ক্রিকেট বিশ্বে টেস্ট মর্যাদা অর্জন করা মোটেই সহজ কাজ ছিল না বাংলাদেশের জন্য। বহু বছরের প্রস্তুতি, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক টুর্নামেন্টে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স আর ক্রিকেট বিশ্বের কাছে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বাংলাদেশ পৌঁছেছিল টেস্ট ক্রিকেটের অভিজাত ক্লাবের দোরগোড়ায়। এই যাত্রায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল আইসিসি ট্রফি এবং একাধিক আইসিসি সহযোগী দেশের টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের ধারাবাহিক সাফল্য। যা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের সদস্য দেশগুলোর আস্থা অর্জনে সহায়ক হয়েছিল। দীর্ঘদিন ক্রিকেট বিশ্বের প্রান্তে থাকা একটি দেশের জন্য টেস্ট মর্যাদা ছিল কেবল একটি ক্রীড়া স্বীকৃতি নয় বরং জাতীয় গর্বের বিষয়ও। শেষ পর্যন্ত ২০০০ সালের ২৬ জুন নয়টি টেস্ট খেলুড়ে দেশের ভোটে বাংলাদেশ পরিণত হয় বিশ্বের দশম টেস্ট খেলুড়ে জাতিতে। এই স্বীকৃতি বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। যেখানে দেশটি প্রবেশ করে বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে সম্মানজনক ও কঠিন সংস্করণে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ নিয়ে।
লাল-সবুজের জার্সির বদলে সেদিন বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের গায়ে উঠেছিল সাদা পোশাক। প্রতিপক্ষ ছিল ভারত। মাঠের এক পাশে নতুন এক টেস্ট দলের স্বপ্ন অন্য পাশে ক্রিকেটের অন্যতম শক্তিশালী দল। ফলাফল বাংলাদেশের পক্ষে না এলেও সেই ম্যাচ দিয়েই শুরু হয়েছিল দেশের টেস্ট ক্রিকেটের দীর্ঘ যাত্রা। আজ সেই ঐতিহাসিক ম্যাচের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায় হারলেও বাংলাদেশের অভিষেকটা মোটেও সাদামাটা ছিল না। প্রথম ইনিংসে ৪০০ রান, আমিনুল ইসলাম বুলবুলের অসাধারণ ১৪৫ এবং অধিনায়ক নাইমুর রহমান দুর্জয়ের ৬ উইকেট বাংলাদেশের আগমনের বার্তাই দিয়েছিল।
১৯৯৯ বিশ্বকাপ থেকে ২০০০ সালের টেস্ট অভিষেক
টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার আগে বাংলাদেশ ক্রিকেটে যে ঘটনাটি সবচেয়ে বেশি আলোড়ন তুলেছিল তা হলো ১৯৯৯ বিশ্বকাপের পারফরম্যান্স। আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নেতৃত্বে বাংলাদেশ দল প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে অংশ নিয়েই পরাক্রমশালী পাকিস্তান ও অভিজ্ঞ স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে গোটা ক্রিকেট বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয়। আকরাম খান, খালেদ মাহমুদ সুজনদের মতো ক্রিকেটাররা সেই সাফল্যের মূল কারিগর ছিলেন। এই পারফরম্যান্সই বাংলাদেশের টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পথ সুগম করে দেয়। ২৬ জুন টেস্ট স্ট্যাটাস অর্জনের ঠিক পাঁচ মাসের মাথায় ১০ নভেম্বর ২০০০ তারিখে, প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চে টেস্ট খেলতে নামে বাংলাদেশ দল। প্রতিপক্ষ ছিল ক্রিকেট বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দল ভারত।
