নদীর বুক চিরে বয়ে চলা এই বাংলায় একটা সময় জীবন মানেই ছিল পারাপারের সংগ্রাম। খাল-বিল, নদী-নালায় ঘেরা এই জনপদে একদিকের গ্রাম থেকে অন্যদিকে যেতে হলে হয় নৌকার অপেক্ষা, নয়তো ঘুরপথে অনেকটা সময় নষ্ট এই ছিল নিত্যদিনের বাস্তবতা। ঠিক সেই সংকট থেকেই মোগল সুবাদাররা একটা সমাধান খুঁজে বের করেছিলেন। কোনো আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়াই, শুধু ইট, চুন আর সুড়কির হাতযশে তারা গড়ে তুলেছিলেন একের পর এক সেতু যা মানুষকে সংযুক্ত করত, বাণিজ্যকে সচল রাখত, আর একইসঙ্গে হয়ে উঠত সেকালের প্রকৌশল দক্ষতার এক নীরব উদাহরণ।
শত শত বছর পেরিয়ে গেলেও সেই সেতুগুলোর দু-একটি আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে যেন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টিকে থাকার এক জেদ। মুন্সিগঞ্জের মীরকাদিম সেতু তার একটি স্থানীয়দের কাছে যা পুলঘাটা বা গায়েবি সেতু নামেই বেশি পরিচিত। আর যাকে ঘিরে আজও ছড়িয়ে আছে অলৌকিক নানা গল্প। অন্যটি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের পানাম সেতু যা এক সময়কার জমজমাট পানাম নগরীর সঙ্গে মিশে আছে অবিচ্ছেদ্যভাবে। দুটি সেতুই দেখতে প্রায় একই রকম, নির্মাণকৌশলও কাছাকাছি, তবু প্রতিটির নিজস্ব ইতিহাস, নিজস্ব লোককথা আর নিজস্ব সংগ্রামের গল্প আছে। আজকের লেখায় আমরা ঘুরে দেখব এই দুই ঐতিহাসিক সেতুর অতীত, তাদের স্থাপত্যের খুঁটিনাটি আর বর্তমানে অবহেলায় ধুঁকতে থাকা তাদের করুণ বাস্তবতা।
মীরকাদিম সেতু: বিক্রমপুরের নীরব সাক্ষী
মুন্সিগঞ্জ জেলা মানেই ইদ্রাকপুর দুর্গ, আড়িয়াল বিল আর প্রাচীন বিক্রমপুরের ঐতিহ্য। কিন্তু এই জেলার রামপাল ইউনিয়নের পুলঘাটা গ্রামের পশ্চিম প্রান্তে আজও দাঁড়িয়ে আছে এমন এক সেতু। যার রহস্য আর সৌন্দর্য শত শত বছর ধরে মানুষকে টানে। মুন্সিগঞ্জ শহর থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে এবং টঙ্গীবাড়ি উপজেলা থেকে সাত কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত এই সেতুটি একসময় প্রাচীন শ্রীবিক্রমপুর মহানগরীর সীমানা-পরিখা হিসেবে পরিচিত মীরকাদিম খালের ওপর নির্মিত হয়েছিল। খালটি সদর উপজেলার কমলাঘাট থেকে টঙ্গীবাড়ি উপজেলার মধ্য দিয়ে দীঘিরপাড়-হাসাইল পর্যন্ত বিস্তৃত এবং পদ্মা নদীর সঙ্গে ধলেশ্বরী নদীর সংযোগ ঘটিয়েছে। সেতুটি সদর উপজেলার পুলঘাটা গ্রাম আর টঙ্গীবাড়ি উপজেলার আবদুল্লাহপুরের মধ্যে বন্ধন তৈরি করে রেখেছে বহু যুগ ধরে।
নির্মাণকাল ও ইতিহাস
সেতুর নির্মাণকাল নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও অধিকাংশ গবেষক একে মোগল স্থাপত্যরীতির নিদর্শন বলে চিহ্নিত করেন। একটি সূত্র মতে মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে সুবাদার মীর জুমলা লাদাখপুর দুর্গ ও দোহারের মুসা খান দুর্গের মধ্যে যোগাযোগ সহজ করার লক্ষ্যে দুটি সেতু নির্মাণ করেছিলেন একটি মীরকাদিম সেতু অন্যটি তালতা সেতু। ধারণা করা হয় ১৭৭৫ থেকে ১৮০০ সালের মধ্যে এই সেতু নির্মিত হয়। দুর্ভাগ্যবশত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইংরেজদের ছোড়া বোমার আঘাতে তালতা সেতুটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়, পুরনো নথি ও ইতিহাসে যার উল্লেখ পাওয়া যায়। মীর জুমলার নির্মিত দুটি সেতুর মধ্যে টিকে আছে কেবল মীরকাদিম সেতুটি।
