১৯৭১ সাল। ২৫ মার্চের সেই কালরাত্রিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী "অপারেশন সার্চলাইট" নামের নির্মম অভিযান চালিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্বিচারে গণহত্যা শুরু করে। এই একটা রাতই যেন গোটা জাতির ভাগ্য বদলে দেয় শুরু হয়ে যায় রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ। একদিকে দেশের ভেতরে মানুষ প্রাণ দিচ্ছে স্বাধীনতার জন্য, অন্যদিকে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে ভারতে। ইতিহাসের পাতায় এত বড় শরণার্থী স্রোত এর আগে খুব কমই দেখা গেছে প্রায় এক কোটি মানুষ ঘরবাড়ি, জমি, চেনা জীবন ফেলে রাতারাতি শরণার্থী শিবিরের অনিশ্চিত আশ্রয়ে গিয়ে উঠেছিল। খাদ্যের তীব্র অভাব, কলেরার মহামারি, আর ভবিষ্যতের কোনো নিশ্চয়তা না থাকা এই তিনে মিলে ক্যাম্পগুলোতে তৈরি হয়েছিল এক ভয়াবহ মানবিক সংকট।
অথচ পশ্চিমা গণমাধ্যমে এই কষ্টের কথা তেমন গুরুত্ব পাচ্ছিল না, যেন দূরের একটা দেশের সমস্যা বলে সবাই কিছুটা উদাসীন। রাজনীতির হিসাব-নিকাশ, কূটনৈতিক সমীকরণ আর ক্ষমতার লড়াইয়ের ভিড়ে সাধারণ মানুষের এই আর্তনাদ কোথাও যেন চাপা পড়ে যাচ্ছিল। ঠিক এই সময়ে, সুদূর আমেরিকার মাটিতে বসে এক শিল্পীর মন কেঁদে ওঠে সেই খবর পড়ে। তিনি আর কেউ নন বিশ্বখ্যাত সেতারবাদক পণ্ডিত রবিশঙ্কর। নিজের শিকড়ের দেশ থেকে ভেসে আসা এই যন্ত্রণার খবর তাঁকে ভেতর থেকে নাড়া দেয়, আর তিনি সিদ্ধান্ত নেন চুপ করে বসে থাকা যাবে না। কণ্ঠহীন মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানোর একটাই পথ তাঁর জানা ছিল সংগীত। আর সেই সংগীতকেই তিনি অস্ত্র বানিয়ে যোগাযোগ করেন তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু, বিটলসের সাবেক গিটারিস্ট জর্জ হ্যারিসনের সঙ্গে। সেখান থেকেই শুরু হয় এক অভূতপূর্ব ইতিহাসের পথচলা।
এক সেতারবাদকের কষ্ট আর এক গিটারিস্টের সাড়া
রবিশঙ্কর তখন বিশ্বখ্যাত সেতারশিল্পী। নিজের শিকড় পশ্চিমবঙ্গে কিন্তু বসবাস আমেরিকায়। বাংলাদেশ থেকে আসা খবরগুলো তাঁকে ভেতর থেকে নাড়া দিচ্ছিল। এই যন্ত্রণা তিনি একা বহন করতে পারছিলেন না। তাই তিনি ফোন করেন তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু বিটলসের সাবেক গিটারিস্ট জর্জ হ্যারিসনকে। মজার বিষয় হলো এই দুজনের মধ্যে মানবিক কাজের এই যোগসূত্র নতুন কিছু ছিল না। এর আগে ১৯৭০ সালে যখন ভোলায় প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে তখনো হ্যারিসন সেতার শিখছিলেন রবিশঙ্করের কাছে। আর দুজনে মিলে বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য কিছু করার কথা ভেবেছিলেন।
