মুর্তজা বশীর নামটি উচ্চারিত হলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রকলার এক উজ্জ্বল অধ্যায়। কিন্তু তিনি কেবল একজন খ্যাতিমান চিত্রশিল্পীই নন একই সঙ্গে ছিলেন কথাসাহিত্যিক গবেষক এবং ইতিহাস-অনুসন্ধানী এক বহুমাত্রিক সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্ব।
রঙ, রেখা ও ক্যানভাসের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি শব্দের জগতেও নির্মাণ করেছেন স্বতন্ত্র এক শিল্পভুবন, যেখানে মানুষের একাকীত্ব, প্রেম, স্মৃতি, নাগরিক জীবনের সংকট এবং অস্তিত্বের প্রশ্ন গভীর সংবেদনশীলতায় উঠে এসেছে।
চিত্রশিল্পী মুর্তজা বশীর এর সাহিত্য ও ইতিহাসে সৃষ্টিশীল রূপ’ শীর্ষক এই ধারাবাহিকের প্রথম পর্বে আলোচিত হবে তাঁর সাহিত্যিক সত্তার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন ‘আলট্রামেরীন’, ‘মিতার সঙ্গে চার সন্ধ্যে’ ও ‘অমিত্রাক্ষর’; পাশাপাশি তুলে ধরা হল
ইতিহাস-গবেষক মুর্তজা বশীরের অনন্য কীর্তি ‘মুদ্রা ও শিলালিপির আলোকে বাংলার হাবশী সুলতান ও তৎকালীন সমাজ’ গ্রন্থের তাৎপর্য। শিল্প, সাহিত্য ও ইতিহাসের এই সম্মিলিত পাঠ আমাদের সামনে উন্মোচন করবে মুর্তজা বশীরের এক বিস্ময়কর সৃষ্টিশীল জগত।
আলট্রামেরীন'— জীবনের ক্যানভাসে এক নীল বেদনা
মুর্তজা বশীর তাঁর চিত্রকর্মে যেভাবে রঙের ব্যবহারে মানুষের ভেতরের জগতকে ফুটিয়ে তুলতেন, ঠিক তেমনি শব্দের তুলিতে তিনি এঁকেছেন 'আলট্রামেরীন'। "আলট্রামেরীন" (Ultramarine) মূলত একটি গাঢ় নীল রঙ।
শিল্পী মুর্তজা বশীরের চোখে এই নীল কেবল কোনো রঙ নয়, বরং এটি মানুষের একাকীত্ব, বিষাদ, গভীর প্রেম এবং অস্তিত্বের সংকটের এক প্রতীক।
মূল বিষয়বস্তু ও প্রেক্ষাপট
উপন্যাসটি মূলত নাগরিক জীবনের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং মানুষের ভেতরের একাকীত্বকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে।
মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত সমাজের ভেতরের শূন্যতা, মেকি আভিজাত্য এবং চেনা সম্পর্কের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অচেনা মানুষগুলোকে তিনি খুব সূক্ষ্মভাবে ব্যবচ্ছেদ করেছেন।
উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য:
- শৈল্পিক ভাষা: একজন চিত্রশিল্পী যখন সাহিত্য রচনা করেন, তখন তাঁর লেখায় এক ধরণের ভিজ্যুয়াল বা দৃশ্যমানতা তৈরি হয়। মুর্তজা বশীরের লেখার বর্ণনাভঙ্গি এতই জীবন্ত যে, পড়তে পড়তে পাঠক চোখের সামনে দৃশ্যগুলো দেখতে পান।
- মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা: চরিত্রের ভেতরের দ্বন্দ্ব, অবদমিত ইচ্ছা এবং একাকীত্বের এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ রয়েছে এই উপন্যাসে।
- রঙ ও জীবনের মেলবন্ধন: উপন্যাসের পরতে পরতে রঙের ব্যবহার এবং মানুষের আবেগের সাথে তার সংযোগ এক ভিন্ন মাত্রার রস সৃষ্টি করেছে।
"জীবন তো আসলে এক ক্যানভাস, যেখানে আমরা প্রতিনিয়ত নিজেদের অজান্তেই সুখ-দুঃখের রঙ লেপে যাই। কখনো সেই রঙ উজ্জ্বল, কখনো বা তা আলট্রামারীনের মতো গাঢ় ও বিষাদময়।"
মিতার সঙ্গে চার সন্ধ্যে ও অমিত্রাক্ষর (উপন্যাসদ্বয়)
এই বই দুটির পেছনে রয়েছে বাংলা সাহিত্যের এক রোমাঞ্চকর ইতিহাস। ১৯৫৫ সালে মুর্তজা বশীর যখন তাঁর কলকাতার ছাত্রজীবনের ডায়েরির ওপর ভিত্তি করে 'আলট্রামেরীন' লিখতে শুরু করেন, তখন ফ্লোরেন্স ও লন্ডনে যাতায়াতের পথে মূল পাণ্ডুলিপিটি হাতছাড়া হয়ে যায়।
পরবর্তীতে সেই অমূল্য ডায়েরির রসদ থেকেই ষাটের দশকের শেষে ‘সচিত্র সন্ধানী’ পত্রিকায় এই দুটি নাতিদীর্ঘ উপন্যাস প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালে মুর্তজা বশীর 'আলট্রামেরীন' উপন্যাসটি সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে পুনর্লিখন করেন। যা তৎকালীন জনপ্রিয় 'বিচিত্রা'র ঈদসংখ্যায় মুদ্রিত হয়।
মূলত, 'মিতার সঙ্গে চার সন্ধ্যে' এবং 'অমিত্রাক্ষর'—এই দুটি উপন্যাসই ছিল 'আলট্রামেরীন'-এর সেই আদি ও অকৃত্রিম নির্যাস, যা গ্রন্থাকারে প্রকাশের এক দশক আগেই 'সচিত্র সন্ধানী'র পাতায় পাঠকদের মুগ্ধ করেছিল।
মিতার সঙ্গে চার সন্ধ্যে
মিতার সঙ্গে চার সন্ধ্যে' উপন্যাসটি নাগরিক জীবনের এক অদ্ভুত শূন্যতা এবং সম্পর্কের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতাকে ধারণ করে তৈরি হয়েছে। মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনের এক অনবদ্য দলিল।
- মূল সুর: এখানে 'চার সন্ধ্যে' কেবল সময়ের পরিমাপ নয়, বরং একটি সম্পর্কের চার রকমের মানসিক রূপান্তর।
- বৈশিষ্ট্য: চিত্রশিল্পীর ডায়েরি থেকে উঠে আসা এই কাহিনীতে চারপাশের পরিবেশ, আলো-ছায়ার খেলা এবং মানুষের ভেতরের একাকীত্ব এত চমৎকারভাবে উঠে এসেছে যে পাঠক সহজেই চরিত্রের ভেতরের অবদমিত ইচ্ছা ও দ্বিধাদ্বন্দ্বের সাথে নিজেকে মেলাতে পারেন। মিতা চরিত্রটি এখানে সমকালীন আধুনিক বাঙালি নারীর এক প্রতিনিধি, যার সাথে লেখকের আত্মিক ও মানসিক সংলাপের মধ্য দিয়ে গল্প এগিয়ে যায়।
অমিত্রাক্ষর: জীবনের ছন্দহীনতার শিল্পরূপ
কাব্যের ছন্দের ক্ষেত্রে 'অমিত্রাক্ষর' যেমন প্রথাগত অন্ত্যমিলহীন, মুর্তজা বশীরের এই উপন্যাসটিও জীবনের সেই প্রথাগত ছন্দের বাইরে গিয়ে এক ভিন্ন সুরের সন্ধান করে।