তবে ভিন্নমতও আছে। স্থানীয়দের একাংশ দাবি করেন সেতুটি নির্মাণ করেছিলেন রাজা বল্লাল সেন সপ্তদশ শতকেরও আগে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সূত্র মতে সেতুটি মীর কাদিম খালের ওপর নির্মিত আর স্থানীয় লোকজন একে সেন রাজার কীর্তি বলে মনে করলেও স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা একে সম্পূর্ণরূপে মোগল আমলের নির্মাণ বলেই মত দেন, এবং সেতুটি সপ্তদশ শতাব্দীর আগের নয় বলেই তাদের ধারণা।
স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য ও নির্মাণকৌশল
সেতুটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৫২.৪২ থেকে ৫২.৭২ মিটার (প্রায় ১৭৩ ফুট) এবং প্রস্থ প্রায় ৬ মিটার। সম্পূর্ণ ইট, চুন আর সুড়কি দিয়ে তৈরি এই ধনুকাকৃতির সেতুতে কোনো রড বা সিমেন্টের ব্যবহার নেই। তিনটি খিলান নিয়ে গঠিত সেতুটির মাঝেরটি সবচেয়ে বড় প্রস্থে প্রায় ৪.২৫ থেকে ৪.২৬ মিটার এবং পানির স্তর থেকে প্রায় ৮.৫৩ মিটার উঁচু যাতে অতীতে বড় বড় নৌকা অনায়াসে চলাচল করতে পারত। দুই পাশের খিলান দুটি তুলনামূলক ছোট, প্রতিটি প্রায় ২.১৩ থেকে ২.১৭ মিটার প্রশস্ত এবং প্রায় ৫.১৮ মিটার উঁচু। সেতুর দেয়ালের পুরুত্ব প্রায় ৪ ফুট ৫ ইঞ্চি, যা এর ভার বহনক্ষমতা অনেকখানি বাড়িয়ে দিয়েছে।
নির্মাণকৌশলও ছিল চমকপ্রদ। প্রথমে নদীর তলদেশে মজবুত ভিত্তি তৈরি করা হতো এরপর ধাপে ধাপে ইট বসিয়ে খিলান আকৃতি গড়া হতো। বড় খিলান তৈরির সময় কাঠের ফ্রেম ব্যবহার করে তার ওপর ইট বসানো হতো, খিলান শক্তপোক্ত হয়ে গেলে কাঠামো সরিয়ে নেওয়া হতো। সবশেষে ওপরের অংশে মাটি ও ইট ভরে রাস্তার মতো সমতল তৈরি করা হতো। রড-সিমেন্ট ছাড়াই কেবল এই কৌশলের জোরে সেতুটি আজও দাঁড়িয়ে থাকতে পেরেছে।
লোককথা ও নামকরণ
সেতুটিকে ঘিরে আছে নানা লোককথা। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এটি নাকি এক রাতেই অলৌকিকভাবে তৈরি হয়ে গিয়েছিল। তাই একে অনেকে "গায়েবি সেতু" নামে ডাকেন। মীরকাদিমের কিছু বাসিন্দা মনে করেন এটি জিনের তৈরি। মানুষের পক্ষে এমন নির্মাণ সম্ভব নয় বলেই তাদের বিশ্বাস। লোকমুখে এমনও প্রচলিত আছে যে, কোনো এক বৈশাখী পূর্ণিমার রাতে অদৃশ্য শক্তি নিজ হাতে সেতুটি গড়ে তুলেছিল আবার কারও মতে এটি দৈত্য-দানবের এক রাতের কীর্তি। স্থানীয় প্রবীণরা বলেন সেতুটি কারা বানিয়েছে তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না বলেই একে গায়েবি ব্রিজ বলা হয় এবং প্রচলিত ধারণা অনুযায় এটি প্রায় পাঁচশো বছরের পুরনো। এসব কথা মূলত পুরাকথা বা জনশ্রুতি হলেও কালের পর কাল মুখে মুখে টিকে থেকে সেতুটিকে দিয়েছে এক রহস্যময় জনপ্রিয়তা।