রবিশঙ্কর রেকর্ড করেছিলেন "জয় বাংলা" আর হ্যারিসন লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত গান "বাংলাদেশ"। কিন্তু সেই পরিকল্পনা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হওয়ার আগেই শুরু হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধ আর সমস্যাটা আরও বড় আকার নেয়। তাই যখন রবিশঙ্কর আবার হ্যারিসনের দুয়ারে গিয়ে দাঁড়ালেন, হ্যারিসনের কাছে এটা নিছক একটা অনুরোধ ছিল না এটা ছিল এক অসম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতি পূরণের সুযোগ। হ্যারিসন তখন নিজেও সংগীত জগতে নতুন উচ্চতায় বিটলস ভেঙে যাওয়ার পর তাঁর একক অ্যালবাম "অল থিংস মাস্ট পাস" তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এমন একজন তারকার হাত ধরে যদি একটা কনসার্ট হয়, তাহলে বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করা সম্ভব এই বিশ্বাস থেকেই হ্যারিসন রাজি হয়ে যান।
মাত্র পাঁচ সপ্তাহে এক ইতিহাস তৈরির প্রস্তুতি
ভাবতে অবাক লাগে, এত বড় একটা আয়োজন যা পরবর্তীতে বিশ্বের প্রথম "বেনিফিট কনসার্ট" হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেবে তার পুরো প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছিল মাত্র পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে। হ্যারিসন প্রথমে চেষ্টা করেছিলেন তাঁর পুরনো দল বিটলসের বাকি সদস্যদের একসাথে করতে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। পল ম্যাকার্টনি তখন দলের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনে থাকায় সরাসরি না করে দেন। জন লেনন আসতে রাজি থাকলেও তখন তিনি স্ত্রী ইয়োকো ওনোর সঙ্গে সন্তানের অভিভাবকত্ব নিয়ে আদালতে আইনি লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকায় শেষ পর্যন্ত আসতে পারেননি। আর মিক জ্যাগার তখন দক্ষিণ ফ্রান্সে অবস্থান করছিলেন, ভিসাজনিত জটিলতায় তাঁরও আসা সম্ভব হয়নি।
শেষ পর্যন্ত বিটলসের প্রতিনিধিত্ব করেন কেবল রিঙ্গো স্টার। কিন্তু হ্যারিসনের ডাকে সাড়া দিয়ে এগিয়ে আসেন আরও অনেক তারকা বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটন, বিলি প্রেস্টন, লিওন রাসেল, আর হ্যারিসনের তখনকার নতুন দল ব্যাডফিঙ্গারের সদস্যরা। একটা ছোট্ট বিজ্ঞাপন ছাপা হয়েছিল নিউইয়র্ক টাইমসের পেছনের পাতায় "হ্যারিসন অ্যান্ড ফ্রেন্ডস বাংলাদেশের জন্য দুটি কনসার্ট আয়োজন করছে"। এই সাধারণ একটা বিজ্ঞাপনের প্রভাব ছিল অবিশ্বাস্য মাত্র ছয় ঘণ্টার মধ্যেই চল্লিশ হাজার টিকিট বিক্রি হয়ে যায়। এমনকি ঘটনার নেপথ্যের কারণ জেনে কিছু সাংবাদিকও নিজেদের পকেট থেকে অনুদান দিয়ে দেন।
সেই সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও কিন্তু সহজ ছিল না। মার্কিন প্রশাসন তখন বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। তাই আয়োজকরা কৌশলে সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টাকে তুলে ধরেন "শরণার্থী শিশুদের সাহায্য" হিসেবে, আর ঘোষণা দেন সংগৃহীত অর্থ ইউনিসেফের মাধ্যমে ব্যয় হবে। এমনকি কনসার্টের পোস্টারেও ব্যবহার করা হয় একটি শিশুর ছবি, যাতে রাজনৈতিক বাধা এড়ানো যায়।
