প্রকৃতি ও নবজীবনের সন্ধানে সাঁওতালদের অনন্য পুষ্পবন্দনা
প্রকৃতি যখন শীতের জীর্ণতা মুছে বসন্তের নতুন সাজে সাজে, চারদিকে যখন শিমুল-পলাশ আর শালের মঞ্জুরিতে মুখরিত হয় বনভূমি ঠিক তখনই সমতলের আদিবাসী সাঁওতালরা মেতে ওঠে তাদের প্রাণের উৎসব বাহা-তে। বাহা মানে ফুল। এই উৎসব কেবল আনন্দ-বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি প্রকৃতি ও মানুষের শাশ্বত মিলনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশের আদিবাসী সংস্কৃতির ভাণ্ডারে সাঁওতালদের ‘বাহা উৎসব’ এক উজ্জ্বল অধ্যায়। প্রকৃতি, সৃষ্টি ও জীবনের সঙ্গে গভীর সম্পর্কের এক অনন্য প্রকাশ। বসন্তের আগমনে প্রকৃতি যখন নতুন রূপে সেজে ওঠে তখন সাঁওতাল সমাজ আনন্দ, ভক্তি ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে উদযাপন করে এই বাহা পরব বা ফুল উৎসব । ফুল ও প্রকৃতির সাথে মানুষের এক নিবিড় আত্মিক বন্ধনের উৎসব।
বাহা উৎসবের মূল অর্থ ও দর্শন
‘বাহা’ শব্দের অর্থ ফুল। তাই বাহা উৎসব মানেই ফুলের উৎসব প্রকৃতির নবজাগরণের উৎসব। শীতের নিস্তব্ধতা কাটিয়ে যখন বসন্ত আসে, গাছে গাছে নতুন পাতা গজায়, শাল, পলাশ, মহুয়া ফুলে বনভূমি রঙিন হয়ে ওঠে—তখনই সাঁওতালরা উপলব্ধি করে প্রকৃতির নতুন সৃষ্টিকে। এই নতুন সৃষ্টিকে সম্মান জানানোই বাহা উৎসবের মূল উদ্দেশ্য।
👉 সহজভাবে বলতে গেলে, এটি—
- প্রকৃতিকে ধন্যবাদ জানানোর উৎসব
- নতুন জীবনকে স্বাগত জানানোর উৎসব
- এবং অনেক ক্ষেত্রে নববর্ষ বরণের উৎসব
সৃষ্টির আদি উৎস ও বাহা পরবের মাহাত্ম্য
সাঁওতালদের বিশ্বাস অনুযায়ী, বাহা উৎসব মূলত সৃষ্টির উৎসব। বসন্তে গাছে গাছে যখন নতুন পাতা গজায়, মুকুল প্রস্ফুটিত হয়, তখন সেই নতুন প্রকৃতিকে ব্যবহারের আগে স্রষ্টাকে কৃতজ্ঞতা জানাতে হয়। যতক্ষণ না এই পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে, ততক্ষণ কোনো সাঁওতাল নারী খোঁপায় নতুন ফুল গোঁজেন না এবং নতুন কোনো ফল ভক্ষণ করেন না। এই সংযমই প্রকৃতির প্রতি তাদের গভীর শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ।
উৎসবের সময়কাল ও অংশগ্রহণকারী
বাহা উৎসব মূলত সাঁওতাল আদিবাসীদের প্রধান ধর্মীয় পার্বণ। তবে শুধু সাঁওতালরাই নয়। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের সমতলে বসবাসকারী আরও অনেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এই উৎসব পালন করে।মূলত ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে নববর্ষ হিসেবে এই উৎসব উদযাপিত হয়। তবে অমাবস্যার পর চাঁদ দেখার পর থেকেই সাঁওতাল পল্লীতে দুন্দুভি বেজে ওঠে। উত্তরাঞ্চলের সমতলে বসবাসকারী সাঁওতাল ছাড়াও ওঁড়াও, মুন্ডা, মালো, মাহাতোসহ মোট ৩৮টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ভিন্ন ভিন্ন নামে (যেমন মুন্ডারা বলে ‘সাহরুল’) এই বসন্ত উৎসব পালন করে। ফাল্গুন মাসের দ্বাদশী তিথি থেকে শুরু হয়ে পূর্ণিমা পর্যন্ত চলে। অনেক ক্ষেত্রে দোলপূর্ণিমার পর আরও কয়েকদিন ধরে এর আনন্দ চলতে থাকে। চাঁদ ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই সাঁওতাল পল্লীতে শুরু হয় ঢাক-ঢোল, মাদলের আওয়াজ। গ্রামজুড়ে উৎসবের আবহ তৈরি হয়।
উৎসবের তিন দিনের পূর্ণাঙ্গ আখ্যান
বাহা পরব সাধারণত তিন দিনব্যাপী অত্যন্ত পবিত্রতার সাথে পালিত হয়:
১. প্রথম দিন: উম (শৌচ ও স্নানের দিন) এটি উৎসবের প্রস্তুতির দিন। এদিন সাঁওতালরা তাদের ঘরবাড়ি ও আঙিনা গিরু মাটি, গোবর এবং খড় পুড়িয়ে তৈরি করা প্রাকৃতিক রঙ দিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে। দেওয়ালে আঁকা হয় আলপনা—যেখানে ফুটে ওঠে লতাপাতা ও পশু-পাখির চিত্র। এদিন জাহের থান বা পূজাস্থলটিও পরিষ্কার করা হয়।