সামাজিক তাৎপর্য ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি
শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয় সেতুটি ছিল সামাজিক মিলনস্থলও। এখানে বসত হাট-বাজার, নৌকায় আসা-যাওয়া করতেন ব্যবসায়ী-কৃষক-যাত্রী আর আশপাশের জমিদাররাও বিক্রমপুর থেকে ঢাকায় যাতায়াতে এই পথ ব্যবহার করতেন বলে জনশ্রুতি আছে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ও সেতুটি ছিল কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মুক্তিযোদ্ধারা এখানে ক্যাম্প গড়ে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ পরিকল্পনা করতেন, আর সেতুর দুই প্রান্তে সংঘটিত হয়েছিল সম্মুখযুদ্ধও। সেতুর পাশে টোকানী পাল পরিবারের বাড়িতে পাকিস্তানি বাহিনী নির্মম গণহত্যা চালিয়েছিল বলেও স্থানীয়রা জানান।
বর্তমান অবস্থা ও সংকট
২০০৬ সালে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সেতুটিকে সংরক্ষণের আওতায় আনে এবং আংশিক সংস্কার করে। দুই পাশে সতর্কীকরণ নোটিশও টানিয়ে দেওয়া হয় যাতে সেতুর ক্ষতিসাধন দণ্ডনীয় অপরাধ বলে উল্লেখ ছিল। কয়েক বছর আগে ইট, সুড়কির পাশাপাশি তেঁতুলের পানি ও রসুনের পানি মিশিয়ে ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতেও সেতুটি সংস্কার করা হয়েছিল। কিন্তু নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, অবৈধ দখল আর রেলিঙ থেকে ইট খুলে নেওয়ার প্রবণতায় সেতুটি ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নিচের চুন-সুড়কির আস্তরণ উঠে যাওয়া, মাঝে ফাটল দেখা দেওয়া, আর সেতুর নিচ দিয়ে চলাচলকারী ট্রলারের ধাক্কায় দুই পাশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও প্রতিদিন অটোরিকশা, সাইকেল, মোটরসাইকেলের মতো হালকা যান এই সেতুর ওপর দিয়ে চলাচল করে। সেতুর আশপাশে ইট-বালুর ব্যবসা আর ড্রেজার পাইপলাইন বসানোর কারণে খালের নৌ চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে, আর দখল-দূষণে খালটি প্রায় মৃতপ্রায়। তা সত্ত্বেও ঈদ, পূজা কিংবা পয়লা বৈশাখে দেশের নানা প্রান্ত থেকে ভ্রমণপিপাসু মানুষ, এমনকি মাঝেমধ্যে বিদেশি পর্যটকরাও ভিড় করেন এই ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখতে।
পানাম সেতু: সোনারগাঁয়ের মোগল স্থাপত্যের আরেক নিদর্শন
মীরকাদিম সেতুর মতোই একই ধাঁচের আরেকটি মোগল স্থাপত্য নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁ উপজেলার পানাম এলাকায় দেখা যায় পানাম সেতু। পঞ্চদশ শতকে ঈসা খাঁ বাংলার প্রথম স্বাধীন রাজধানী স্থাপন করেছিলেন এই সোনারগাঁয়ে আর মেঘনা-শীতলক্ষ্যা নদীপথ ধরে তখন চলত মসলিনসহ নানা পণ্যের বাণিজ্য। পরবর্তীতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যিক কার্যক্রমের হাত ধরে ইউরোপীয় স্থাপত্যরীতির প্রভাবে গড়ে ওঠে পানাম নগরী। যেখানে আজও ঔপনিবেশিক আমলের ৫২টি স্থাপনা টিকে আছে। উত্তর পাশে ৩১টি আর দক্ষিণ পাশে ২১টি। এসব ভবনের স্থাপত্যে মোগল, ইউরোপীয়, এমনকি গ্রিক ও গান্ধারা রীতির মিশ্রণ লক্ষ করা যায়। যা বিশেষজ্ঞদের কাছে "পানাম স্থাপত্যশৈলী" নামেই পরিচিত।