১ আগস্ট, ১৯৭১-ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনের সেই বিকেল
অবশেষে এল সেই দিন ১ আগস্ট, ১৯৭১, রবিবার। নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে দুপুর আড়াইটা আর রাত আটটায় অনুষ্ঠিত হয় দুটি শো। প্রতিটিতে প্রায় চল্লিশ হাজার দর্শক। অনুষ্ঠান শুরু হয় পুরোপুরি ভারতীয় ধ্রুপদি সংগীতের সুরে। রবিশঙ্করের সেতার, ওস্তাদ আলি আকবর খানের সরোদ, আর ওস্তাদ আল্লা রাখার তবলার এক অপূর্ব মেলবন্ধনে পরিবেশিত হয় "বাংলা ধুন"। এই একটি পরিবেশনার মধ্য দিয়েই যেন প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের সংগীত একে অপরের হাত ধরল।
এরপর মঞ্চে ওঠেন হ্যারিসন, রিঙ্গো স্টার, জিম কেল্টনার, লিওন রাসেল, বিলি প্রেস্টন, এরিক ক্ল্যাপটন আর অন্যান্য শিল্পীরা। একে একে গাওয়া হয় "হোয়াইল মাই গিটার জেন্টলি উইপস", "সামথিং", "হেয়ার কামস দ্য সান"-এর মতো কালজয়ী গান। বব ডিলান যিনি ১৯৬৯ সালের পর প্রথমবার শ্রোতাদের সামনে এলেন গাইলেন "ব্লোয়িং ইন দ্য উইন্ড" আর "মিস্টার ট্যাম্বোরিন ম্যান"। আর অনুষ্ঠানের শেষটা হলো হ্যারিসনের নিজের লেখা গান দিয়ে "বাংলাদেশ"। এই একটা গানই যেন সেদিন হয়ে উঠেছিল লক্ষ শরণার্থীর কষ্টের প্রতিনিধি।
বিটলস ভাঙার পর এটাই ছিল হ্যারিসনের প্রথম সরাসরি অনুষ্ঠান। ক্ল্যাপটনের জন্যও প্রায় পাঁচ মাস পর প্রথম মঞ্চে ওঠা। এমন একটা মুহূর্তে এত বড় বড় তারকা একসাথে গান গাইছেন এই দৃশ্য এর আগে বিশ্ব কখনো দেখেনি।
জর্জ হ্যারিসনের-"বাংলাদেশ" গানটির গুরুত্ব
হ্যারিসনের লেখা "Bangla Desh" গানটির কথা আলাদা করে বলতেই হয়। বিশ্বের জনপ্রিয় সংগীতে বাংলাদেশের নাম এভাবে উচ্চারিত হওয়ার ঘটনা তখন পর্যন্ত ছিল বিরল। গানের কথায় হ্যারিসন শরণার্থীদের অসহায়ত্ব আর দুর্দশার ছবি তুলে ধরে সরাসরি বিশ্ববাসীর কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছিলেন। একটা পপ গানের ভেতর দিয়ে এমন রাজনৈতিক ও মানবিক বার্তা পৌঁছে দেওয়া সেই সময়ে ছিল একরকম সাহসী পদক্ষেপ। আর এই গানই কনসার্টের একদম শেষ পরিবেশনা হিসেবে বাজানো হয়েছিল, যেন পুরো অনুষ্ঠানের সবচেয়ে বড় বার্তাটা শ্রোতাদের মনে গেঁথে দেওয়া যায়।
কনসার্ট থেকে কত অর্থ সংগ্রহ হয়েছিল
পাঠকদের মনে সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটা আসে, তা হলো এই কনসার্ট থেকে ঠিক কত টাকা উঠেছিল? প্রাথমিকভাবে কনসার্টের দুটি শো থেকে সরাসরি প্রায় দুই লাখ তেতাল্লিশ হাজার মার্কিন ডলার সংগ্রহ হয়েছিল। তবে এখানেই গল্প শেষ হয়নি। পরবর্তীতে গানের অ্যালবাম, চলচ্চিত্র এবং বছরের পর বছর ধরে পুনঃপ্রকাশিত সিডি-ডিভিডি সংস্করণ থেকে আসা রয়্যালটি যুক্ত হয়ে এই সহায়তার পরিমাণ ক্রমে কয়েক মিলিয়ন ডলারে গিয়ে পৌঁছায়। এই সমস্ত অর্থ ইউনিসেফের মাধ্যমে বাংলাদেশের শরণার্থীদের সাহায্যে ব্যয় করা হয়েছিল একটা কনসার্ট যে দীর্ঘমেয়াদে এত বড় একটা মানবিক তহবিলে রূপ নিতে পারে, তা তখনকার দিনে ছিল একরকম নজিরবিহীন ঘটনা।