২. দ্বিতীয় দিন: সার্দিমাহা (মূল পূজার দিন) এদিন সকালে গ্রামের যুবক-যুবতীরা স্নান সেরে পবিত্র মনে পুরোহিত বা ‘নায়কে’-কে সঙ্গে নিয়ে জাহের থানে যায়। শাল ও মহুয়া ফুল দিয়ে দেব-দেবীর চরণে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। পূজা শেষে নায়কে যখন গ্রামে ফেরেন, তখন প্রতিটি বাড়ির দরজায় নারীরা তার পা ধুইয়ে দেন। বিনিময়ে নায়কে তাদের হাতে পবিত্র শালফুল তুলে দেন, যা নারীরা পরম শ্রদ্ধায় খোঁপায় পরেন।
৩. তৃতীয় দিন: জালে মাহা (বিদায় ও আনন্দ উৎসব) এটি উৎসবের শেষ দিন। এদিন মূলত সামাজিকভাবে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া হয়। পাড়ায় পাড়ায় চলে খাওয়া-দাওয়া এবং হাড়িয়া পানের আসর। বাহা উৎসবের একটি বিশেষ দিক হলো জলের খেলা। আবির বা কৃত্রিম রঙের বদলে তারা একে অপরের গায়ে পবিত্র জল ছিটিয়ে আনন্দ প্রকাশ করে, যা তাদের হৃদয়ের নির্মলতার প্রতীক।
জাহের থান ও শালগাছের পবিত্রতা
সাঁওতালদের কাছে শালগাছ অত্যন্ত পবিত্র। তাদের ধর্মবিশ্বাসে ‘জাহের থান’ হলো দেবতাদের আবাসস্থল। এক সময় পবিত্র শালগাছের নিচেই তাদের বিচারসভা বসত এবং তারা এখানেই সত্যের সন্ধান পেত। তাই তারা শালগাছকে "সৌরি সারজম" (সত্যের শালগাছ) বলে সম্মান করে। তাদের আদি দেবতা 'ঠাকুর-জিউ' বা 'মারাং বুরু'র প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েই বাহা গান গীত হয়। উৎসবের একটি প্রচলিত গান:
অকয় মায় চিয়ায়া হো বির বিসম দ?
মারাং বুরুয়া চিয়ারা হো বির দিশম দ,
জাহের এরায় দহয় হো আতোরে পাঁয়রি।
🌼 নতুন ফুল ও ফল ব্যবহারের বিধান
বাহা উৎসবের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিয়ম ও সংযম। এটি প্রকৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের একটি প্রতীকী রীতি। উৎসবের আগে—
- নতুন ফুল ব্যবহার করা যায় না
- নতুন ফল খাওয়া যায় না
- নারীরা খোঁপায় ফুল পরেন না
পূজা শেষে—
- সবাই নতুন ফুল ও ফল ব্যবহার করতে পারে
- নারীরা শালফুল দিয়ে নিজেদের সাজায়
সামাজিক সম্প্রীতি ও আধ্যাত্মিকতা
বাহা উৎসব কেবল একটি নাচ-গানের অনুষ্ঠান নয়, এটি সাঁওতালদের ইহকাল ও পরকালের আধ্যাত্মিক চিন্তার প্রতিফলন। এই উৎসবের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি হয় এবং মধুর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মাদলের গম্ভীর ধ্বনি আর ধামসার তালের সাথে সাঁওতাল নারীদের ছন্দোবদ্ধ নৃত্য পুরো পল্লীকে স্বর্গীয় রূপ দান করে। বর্তমানে বাহা উৎসব শুধু গ্রামেই সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন, আদিবাসী পরিষদ এবং সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে শহরেও এই উৎসব পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশের দিনাজপুর, রংপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বড় পরিসরে বাহা পরব আয়োজন করা হয়, যেখানে দেশ-বিদেশ থেকে সাঁওতালরা অংশ নেয়।
অরণ্য-সংস্কৃতির অমূল্য সম্পদ বাহা পরব
আধুনিকতার ছোঁয়ায় অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে গেলেও সাঁওতালরা আজও তাদের এই ‘বাহা পরব’কে পরম মমতায় টিকিয়ে রেখেছে। প্রকৃতিকে না দিয়ে নিজে কিছু গ্রহণ না করার এই আদিবাসী দর্শন বর্তমান বিশ্বের জলবায়ু সংকটের যুগে আমাদের জন্য এক বড় শিক্ষা হতে পারে। বসন্তের রঙিন সাজে বাহা উৎসব কেবল সাঁওতালদের নয়, বরং বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের এক অমূল্য সম্পদ। এই উৎসব আমাদের শেখায় প্রকৃতিকে ভালোবাসতে, নতুন জীবনকে সম্মান করতে এবং ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে।