১৬১১ খ্রিষ্টাব্দে মোগলরা সোনারগাঁ জয় করার পর রাজধানী শহরের সঙ্গে পানাম এলাকার সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের জন্য সড়ক ও সেতু নির্মাণ শুরু করে। মোগল বিজয়ের পর প্রশাসনিক ও বসতি এলাকা হিসেবে গড়ে ওঠা পানামে আজও টিকে আছে মোগল আমলের তিনটি ইটের সেতু পানাম সেতু, দলালপুর সেতু এবং পানামনগর সেতু। এই সেতুগুলো ও চারপাশ ঘিরে থাকা খাল-পরিখা প্রমাণ করে একসময় এটি মধ্যযুগীয় মহানগরীর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপনগর হিসেবে বিবেচিত হতো।
অবস্থান ও নামকরণ
পানাম সেতুটি মূলত পঙ্খীরাজ খালের ওপর নির্মিত। হাজীগঞ্জ থেকে বৈদ্যের বাজার যাওয়ার একটি গ্রামীণ সড়কে। বর্তমানে এটি কোম্পানিগঞ্জ ও বাড়ি মজলিসের মধ্যবর্তী পাকা রাস্তায় হাবিবপুরের পূর্বদিকে অবস্থিত। এর আদি নাম ছিল "কোম্পানিগঞ্জ কা পুল" (কোম্পানিগঞ্জের পুল)। যা পরবর্তীতে পানাম সেতু নামেই পরিচিতি পায়। উল্লেখ্য পানাম নগরীর প্রবেশপথে সোনারগাঁ লোক ও কারুশিল্প জাদুঘরের অদূরে আরও একটি অর্ধচন্দ্রাকৃতি "পানাম পুল" ছিল, যার দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৭২ ফুট, তবে সেটি কালের বিবর্তনে ধ্বংস হয়ে গেছে। বর্তমানে টিকে থাকা পানাম সেতুটিই এলাকার প্রধান ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে পরিচিত।
স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য
স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে পানাম সেতু মীরকাদিম সেতুর সঙ্গে বিস্ময়কর মিল বহন করে। দৈর্ঘ্যে প্রায় ৫৩ মিটার (১৭৩ ফুট) আর প্রস্থে প্রায় ৫ মিটার (১৪ ফুট) এই সেতুটিও তিনটি খিলান নিয়ে গঠিত, যার মাঝেরটি অন্য দুটির তুলনায় বড় ও উঁচু যাতে নিচ দিয়ে অনায়াসে নৌকা চলাচল করতে পারে। রাস্তার পথটি ইট দিয়ে বৃত্তাকারে সাজানো, আর সেতুর মাঝখানের পিলারের পুরুত্ব প্রায় ২.২১ মিটার। এই স্থাপত্যরীতি সেতুটিকে সপ্তদশ শতকের মোগল আমলের নির্মাণ বলে চিহ্নিত করে।
মজার বিষয় হলো মীরকাদিম সেতুর আদলে বাংলায় আরও যে সেতু নির্মিত হয়েছিল তার একটি হলো এই পানাম সেতু অন্যটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাড়িউড়া বা হাতিরপুল সেতু। যা নির্মাণ করেন সম্রাট আকবরের দেওয়ান শাহবাজ খান আনুমানিক ১৬৫০ সালের দিকে। জনশ্রুতি আছে, সরাইলের দেওয়ানরা হাতির পিঠে চড়ে এই সেতু পার হতেন এবং হাতিগুলো সেখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিত এ থেকেই নাম হয় "হাতিরপুল"। এই তিনটি সেতুর নির্মাণশৈলীর সাদৃশ্য বাংলায় মোগল প্রকৌশল ঐতিহ্যের একটি সুসংগত ধারা তুলে ধরে।
বর্তমান অবস্থা ও সংস্কার উদ্যোগ
