কৃষকের অধিকার আদায়ের এক চিরঞ্জীব মানবিক আন্দোলন
১৯৮৫ সাল। বিশ্বজুড়ে তখন এক চরম মানবিক বিপর্যয়। আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়ায় আঘাত হেনেছে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। হাজার হাজার মানুষ অনাহারে, ক্ষুধায় ধুঁকে ধুঁকে মারা যাচ্ছে এমন বুকভাঙা খবর আর ছবি তখন কাঁপিয়ে দিয়েছিল পুরো বিশ্বকে। এই শোকাবহ সংবাদ গভীরভাবে দাগ কেটেছিল ব্রিটিশ ব্যান্ড 'বুমটাউন র্যাটস'-এর লিড সিঙ্গার বব গেলডফ-এর মনে।
তিনি স্তব্ধ হয়ে বসে থাকলেন না; সিদ্ধান্ত নিলেন সংগীতের শক্তি দিয়ে বাড়াতে হবে সাহায্যের হাত। দ্রুত তিনি গঠন করলেন একটি সুপারগ্রুপ, যার নাম দেওয়া হলো Band Aid। তাদের কণ্ঠে রেকর্ড হলো ঐতিহাসিক গান—Do They Know It’s Christmas?। শুরু হলো দাতব্য সংগীতের (Charity Music) এক নতুন এবং গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।
লাইভ এইড স্টেজ এবং বব ডিলানের সেই একটি বাক্য
আফ্রিকার ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিতে বিশ্বজুড়ে শুরু হলো দানশীলতার মহোৎসব, যার চূড়ান্ত রূপ ছিল ঐতিহাসিক 'লাইভ এইড' (Live Aid) কনসার্ট। ফিলাডেলফিয়ার সেই জমকালো লাইভ এইড স্টেজে তখন পারফর্ম করছেন কিংবদন্তিরা। রোলিং স্টোনসের কিথ রিচার্ডস এবং রন উডের পাশে দাঁড়িয়ে গিটার হাতে মাইক নিলেন সুরের জাদুকর বব ডিলান।
ঠিক তখনই ঘটল সেই অভাবনীয় ঘটনা। লাইভ কনসার্টের মঞ্চে দাঁড়িয়ে ডিলান বিশ্ববাসীর উদ্দেশে বললেন: "আমি আশা করি আফ্রিকার জন্য যে অর্থ সংগ্রহ হচ্ছে, তার থেকে অন্তত একটা ছোট অংশ হতে পারে এক বা দুই মিলিয়ন ডলার—যদি আমাদের এখানকার (আমেরিকার) স্থানীয় কৃষকদের ব্যাংক ঋণ মেটাতে ব্যবহার করা যেত, তবে খুব ভালো হতো।"
বিশ্ব যখন আফ্রিকার দিকে তাকিয়ে, তখন ডিলান আঙুল তুললেন ঘরের ভেতরের অন্ধকারের দিকে। আমেরিকার নিজস্ব কৃষকরা যে ঋণের বোঝায় পিষ্ট হয়ে দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছিল, সেই সত্যটা ডিলান এক লহমায় সবার সামনে নিয়ে এলেন।
উইলি নেলসনের স্মৃতি এবং এক নতুন সংকল্প
ডিলানের এই একটি কথাই যেন চোখ খুলে দিল সংগীতজগতের আরেক জীবন্ত কিংবদন্তি উইলি নেলসন-এর। ডিলানের কথাগুলো তীরের মতো গিয়ে বিঁধল তাঁর বুকে। নেলসনের চোখের সামনে ভেসে উঠল নিজের ছোটবেলার দিনগুলো। টেক্সাসের খামারে বড় হওয়া নেলসন খুব ভালো করেই জানতেন, একটা খামার চালানো কতটা কঠিন, কতটা হাড়ভাঙা খাটুনির কাজ।
তিনি উপলব্ধি করলেন, শুধু গ্লোবাল দাতব্য নয়, নিজের দেশের মাটির সন্তানদের—যাঁরা আমাদের মুখে অন্ন জোগান—সেই কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোও এই মুহূর্তে সমভাবে জরুরি।
উইলি নেলসন আর এক মুহূর্তও দেরি করলেন না। তিনি ফোন করলেন তাঁর দুই সংগীতশিল্পী বন্ধু নিল ইয়াং এবং জন কুগার মেলেনক্যাম্প-কে। ফোনে ফোনেই তিনজনে মিলে এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিলেন—তারা আমেরিকার কৃষকদের বাঁচাতে একটি বিশাল কনসার্টের আয়োজন করবেন, যা সরাসরি কৃষকদের আর্থিক ও আইনি সহায়তার জন্য ফান্ড সংগ্রহ করবে।
মাত্র ১০ সপ্তাহের প্রস্তুতি এবং 'Farm Aid'-এর আত্মপ্রকাশ
একটি বিশাল কনসার্ট আয়োজনের জন্য সাধারণত মাসের পর মাস, এমনকি বছরেরও প্রয়োজন হয়। কিন্তু কৃষকদের সংকট এতটাই তীব্র ছিল যে, মাত্র ১০ সপ্তাহের অবিশ্বাস্য দ্রুততায় সম্পন্ন হলো সব প্রস্তুতি।