১০ নভেম্বরের বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের পরিবেশ
সেদিন সকাল থেকেই ঢাকা শহরের চিত্র ছিল একেবারে অন্যরকম। সূর্য ওঠার পর থেকেই পুরো শহরে ছিল সাজ সাজ রব। রিকশা, বাস, পায়ে হাঁটা মানুষ সবার গন্তব্য যেন এক জায়গায় বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম। এমন দিন বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে খুব কমই এসেছে যেদিন ইতিহাসের সাক্ষী হওয়ার সুযোগ কেউ হাতছাড়া করতে চায়নি। ম্যাচের আগে নানা আয়োজনে রাঙানো হয় অনুষ্ঠান। গ্যালারি ভরে উঠেছিল দর্শকে। যাদের চোখে ছিল উত্তেজনা আর গর্বের মিশ্র অনুভূতি। এই ম্যাচটি ছিল বিশ্ব ক্রিকেট ইতিহাসের ১৫১২তম টেস্ট এবং ভারতের জন্য তাদের ৩৩৪তম টেস্ট। বাংলাদেশের মাটিতে অবশ্য এটি ছিল নবম টেস্ট আয়োজন। এর আগে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে সাতটি টেস্ট হয়েছিল যখন বাংলাদেশ পাকিস্তানের অংশ ছিল আর একটি ছিল এশিয়ান টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল, যেখানে মুখোমুখি হয়েছিল পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা। ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন দুই অভিজ্ঞ আম্পায়ার ইংল্যান্ডের ডেভিড শেফার্ড, যার জন্য এটি ছিল ক্যারিয়ারের ৫৪তম টেস্ট, আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্টিভ বাকনার, যার জন্য এটি ছিল ৫২তম।
টস ও বাংলাদেশের প্রথম একাদশ
টস করতে মাঠে নামেন দুই অধিনায়ক। বাংলাদেশের নাঈমুর রহমান দুর্জয় এবং ভারতের নতুন অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলি। দুর্জয় কয়েন উঁচিয়ে জেতার সঙ্গে সঙ্গেই গ্যালারিতে নেমে আসে উল্লাসের ঢেউ আর সেই মুহূর্তেই বাংলাদেশ প্রবেশ করে টেস্ট ক্রিকেটের অভিজাত জগতে। টস জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন দুর্জয়। বাংলাদেশের ঐতিহাসিক এই একাদশে ছিলেন: শাহরিয়ার হোসেন, মেহরাব হোসেন অপি, হাবিবুল বাশার, আমিনুল ইসলাম বুলবুল, আকরাম খান, আল শাহরিয়ার, নাঈমুর রহমান (অধিনায়ক), খালেদ মাসুদ পাইলট (উইকেটরক্ষক), মোহাম্মদ রফিক, হাসিবুল হোসেন ও বিকাশ রঞ্জন দাস। এই ম্যাচে মোট চৌদ্দজন ক্রিকেটারের টেস্ট অভিষেক হয়েছিল। বাংলাদেশের এগারোজনের পাশাপাশি ভারতের শিব সুন্দর দাস, মুরালি কার্তিক ও সাবা করিমেরও প্রথম টেস্ট অভিষেক ঘটে এই ম্যাচে।
আমিনুল ইসলাম বুলবুলের ১৪৫ রানের ইতিহাস
ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুটা মোটেও স্বস্তিদায়ক ছিল না বাংলাদেশের জন্য। মাত্র ১০ রানের মাথায় জাভাগাল শ্রীনাথের বলে বোল্ড হয়ে ফেরেন মেহরাব হোসেন (৪ রান, ১৮ বল)। এরপর ৪৪ রানের মাথায় জহির খানের বলে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন শাহরিয়ার হোসেন (১২ রান, ৫০ বল)। দুই ওপেনারকে হারিয়ে চাপে পড়া দলকে টেনে তোলেন আমিনুল ইসলাম বুলবুল। প্রথম টেস্ট খেলতে নেমেই তিনি গড়েন ইতিহাস। ৩৮০ বল মোকাবিলা করে সতেরোটি চারের সাহায্যে তিনি খেলেন ১৪৫ রানের অবিস্মরণীয় ইনিংস, শেষপর্যন্ত আউট হন আজিত আগারকারের বলে শ্রীনাথের হাতে ক্যাচ দিয়ে। এই ইনিংস বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি হিসেবে চিরস্থায়ী হয়ে থাকে। অস্ট্রেলিয়ার চার্লস ব্যানারম্যান ও জিম্বাবুয়ের ডেভ হটনের পর আমিনুল হয়ে ওঠেন বিশ্বের তৃতীয় ক্রিকেটার, যিনি নিজের দেশের অভিষেক টেস্টে সেঞ্চুরি করেন। সব মিলিয়ে টেস্ট ইতিহাসে অভিষেক ম্যাচে সেঞ্চুরি করা ৪৫তম ব্যাটসম্যান তিনি।
হাবিবুল বাশারের ৭১
আমিনুলের পাশাপাশি এই ইনিংসে সমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন হাবিবুল বাশারও। প্রথম টেস্ট খেলতে নেমে তিনি ভারতীয় বোলারদের দারুণভাবে সামলে ১১২ বলে দশটি চারের সাহায্যে খেলেন ৭১ রানের ঝকঝকে ইনিংস। শতরান থেকে মাত্র কয়েক পা দূরে গিয়ে জহির খানের বলে গাঙ্গুলির হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন তিনি। আমিনুল ও বাশারের এই জুটিই মূলত বাংলাদেশের ইনিংসের মেরুদণ্ড গড়ে দেয়। মাঝের সারিতে আকরাম খান করেন ৩৫ রান, আল শাহরিয়ার ১২, আর অধিনায়ক নাঈমুর রহমান করেন ১৫। খালেদ মাসুদ ১২১ বলে ৩২ রানের ধৈর্যশীল ইনিংস খেলেন, মোহাম্মদ রফিক করেন ২৯ বলে ২২ রান, আর হাসিবুল হোসেন অপরাজিত থাকেন ২৮ রানে। শেষ ব্যাটসম্যান রঞ্জন দাস ২ রানে আউট হলে ১৫৩.৩ ওভারে বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থামে ৪০০ রানে যা কোনো দেশের অভিষেক টেস্টে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ হিসেবে রেকর্ডে ওঠে। সর্বোচ্চ রেকর্ডটি অবশ্য ভারতের বিপক্ষেই, ১৯৯২-৯৩ মৌসুমে জিম্বাবুয়ের গড়া, ৪৫৬ রান। ভারতের বোলারদের মধ্যে সুনীল জোশি ছিলেন সবচেয়ে সফল ৪৫.৩ ওভার বল করে আটটি মেডেনসহ ১৪২ রানে নেন ৫ উইকেট।
ভারতের ৪২৯ রান ও দুর্জয়ের ৬/১৩২
জবাবে ব্যাট করতে নেমে ভারতও শুরুতে হোঁচট খায়। শিব সুন্দর দাস করেন ২৯ রান, সদাগোপ্পান রমেশ ৯২ বলে ৫৮ রান। মুরালি কার্তিক করেন ৪৩, রাহুল দ্রাবিড় ৪৮ বলে ২৮। মাঝে সচিন টেন্ডুলকার আউট হন মাত্র ১৮ রানে। কিন্তু অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলি ১৫৩ বলে ৮৪ রানের ইনিংস খেলে দলকে টেনে নিয়ে যান। সুনীল জোশি নিচের সারিতে নেমে খেলেন ৯২ রানের গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস, আর আজিত আগারকার করেন ৩৪ রান। বল হাতে এই ইনিংসে বাংলাদেশের সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম ছিলেন অধিনায়ক নাঈমুর রহমান দুর্জয় নিজেই। ৪৪.