পানাম নগরী বিশ্বের ধ্বংসপ্রায় ঐতিহাসিক শহরগুলোর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত আর পর্যাপ্ত সংরক্ষণের অভাবে এর সৌন্দর্য দিন দিন ফিকে হয়ে আসছে। তবে সুখবর হলো সাম্প্রতিক সময়ে ঐতিহাসিক পানাম সেতুর সংস্কারকাজ শুরু হয়েছে এবং সোনারগাঁয়ের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ কমিটি নিয়মিত এই কাজ পরিদর্শন করছে, যা স্থানীয় সাংবাদিক ও সংগঠকদের অংশগ্রহণে পরিচালিত একটি উদ্যোগ। এটি প্রমাণ করে, স্থানীয় পর্যায়ে ঐতিহ্য রক্ষার সচেতনতা ধীরে ধীরে বাড়ছে। পানাম নগরী ভ্রমণের সঙ্গে একত্রে দেখার মতো একটি জনপ্রিয় গন্তব্য হিসেবে সেতুটি আজও ইতিহাসপ্রেমী পর্যটকদের আকর্ষণ করে চলেছে।
ঐতিহ্য রক্ষার দায়
মীরকাদিম সেতু আর পানাম সেতু দুটোই মোগল আমলের প্রকৌশল দক্ষতা আর শৈল্পিক বিচক্ষণতার জীবন্ত সাক্ষী। রড-সিমেন্ট ছাড়াই কেবল ইট, চুন আর সুড়কির কৌশলে শত শত বছর টিকে থাকা এই সেতুগুলো আমাদের ইতিহাসের এক অমূল্য অধ্যায়। কিন্তু অযত্ন, অবৈধ দখল আর অপরিকল্পিত সংস্কারের কারণে এই স্থাপনাগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার পথে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের উদ্যোগ আর স্থানীয় সংরক্ষণ কমিটিগুলোর তৎপরতা কিছুটা আশার আলো দেখালেও তা যথেষ্ট নয়। এখনই যদি সঠিক পরিকল্পনায় এই সেতুগুলো সংরক্ষণ করা না হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো কেবল ছবিতেই দেখবে বাংলার এই মোগল স্থাপত্যের গৌরবময় নিদর্শনগুলো।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন: মীরকাদিম সেতু কোথায় অবস্থিত?
উত্তর: মুন্সিগঞ্জ জেলার রামপাল ইউনিয়নের পুলঘাটা গ্রামে, মীরকাদিম খালের ওপর এই সেতুটি অবস্থিত।
প্রশ্ন: মীরকাদিম সেতুকে "গায়েবি সেতু" কেন বলা হয়?
উত্তর: সেতুটির নির্মাতা বা নির্মাণকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকায় এবং এটি নাকি এক রাতেই তৈরি হয়ে গিয়েছিল এমন লোককথা প্রচলিত থাকায় স্থানীয়রা একে "গায়েবি সেতু" বলে ডাকেন।
প্রশ্ন: পানাম সেতু কোথায় অবস্থিত?
উত্তর: নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁ উপজেলার পানাম এলাকায়, পঙ্খীরাজ খালের ওপর এই সেতুটি অবস্থিত।
প্রশ্ন: দুটি সেতুই কি একই আমলে তৈরি?
উত্তর: হ্যাঁ, স্থাপত্যশৈলী বিশ্লেষণে দুটি সেতুই মোগল আমলের (সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতক) নির্মাণ বলে চিহ্নিত করা হয়।
প্রশ্ন: সেতু দুটি নির্মাণে কী কী উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছিল?
উত্তর: শুধু ইট, চুন আর সুড়কি দিয়ে তৈরি এই সেতুগুলোতে কোনো রড বা সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়নি।
প্রশ্ন: সেতু দুটির বর্তমান অবস্থা কী?
উত্তর: বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষণের আওতায় থাকলেও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দুটি সেতুই ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রশ্ন: সেতু দুটি দেখতে কীভাবে যাওয়া যায়?
উত্তর: মীরকাদিম সেতু মুন্সিগঞ্জ শহর থেকে সাত কিলোমিটার দূরে আর পানাম সেতু সোনারগাঁর পানাম নগরী ঘুরতে গেলেই সহজে দেখা যায় দুটি স্থানই ঢাকা থেকে একদিনে ভ্রমণযোগ্য।
