দ্যাখো দ্যাখোইহুদী-নাসারার বদমাসীদ্যাখো দ্যাখো-আমরা হাজার জ্বালার জলে ভাসি
বাংলা সাহিত্যে এমন কিছু লেখক আছেন, যাঁরা কেবল গল্প-উপন্যাস লেখেননি; তাঁরা তাঁদের কলম দিয়ে সমাজের বিবেককে নাড়া দিয়েছেন। শওকত ওসমান সেই বিরল লেখকদের অন্যতম। সমাজের ভণ্ডামি, ধর্মান্ধতা, অন্ধবিশ্বাস, স্বৈরাচার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদ ছিল নির্ভীক এবং ব্যঙ্গ ছিল শাণিত অস্ত্র। তাঁর ব্যঙ্গগ্রন্থ ‘শেখের সম্ভরা’-এর অন্যতম আলোচিত অংশ ‘দ্যাখো দ্যাখো ইহুদী-নাসারার বদমাসী’। প্রথম দর্শনে এটি ধর্মীয় উন্মাদনার ভাষা বলে মনে হলেও, প্রকৃতপক্ষে এটি ধর্মীয় গোঁড়ামি, ষড়যন্ত্রতত্ত্ব এবং আত্মসমালোচনাহীন মানসিকতার বিরুদ্ধে এক অসাধারন ব্যঙ্গরচনা।
তাঁর সাহিত্যকর্মে যেমন মানবমুক্তির স্বপ্ন রয়েছে, তেমনি রয়েছে কুসংস্কার, সংকীর্ণতা ও আত্মপ্রবঞ্চনার বিরুদ্ধে নির্ভীক প্রতিবাদ। ব্যঙ্গকে তিনি কেবল হাস্যরসের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেননি; বরং সমাজের অসুস্থ চিন্তা ও মিথ্যা অহংকারকে উন্মোচনের কার্যকর অস্ত্রে পরিণত করেছিলেন। তাঁর লেখার ভাষা কখনও রসাত্মক, কখনও তীব্র বিদ্রূপে ভরা, কিন্তু প্রতিটি বাক্যের অন্তরালে লুকিয়ে থাকে গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য।
কীর্তনের সুর, লোকজ ভাষা, কৌতুক ও বিদ্রূপের মোড়কে তিনি তুলে ধরেছেন আত্মসমালোচনার প্রয়োজনীয়তা, যুক্তিবোধের গুরুত্ব এবং মুক্তচিন্তার অপরিহার্যতা। এই কারণেই রচনাটি আজও কেবল একটি ব্যঙ্গগীতি নয়, বরং সমাজমনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণের এক শক্তিশালী সাহিত্যিক দলিল হিসেবে সমান প্রাসঙ্গিক।
শওকত ওসমান: জীবন ও সাহিত্য
বাংলা কথাসাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র শওকত ওসমান। তাঁর প্রকৃত নাম শেখ আজিজুর রহমান। তিনি ১৯১৭ সালের ২ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার সবল সিংহপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম শেখ মোহাম্মদ এহিয়া এবং মাতার নাম গুলজান বেগম। শওকত ওসমানের শিক্ষাজীবন শুরু হয় মক্তব ও মাদ্রাসায়। পরবর্তীকালে তিনি কলকাতার আলিয়া মাদ্রাসায় অধ্যয়ন করেন। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি এবং পরে বাংলা বিষয়ে এম.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন।
পেশাগত জীবনে তিনি প্রথমে কলকাতা করপোরেশন ও বাংলা সরকারের তথ্য বিভাগে চাকরি করেন। এম.এ. পাসের পর ১৯৪১ সালে কলকাতার গভর্নমেন্ট কমার্শিয়াল কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৪৭ সালে চট্টগ্রাম কলেজ অব কমার্সে (বর্তমানে সরকারি কমার্স কলেজ, চট্টগ্রাম) যোগদানের পর ১৯৫৮ সাল থেকে তিনি ঢাকা কলেজে অধ্যাপনা করেন। সেখানে ১৯৭২ সালে স্বেচ্ছা অবসর গ্রহণ করেন। চাকরিজীবনের প্রারম্ভে কিছুদিন তিনি ‘কৃষক’ পত্রিকায় সাংবাদিকতাও করেছিলেন।
