ম্যাচের আগে আমরা বলেছিলাম ফুটবল আর রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু ওটা মিথ্যা ছিল। আমরা আর্জেন্টিনার সাধারণ মানুষের কথা ভাবছিলাম, যারা ফকল্যান্ডে মারা গিয়েছিল--ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা
১৯৮৬ সালের ২২ জুন। আজ থেকে ৮ দিন কম ৪০ বছর আগে। মেক্সিকো সিটির অ্যাজটেকা স্টেডিয়াম। বিশ্বকাপ ফুটবলের কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা। মাঠের লড়াই যেন শুধু ফুটবলের জন্য নয়। চার বছর আগের ফকল্যান্ড যুদ্ধের ক্ষত তখনও তাজা। আর সেই উত্তপ্ত প্রেক্ষাপটে উঠে আসেন এক কিংবদন্তি ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা।
এক ম্যাচে তিনি যেন স্বর্গ আর নরকের দুটি গোল করে দেখান। একটি গোল যাকে বলা হয় ‘শতাব্দীর সেরা গোল’, আর অপরটি যাকে ইতিহাস ডাকে ‘হ্যান্ড অফ গড’। আজ চার দশক বা ৪০ বছর পেরিয়েও ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত, সমালোচিত এবং রোমাঞ্চকর অধ্যায়ের নাম ‘হ্যান্ড অব গড’ (Hand of God)।
একই ম্যাচে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত এবং সবচেয়ে বিখ্যাত গোলের জন্ম দিয়ে ম্যারাডোনা নিজেকে নিয়ে গিয়েছিলেন এক অনন্য উচ্চতায়। আজকে থাকছে রহস্যময় হাতের স্পর্শ, তার পেছনের ইতিহাস, এক অমর কিংবদন্তির দ্বিধাবিভক্ত উত্তরাধিকার এবং বাইরের নানা অজানা গল্প।
পটভূমি: ফুটবল যখন ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রতিশোধ
১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে যখন আর্জেন্টিনা এবং ইংল্যান্ড মুখোমুখি হয়েছিল তখন গ্যালারি কিংবা মাঠের উত্তেজনার পারদ সাধারণ যেকোনো ম্যাচের চেয়ে অনেক উঁচুতে ছিল। এর পেছনে ছিল এক রক্তাক্ত রাজনৈতিক ইতিহাস।
১৯৮২ সালে দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা নিয়ে আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে এক সংক্ষিপ্ত কিন্তু ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মাত্র ৭৪ দিনের সেই যুদ্ধে আর্জেন্টিনার প্রায় ৬৫০ জন এবং ব্রিটেনের ২৫৫ জন সেনা নিহত হন। যুদ্ধে আর্জেন্টিনা পরাজিত হয় এবং ফকল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ ব্রিটেনের হাতেই থেকে যায়। এই পরাজয় আর্জেন্টিনার মানুষের জাতীয় মর্যাদায় এক চরম আঘাত হেনেছিল।
ফলে, ১৯৮৬ সালের সেই ম্যাচটি আর্জেন্টিনার ফুটবলার এবং সাধারণ মানুষের কাছে কেবল সেমিফাইনালে ওঠার লড়াই ছিল না। এটি ছিল মাঠের ভেতরে ইংরেজদের হারিয়ে এক ধরনের রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রতিশোধ নেওয়ার মঞ্চ। ম্যারাডোনা তার আত্মজীবনীতে পরবর্তীতে স্বীকার করেছিলেন, ম্যাচের আগে আমরা বলেছিলাম ফুটবল আর রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু ওটা মিথ্যা ছিল। আমরা আর্জেন্টিনার সাধারণ মানুষের কথা ভাবছিলাম, যারা ফকল্যান্ডে মারা গিয়েছিল।
