে একাধিক পিয়ার। সেতুটির মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১,৭৯৮ মিটার বা ১.৮ কিলোমিটার। এটি মূলত ডাবল-লাইন ব্রডগেজ রেলসেতু হিসেবে নির্মিত হয়েছিল। অর্থাৎ এর ওপর দিয়ে পাশাপাশি দুটি ব্রডগেজ রেললাইন চলাচলের জন্য ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে পদ্মার স্রোত, বন্যা, বর্ষা, রোদ ও কুয়াশা সহ্য করেও এর ইস্পাত কাঠামো আজও দাঁড়িয়ে আছে এটাই এর প্রকৌশলগত স্থায়িত্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ স্মৃতি
হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়গুলোর একটি হলো ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর জন্য সেতুটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। ফলে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর দৃষ্টিতেও সেতুটির কৌশলগত গুরুত্ব ছিল অনেক। যুদ্ধের সময় বিমান হামলায় সেতুটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে ১২ নম্বর স্প্যান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল; অন্য কয়েকটি স্প্যানও ক্ষতির মুখে পড়ে। একসময় যে ইস্পাত কাঠামো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শক্তির প্রতীক ছিল, মুক্তিযুদ্ধের সময় সেটিই হয়ে উঠেছিল যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের সাক্ষী। পরে সেতুটি মেরামত করা হয় এবং আবারও ট্রেন চলাচল শুরু করে।
শতবর্ষ পেরিয়েও হার্ডিঞ্জ ব্রিজ
২০১৫ সালের ৪ মার্চ হার্ডিঞ্জ ব্রিজ তার উদ্বোধনের শতবর্ষ পূর্ণ করে। একটি স্থাপনার জন্য ১০০ বছর শুধু সময়ের হিসাব নয়। এই এক শতাব্দীতে বাংলাদেশ দেখেছে ব্রিটিশ শাসনের অবসান, ভারত-পাকিস্তান বিভাজন, পাকিস্তান আমল, মুক্তিযুদ্ধ, আর স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম। এই পুরো সময়ের নীরব সাক্ষী হয়ে পদ্মার ওপর দাঁড়িয়ে থেকেছে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ। ১৯১৫ সালে যে ট্রেন সেতুর ওপর দিয়ে প্রথম চলেছিল, তার পর থেকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষ এই সেতু দিয়ে যাতায়াত করেছে। কত মানুষের প্রথম ট্রেনযাত্রা, কত বিদায়, কত ফিরে আসা, কত আনন্দ আর কত অশ্রু সবকিছুরই যেন নীরব সাক্ষী এই সেতু।
পর্যটকদের কাছে কেন এত আকর্ষণীয়?
হার্ডিঞ্জ ব্রিজ শুধু রেলযাত্রীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়—এটি বাংলাদেশের অন্যতম পরিচিত ঐতিহাসিক স্থাপনাও বটে। দূর থেকে দেখা গেলে পদ্মার বিস্তৃত জলরাশির ওপর দীর্ঘ লালচে ইস্পাত কাঠামোটি অসাধারণ এক দৃশ্য তৈরি করে। বর্ষায় এক রূপ, শীতের কুয়াশায় আরেক রূপ, আবার বিকেলের শেষ আলোয় এর সৌন্দর্য সম্পূর্ণ অন্যরকম।
অনেক দর্শনার্থী নৌকায় করে পদ্মার বুক থেকে ব্রিজটি দেখতে আসেন। কেউ ছবি তোলেন, কেউ নদীর পাড়ে বসে থাকেন নিঃশব্দে, আবার কেউ ট্রেনের শব্দ শুনে হয়তো ফিরে যান নিজের শৈশব বা পুরোনো কোনো স্মৃতিতে। হার্ডিঞ্জ ব্রিজ তাই শুধু একটি স্থাপনা নয় এটি একটি অনুভূতিও। আর সেতুটির ঠিক পাশ দিয়ে ২০০৪ সালে তৈরি হয়েছে আরেকটি সড়কসেতু বাউল সাধক লালন শাহের নামে নামকরণ করা লালন শাহ সেতু। পুরনো আর নতুনের এই মিলবন্ধন আজ পদ্মাপাড়ে তৈরি করেছে এক অনন্য দৃশ্য।
আজ হার্ডিঞ্জ ব্রিজের বয়স কত
হার্ডিঞ্জ ব্রিজ উদ্বোধন হয়েছিল ৪ মার্চ, ১৯১৫ সালে। সেই হিসাবে ২০২৬ সালে এসে সেতুটির উদ্বোধনের বয়স দাঁড়ায় ১১১ বছরে। অর্থাৎ এটি এখন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম প্রবীণ অথচ এখনো সচল রেলসেতু। বাংলাদেশ রেলওয়ের নথি ও প্রকৌশল পরিকল্পনাতেও সেতুটিকে শতবর্ষী গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবেই বিবেচনা করা হয়, আর এর ভবিষ্যৎ সক্ষমতা নিয়েও সময়ে সময়ে সমীক্ষা চলে।