শওকত ওসমান ছিলেন একাধারে উপন্যাসিক, নাট্যকার, ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক, রম্যরচয়িতা ও শিশু-কিশোর সাহিত্যিক। তিনি ছিলেন মুক্তচিন্তার এক তেজস্বী বুদ্ধিজীবী। তাঁর রচনায় সমাজ, রাজনীতি ও মানবিক মূল্যবোধের তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ পাওয়া যায়। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ হলো: জননী (১৯৬১), ক্রীতদাসের হাসি (১৯৬২), সমাগম (১৯৬৭), চৌরসন্ধি (১৯৬৮), রাজা উপাখ্যান (১৯৭১), জাহান্নম হইতে বিদায় (১৯৭১), দুই সৈনিক (১৯৭৩) , নেকড়ে অরণ্য প্রভৃতি।
বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অসাধারণ অবদানের জন্য তিনি বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন, বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬২), আদমজী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৬), প্রেসিডেন্ট পুরস্কার (১৯৬৭), একুশে পদক (১৯৮৩), স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার (১৯৯৭)। শওকত ওসমান ১৯৯৮ সালের ১৪ মে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর সাহিত্য, চিন্তাধারা ও মানবতাবোধ বাংলা সাহিত্যে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমান: মানবতাবাদ, ব্যঙ্গ ও প্রতিবাদের অনন্য কণ্ঠস্বর
শওকত ওসমান কেবল একজন কথাসাহিত্যিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন সমাজের বিবেক। তাঁর লেখায় যেমন রয়েছে নির্মম সত্য, তেমনি রয়েছে গভীর মানবিকতা। তিনি ধর্মান্ধতা, বুর্জোয়া ভণ্ডামি, রাজনৈতিক মেকিপনা এবং সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে নির্ভীকভাবে লিখেছেন। তাঁর ব্যঙ্গ কখনও হাসায়, কখনও অস্বস্তিতে ফেলে, আবার কখনও আত্মসমালোচনায় বাধ্য করে।
- ব্যঙ্গ তাঁর সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র
শওকত ওসমানের ভাষা ছিল সহজ, কিন্তু তার আঘাত ছিল তীক্ষ্ণ। তিনি বিশ্বাস করতেন, সমাজের সবচেয়ে বড় সংকট হলো-
- সাধারণ বুদ্ধির অভাব,
- যুক্তিহীন বিশ্বাস,
- আত্মসমালোচনার অক্ষমতা।
এই কারণেই তাঁর ব্যঙ্গরচনা কেবল হাস্যরস নয়; বরং সামাজিক বিশ্লেষণের শক্তিশালী দলিল।
- লোকজ ভাষায় সমাজের মুখোশ উন্মোচন
শওকত ওসমান পাশ্চাত্য যুক্তিবাদ যেমন চিনতেন, তেমনি বাংলার লোকজ সংস্কৃতির শক্তিও উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি লোকভাষা, কীর্তনের ছন্দ, প্রবাদ-প্রবচন, আঞ্চলিক শব্দ ও হাস্যরসকে ব্যবহার করেছেন সমাজের ভণ্ডামিকে নগ্নভাবে প্রকাশ করার জন্য। এই কারণেই তাঁর ব্যঙ্গরচনার ভাষা একই সঙ্গে সহজ, প্রাণবন্ত এবং ভয়ংকর কার্যকর।
‘শেখের সম্ভরা’: ব্যঙ্গের অসাধারণ দলিল
‘শেখের সম্ভরা’ শওকত ওসমানের অন্যতম আলোচিত ব্যঙ্গগ্রন্থ। এখানে তিনি একটি কাল্পনিক ধর্মান্ধ চরিত্রের কণ্ঠ ব্যবহার করে এমনসব কথা বলিয়েছেন, যা প্রথমে সত্যি বলে মনে হলেও ধীরে ধীরে পাঠক বুঝতে পারেন—আসলে লেখক সেই মানসিকতাকেই বিদ্রূপ করছেন। দ্যাখো দ্যাখো ইহুদী-নাসারার বদমাসী’: আসলে কী বলতে চেয়েছেন শওকত ওসমান?