৩ ওভার বল করে নয়টি মেডেনসহ তিনি নেন ১৩২ রানে ৬ উইকেট। যা টেস্ট ইতিহাসে অভিষেক ম্যাচে দ্বিতীয় সেরা বোলিং ফিগার। এই তালিকার শীর্ষে আছেন অস্ট্রেলিয়ার টম কেন্ডাল, যিনি ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম টেস্টেই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৫৫ রানে নিয়েছিলেন ৭ উইকেট। মোহাম্মদ রফিক ৫১ ওভার বল করে নেন ৩ উইকেট। শেষ পর্যন্ত ১৪১.৩ ওভারে ৪২৯ রানে অলআউট হয় ভারত বাংলাদেশের চেয়ে মাত্র ২৯ রান বেশি।
বাংলাদেশের ৯১ রানের দ্বিতীয় ইনিংস
মাত্র ২৯ রানের সামান্য লিড হাতে নিয়ে দ্বিতীয়বার ব্যাট করতে নামে বাংলাদেশ, কিন্তু এবার আর প্রথম ইনিংসের ছায়াও দেখা যায়নি। শাহরিয়ার হোসেন ৩২ বলে ৭ রান করে লেগ বিফোরের ফাঁদে পড়েন জোশির বলে। মেহরাব হোসেন করেন মাত্র ২, আউট হন জহির খানের বলে। হাবিবুল বাশার এবার লড়াই করেন ৬৩ বলে ৩০ রানের ইনিংসে, কিন্তু আগারকারের বলে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন। আমিনুল ইসলাম এবার আর জ্বলে উঠতে পারেননি, লেগ বিফোর হন মাত্র ৬ রানে। আল শাহরিয়ার ৬, আকরাম খান মাত্র ২ রান করে আউট হন। খালেদ মাসুদ এবারও লড়াই করে অপরাজিত থাকেন ৬৮ বলে ২১ রানে, কিন্তু বাকিদের ব্যর্থতায় দল টিকতে পারেনি। নাঈমুর রহমান করেন ৩, মোহাম্মদ রফিক ৪, হাসিবুল হোসেন ও রঞ্জন দাস দুজনেই আউট হন শূন্য রানে। মাত্র ৪৬.৩ ওভারেই ৯১ রানে গুটিয়ে যায় বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংস। ভারতের বোলারদের মধ্যে এই ইনিংসেও সুনীল জোশি ছিলেন সফলতম ১৮ ওভার বল করে পাঁচটি মেডেনসহ ২৭ রানে নেন ৩ উইকেট। শ্রীনাথ নেন ৩ উইকেট, আগারকার ২টি, আর মুরালি কার্তিক একটি।
ভারতের ৯ উইকেটের জয়
মাত্র ৬৩ রানের লক্ষ্য নিয়ে দ্বিতীয়বার ব্যাটিংয়ে নামে ভারত। সদাগোপ্পান রমেশ দ্রুত ফিরে যান হাসিবুল হোসেনের বলে, মাত্র ১ রানে। কিন্তু এরপর শিব সুন্দর দাস অপরাজিত ৩৮ বলে ২২ রান আর রাহুল দ্রাবিড়ের ঝকঝকে ৪৯ বলে অপরাজিত ৪১ রানের ইনিংসে ভর করে মাত্র ১৫ ওভারেই লক্ষ্যে পৌঁছে যায় ভারত। ৯ উইকেটের বিশাল ব্যবধানে জয় পায় তারা, আর বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম টেস্ট শেষ হয় হার দিয়ে।
ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ড ও পরিসংখ্যান
