বাংলার আকাশ-বাতাস চিরকালই মরমী গানে মুখরিত। এই মাটির সোঁদা গন্ধে মিশে আছেন এমন কিছু সাধক যাঁদের গান মানুষকে আধ্যাত্মিক জগতের সন্ধান দেয়। তেমনই একজন প্রবাদপ্রতিম বাউল সাধক ও গীতিকার হলেন রজ্জব আলী দেওয়ান। ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জের চরচন পাড়া গ্রামে জন্ম নেওয়া এই সাধকের জীবন ছিল সুর আর সাধনার এক অপূর্ব মেলবন্ধন। জ্ঞানের প্রদীপ খেতাবপ্রাপ্ত মরমী সাধক ও বাউল কবি রজ্জব আলী দেওয়ান বাংলা বাউল ও সুফি ধারার গানে বাউল তত্ত্ব, মুর্শিদি ও আধ্যাত্মিক ভাবের গভীর প্রকাশ ঘটিয়েছেন।
জন্ম, পরিবার ও শৈশবের সুরযাত্রা
সাধক রজ্জব আলী দেওয়ান ইংরেজি ১৯০৬ সালে (বাংলা ১৩১৩ এবং হিজরী ১৩২৭) মানিকগঞ্জের চরচন পাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম জহুর আলী দেওয়ান। শৈশব থেকেই সুরের প্রতি তাঁর ছিল এক সহজাত টান। পিতার ঐকান্তিক উৎসাহে পল্লীর নিবিড় পরিবেশে মাত্র ১২ বছর বয়স থেকেই তিনি গান গাওয়া শুরু করেন। ২০ বছর বয়সে তিনি পিতাকে এবং তার ৮ বছর পর মাতাকে হারান। অকালে বাবা-মাকে হারানোর শোক তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করলেও, তিনি দমে যাননি। শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে তিনি পূর্ণ উদ্যমে পুনরায় গান-বাজনা শুরু করেন।
আধ্যাত্মিক জাগরণ ও আজমীর শরীফ যাত্রা
লোকমুখে শোনা যায়, এক নিঝুম রাতে এক কামেল দরবেশের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। সেই দরবেশের নির্দেশে তিনি ছোট ভাই ইজ্জত আলীকে নিয়ে আজমীর শরীফে খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী (র.)-এর ওরশ মোবারকে যোগ দেন। এই যাত্রা তাঁর আধ্যাত্মিক জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। পরবর্তীতে তিনি বারৈ খালির প্রখ্যাত সাধক হযরত মো: দয়াল আবদুল কাদের শাহ্ চিশতীর কাছে বায়াত গ্রহণ করেন।
সংগীত জীবন ও কালজয়ী সৃষ্টি
গুরুর আদেশে ১৯৬৬ সালের মার্চ মাস থেকে তিনি নিয়মিত গান লেখা শুরু করেন। তাঁর রচিত গানের ভাণ্ডার অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ১৯৬৬ সালেই তিনি রেডিও পাকিস্তানে মারফতী ও পল্লীগীতি গাওয়ার সুযোগ পান এবং হিজ মাস্টার রেকর্ড কোম্পানির মাধ্যমে তাঁর গানের রেকর্ড বের হয়। রজ্জব গীতি মূলত প্রখ্যাত বাউল কবি ও মরমী সাধক রজ্জব আলী দেওয়ানের রচিত আধ্যাত্মিক গানের এক অনন্য সংকলন। তাঁর এই সৃষ্টিগুলো বাউল দর্শনের এক শক্তিশালী ধারক হিসেবে কাজ করে, যেখানে নিগূঢ় সত্য সহজ ভাষায় ফুটে উঠেছে।
