পর্তুগালের বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাস: ইউসেবিওর বীরত্ব থেকে রোনালদোর রেকর্ডগাথা
বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে পর্তুগাল বা 'সেলেসাও দাস কিনাস' (Seleção das Quinas) একটি অন্যতম পরাশক্তি ও জনপ্রিয় নাম। ইউসেবিও, লুইস ফিগো থেকে শুরু করে আধুনিক ফুটবলের মহাতারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই দেশ বিশ্বকে উপহার দিয়েছে অসাধারণ সব ফুটবলার।
ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপের (ইউরো) ট্রফি ঘরে তুললেও, ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর ‘ফিফা বিশ্বকাপ’ এখনো পর্তুগালের জন্য এক অধরা স্বপ্ন। নাটকীয়তা, অবিশ্বাস্য উত্থান আর হৃদয়ভাঙার গল্পে ঘেরা পর্তুগালের বিশ্বকাপ ইতিহাস। আজ আমরা পর্তুগালের সেই রোমাঞ্চকর বিশ্বকাপ যাত্রা বিশদভাবে জানবো।
এক নজরে পর্তুগালের বিশ্বকাপ পরিসংখ্যান
পর্তুগালের বিশ্বকাপ ইতিহাসের মূল অংশে যাওয়ার আগে তাদের সামগ্রিক পারফরম্যান্সের ওপর একবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক:
- মোট অংশগ্রহণ: ৯ বার (১৯৬৬, ১৯৮৬, ২০০২, ২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ এবং ২০২৬)
- সর্বোত্তম সাফল্য: তৃতীয় স্থান (১৯৬৬)
- মোট ম্যাচ খেলা: ৩৫টি
- জয়: ১৭টি ম্যাচ
- ড্র: ৬টি ম্যাচ
- পরাজয়: ১২টি ম্যাচ
- গোল সংখ্যা: তারা প্রতিপক্ষের জালে ৬১টি গোল করেছে এবং নিজেদের জালে ৪১টি গোল হজম করেছে।
১৯৬৬: প্রথম আবির্ভাব এবং ইউসেবিও জাদু (সেরা সাফল্য)
১৯৩০ সালে বিশ্বকাপ শুরু হলেও পর্তুগালকে প্রথমবার বিশ্বমঞ্চে কোয়ালিফাই করতে দীর্ঘ ৩৬ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। ১৯৬৬ সালের ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে পর্তুগাল যখন প্রথমবার পা রাখে, তখন কেউই ভাবেনি এই নবাগত দলটি পুরো টুর্নামেন্ট কাঁপিয়ে দেবে।
সেবার পর্তুগাল ফুটবল বিশ্বকে চমকে দিয়ে গ্রুপ পর্বে ব্যাক-টু-ব্যাক চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে ৩-১ গোলে হারিয়ে দেয়। তবে পর্তুগালের আসল রূপ দেখা যায় কোয়ার্টার ফাইনালে উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে। সেই ম্যাচে এক অবিশ্বাস্য নাটকের জন্ম হয়।
খেলার প্রথম ২৫ মিনিটের মধ্যেই উত্তর কোরিয়া ৩-০ গোলে এগিয়ে গিয়ে পর্তুগালকে স্তব্ধ করে দেয়। সেখান থেকে শুরু হয় ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা প্রত্যাবর্তন। কিংবদন্তি স্ট্রাইকার ইউসেবিও (Eusébio) একাই ৪টি গোল করে দলকে ৫-৩ ব্যবধানে জয় এনে দেন।
সেমিফাইনালে স্বাগতিক ইংল্যান্ডের কাছে ২-১ গোলে হেরে পর্তুগালের ফাইনালের স্বপ্ন ভাঙলেও, সোভিয়েত ইউনিয়নকে হারিয়ে তারা তৃতীয় স্থান অর্জন করে। ইউসেবিও সেবার মোট ৯টি গোল করে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার ‘গোল্ডেন বুট’ জিতে নেন। এই টুর্নামেন্টটি পর্তুগিজ ফুটবলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল।
১৯৮৬ ও ২০০২: দীর্ঘ নীরবতা এবং 'গোল্ডেন জেনারেশন' এর হতাশা
১৯৬৬ সালের সেই সোনালী অধ্যায়ের পর পর্তুগাল ফুটবল এক দীর্ঘ অন্ধকার যুগে প্রবেশ করে। টানা চারটি বিশ্বকাপে তারা কোয়ালিফাই করতে ব্যর্থ হয়। দীর্ঘ ২০ বছর পর, ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে তারা ফিরে আসে।