গান থামলেও রেশ থামেনি
কনসার্ট শেষ হলেও এর প্রভাব থামেনি। সেই বছরই বের হয় গানের সংকলন, আর পরের বছর, ১৯৭২ সালে মুক্তি পায় কনসার্টের চলচ্চিত্র। জর্জ হ্যারিসন আর ফিল স্পেক্টরের প্রযোজনায় তিনটি রেকর্ডের একটা বক্স সেট বাজারে আসে যা ছিল বব ডিলানের প্রথম সরাসরি পরিবেশনার রেকর্ডিং। পরবর্তীতে ১৯৯২ সালে সিডি আকারে, আর ২০০৫ সালে দুই ডিস্কের বিশেষ ডিভিডি সংস্করণে এই ইতিহাস আবার নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। ২০০৫ সালের সেই ডিভিডিতে দ্বিতীয় ডিস্কে যুক্ত হয় একটি তথ্যচিত্র, যেখানে রবিশঙ্কর, ক্ল্যাপটন, রিঙ্গো স্টার সহ অনেকেই সেই দিনের স্মৃতিচারণ করেন।
তবে এত বড় একটা মানবিক উদ্যোগও বিতর্কের বাইরে থাকেনি। অ্যালবামের দাম নিয়ে, আর সেই অর্থ ঠিকমতো শরণার্থী তহবিলে পৌঁছাচ্ছে কিনা তা নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠেছিল। কর-অব্যাহতির আবেদন না করার কারণে বহু বছর ধরে অর্থের একটা বড় অংশ আটকে ছিল মার্কিন রাজস্ব সংস্থার হিসাবে। এমনকি জন লেনন পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, এমন উদ্যোগের অর্থ প্রায়ই "চুরি হয়ে যায়"। তবে এত জটিলতা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত লক্ষ লক্ষ ডলার সত্যিই ইউনিসেফের মাধ্যমে বাংলাদেশের শরণার্থীদের কাছে পৌঁছেছিল, আর কিছু অর্থ সহায়তা করেছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রকেও।
কনসার্ট ফর বাংলাদেশের উত্তরাধিকার
আজকের দিনে যখন আমরা কোনো বিপর্যয় বা মানবিক সংকটের সময় তারকাদের একসঙ্গে গলা মেলাতে দেখি, তখন খুব কম মানুষই মনে রাখেন যে এই ধারণার শুরুটা হয়েছিল ঠিক এই কনসার্ট থেকেই। ১৯৮৫ সালের বিশ্বজোড়া আলোচিত "লাইভ এইড", ২০০১ সালে ৯/১১-পরবর্তী "দ্য কনসার্ট ফর নিউ ইয়র্ক সিটি", কিংবা ২০০৫ সালের "লাইভ ৮" এই সবকটি বড় বড় দাতব্য কনসার্টের পেছনেই অনুপ্রেরণা হিসেবে বারবার উঠে এসেছে "কনসার্ট ফর বাংলাদেশ"-এর নাম। এই কারণেই একে বলা হয় আধুনিক মানবিক বেনিফিট কনসার্টের পথিকৃৎ যে পথ ধরে পরবর্তী কয়েক দশকে সংগীতশিল্পীরা বারবার এগিয়ে এসেছেন মানবতার পাশে দাঁড়াতে।
শুধু কনসার্ট আয়োজনের ধারণাতেই নয়, বাংলাদেশ নামের একটা তরুণ রাষ্ট্রকে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত করিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও এই আয়োজনের ভূমিকা ছিল অসাধারণ। যে দেশটার নাম তখন পশ্চিমা গণমাধ্যমে প্রায় অনুচ্চারিত ছিল, একটি মাত্র সন্ধ্যায় সেই নামটাই কোটি কোটি মানুষের কানে পৌঁছে যায়। জর্জ হ্যারিসন আর পণ্ডিত রবিশঙ্করের এই মানবিক উদ্যোগ তাই শুধু একটা সংগীত আয়োজন হিসেবে থেমে থাকেনি এটা হয়ে উঠেছিল বন্ধুত্ব, সহমর্মিতা আর শিল্পীসত্তার এক জীবন্ত উত্তরাধিকার, যা আজও নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের মনে করিয়ে দেয় গান দিয়েও বদলে দেওয়া যায় পৃথিবীর দৃষ্টিভঙ্গি।