‘দ্যাখো দ্যাখো ইহুদী-নাসারার বদমাসী’ অংশটি শওকত ওসমানের ব্যঙ্গরচনার সবচেয়ে শক্তিশালী উদাহরণগুলোর একটি। এখানে তিনি এমন এক চরিত্র সৃষ্টি করেছেন, যে পৃথিবীর সব উন্নয়ন, বিজ্ঞান, চিকিৎসা, প্রযুক্তি কিংবা আধুনিক আবিষ্কারের জন্য অন্যদের দোষারোপ করে, কিন্তু নিজের সমাজের দুর্বলতা নিয়ে একবারও আত্মসমালোচনা করে না। এই ব্যঙ্গের মাধ্যমে লেখক দেখিয়েছেন—
- অন্ধ ষড়যন্ত্রতত্ত্বের বিপদ
- ধর্মান্ধ চিন্তার অসারতা
- যুক্তিবোধের প্রয়োজনীয়তা
- আত্মসমালোচনার অভাব
- বিজ্ঞানবিমুখতার ভয়াবহতা
এই রচনার হাস্যরসের আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর সামাজিক সমালোচনা।
শেখের সম্বরা দোসরা বালাম থেকে নির্বাচিত অংশ
সংগীত-১
(ইচ্ছেমত আখর দেয়,
ঝাড়খন্ডী কীর্তনের সুরে গেয়)
দ্যাখো দ্যাখো-
ইহুদী-নাসারার বদমাসী।
দ্যাখো দ্যাখো-
আমরা হাজার জ্বালার জলে ভাসি।
আমাদের এ-দুনিয়ায় টেকা দায়
আমরা ছিলাম সুখে যে-যার জায়গায়
ওরা নিয়ে এলো দুনিয়াদারীর বাহানা
কলকব্জা হাতিয়ার নানা কারখানা
ওরা নিয়ে এলো
ওরা নিয়ে এলো রেলগাড়ী,টেলিফোন
বিজলী বাতী,কান-ফাটা যন্ত্র ঝমাঝঝম।
আমাদের ঈমান নিল।
আমাদের ঈমান নিল ধীরে ধীরে কেড়ে
চাঁদের মুখে বুটের ধুলো এলো ঝেড়ে
আমাদের বিশ্বাস, আকিদা-ঈমানে
প্রতিদিন কতো রকম বাণ না হানে।
এই দুনিয়ায় সত্যি আর টেকা দায়
এমন-কি ধাক্কা দিলে নিত্যকার বাঁচায়।
বাঙলা প্রবাদ ঃ বল, বুদ্ধি, ভরসা
চল্লিশ পেরোলেই ফর্সা।
বাপ-দাদার আয়ুর ওই সীমানা
তার পূর্বেই অনেকের মৃত্যু দিত হানা।
নাসারা বের করেছে হাজার দাওয়ােই
এখন সহজে কেউ অক্কা না পায়
তাড়াতাড়ি আর ফলে মরে না কেউ
জনসংখ্যা এখন উত্তাল ঢেউ
খাদ্য, র্যাশন, পরিবার র্যাশন
গর্ভনমেন্ট ভেবে ভেবে শ্যাষ হন।
চিকিৎসার জন্য ধন্যবাদ প্রভুর
দ্যাখো দৌড়াদৌড়ি ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর
লন্ডন মস্কো অথবা ভিয়েনা
আরো কতো শহর আমাদের অচেনা।
ওরা সব বেহেস্তে যেতে নারাজ
এই যুগে বেশ বুঝা যায় আজ
এত বেঁচে থেকে আর ফায়দা কোথায়?
বাঁচলে এতো কিভাবে বেহেস্তে যায়?
মরার আগে ত সেথা যাওয়া দায়,
বোঝে না আদৌ হালা ইহুদী নাসারায়।
আমাদের দুঃখ জড়ো রাশি রাশি
দ্যাখো দ্যাখো ইহুদীনাসারার বদমাশী।।
সংগীত-২
ইচ্ছেমত আখর দেয়,
কীর্তনের সুরে গেয়
দ্যাখো দ্যাখো-
ইহুদী-নাসারার বদমাসী।
দ্যাখো দ্যাখো-
আমরা হাজার জ্বালার জলে ভাসি।
খ্রীষ্টানী মগজে আছে শয়তানীর বীজ
বহু ধরনের পোকা করে গিজগিজ।
ওরা দুনিয়ায় কতো কি যে বানায়
তার মোটে কোথাও লেখাজোখা নাই।
রোজগারের ধান্দা কটা ছিল এদশে?
আঙুলে গণা যায় সোজা অক্লেশে:
কামার কুমোর চাষী মাঝি ধোপা তাঁতী,
ছোটখাট চিজ, কেউ বানাতো মোমবাতি।
ছিল স্যাকরা ময়রা কামলা কয়াল
পাইক পেয়াদা ব্যাধ মুদী লাঠিয়াল
এইভোবে তুমি যদি গণনায় যাও
জোর একশোর বেশি পাবে না কোথাও....