- মূল সুর: 'আলট্রামেরীন'-এর ছায়া অবলম্বনে রচিত এই উপন্যাসে এক তরুণের শিল্পী হয়ে ওঠার সংগ্রাম, কলকাতার দিনগুলোর উত্তাপ এবং মধ্যবিত্ত সমাজের আভিজাত্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কৃত্রিমতাকে ব্যবচ্ছেদ করা হয়েছে।
- বৈশিষ্ট্য: সম্পর্কের কোনো সহজ বা সরল রেখায় না গিয়ে জীবনের জটিল ও অমিল দিকগুলোকে এখানে তুলে ধরা হয়েছে। ডায়েরির পাতায় লুকিয়ে থাকা কাঁচা আবেগ ও পরিণত বয়সের লেখনীর এক দারুণ মিশেল দেখা যায় এই উপন্যাসে।
একজন চিত্রশিল্পীর আত্মজৈবনিক ডায়েরি কীভাবে ভেঙে চুরমার হয়ে আবার নতুন শিল্পে রূপ নিতে পারে, এই উপন্যাস দুটি তার প্রমাণ। 'মিতার সঙ্গে চার সন্ধ্যে' এবং 'অমিত্রাক্ষর' কেবল দুটি স্বাধীন উপন্যাসই নয়।
বরং এগুলো 'আলট্রামেরীন'-এর সেই আদি প্রতিবিম্ব, যা ছাড়া মুর্তজা বশীরের সাহিত্যিক সত্ত্বার বিবর্তনকে পুরোপুরি জানা অসম্ভব। বাংলা সাহিত্যের গবেষক এবং সিরিয়াস পাঠকদের জন্য এই দুই সৃষ্টির নেপথ্য ইতিহাস এবং এদের পাঠ এক পরম প্রাপ্তি।
মুদ্রা ও শিলালিপির আলোকে বাংলার হাবশী সুলতান ও তৎকালীন সমাজ’
বহুপ্রাতিত চিত্রশিল্পী ও গবেষক মুর্তজা বশীর-এর একটি আকর গ্রন্থ ও অসাধারণ ঐতিহাসিক গবেষণা। আমরা সাধারণত মুর্তজা বশীরকে একজন মহান চিত্রশিল্পী বা কথাসাহিত্যিক হিসেবে চিনলেও, ইতিহাস ও মুদ্রাতত্ত্বে (Numismatics) তাঁর যে অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল, এই বইটি তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
বইটির মূল প্রেক্ষাপট: বাংলার হাবশী শাসন
বাংলার মধ্যযুগীয় ইতিহাসে (১৪৮৭–১৪৯৩ খ্রিস্টাব্দ) ইলিয়াস শাহী বংশের পতনের পর এক সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য আবিসিনিয়া বা বর্তমান ইথিওপিয়া থেকে আসা ‘হাবশী’ ক্রীতদাসরা ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসে। তারা তৎকালীন সুলতানদের দেহরক্ষী বা প্রাসাদের উচ্চপদে আসীন ছিল।
পরবর্তীতে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র ও বিদ্রোহের মাধ্যমে তারা একে একে বাংলার সিংহাসন দখল করে। মাত্র কয়েক বছরের এই শাসনামলে বারবাক শাহজাদা, সাইফউদ্দিন ফিরুজ শাহ, দ্বিতীয় মাহমুদ শাহ এবং শামসউদ্দিন মুজাফফর শাহ নামের চারজন হাবশী সুলতান বাংলা শাসন করেন।
গবেষণার অভিনবত্ব: মুদ্রা ও শিলালিপির সাক্ষ্য
ইতিহাসের পাতায় হাবশী সুলতানদের সাধারণত ‘ক্রূর’, ‘অত্যাচারী’ বা ‘লুটেরা’ হিসেবে একপেশেভাবে চিত্রায়িত করা হয়েছে। মুর্তজা বশীর এই প্রচলিত ধারণাকে শুধু লিখিত ইতিহাসের ওপর ছেড়ে না দিয়ে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন। তিনি মূলত দুটি প্রাথমিক উৎসের ওপর ভিত্তি করে তাঁর গবেষণা সাজিয়েছেন:
- প্রাচীন মুদ্রা: হাবশী সুলতানদের আমলে জারি করা মুদ্রাগুলোর ওজন, ধাতু, উৎকীর্ণ লিপি এবং পুদিনা বা টাকশালের (Mint) নাম বিশ্লেষণ করেছেন। মুদ্রাগুলো প্রমাণ করে যে, সংক্ষিপ্ত ও রাজনৈতিকভাবে অস্থির সময়েও বাংলার অর্থনীতি কতটা সচল ছিল।
- শিলালিপি (Inscriptions): তৎকালীন মসজিদ, মাদ্রাসা বা প্রাসাদের গায়ে খোদাই করা শিলালিপিগুলোর পাঠোদ্ধার করে তিনি দেখিয়েছেন যে, হাবশী সুলতানরা কেবল যুদ্ধবিগ্রহেই লিপ্ত ছিলেন না, বরং শিল্প, স্থাপত্য এবং জনকল্যাণমূলক কাজেও তাঁদের অবদান ছিল।
তৎকালীন সমাজ ও সংস্কৃতির চিত্র
এই গ্রন্থের মাধ্যমে মুর্তজা বশীর তৎকালীন বাংলার সামাজিক চিত্রটি খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অভিজাত শ্রেণী: ক্ষমতার জন্য প্রাসাদ ষড়যন্ত্র কীভাবে সাধারণ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলত, তার বিবরণ পাওয়া যায়।
- সাংস্কৃতিক মিশ্রণ: আফ্রিকার হাবশী সংস্কৃতি, পারস্যের দরবারী সংস্কৃতি এবং বাংলার স্থানীয় সংস্কৃতির এক অদ্ভুত মেলবন্ধন ঘটেছিল এই সময়ে।
- ধর্মীয় ও স্থাপত্য বিকাশ: লিপিগুলোর প্রমাণ থেকে জানা যায়, অনেক হাবশী সুলতানই সুফি-সাধকদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং বহু মসজিদ ও জলাশয় নির্মাণ করেছিলেন।
ইতিহাস কেবল বিজয়ী বা রাজাদের লিখিত কাহিনী নয়, মাটির নিচ থেকে উঠে আসা একটি প্রাচীন মুদ্রা বা ক্ষয়ে যাওয়া শিলালিপি কখনো কখনো শত বছরের চাপিয়ে দেওয়া মিথ্যাকে ভেঙে চুরমার করে দিতে পারে।
মুর্তজা বশীরের এই কাজটি কোনো শুষ্ক ঐতিহাসিক বিবরণ নয়। একজন শিল্পীর চোখ দিয়ে তিনি ইতিহাসের খণ্ডাংশগুলোকে জোড়া লাগিয়েছেন, আবার একজন খাঁটি গবেষকের মতো নিরপেক্ষ থেকে সত্য উদ্ঘাটন করেছেন।
যাঁরা বাংলার মধ্যযুগীয় ইতিহাস, মুদ্রা তত্ত্ব এবং সমাজ বিবর্তনের ধারা সম্পর্কে জানতে আগ্রহী, তাঁদের জন্য ‘মুদ্রা ও শিলালিপির আলোকে বাংলার হাবশী সুলতান ও তৎকালীন সমাজ’ একটি অবশ্য পাঠ্য এবং সংগ্রহে রাখার মতো আকর গ্রন্থ।
বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী শিল্পী মুর্তজা বশীর। কেবল ছবি আঁকা নয়; উপন্যাস, ইতিহাস-গবেষণা কিংবা স্মৃতিকথা সবখানেই ছিল তাঁর অসামান্য পণ্ডিত্য।
মুর্তজা বশীরের লেখা বই যা প্রতিটি বইপ্রেমীর বুকশেলফে থাকা উচিত। আপনি যদি খাঁটি সাহিত্য এবং গভীর গবেষণার স্বাদ পেতে চান, বই গুলো আপনার পাঠতালিকায় আজই যুক্ত করে নিন।