১৯৮৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর ইলিনয়ের চ্যাম্পেইনের কলেজ ফুটবল স্টেডিয়ামে পর্দা উঠল ইতিহাসের প্রথম Farm Aid কনসার্টের। বব ডিলান, উইলি নেলসন, নিল ইয়ং ছাড়াও বব ডিলান, বি বি কিং, জনি ক্যাশ, বন জোভির মতো প্রায় ৮০ জন বিশ্বখ্যাত শিল্পী সেই মঞ্চে পারফর্ম করেছিলেন।
- সংগৃহীত অর্থ: মাত্র এক দিনের সেই কনসার্ট থেকে সংগ্রহ হয়েছিল প্রায় ২০ মিলিয়ন ডলার।
- মূল উদ্দেশ্য: আমেরিকার পারিবারিক খামারগুলোকে (Family Farms) ব্যাংকের ঋণ এবং দেউলিয়া হওয়া থেকে রক্ষা করা।
উইলি নেলসন পরবর্তীতে তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন:
"১৯৮৫ সাল থেকে আজ পর্যন্ত পারিবারিক খামারগুলোর সমস্যা কিন্তু শেষ হয়ে যায়নি। প্রতিকূল আবহাওয়া, বাজারের ওঠানামা এবং বড় বড় কর্পোরেট কোম্পানিগুলোকে সুবিধা দেওয়া সরকারি নীতি এখনো ছোট কৃষকদের কোণঠাসা করে রাখে। তবে আমরা যখন একত্রিত হই, আমরা জয় করতে পারি।"
৪০ বছর পর: আজও চলমান এক মানবিক আন্দোলন
আজ প্রায় চার দশক (৪০ বছর) পার হয়ে গেছে, কিন্তু Farm Aid-এর লড়াই থেমে যায়নি। এটি কেবল একটি কনসার্ট বা স্মৃতি হয়ে থাকেনি, বরং আমেরিকার কৃষি নীতিতে বড় ধরনের প্রভাব বিস্তারের আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।
বর্তমানে মার্কিন রাজনীতিবিদ চেলি পিংরির নেতৃত্বে 'Agriculture Resilience Act'-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রস্তাবনার মাধ্যমে ছোট এবং স্বাধীন ফার্মগুলোকে টিকিয়ে রাখার জন্য লড়াই চলছে।
মেইনের একজন সাধারণ কৃষক সেথ ক্রোয়েক তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন: "ছোট ফার্মগুলো প্রতিদিন টিকে থাকার জন্য আক্ষরিক অর্থেই যুদ্ধ করছে। বড় বড় কর্পোরেট ফসল উৎপাদনকারী কৃষকদের তুলনায় আমাদের মতো ছোট খামারিরা সরকারের কাছ থেকে খুব কমই সাহায্য বা ভর্তুকি পায়।"
শেষ কথা: সংগীত যখন প্রতিবাদের ভাষা
'Farm Aid' গত ৪০ বছর ধরে প্রমাণ করে চলেছে যে, সংগীত কেবল সস্তা বিনোদন বা কানের আরামের জন্য নয়। সংগীতের রয়েছে এক অলৌকিক শক্তি, যা মানুষকে একত্রিত করতে পারে, সমাজকে সচেতন করতে পারে এবং শোষিত মানুষের পক্ষে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে পারে।
বব ডিলানের সেই একটি সাহসী মন্তব্য, উইলি নেলসনের তাৎক্ষণিক উদ্যোগ এবং হাজারো শিল্পীর একাত্মতা আজ এক অবিশ্বাস্য ইতিহাসে পরিণত হয়েছে। সহজ কথায় বলতে গেলে, Farm Aid হলো গান, সুর আর কনসার্টের মেলবন্ধনে—কৃষকের অধিকার আদায়ের এক চিরঞ্জীব মানবিক আন্দোলন।
এক নজরে: বব ডিলান (Bob Dylan)
"সংগীতের কবি, যিনি সুরের আঙিনায় এনেছিলেন প্রতিবাদের ভাষা এবং সাহিত্যে এনেছিলেন নোবেল।"
বৈশিষ্ট্য তথ্য
- প্রকৃত নাম রবার্ট অ্যালেন জিমারম্যান (Robert Allen Zimmerman)
- জন্ম ২৪ মে, ১৯৪১; ডুলুথ, মিনেসোটা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
- পরিচয় গায়ক, গীতিকার, লেখক ও কবি
- সংগীতের ধারা ফোক (Folk), রক (Rock), ব্লুজ (Blues), গসপেল (Gospel)
- ঐতিহাসিক গান Blowin' in the Wind, The Times They Are A-Changin', Like a Rolling Stone
- সর্বোচ্চ স্বীকৃতি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার (২০১৬) এবং আমেরিকার সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা 'প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম' (২০১২)
- বিশেষ অবদান ১৯৬০-এর দশকে আমেরিকার নাগরিক অধিকার আন্দোলন এবং যুদ্ধবিরোধী চেতনার প্রধান মুখ। তিনি গানকে কেবল বিনোদনের মাধ্যম থেকে তুলে এনে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিবাদের প্রধান হাতিয়ারে পরিণত করেছিলেন।