ম্যাচের আগে লকাররুমে আমরা যুদ্ধের গল্প বলছিলাম। মাঠে নামার আগে মনে হচ্ছিল, ওরা শুধু প্রতিপক্ষ নয়; ওরা আমাদের মাটি কেড়ে নেওয়া শত্রু।
সেই ঐতিহাসিক ৫১তম মিনিট: ঈশ্বরের হাত
ম্যাচের প্রথমার্ধ শেষ হয়েছিল ০-০ গোলে। দুই দলই লড়ছিল সমানে সমানে। কিন্তু ম্যাচের ৫১তম মিনিটে ফুটবল বিশ্ব এমন এক ঘটনার সাক্ষী হলো, যা এর আগে কেউ কখনো কল্পনাও করেনি। আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার হোর্হে ভালদানো বল নিয়ে ইংল্যান্ডের ডিফেন্সে ঢোকার চেষ্টা করছিলেন। তাকে বাধা দিতে গিয়ে ইংলিশ মিডফিল্ডার স্টিভ হজ বলটি ক্লিয়ার করতে চান, কিন্তু বল তার পায়ে লেগে উল্টো আকাশে ড্রপ খেয়ে ইংল্যান্ডের পেনাল্টি বক্সের ভেতরে চলে যায়।
বক্সের ভেতর তখন ছুটে আসছিলেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক ডিয়েগো ম্যারাডোনা এবং ইংল্যান্ডের ৬ ফুট ১ ইঞ্চির দীর্ঘদেহী গোলরক্ষক পিটার শিলটন। উচ্চতার দিক থেকে ৫ ফুট ৫ ইঞ্চির ম্যারাডোনা শিলটনের চেয়ে অনেক পিছিয়ে ছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই বলটি শিলটনের গ্রিপে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়ে ম্যারাডোনা বাতাসে লাফিয়ে উঠলেন এবং শিলটন তার হাত প্রসারিত করার আগেই বলটি ইংল্যান্ডের জালে জড়িয়ে গেল।
স্টেডিয়ামের ১ লক্ষ ১৪ হাজার দর্শক প্রথম চটকাতেই বুঝতে পারেননি আসলে কী ঘটেছে। ম্যারাডোনা গোল উদযাপন করতে করতে কর্নার ফ্ল্যাগের দিকে দৌড়াতে শুরু করলেন। ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা, বিশেষ করে পিটার শিলটন এবং টেরি ফেনউইক রেফারিকে ঘিরে ধরে হ্যান্ডবলের দাবি জানাতে লাগলেন। কিন্তু তিউনিসিয়ান রেফারি আলী বিন নাসের এবং লাইন্সম্যান বোগদান দোচেভ কেউই ম্যারাডোনার সেই চাতুর্য ধরতে পারেননি। রেফারি গোলের বাঁশি বাজান। আর্জেন্টিনা ১-০ গোলে এগিয়ে যায়।
নামকরণের ইতিহাস: "একটু ম্যারাডোনার মাথা, বাকিটা ঈশ্বরের হাত"
ম্যাচ শেষে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। টিভি রিপ্লেতে পরিষ্কার দেখা যায়, ম্যারাডোনা বলটি মাথায় নয়, বরং তার বাম হাত দিয়ে পাঞ্চ করে পিটার শিলটনের মাথার ওপর দিয়ে জালে পাঠিয়েছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা যখন ম্যারাডোনাকে ছেঁকে ধরলেন এবং গোলের সত্যতা জানতে চাইলেন, তখন ম্যারাডোনা ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আইকনিক এবং চতুর উক্তিটি করেন।
গোলটি হয়েছে কিছুটা ম্যারাডোনার মাথা দিয়ে, আর বাকিটা ঈশ্বরের হাত দিয়ে (Un poco con la cabeza de Maradona y otro poco con la mano de Dios).