ওদিকে ইহুদী নাসারার বিদ্যের ঠেলায়
যেদিকে তাকাও ধন্দ লেগে যায়।
কবিরাজ ছিল, এখন তাদের ডাক্তার
ধন্দ লাগে হে-ও দ্যাখো বেসুমার:
কান,নাক-গলা, চোখ চিকিৎসক
হাড়ের-হার্টের... কতো গণবে না-হক?
নাকেরও ডান-বাম আছে বিলক্ষণ
তারও ডাক্তার দ্যাখো দুই রকম।
হালাগো ইলেম দ্যাখো আকাশে বাতামে
কেড়েছে চাঁদের হাসি, সেথা ওরা গিয়ে হাসে।
পেটে পেটে কিন্তু ওদের হারামীর চাকু
আমাদের জান আইঢাই করে আকুপাকু,
আমাদের প্রতিদিন বিপদে ফেলায়
নিজেরা মওজ করে হৈ-হল্লায়:
সিনেমা টেলিভিশন হালাগো কারবার
দ্যাখো আমাদের কতো রেখেছে নাচার। ।.... (আংশিক)
সংগীত-৩
ইচ্ছেমত আখর দেয়,
কীর্তনের সুরে গেয়
দ্যাখো দ্যাখো-
ইহুদী-নাসারার বদমাসী।
দ্যাখো দ্যাখো-
আমরা হাজার জ্বালার জলে ভাসি।
আহা রে আহা রে! যেদিকে তাকাই
আমাদের দুই চোখ ছাই হয়ে যায়
আমাদের কোথাও কিছু আর নাই
সব জায়গায় ওরা-ই ওরা-ই।
যেদিকে তাকাই আহা রে আহা রে।
কোথাও নাই আমরা দুনিয়ার বাহার।
আছি আমরা অবিশ্যি-অবিশ্যি আহারে
অস্বীকার যাবে না পুছো যাহারে
কিন্তু কি খাই? ভ্যাংটা ভ্যাজাং তরকারী
সাতাশি জন শতকরা
খাওয়া-পরা লাইনের নীচে
ঘোষণা সরকারী।
তবু শোকর রোজ জানাই আল্লারে
আছি আমরা অবিশ্যি-অবিশ্যি আহারে
কিন্তু কোথাও নাই দুনিয়ার বাহারে।
এক দরিয়া কালি হয়ে যাবে শেষ
কতো না দিকে নাসারাদের অন্বেষ
দিতে তার সকল ও সঠিক বয়ান
গুণীজন দ্যাখো হয়রান পেরেসান।
তবে আমাদের আছে যেদিকেই চাহি
ডাগর গোছের অনেক হামবড়ায়ি
সঙ্গে ফখর-ফুলানো সিনাজুরি
ওদের দেখবে চারিদিকে বাহাদুরী।
হালফিল আমার আর হয় না ঘুম
ওদের বাহাদুরী দেখে আক্কেল গুড়ুম।
এইখানে আপনারা রাখুন শুনে
চিকিৎসা শাস্ত্রের শব্দ দুটি গুণে গুণে।।(আংশিক)
সংগীত-৪
ইচ্ছেমত আখর দেয়,
কীর্তনের সুরে গেয়
দ্যাখো দ্যাখো-
ইহুদী-নাসারার বদমাসী।
দ্যাখো দ্যাখো-
আমরা হাজার জ্বালার জলে ভাসি।
ফজরে বিষন্ন শিরে হাত বুলাই
খালি বালুচড়া ঠেকে মরুভূমি প্রায়।
চারিদিকে চোখ মেলে তাজ্জব, তাজ্জব।
ঠাঁই ঠাঁই ইহুদী নাসারারাই সব
তাজ্জব....তাজ্জব.....তাজ্জব!!
তাজ্জব....তাজ্জব.....তাজ্জব!!
