সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের লেখা গান
বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে বহুমুখী প্রতিভার এক অনন্য নাম সৈয়দ শামসুল হক। গান, কবিতা, নাটক, উপন্যাস, ছোটগল্প ও চিত্রনাট্য প্রতিটি শাখায় ছিল তার সাবলীল পদচারণা। এ কারণেই তাকে বলা হয় সব্যসাচী লেখক। সাহিত্যের আকাশে নিজের আলো ছড়ানোর আগেই তিনি কাজ শুরু করেছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রে। মূলত চিত্রনাট্যকার হিসেবে তার পথচলা শুরু হলেও ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন চলচ্চিত্র ও সংগীত জগতের এক গুরুত্বপূর্ণ নাম। তাঁর বহুমুখী প্রতিভার এক বিশাল অংশ জুড়ে ছিল রূপালি পর্দা। সাহিত্যিক পরিচয়ের আড়ালে তিনি ছিলেন একজন আপাদমস্তক চলচ্চিত্রের মানুষ।সৈয়দ শামসুল হক বিশ্বাস করতেন, সুর এবং কথা যদি একজনের ভেতর থেকে আসে, তবেই তা সার্থকতা পায়। তবুও তিনি যখনই গান লিখেছেন, তাতে যোগ করেছেন নতুনত্ব। হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস’ গানটি লেখার পর তিনি সুরকার আলম খানকে আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেছিলেন এই গান জাতীয় পুরস্কার পেতে বাধ্য। শেষ পর্যন্ত হয়েছিলও তাই। আজকে থাকছে তাঁর লেখা নয়টি গানের কথা নিয়ে প্রথম পর্ব।
চলচ্চিত্রে পথচলার শুরু
চলচ্চিত্রের প্রতি তার ভালোবাসা ছিল গভীর। ১৯৫১ সালে বাড়ি থেকে পালিয়ে তিনি পাড়ি জমান বোম্বেতে (বর্তমান মুম্বাই), যেখানে চলচ্চিত্রকার কামাল আমরোহি-র দলে কাজ করার সুযোগ পান। ১৯৫২ সালে দেশে ফিরে এসে তিনি যুক্ত হন ঢাকার নবযাত্রা শুরু করা চলচ্চিত্র অঙ্গনের সঙ্গে। ১৯৬৪ সালে পরিচালক সুভাষ দত্ত-এর চলচ্চিত্র ‘সুতরাং’-এর মাধ্যমে তিনি প্রথম চিত্রনাট্যকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এরপর একের পর এক জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে তার কাজ বাংলা সিনেমাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। তার লেখা চিত্রনাট্যে নির্মিত কিছু উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র হলো:
- সুতরাং (১৯৬৪)
- মাটির ময়না
- ময়নামতি
- বড় ভালো লোক ছিলো
- তোমার আমার ঠিকানা
- নতুন দিগন্ত
- ক খ গ ঘ ঙ
- গেরিলা
গান লেখার শুরু: অনিচ্ছা থেকে কিংবদন্তি
মজার বিষয় হলো তিনি কখনোই গান লিখতে চাননি! চলচ্চিত্রের প্রযোজনার খরচ বাঁচাতে এবং সুরকার সত্য সাহা-কে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে তিনি প্রথম গান লেখেন। সেই শুরু, এরপর আর থামেননি। ১৯৬১ সালে পুরান ঢাকার ফরাশগঞ্জের একটি চিলেকোঠায় বসে তিনি তার জীবনের প্রথম গানটি লেখেন। সেই গানটি ব্যবহার করা হয় ‘সুতরাং’ চলচ্চিত্রে, যা কণ্ঠ দেন আঞ্জুমান আরা বেগম। গানের শেষ অংশে কণ্ঠ দেন কাজী আনোয়ার হোসেন। এই চলচ্চিত্রের সব গানই তিনি লিখেছিলেন এবং সবগুলোই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
কালজয়ী গান ও সংগীতসৃষ্টি
১. নদী বাঁকা জানি
গীতিকার: সৈয়দ শামসুল হক
চলচ্চিত্র: সুতরাং (১৯৬৪)
সুর: সত্য সাহা
কণ্ঠ: ফেরদৌসী রহমান ও মোস্তফা জামান আব্বাসী
নদী বাঁকা জানি চাঁদ বাঁকা জানি
তাহার চেয়ে আরও বাঁকা তোমার ছলনা (জানি)
এই ছিল কি তোমার মনে গো (হায়)
হায় রে রূপকুমারী তোমরা নারী আমরা কথায় পারি কেমনে
এই ছিল কি তোমার মনে গো (হায়) ॥
ও রসিক রাজা তোমার ভালোবাসা