কিন্তু মাঠের বাইরের নানা বিতর্ক এবং খেলোয়াড়দের সাথে বোর্ডের ঝামেলার কারণে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে মরক্কোর কাছে হেরে তারা প্রথম রাউন্ডেই বিদায় নেয়। এরপর আবার ১৬ বছরের অপেক্ষা। ২০০২ সালের কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপে পর্তুগাল দলে তখন লুইস ফিগো, রুই কস্তা, জোয়াও পিন্টোদের মতো তারকাদের মেলা, যাদের পর্তুগালের 'গোল্ডেন জেনারেশন' বলা হতো।
এই দলটিকে নিয়ে ফুটবল ভক্তদের অনেক আশা ছিল। কিন্তু সবাইকে হতাশ করে গ্রুপ পর্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে হেরে তারা অত্যন্ত লজ্জাজনকভাবে প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নেয়। তারকাখচিত দল নিয়ে এমন বিদায় ছিল পর্তুগিজ ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় ধাক্কা।
২০০৬: ফিগো-র বিদায়, রোনালদোর উদয় এবং দ্বিতীয় সেরা সাফল্য
- ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপ পর্তুগিজ ফুটবলের জন্য ছিল একটি বড় পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণ। এটি ছিল মহানায়ক লুইস ফিগোর শেষ বিশ্বকাপ এবং বিশ্বমঞ্চে ২১ বছর বয়সী তরুণ ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর প্রথম আগমন। অভিজ্ঞ ফিলিপ স্কোলারির কোচিংয়ে এই দলটিতে ছিল অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের দারুণ এক মিশ্রণ।
- গ্রুপ পর্বের সবকটি ম্যাচ জিতে পর্তুগাল নকআউট পর্বে পৌঁছায়। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে শেষ ১৬-র ম্যাচটি ফুটবল ইতিহাসে 'ব্যাটেল অফ নুরেমবার্গ' নামে পরিচিত, যেখানে রেকর্ড ১৬টি হলুদ কার্ড এবং ৪টি লাল কার্ড দেখানো হয়েছিল। সেই উত্তপ্ত ম্যাচে ১-০ গোলে জিতে পর্তুগাল কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে এবং সেখানে টাইব্রেকারে ইংল্যান্ডকে পরাজিত করে।
- দীর্ঘ ৪০ বছর পর পর্তুগাল আবার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠে। কিন্তু সেমিফাইনালে জিনেদিন জিদানের ফ্রান্সের কাছে পেনাল্টি থেকে গোল হজম করে ০-১ ব্যবধানে হেরে যায় তারা। পরে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে জার্মানির কাছে ৩-১ গোলে হেরে পর্তুগাল চতুর্থ স্থান নিয়ে টুর্নামেন্ট শেষ করে। ট্রফি না জিতলেও এই বিশ্বকাপটি পর্তুগালকে আবারো বিশ্ব ফুটবলের পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
২০১০ - ২০১৪: রোনালদো যুগ এবং মধ্যম সারির পারফরম্যান্স
২০০৬ সালের পর থেকে পর্তুগাল দল এককভাবে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকেন্দ্রিক দলে পরিণত হতে শুরু করে। তবে দলগত পারফরম্যান্সে কিছুটা ভাটা পড়ে।
- ২০১০ (দক্ষিণ আফ্রিকা): এই বিশ্বকাপে পর্তুগাল ডিফেন্সে দারুণ শক্তিমত্তা দেখায়। গ্রুপ পর্বে উত্তর কোরিয়াকে তারা ৭-০ গোলে বিধ্বস্ত করে। কিন্তু শেষ ১৬-র লড়াইয়ে স্পেনের 'টিকি-টাকা' কৌশলের কাছে ১-০ গোলে হেরে তাদের বিদায় নিতে হয়। উল্লেখ্য, স্পেনই সেবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল।
- ২০১৪ (ব্রাজিল): এটি ছিল পর্তুগালের বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম হাতাশাজনক পারফরম্যান্স। প্রথম ম্যাচেই জার্মানির কাছে ৪-০ গোলে বিধ্বস্ত হয় তারা। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ইনজুরি নিয়ে খেললেও দলকে বাঁচাতে পারেননি। গোল ব্যবধানে পিছিয়ে থেকে পর্তুগালকে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়।