কেন আজও এই কনসার্ট গুরুত্বপূর্ণ
আজ থেকে পাঁচ দশকেরও বেশি সময় আগে ঘটে যাওয়া এই কনসার্ট নিছক একটা গানের অনুষ্ঠান ছিল না। এটা ছিল বিশ্বের প্রথম বেনিফিট কনসার্ট, যা প্রমাণ করেছিল—রাজনীতিবিদদের চেয়ে শিল্পী আর সাধারণ মানুষের মানবিকতা কোনো অংশে কম নয়। জর্জ হ্যারিসন নিজেও পরে তাঁর আত্মজীবনী "আই, মি, মাইন"-এ লিখেছিলেন যে, এই কনসার্ট ছিল একটা নৈতিক অবস্থান নেওয়ার মতো ব্যাপার।
যে দেশটার নাম তখন পশ্চিমা বিশ্বের কাছে প্রায় অজানা ছিল, সেই "বাংলাদেশ" নামটাই একদিনে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেয়ে গিয়েছিল একটা মাত্র কনসার্টের মধ্য দিয়ে। একজন সেতারবাদকের কষ্ট আর একজন গিটারিস্টের মানবিক সাড়া এই দুটো মিলে যে ইতিহাস তৈরি হয়েছিল, তা আজও প্রমাণ করে দেয়, ভালোবাসা আর সহমর্মিতার ভাষা রাজনীতির সীমানা ছাড়িয়ে যেতে পারে। বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার এই গল্প তাই শুধু সংগীতের ইতিহাস নয় এটা মানবতার এক অনন্য দলিল, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতার লড়াইয়ের সঙ্গে চিরকালের জন্য জড়িয়ে গেছে।
স্বাধীনতার পরও এই কনসার্টকে বাংলাদেশের ইতিহাসে আন্তর্জাতিক সংহতির এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে স্মরণ করা হয়। আজও প্রতি বছর ১ আগস্ট এলে বাংলাদেশিরা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন জর্জ হ্যারিসন আর পণ্ডিত রবিশঙ্করের এই অবদানের কথা—এমন এক সময়ে যখন বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষ বাংলাদেশের নামটাই ঠিকমতো জানত না, তখন এই দুই শিল্পী নিজেদের সংগীত দিয়ে একটা জাতির কষ্টের কথা পৌঁছে দিয়েছিলেন বিশ্বের কোণে কোণে।
এক নজরে: Concert for Bangladesh
- তারিখ: ১ আগস্ট ১৯৭১
- স্থান: ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেন, নিউইয়র্ক
- আয়োজক: জর্জ হ্যারিসন ও পণ্ডিত রবিশঙ্কর
- উদ্দেশ্য: বাংলাদেশের শরণার্থীদের জন্য তহবিল সংগ্রহ
- দর্শক: প্রায় ৪০,০০০ জন করে দুটি শো-তে
- প্রাথমিক সংগ্রহ: প্রায় ২,৪৩,০০০ মার্কিন ডলার (পরবর্তীতে অ্যালবাম-চলচ্চিত্রের রয়্যালটি যোগে কয়েক মিলিয়ন ডলার)
- গুরুত্ব: বিশ্বের প্রথম বড় আকারের বেনিফিট রক কনসার্ট, আধুনিক চ্যারিটি কনসার্টের পথিকৃৎ
Concert for Bangladesh: সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলি (FAQ)
১. কনসার্ট ফর বাংলাদেশ কবে এবং কোথায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল?