শুধু মুখের যত মিঠে বুলি কাজের কিছু না
আহা চাই কী তোমার বুঝিয়ে বলো না
আমি আনতে পারি আলতা-চুড়ি
দিতে ঢাকাই শাড়ি-গহনা
চাই কী তোমার বুঝিয়ে বলো না ॥
মান করো কেন আরও দেব শোনো
দেব মনপাখিরে শিকল বেঁধে তোমার পিঞ্জরায়
ওগো রেখো মোরে তোমার নয়নে
চলো যাই ভেসে যাই প্রেমসাগরে
চলো নাও ভাসায়ে দুজনে
ওগো রেখো মোরে তোমার নয়নে।।
২. এই যে আকাশ, এই যে বাতাস
গীতিকার: সৈয়দ শামসুল হক
চলচ্চিত্র: সুতরাং (১৯৬৪)
সুর: সত্য সাহা
কণ্ঠ: কাজী আনোয়ার হোসেন, আবদুল আলীম
এই যে আকাশ এই যে বাতাস
বউ কথা কও সুরে যেন ভেসে যায়
বেলা বয়ে যায় মধুমতী গাঁয়
ওরে মন ছুটে চল চেনা ঠিকানায় ॥
অচিন হাওয়া সবুজ বনে
নূপুর বাজায় আপন মনে
চেনা লাগে রে তারে ভালো লাগে রে
সে যে নূপুর বাজায়, বলেআয় ফিরে আয় ॥
বন্ধু রে, তোমার লাগি হইলাম দেশান্তর
আমি পরকে করলাম আপন আমার
মার আপন হইলো পর বন্ধু রে।।
লাগল চাকায় চলার নেশা
পাই না খুঁজে পথের দিশা
ঘুরে চলে রে সে দূরে চলে রে
ওরে ভালোবাসায় সে যে কাঁদায়-হাসায় ॥
৩. তুমি আসবে বলে কাছে ডাকবে বলে
গীতিকার: সৈয়দ শামসুল হক
চলচ্চিত্র: সুতরাং (১৯৬৪)
সুর: সত্য সাহা
কণ্ঠ: আঞ্জুমান আরা বেগম
তুমি আসবে বলে কাছে ডাকবে বলে
ভালোবাসবে ওগো শুধু মোরে
তাই চম্পা-বকুল করে গন্ধে আকুল
এই জোছনা রাতে মনে পড়ে ॥
চঞ্চল হাওয়া বয় কানে কানে কথা কয়
বনে বনে চাঁদ হাসে দূরে কেন সরে রয়
তুমিও তেমনি এমন রাতে রবে কি দূরে দূরে ॥
মায়াভরা এই ক্ষণে কেন ডাকো ফুলবনে
তুমি এলে আঁখিপাতে চুপিচুপি মনে মনে
স্বপ্ন হয়ে মনের মিতা আমার এই বাসরে ॥
৪. হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস
গীতিকার: সৈয়দ শামসুল হক
চলচ্চিত্র: বড় ভাল লোক ছিল (১৯৮২)
সুর: আলম খান
কণ্ঠ: এন্ড্রু কিশোর
হায়রে মানুষ, রঙ্গীন ফানুস
দম ফুরাইলেই ঠুস,
তবু তো ভাই কারোরই নাই
একটুখানি হুশ ।।
পূর্ণিমাতে ভাইসা গেছে নীল দরিয়া
সোনার পিনিশ বানাইছিলা যতন করিয়া
চেলচেলাইয়া চলে পিনিশ
ডুইবা গেলেই ভুস ।।
মাটির মানুষ থাকে সোনার মহল গড়িয়া
জ্বালাইয়াছে সোনার পিদিম তীর্থ হরিয়া
ঝলমলায়া জ্বলে পিদিম
নিইভ্যা গেলেই ফুস ।।
৫. তোরা দেখ তোরা দেখ তোরা দেখরে চাহিয়া
গীতিকার: সৈয়দ শামসুল হক
চলচ্চিত্র: বড় ভাল লোক ছিল (১৯৮২)
সুর: আলম খান
কণ্ঠ: এন্ড্রু কিশোর
তোরা দেখ তোরা দেখ তোরা দেখরে চাহিয়া
চোখ থাকিতে এমন কানা কেমন করিয়া
তোরা দেখ দেখ দেখরে চাহিয়া
রাস্তা দিয়া হাইটা চলে রাস্তা হারাইয়া ।।
হাতের কাছে এইতো মানিক
যেমনি এসে দাঁড়ায় খানিক,
আবার আবার অন্য দিকে
যায় চলে সে মুখটি ফিরাইয়া ।।
ইষ্টিশনে আসলো গাড়ি
ঊঠতে হবে তাড়াতাড়ি,
ও পাগল সঙ্গে আছে টিকিট
তবু পায় না খুঁজিয়া ।।
এই বাজারে আনাগোনা
না করিলেও বেচাকেনা,
মহাজন ছাড়বে না তো
খাতায় দেনা রাখবে লিখিয়া ।।
৬. ডেকো না আমারে তুমি কাছে ডেকো না
গীতিকার: সৈয়দ শামসুল হক
চলচ্চিত্র: ময়নামতি (১৯৬৯)
সুর: বশীর আহমদ
কণ্ঠ: বশীর আহমদ
ডেকো না আমারে তুমি কাছে ডেকো না
দূরে আছি সেই ভাল নিয়ে বেদনা
তুমি ডেকো না।।
ভেবো না কখনো যদি যায় ডেকে
আমার এ ভুবন আঁধারে
নেই কোন ক্ষতি জীবনের আলো
নিভে যায় যদি বারে বারে
সুখে থাক তুমি এই শুধু বলি
আর কিছু নেই কামনা
তুমি ডেকো না।।
ভালোবাসা পেয়ে যে ব্যাথা পেয়েছি
ভুলে যাই তারে যেন আমি
সবই আছে সেই তো আগেরই মত
শুধু আজ ওগো নাই তুমি
যেখানেই থাকো মনে মনে বলি
মোরে তুমি মনে রেখো না
তুমি ডেকো না।।
.