২০১৮ ও ২০২২: নকআউটের বাধা এবং মরক্কো ট্র্যাজেডি
২০১৬ সালে পর্তুগাল তাদের ইতিহাসের প্রথম বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি ‘ইউরো’ জয় করে। ফলে ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপে তাদের নিয়ে প্রত্যাশার পারদ ছিল তুঙ্গে।
- ২০১৮ (রাশিয়া): স্পেনের বিরুদ্ধে ৩-৩ ড্রয়ের ম্যাচে রোনালদোর ঐতিহাসিক হ্যাটট্রিক দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করে পর্তুগাল। কিন্তু নকআউট পর্বের প্রথম ম্যাচেই উরুগুয়ের এডিনসন কাভানির জোড়া গোলের কাছে ২-১ ব্যবধানে হেরে বিদায় নেয় তারা।
- ২০২২ (কাতার): কাতার বিশ্বকাপে পর্তুগাল বেশ শক্তিশালী স্কোয়াড নিয়ে যাত্রা শুরু করে। গ্রুপ পর্ব টপকে শেষ ১৬-র ম্যাচে তারা সুইজারল্যান্ডকে ৬-১ গোলের বিশাল ব্যবধানে উড়িয়ে দেয়, যেখানে তরুণ গনসালো রামোস হ্যাটট্রিক করেন। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে আফ্রিকার চমক মরক্কোর রক্ষণভাগ ভাঙতে ব্যর্থ হয় পর্তুগাল। ০-১ গোলের সেই পরাজয়টি ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক, যা মাঠ ছেড়ে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর অশ্রুসিক্ত বিদায়ের দৃশ্যের জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
বিশ্বকাপে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর অনন্য কীর্তি
পর্তুগালের বিশ্বকাপ ইতিহাসের কথা বলতে গেলে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর ব্যক্তিগত রেকর্ডের কথা আলাদাভাবে বলতেই হয়। তিনি বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে একমাত্র পুরুষ খেলোয়াড় যিনি ৫টি ভিন্ন বিশ্বকাপে (২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২২) গোল করার অলৌকিক কীর্তি গড়েছেন। বিশ্বকাপে পর্তুগালের হয়ে তিনি রেকর্ড ২২টি ম্যাচ খেলেছেন এবং মোট ৮টি গোল করেছেন।
কুইজের বর্ণনা ও নিয়মাবলী (Quiz Description & Guidelines)
💡 কুইজটি খেলার আগে জেনে নিন:এখানে আর্জেন্টিনা সম্পর্কিত ইতিহাস, ভূগোল, সংস্কৃতি এবং ফুটবল নিয়ে মোট ১০টি বহুনির্বাচনী (MCQ) প্রশ্ন রয়েছে।
- প্রতিটি প্রশ্নের ৪টি করে অপশন থাকবে।
- সঠিক উত্তরটি নির্বাচন করার সাথে সাথেই আপনি আপনার স্কোর দেখতে পাবেন।
- নিচের কুইজ সেকশনে যান, সঠিক অপশনে ক্লিক করুন এবং কুইজ শেষে কমেন্ট বক্সে আমাদের জানান আপনার স্কোর কত হলো!
- শুভকামনা (¡Buena Suerte!)
নাউসা সেনহোরা | পর্তুগাল কুইজ
🏅 আপনার স্কোর
০ / ১০
উপসংহার ও ২০২৬ বিশ্বকাপের নতুন দিগন্ত
পর্তুগালের বিশ্বকাপ ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তারা যখনই ছন্দ খুঁজে পেয়েছে, তখনই বিশ্ব কাঁপিয়েছে। তবে ধারাবাহিকতার অভাব এবং নকআউট পর্বের স্নায়ুচাপ ধরে রাখতে না পারাটাই তাদের বারবার পিছিয়ে দিয়েছে।
ইতিমধ্যেই পর্তুগাল ২০২৬ বিশ্বকাপে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছে। বর্তমান পর্তুগাল দলে ব্রুনো ফার্নান্দেস, বার্নার্ডো সিলভা, রাফায়েল লিয়াও, রুবেন দিয়াসের মতো বিশ্বসেরা তারকারা রয়েছেন। অভিজ্ঞতার আলো ছড়াতে পারেন রোনালদোও।
ফুটবল ভক্তদের প্রত্যাশা, বিগত বছরের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে এই প্রতিভাবান দলটি ২০২৬ সালের বিশ্বমঞ্চে তাদের অধরা সোনালী ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরে ইতিহাস নতুন করে লিখবে। শুভকামনা।