একটি সেতুর মূল্য শুধু তার দৈর্ঘ্য, স্প্যান কিংবা নির্মাণব্যয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। হার্ডিঞ্জ ব্রিজের দিকে তাকালে দেখা যায় এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে উপমহাদেশের ঔপনিবেশিক ইতিহাস, হাজার হাজার শ্রমিকের ঘাম, প্রকৌশলীদের মেধা, পদ্মার প্রকৃতি, পাকশীর রেলশহরের বিকাশ, মুক্তিযুদ্ধের ক্ষত, আর স্বাধীন বাংলাদেশের দীর্ঘ পথচলা।
ব্রিটিশ আমলে নির্মিত হলেও স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষের কাছে এই সেতু আজ অন্য এক অর্থ বহন করে। এটি এখন আর কোনো সাম্রাজ্যের প্রতীক নয়; বরং বাংলাদেশের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পদ্মা প্রতিদিন তার জল বদলায়, নদীর চর বদলায়, তীর বদলায়, মানুষের জীবন বদলায় কিন্তু হার্ডিঞ্জ ব্রিজ দাঁড়িয়ে থাকে, একটি দীর্ঘ সময়ের স্মৃতি হয়ে।
ভ্রমণ গাইড: কীভাবে যাবেন, কী দেখবেন, কী খাবেন
গল্প শোনার পর নিশ্চয়ই মন চাইছে নিজের চোখে দেখে আসতে এই শতবর্ষী সেতুকে। তাহলে জেনে নিন কীভাবে সহজে পৌঁছে যাবেন পাকশীর হার্ডিঞ্জ ব্রিজে। ঢাকা থেকে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের দূরত্ব প্রায় ১৪৩ কিলোমিটার। দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে সড়ক বা রেলপথে প্রথমে পৌঁছাতে হবে ঈশ্বরদীতে। ঢাকার গাবতলী বা কল্যাণপুর থেকে পাবনাগামী বাসে চড়ে সরাসরি ঈশ্বরদী নামা যায়, আবার চাইলে ট্রেনেও যাওয়া যায় ঈশ্বরদী জংশন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রেলস্টেশন। ঈশ্বরদী রেলস্টেশন বা বাসস্ট্যান্ডে নেমে রিকশা, টেম্পো বা সিএনজি অটোরিকশা ভাড়া করে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায় পাকশী রেলস্টেশন সংলগ্ন হার্ডিঞ্জ ব্রিজে। দূরত্ব খুব বেশি নয়, তাই আধা ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছানো সম্ভব।
কী দেখবেন শুধু হার্ডিঞ্জ ব্রিজ দেখেই ফিরে আসার দরকার নেই এর আশপাশে ছড়িয়ে আছে আরও অনেক দর্শনীয় জায়গা।
- লালন শাহ সেতু: হার্ডিঞ্জ ব্রিজের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা এই সড়কসেতু থেকে পুরনো সেতুটির পূর্ণাঙ্গ দৃশ্য উপভোগ করা যায়, বিশেষ করে বিকেলের আলোয়।
- পাকশী রিসোর্ট: পদ্মার তীরে গড়ে ওঠা এই রিসোর্টে বাগান, লেক, মিনি চিড়িয়াখানা আর সুইমিং পুল রয়েছে, একটু জিরিয়ে নেওয়ার জন্য চমৎকার জায়গা।
- দেশের প্রথম ন্যারো গেজ রেললাইন ও ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশন: রেলপ্রেমীদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি ও লালন শাহের মাজার: কাছাকাছি কুষ্টিয়ায় গেলে ইতিহাস আর সংস্কৃতির আরও গভীরে ঢোকা যায়।
- পদ্মার পাড়ে বসে সূর্যাস্ত দেখাটাও এখানকার অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা: লালরঙা ইস্পাত কাঠামোর ওপর সোনালি আলো পড়লে দৃশ্যটা সত্যিই ভোলার নয়।
কী খাবেন ও কোথায় থাকবেন পাবনা শহরের আব্দুল হামিদ রোডে বেশ কিছু পরিচিত খাবারের হোটেল আছে, যেখানে স্থানীয় ও চাইনিজ—দুই ধরনের খাবারই মেলে। দিনে দিনে ঘুরে আসতে চাইলে থাকার দরকার নেই, তবে রাত কাটাতে চাইলে পাবনা শহরে বিভিন্ন মানের আবাসিক হোটেল পাওয়া যায়, আর বাড়তি আরামের জন্য বেছে নিতে পারেন পাকশী রিসোর্টের মতো জায়গাও।
ভ্রমণের সেরা সময় শীতকালে পদ্মার পানি কমে গেলেও কুয়াশামাখা সকালে সেতুর রূপ হয় অন্যরকম মায়াবী। আর বর্ষায় পদ্মা যখন পূর্ণ যৌবনে ফিরে আসে, তখন সেতু আর নদীর মেলবন্ধন দেখতে ভিড় করেন আরও বেশি মানুষ। তাই ঋতু বুঝে ভ্রমণের পরিকল্পনা করলে অভিজ্ঞতাটা হয়ে ওঠে আরও সমৃদ্ধ।
হার্ডিঞ্জ ব্রিজ নিয়ে সংক্ষিপ্ত FAQ
১. হার্ডিঞ্জ ব্রিজ কোথায় অবস্থিত?
হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশী ও কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার মাঝখানে পদ্মা নদীর ওপর অবস্থিত।
২. হার্ডিঞ্জ ব্রিজ কবে নির্মিত হয়?
হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নির্মাণকাজ ১৯০৯ সালে শুরু হয়ে ১৯১৫ সালে শেষ হয়।
৩. হার্ডিঞ্জ ব্রিজ উদ্বোধন করা হয় কবে?
১৯১৫ সালের ৪ মার্চ তৎকালীন ভারতের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ সেতুটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
৪. হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নামকরণ কেন করা হয়েছিল?
তৎকালীন ভারতের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের নাম অনুসারে সেতুটির নামকরণ করা হয় ‘হার্ডিঞ্জ ব্রিজ’।
৫. হার্ডিঞ্জ ব্রিজের দৈর্ঘ্য কত?
হার্ডিঞ্জ ব্রিজের দৈর্ঘ্য প্রায় ১,৭৯৮ মিটার বা ১.৮ কিলোমিটার।
৬. হার্ডিঞ্জ ব্রিজে কয়টি স্প্যান রয়েছে?
সেতুটিতে মোট ১৫টি প্রধান স্টিল ট্রাস স্প্যান রয়েছে।
৭. হার্ডিঞ্জ ব্রিজ দিয়ে কী চলাচল করে?
হার্ডিঞ্জ ব্রিজ মূলত একটি রেলসেতু। এর ওপর দিয়ে ট্রেন চলাচল করে এবং দুটি ব্রডগেজ রেললাইন রয়েছে।
৮. হার্ডিঞ্জ ব্রিজ নির্মাণে কত শ্রমিক কাজ করেছিলেন?
সেতুটি নির্মাণে প্রায় ২৪ হাজার ৪০০ শ্রমিক কাজ করেছিলেন বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
৯. মুক্তিযুদ্ধের সময় হার্ডিঞ্জ ব্রিজের কী হয়েছিল?
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বিমান হামলায় হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ১২ নম্বর স্প্যানসহ কয়েকটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে সেতুটি মেরামত করা হয়।
১০. হার্ডিঞ্জ ব্রিজের পাশে কোন সেতু রয়েছে?
হার্ডিঞ্জ ব্রিজের পাশে লালন শাহ সেতু রয়েছে। এটি ২০০৪ সালে নির্মিত একটি সড়কসেতু।
১১. হার্ডিঞ্জ ব্রিজ কত বছরের পুরোনো?
১৯১৫ সালে উদ্বোধনের হিসাবে ২০২৬ সালে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের বয়স ১১১ বছর।
১২. হার্ডিঞ্জ ব্রিজ কেন ঐতিহাসিক?
ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এই সেতু এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রেল যোগাযোগ, প্রকৌশল ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ ও সামাজিক পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হয়ে আছে।
শেষ কথা: পদ্মার বুকের চিরযৌবনা সেতু
১৯১৫ সালে যখন হার্ডিঞ্জ ব্রিজ উদ্বোধন হয়েছিল, তখন কেউ হয়তো ভাবেনি যে একদিন এটি শতবর্ষ পেরিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠবে। আজ ১১১ বছর পরও পদ্মার ওপর দিয়ে ট্রেন ছুটে যায়। লোহার গার্ডারে বাতাসের শব্দ ওঠে। নিচে পদ্মা তার নিজের গতিতে বয়ে চলে। আর দুই তীরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ—নীরব, দৃঢ়, অথচ অসংখ্য গল্পে জীবন্ত। এই সেতু দেখেছে ব্রিটিশ শাসন, দেখেছে দেশভাগ, দেখেছে পাকিস্তান আমল, দেখেছে মুক্তিযুদ্ধ, দেখেছে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম ও পরিবর্তন। তার ইস্পাতের শরীরে সময়ের ছাপ থাকলেও, ইতিহাসের কাছে এটি এখনো তরুণ চিরযৌবনা, ঠিক যেমনটা তার নির্মাতা একদিন স্বপ্ন দেখেছিলেন।