এই একটি বাক্যই গোলটিকে রাতারাতি ফুটবল সংস্কৃতির অংশ বানিয়ে দেয়। বিশ্বজুড়ে এটি পরিচিতি পায় ‘হ্যান্ড অব গড’ বা ‘ঈশ্বরের হাত’ নামে। আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে এটি ছিল এক চতুর এবং মোক্ষম প্রতিশোধ আর ইংরেজদের কাছে এটি ছিল চরম এক প্রতারণা।
চার মিনিট পর: খলনায়ক থেকে এক নিমেষে ‘ফুটবল ঈশ্বর’
"হ্যান্ড অব গড" গোলটি যদি ম্যারাডোনার ক্যারিয়ারের একমাত্র গল্প হতো তবে ফুটবল ইতিহাস তাকে হয়তো কেবল একজন ‘প্রতারক জিনিয়াস’ হিসেবে মনে রাখত। কিন্তু ম্যারাডোনা ছিলেন অন্য ধাতুতে গড়া। প্রথম গোলের বিতর্ক এবং ইংলিশদের ক্ষোভের আগুন স্তমিত হওয়ার ঠিক ৪ মিনিট পর (৫৫তম মিনিটে) ম্যারাডোনা যা করলেন তা মানবীয় কল্পনার অতীত।
নিজেদের অর্ধে বল পেয়েছিলেন ম্যারাডোনা। এরপর তিনি শুরু করলেন তার জীবনের সবচেয়ে বিখ্যাত ড্রিবলিং। একে একে ইংল্যান্ডের পিটার বিয়ার্ডসলি, পিটার রিড, টেরি বুচার এবং টেরি ফেনউইককে সাপের মতো এঁকেবেঁকে কাটিয়ে তিনি ঢুকে পড়লেন ইংল্যান্ডের বক্সে। সামনে তখন ছিটকে আসা গোলরক্ষক পিটার শিলটন। ম্যারাডোনা তাকেও এক জাদুকরী ডজে মাটিতে নামিয়ে বল পাঠিয়ে দিলেন শূন্য জালে।
মাত্র ১০ সেকেন্ডে ৬০ গজ দৌড়ে, ৪ জন বিশ্বমানের ডিফেন্ডার এবং গোলরক্ষককে পরাস্ত করে করা এই গোলটি ২০০২ সালে ফিফার জরিপে "শতাব্দীর সেরা গোল" (Goal of the Century) হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ধারাভাষ্যকার ভিক্টর হুগো মোরালেস লাইভ কমেন্ট্রিতে কেঁদে ফেলে বলেছিলেন, "হে ঈশ্বর, ফুটবলকে ধন্যবাদ! ম্যারাডোনার জন্য ধন্যবাদ!" একই ম্যাচে ম্যারাডোনা মানুষের চাতুর্য (খলনায়ক রূপ) এবং ফুটবলের ঈশ্বরত্ব (নায়ক রূপ) দুই-ই প্রদর্শন করেছিলেন। ম্যাচটি আর্জেন্টিনা ২-১ ব্যবধানে জিতে নেয়।
চার দশকের বিতর্ক এবং বর্তমান ফুটবল
আজ ৪০ বছর পেরিয়েও এই গোলটি নিয়ে আলোচনা শেষ হয়নি। এই একটি গোল ফুটবল সংস্কৃতি এবং ইতিহাসে গভীর প্রভাব ফেলেছে:
- পিটার শিলটনের চিরস্থায়ী ক্ষোভ: ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক পিটার শিলটন ম্যারাডোনাকে তার জীবদ্দশায় কখনোই ক্ষমা করেননি। ২০২০ সালে ম্যারাডোনার মৃত্যুর পরও শিলটন বলেছিলেন, ম্যারাডোনা সর্বকালের অন্যতম সেরা ছিলেন, কিন্তু তার মধ্যে স্পোর্টসম্যানশিপের অভাব ছিল।
- ভিএআর (VAR) প্রযুক্তির আগমন: আজকের আধুনিক ফুটবলে ‘ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি’ বা VAR প্রযুক্তি রয়েছে। বর্তমান যুগে এই গোলটি হলে সেকেন্ডের মধ্যে তা বাতিল হয়ে যেত এবং ম্যারাডোনা হলুদ কার্ড দেখতেন। ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, ‘হ্যান্ড অব গড’-এর মতো বড় ভুলগুলোই ফুটবলে প্রযুক্তি আনার পেছনে দূরবর্তী অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
- বল এবং জার্সির নিলাম: অতি সম্প্রতি ২০২২ সালে ম্যারাডোনার সেই ম্যাচের ঐতিহাসিক জার্সিটি প্রায় ৯.৩ মিলিয়ন ডলারে এবং যে বলটি দিয়ে ‘হ্যান্ড অব গড’ হয়েছিল, সেটি প্রায় ২.৪ মিলিয়ন ডলারে নিলামে বিক্রি হয়। এটিই প্রমাণ করে এই বিতর্কের বাণিজ্যিক ও ঐতিহাসিক মূল্য কতটা আকাশচুম্বী।