মাথার উপরে ঘোরে পাখা বিজলীর
সেথা বসে আলেসান্দ্রো ভোল্টা ইটালীর
(দুই চোখ Alesandro Volta) বিজ্ঞানীর)
আমার দু’নয়নে রাজ্য বিরক্তির।
এ্যাপিয়ার (Ampere) গণনায় ফরাসী জ্যাকুইস
টেলিফোনে বেল সাহেব, হাতঘড়ি সুইস।
ওদের খপ্পর থেকে নেইক রেহাই
হালা ইচ্ছে করে দুনিয়া ছেড়ে যাই।
দুনিয়ার ভেতর চলে মহা-উৎসব
আমরা কোথাও নেই, এমনি তাজ্জব।
মাথা ছেড়ে লিঙ্গে গেছে শক্তি সৃজনী
আমাদেরই কওমের জপ শ্রীযোনি,
জনসংখ্যা প্রমান তার প্রতি বছর
বৃদ্ধি পায় যাপিতে জীবন ইতর।
পরিবার-পরিকল্পনা ডাহা ফেল,
সাপ্লাই বন্ধ হয়নি টাংকীতে তেল।
ওদের দুনিয়া জুড়ে কতো কলরব,
আমরা কোথাও নেই পড়ে থাকি শব।
ওদের বাহাদুরী দ্যাখো কতো কি যে করে
সরু সেলুলযেডের ফিতে তার ভিতরে
শব্দ আর ছবি স্বচ্ছন্দে ঢোকায়
গন্ধও ভরে দেবে মত্ত গবেষণায়।। (আংশিক)
সংগীত-৫
(ইচ্ছেমত আখর দেয়,
কীর্তনের সুরে গেয়)
দ্যাখো দ্যাখো-
ইহুদী-নাসারার বদমাসী।
দ্যাখো দ্যাখো-
আমরা হাজার জ্বালার জলে ভাসি।
ওদের বদমাসীর, ভাই, নেই শেষ
ওদের হাজার ফাঁদ পাতা দিতে ক্লেশ।
অনেক কান্ড ঘটে এই দুনিয়ায়
তার হেতু খোঁজে দেখবে ওরা গোড়ায়।
ভাইসব শোনো এক খবরের খবর
চোখে রাস্তা দেখি না তারপর
ঠেলার ওসার চৌদ্দশ বছর।
এক বিদ্রোহী কণ্ঠের সাহসী উচ্চারণ
শওকত ওসমান বাংলা সাহিত্যের এমন এক প্রজ্ঞাবান কথাশিল্পী, যিনি কলমকে কেবল সাহিত্য সৃষ্টির মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং সত্য, ন্যায় ও মানবতার পক্ষে প্রতিবাদের শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাঁর লেখায় সমাজের অসঙ্গতি, ভণ্ডামি, ধর্মান্ধতা, স্বৈরাচার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে রয়েছে নির্ভীক উচ্চারণ। একই সঙ্গে মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ, মুক্তচিন্তার আহ্বান এবং সত্যের নিরন্তর অনুসন্ধান তাঁর রচনাকে দিয়েছে এক অনন্য মানবিক মাত্রা।
ব্যঙ্গ, রসবোধ, তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ এবং শক্তিশালী ভাষাশৈলীর মাধ্যমে শওকত ওসমান পাঠককে শুধু বিনোদন দেননি; বরং সমাজ, রাষ্ট্র ও মানুষের অবস্থান নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছেন। তাঁর সাহিত্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একজন লেখকের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্য উচ্চারণ করা এবং মানুষের বিবেককে জাগিয়ে তোলা। সময় বদলেছে, কিন্তু তাঁর লেখার বার্তা আজও সমান প্রাসঙ্গিক, অনুপ্রেরণাদায়ী এবং বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে চিরস্মরণীয়।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন ১. ‘দ্যাখো দ্যাখো ইহুদী-নাসারার বদমাসী’ কী?
উত্তর: এটি কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমানের ব্যঙ্গগ্রন্থ ‘শেখের সম্ভরা’-এর একটি আলোচিত ব্যঙ্গরচনা, যেখানে ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার ও আত্মসমালোচনার অভাবকে তীব্র ব্যঙ্গের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রশ্ন ২. শওকত ওসমানের ‘শেখের সম্ভরা’ গ্রন্থের মূল বিষয় কী?
উত্তর: গ্রন্থটিতে ব্যঙ্গ, রস ও বিদ্রূপের মাধ্যমে সমাজের ভণ্ডামি, ধর্মীয় গোঁড়ামি, অন্ধবিশ্বাস, স্বৈরাচার ও সামাজিক অসঙ্গতির সমালোচনা করা হয়েছে।
প্রশ্ন ৩. ‘দ্যাখো দ্যাখো ইহুদী-নাসারার বদমাসী’ রচনাটি আজও কেন প্রাসঙ্গিক?
উত্তর: কারণ এটি যুক্তিবোধ, আত্মসমালোচনা ও মুক্তচিন্তার গুরুত্ব তুলে ধরে এবং অন্ধবিশ্বাস ও ষড়যন্ত্রতত্ত্বের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন করে।