১৯৭১ সালের ১ আগস্ট, রবিবার, নিউইয়র্ক শহরের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে দুপুর ও সন্ধ্যায় দুটি আলাদা শোতে এই কনসার্ট অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
২. এই কনসার্টের মূল আয়োজক কারা ছিলেন?
ভারতীয় সেতারবাদক পণ্ডিত রবিশঙ্কর এবং বিটলসের সাবেক সদস্য জর্জ হ্যারিসন মিলে এই কনসার্টের আয়োজন করেছিলেন।
৩. কনসার্টে কোন কোন বিখ্যাত শিল্পী অংশ নিয়েছিলেন?
বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটন, রিঙ্গো স্টার, বিলি প্রেস্টন, লিওন রাসেল, ওস্তাদ আলি আকবর খান এবং ব্যাডফিঙ্গার ব্যান্ডের সদস্যরাসহ আরও অনেক তারকা এই কনসার্টে গান পরিবেশন করেছিলেন।
৪. এই কনসার্ট থেকে মোট কত অর্থ সংগ্রহ হয়েছিল?
কনসার্টের দুটি শো থেকে সরাসরি প্রায় ২,৪৩,০০০ মার্কিন ডলার সংগ্রহ হয়। পরবর্তীতে অ্যালবাম, চলচ্চিত্র ও পুনঃপ্রকাশিত সংস্করণের রয়্যালটি যোগ হয়ে এই পরিমাণ কয়েক মিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, যা ইউনিসেফের মাধ্যমে ব্যয় করা হয়।
৫. কেন এই কনসার্টকে বিশ্বের প্রথম "বেনিফিট কনসার্ট" বলা হয়?
এর আগে এত বড় পরিসরে, এতজন জনপ্রিয় শিল্পীকে একত্র করে সম্পূর্ণ মানবিক উদ্দেশ্যে কোনো কনসার্টের আয়োজন হয়নি। এই কারণেই একে আধুনিক দাতব্য কনসার্টের পথিকৃৎ হিসেবে গণ্য করা হয়।
৬. জর্জ হ্যারিসনের "বাংলাদেশ" গানটির গুরুত্ব কী?
এই গানের মাধ্যমেই বিশ্বের জনপ্রিয় সংগীতে প্রথমবারের মতো "বাংলাদেশ" নামটি এমনভাবে উচ্চারিত হয়। গানের কথায় শরণার্থীদের দুর্দশা তুলে ধরে বিশ্ববাসীর কাছে সাহায্যের আবেদন জানানো হয়েছিল।
৭. এই কনসার্ট পরবর্তী কোন কোন বড় দাতব্য কনসার্টকে অনুপ্রাণিত করেছে?
১৯৮৫ সালের লাইভ এইড, ২০০১ সালের দ্য কনসার্ট ফর নিউ ইয়র্ক সিটি এবং ২০০৫ সালের লাইভ ৮—এই সবকটি বড় দাতব্য কনসার্টের পেছনে অনুপ্রেরণা হিসেবে কনসার্ট ফর বাংলাদেশের নাম বারবার উঠে আসে।