এই ম্যাচ শেষে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য পরিসংখ্যান উঠে আসে। দুই ইনিংস মিলিয়ে ৮ উইকেট নিয়ে (৫টি প্রথম ইনিংসে, ৩টি দ্বিতীয় ইনিংসে) ম্যান অব দ্য ম্যাচ নির্বাচিত হন সুনীল জোশি। বাংলাদেশের বিপক্ষে এই ৯ উইকেটের জয় ছিল দেশের বাইরে ভারতের সবচেয়ে বড় জয়সংখ্যার ব্যবধান—এর আগে নিউজিল্যান্ডের মাটিতে দুইবার (১৯৬৭-৬৮ ও ১৯৭৫-৭৬ সালে) ৮ উইকেটের ব্যবধানে জিতেছিল তারা। মোট ১৫৬টি অ্যাওয়ে টেস্ট খেলে এর আগে মাত্র ১৩টিতে জিতেছিল ভারত; বাংলাদেশের বিপক্ষে এই জয় ছিল তাদের চতুর্দশতম বিদেশি জয়। সৌরভ গাঙ্গুলির জন্যও এই ম্যাচ ছিল স্মরণীয়। ভারতের ২৭তম টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে অভিষিক্ত হওয়া গাঙ্গুলি পঙ্কজ রায়ের পর হয়ে ওঠেন দ্বিতীয় বাঙালি, যিনি ভারতের টেস্ট অধিনায়কত্ব করেন। আর অধিনায়ক হিসেবে নিজের প্রথম টেস্টেই জয় পাওয়া পঞ্চম ভারতীয় হিসেবে নাম লেখান তিনি তার আগে এই কীর্তি ছিল পলি উমরিগার, সুনীল গাভাস্কার, রবি শাস্ত্রী ও শচিন টেন্ডুলকারের।
বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট একাদশের পরবর্তী ইতিহাস
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ঐতিহাসিক একাদশের সদস্যরা বাংলাদেশ ক্রিকেটের বিভিন্ন স্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। আমিনুল ইসলাম বুলবুল পরবর্তীকালে হয়ে ওঠেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি। খালেদ মাসুদ পাইলট, হাবিবুল বাশার ও নাঈমুর রহমান দুর্জয়ও পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটের সংগঠক, নির্বাচক কিংবা প্রশাসনিক পর্যায়ে যুক্ত থেকেছেন। টেস্ট মর্যাদার ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড সেই ঐতিহাসিক দলের সদস্যদের সংবর্ধনা দিয়েছিল শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের নর্থ প্লাজায়। স্মারক ব্লেজার, ক্যাপ হস্তান্তর আর সংক্ষিপ্ত স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে ফিরে দেখা হয় সেই দিনটি, যা বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে চিরকাল বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
হার দিয়ে শুরু, কিন্তু ইতিহাসের জয়
স্কোরবোর্ডের হিসাবে বাংলাদেশ হেরেছিল বড় ব্যবধানেই। কিন্তু শক্তিশালী ভারতের বিপক্ষে নিজেদের প্রথম টেস্টে জয়ের স্বপ্ন হয়তো কেউই আঁকেননি। সাদা পোশাকে এগারোজন বাংলাদেশি ক্রিকেটারের মাঠে নামাটাই ছিল কোটি সমর্থকের বহু যুগের প্রতীক্ষিত এক স্বপ্নপূরণ। আমিনুল ইসলাম বুলবুলের অভিষেক সেঞ্চুরি আর নাঈমুর রহমান দুর্জয়ের ছয় উইকেট শিকার এই দুটি কীর্তিই আজও বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে গর্বের অধ্যায়গুলোর একটি হয়ে আছে। জয়-পরাজয়ের হিসাবের বাইরে গিয়ে বলা যায়, ১০ নভেম্বর ২০০০ ছিল সেই দিন, যেদিন বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো নিজেদের নাম লিখিয়েছিল ক্রিকেটের অভিজাত সংস্করণের ইতিহাসে আর সেই যাত্রাই আজকের বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে।
❓ বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট নিয়ে FAQ
প্রশ্ন ১. বাংলাদেশ কবে প্রথম টেস্ট ম্যাচ খেলে?