এক নজরে ম্যারাডোনা: মাঠের জাদুকর থেকে ফুটবল ঈশ্বর
- আর্জেন্টাইন জাদুকর: ৫ ফুট ৫ ইঞ্চির এই খুদে জাদুকরকে ফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম সেরা এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
- ১৯৮৬-এর মহাকাব্য: একক নৈপুণ্যে মেক্সিকো বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ট্রফি এনে দেন, যা তাকে ফুটবল ঈশ্বরে পরিণত করে।
- হ্যান্ড অব গড (Hand of God): ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে লাফিয়ে উঠে মাথার বদলে বাম হাত দিয়ে গোল করেন। ম্যাচ শেষে একে "ঈশ্বরের হাত" বলে অভিহিত করায় গোলটি চিরকালের জন্য বিতর্কিত ও ঐতিহাসিক হয়ে যায়।
- শতাব্দীর সেরা গোল (Goal of the Century): "হ্যান্ড অব গড" গোলের ঠিক ৪ মিনিট পর নিজেদের অর্ধে বল পেয়ে ইংল্যান্ডের ৫ জন খেলোয়াড় ও গোলরক্ষককে কাটিয়ে শতাব্দীর সেরা গোলটি উপহার দেন। একই ম্যাচে তিনি মানুষের চাতুর্য এবং ফুটবলীয় শ্রেষ্ঠত্ব—দুটি রূপই দেখিয়েছিলেন।
- ফকল্যান্ড যুদ্ধের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিশোধ: ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধে ব্রিটেনের কাছে আর্জেন্টিনার পরাজয়ের পর, এই ম্যাচে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে মাঠের ভেতরে এক আবেগঘন রাজনৈতিক ও জাতীয় প্রতিশোধ নিয়েছিলেন ম্যারাডোনা ও তার দল।
- ক্লাব ফুটবলে বিপ্লব (নাপোলি যুগ): ইতালিয়ান ক্লাব নাপোলিকে একক কাঁধে টেনে তৎকালীন শক্তিশালী মিলান ও জুভেন্টাসকে টেক্কা দিয়ে দুটি সেরি-আ (Serie A) ও একটি উয়েফা কাপ জেতান, যা নেপলসের মানুষের কাছে তাকে দেবতার আসনে বসায়।
- বিতর্কিত জীবন: ফুটবল মাঠের আকাশচুম্বী সাফল্যের পাশাপাশি ড্রাগ আসক্তি (কোকেন), শৃঙ্খলাভঙ্গ এবং ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ডোপ টেস্টে পজিটিভ হয়ে নিষিদ্ধ হওয়ার মতো চরম বিতর্ক সারাজীবন তার সঙ্গী ছিল।
- চিরবিদায়: ২০২০ সালের ২৫শে নভেম্বর ৬০ বছর বয়সে এই ফুটবল কিংবদন্তি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন, তবে তার রেখে যাওয়া রূপকথা আজও ফুটবল বিশ্বে সমান জীবন্ত।
বিতর্ক চিরন্তন, ম্যারাডোনা অমর
৪০ বছর হয়ে গেল এখনো সেই হাতের স্পর্শ ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত বিষয়। এক দিকে, এটি ফুটবলের প্রতি অসৎ আচরণের বেদনাদায়ক উদাহরণ। অন্যদিকে, এটি যুদ্ধবিধ্বস্ত জাতির জন্য বিজয়ের তৃপ্তির প্রতীক।
ম্যারাডোনা বারবার বলেছেন তিনি অনুতপ্ত নন। বরং জাতীয় দরবারে তিনি এটিকে ‘প্রয়োজনীয় পাপ’ আখ্যা দিয়েছেন। এই দ্বিধাবিভক্ত উত্তরাধিকারই তাকে বিতর্কের অমর করে রেখেছে। ফুটবল শুধু খেলা নয় আবেগ, প্রতিশোধ, ন্যায়-অন্যায় আর কালজয়ী প্রতিভার মিশেল। হ্যান্ড অফ গড সেই মিশেলের সবচেয়ে আলোড়িত অধ্যায়।