৭. কেহ করে বেচাকেনা কেহ কান্দে
গীতিকার: সৈয়দ শামসুল হক
চলচ্চিত্র: অবাঞ্ছিত (১৯৬৯)
সুর: আলী হোসেন
কণ্ঠ: আব্দুল আলীম
কেহ করে বেচাকেনা কেহ কান্দে
রাস্তায় পড়ে ধরবি যদি তারে
চলো মুর্শিদের বাজারে।।
ফুলের বনে আছে কাটা মনের ঘরে চাবি আটা
ভাঙতে হবে ঘরের চাবি খুঁজবি যদি তারে
কাটার গাঁয়ে অঙ্গ রে তোর হয় যদি জরজর
কাঁদিস না আর বসে বসে পথের ধারে।।
দুই চোখের পানি দিয়া যায় কি পাওয়া তারে
সাথে থাকলে মন মহাজন কিনা হইতে পারে
৮. যার ছায়া পড়েছে মনের আয়নাতে
গীতিকার: সৈয়দ শামসুল হক
চলচ্চিত্র: আয়না ও অবশিষ্ট (১৯৬৭)
সুর: সত্য সাহা
কণ্ঠ: ফেরদৌসী রহমান
যার ছায়া পড়েছে মনের আয়নাতে
সে কি তুমি নও, ওগো তুমি নও?
হৃদয়ে আমার সুরের আবেশ
ছড়িয়ে দিলে গো
সে কি তুমি নও, ওগো তুমি নও ॥
তুমি কি গো ছবি হয়ে থাকবে
কখনো কি নাম ধরে ডাকবে?
তুমি মোর অন্তর ছুঁয়ে ছুঁয়ে কেন যাও না
যদি ছবি নও, ওগো কথা কও ॥
চোখে চোখে বলিতে কী চাও গো
ভরা জলে ঢেউ কেন দাও গো?
মনচোর তুমি মোর বলো বলো কিছু বলো না
জানি ছবি নও, শুধু ছবি নও ॥
৯. চাঁদের সাথে আমি দেব না তোমার তুলনা
গীতিকার: সৈয়দ শামসুল হক
চলচ্চিত্র: আশীর্বাদ (১৯৮৩)
সুর: আলম খান
কণ্ঠ: রুনা লায়লা ও এন্ড্রু কিশোর
চাঁদের সাথে আমি দেব না তোমার তুলনা
নদীর সাথে আমি দেবো না তোমার তুলনা,
তুমি চাঁদ হতে যদি দূরেই চলে যেতে
তুমি নদী হতে যদি দূরেই চলে যেতে,
এ কথা যেন ভুল না, তুমি যে তোমারই তুলনা ।।
ফুলের সাথে আমি দেব না তোমার তুলনা
অলির সাথে আমি দেব না তোমার তুলনা,
তুমি ফুল হতে যদি ঝরেই পড়ে যেতে
তুমি অলি হতে যদি দূরেই উড়ে যেতে,
এ কথা যেন ভুল না, তুমি যে তোমারই তুলনা ।।
কবির সাথে আমি দেব না তোমার তুলনা
ছবির সাথে আমি দেবো না তোমার তুলনা,
তুমি কবি হতে যদি সবার হয়ে যেতে
তুমি ছবি হতে যদি তবেই মুছে যেতে,
এ কথা যেন ভুল না, তুমি যে তোমারই তুলনা ।।
সৈয়দ শামসুল হকের লেখা গান একটি পর্বে তা শেষ করা অসম্ভব। চলচ্চিত্রের গানকে তিনি যে কাব্যিক গভীরতা ও আধুনিকতা দিয়েছিলেন, তা আজও আমাদের সংগীতে অনন্য হয়ে আছে। আজকের পর্বে আমরা তাঁর অমর কিছু সৃষ্টির কথা জানলাম। তাঁর লেখনীতে আরও কিছু কালজয়ী গান এবং সেগুলোর পেছনের রোমাঞ্চকর গল্প নিয়ে খুব শীঘ্রই ফিরছি পরবর্তী পর্বে। আমাদের সাথেই থাকুন।