উত্তর: বাংলাদেশ ১০ নভেম্বর ২০০০ ভারতের বিপক্ষে নিজেদের প্রথম টেস্ট ম্যাচ খেলে। ম্যাচটি ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়।
প্রশ্ন ২. বাংলাদেশের প্রথম টেস্টের প্রতিপক্ষ কে ছিল?
উত্তর: বাংলাদেশের প্রথম টেস্টের প্রতিপক্ষ ছিল ভারত। ভারতের অধিনায়ক ছিলেন সৌরভ গাঙ্গুলি।
প্রশ্ন ৩. বাংলাদেশের প্রথম টেস্টের অধিনায়ক কে ছিলেন?
উত্তর: বাংলাদেশের প্রথম টেস্টে অধিনায়ক ছিলেন নাঈমুর রহমান দুর্জয়। টস জিতে তিনি প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
প্রশ্ন ৪. বাংলাদেশের প্রথম টেস্টে প্রথম সেঞ্চুরি করেন কে?
উত্তর: আমিনুল ইসলাম বুলবুল বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান। ভারতের বিপক্ষে তিনি ৩৮০ বলে ১৪৫ রান করেন।
প্রশ্ন ৫. বাংলাদেশের প্রথম টেস্টে আমিনুল ইসলাম কত রান করেন?
উত্তর: আমিনুল ইসলাম বুলবুল ১৪৫ রান করেন। তাঁর ইনিংসে ছিল ১৭টি চার।
প্রশ্ন ৬. বাংলাদেশের প্রথম টেস্টে নাঈমুর রহমান কত উইকেট নেন?
উত্তর: নাঈমুর রহমান দুর্জয় ভারতের প্রথম ইনিংসে ১৩২ রান দিয়ে ৬ উইকেট নেন।
প্রশ্ন ৭. বাংলাদেশের প্রথম টেস্টে দলীয় সর্বোচ্চ রান কত ছিল?
উত্তর: বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে ৪০০ রান করে অলআউট হয়। এটি কোনো দেশের অভিষেক টেস্টে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ ছিল।
প্রশ্ন ৮. বাংলাদেশের প্রথম টেস্টের ফলাফল কী হয়েছিল?
উত্তর: ভারত বাংলাদেশকে ৯ উইকেটে পরাজিত করে। বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংস মাত্র ৯১ রানে শেষ হলে ভারতের সামনে জয়ের লক্ষ্য দাঁড়ায় ৬৩ রান।
প্রশ্ন ৯. বাংলাদেশের প্রথম টেস্টে ম্যান অব দ্য ম্যাচ কে ছিলেন?
উত্তর: ভারতের সুনীল জোশি ম্যান অব দ্য ম্যাচ নির্বাচিত হন। তিনি ম্যাচে মোট ৮টি উইকেট নেন। প্রথম ইনিংসে ৫টি এবং দ্বিতীয় ইনিংসে ৩টি।
প্রশ্ন ১০. বাংলাদেশের টেস্ট মর্যাদা কবে অর্জিত হয়?
উত্তর: বাংলাদেশ ২৬ জুন ২০০০ নয়টি টেস্ট খেলুড়ে দেশের ভোটে টেস্ট মর্যাদা অর্জন করে এবং বিশ্বের দশম টেস্ট খেলুড়ে দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
প্রশ্ন ১১. বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট ম্যাচটি কততম টেস্ট ছিল?
উত্তর: ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের অভিষেক ম্যাচটি ছিল ক্রিকেট ইতিহাসের ১৫১২তম টেস্ট। ভারতের জন্য এটি ছিল ৩৩৪তম টেস্ট।
প্রশ্ন ১২. বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট ম্যাচের আম্পায়ার কারা ছিলেন?
উত্তর: বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট ম্যাচ পরিচালনা করেন ইংল্যান্ডের ডেভিড শেফার্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্টিভ বাকনার। শেফার্ডের জন্য এটি ছিল ৫৪তম এবং বাকনারের ৫২তম টেস্ট ম্যাচ।