রজ্জব আলী দেওয়ানের গানগুলোতে মূলত মারফতি, মুর্শিদী এবং দেহতত্ত্বের গভীর বিশ্লেষণ পাওয়া যায়। গানের প্রতিটি চরণে গুরুভক্তি, আত্মতত্ত্ব (নিজেকে চেনা) এবং স্রষ্টার প্রতি নিঃস্বার্থ প্রেমের আকুলতা প্রকাশ পেয়েছে। বাংলা লোকসঙ্গীতের ভাণ্ডারে এই গানগুলো এক বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে। তাঁর রচিত গানগুলো 'জ্ঞানের প্রদীপ রজ্জব গীতি' নামে মোট ৫টি খণ্ডে (১ম-৫ম) প্রকাশিত হয়েছে। এটি সংকলন করেছে 'বাউল কথা প্রকাশ'।
উল্লেখযোগ্য রজ্জব গীতি
- 🟦 আয় মোহাম্মদ কামলে ওয়ালা, আয়রে আমার বুকে আয়
- 🟦 আয় খেয়ে নে বেহেশতের সেই শরাবান তহুরা
- 🟦 মেরাজেতে যাবি যদি মন মেরাজেতে যাবি
- 🟦 তুই আমারে করলি পাগল আমার সকল নিয়া রে
- 🟦 আমি ঘর বেঁধেছি বালুর চরে, পার ভাঙিয়া নেয় সাগরে
- 🟦 রাত্রি শেষে ভোরে এমন কে গাহিল গান
- 🟦 হে বারে খোদা মোর ফরিয়াদ তব দরবারে
- 🟦 খাতুনে জান্নাত মাতা ফাতেমা আমার
- 🟦 হৃদয় খুলে ও মমিন ভাই, নেওরে মধুর না
- 🟦 কে যাবে মদিনার পথে, দয়াল নবীর রওয়াজায়
- 🟦 ওরে নিশি তুমি কেন নিষ্ঠুর সাজিলে
- 🟦 ঘুরে ভুবন পায়না সে ধন, জ্ঞান নয়ন না ফুটিলে
- 🟦 আদম শহর মক্কা নগর, ফুটল কিসের ফুল
- 🟦 ইয়া রাছুল আল্লাহ সেই দিনে তরাইও আমারে
- 🟦 মুখে নেওরে আল্লাহর নাম
- 🟦 পঞ্চ রসে রাখাল বেশে ফুটল ফুল আব্দুল্লাহর ঘরে
- 🟦 মা আমেনার কোলের মাঝে ভাসল এসে কে
- 🟦 পড় লাইলাহা ইল্লাল্লাহু নকসা যার আছে দীলে
- 🟦 দিদারে আমার দে এলাহী, দিদার আমায় দে এলাহী
- 🟦 মন তুমি খোঁজ যারে অতি দূরে সে যে তোমার আপন ঘরে
- 🟦 পূবাল হাওয়া যাওরে বইয়া মদিনার কূলে
- 🟦 মন তোর আপন ঘরে আছেন খোদা
- 🟦 তুমি তো মকসুদ আমার সকলি কামেতে
- 🟦 মানুষ রতন করো তারে যতন
- 🟦 তুমি বাজাও বাঁশি কোন সুখে কলঙ্কিনী করে আমাকে
- 🟦 ঘুমন্ত শিশু ওরে, দু'আঁখি বন্ধ করে
- 🟦 অনিত্য দেহ থাকিতে, নিত্যের করণ হবে না
- 🟦 গুরু নিত্য বস্তু সত্য জেনে মজ তার শ্রীচরণে
- 🟦 আমার বন্ধুর বাঁকা নয়নে আমার শ্যামের বাঁকা নয়নে
আয় খেয়ে নে বেহেশতের সেই সরাবন তহুরা
রজ্জব গীতি| শাহজাহান মুন্সি
মানুষ রতন করো তারে যতন
রজ্জব গীতি| শাহজাহান মুন্সি
ঘুমান্ত শিশুর ডাক
ঘুমান্ত শিশুর ওরে
দু’আঁখি বন্ধ করে, আর কত ঘুম পার?
নিঝুম রাতের অন্ধকারে, নীরব হয়ে থাকবে ঘরে,
ঘুমান্ত শিশু ওরে।
কেটেছে আঁধার আভাস, পেয়েছে আলোর প্রকাশ
হাসছে আকাশ পূর্বান্তরে, ফুটন্ত ফুলের সুবাস
সুসময়ে বয় সুবাতাস, করেছে উদাস,
ভুবন জুড়ে মুগ্ধ করে, ঘুমন্ত শিশু ওরে।
সূর্য ডুবুডুবু লোহিত বরণ
সূর্য ডুবুডুবু লোহিত বরণ
নীরব নিস্তব্ধ নির্জন কানন
এহেন সময় এসে একাকিনী বনে
তোমার সৃজন সৃষ্টি দেখিনু নয়নে।
মাঠ ভরা ফুলে ফলে ভরা সেই বন
মধু নিতে উদাসিনী ভোমরা গুঞ্জন
হঠাৎ মনে যেন কী দিয়েছে সাড়া
মধু ফেলিয়ে বনে অমনি দিচ্ছে উড়।
এই দেহ পুরে হৃদয় মসজিদ ঘরে
এই দেহ পুরে হৃদয় মসজিদ ঘরে,
মনমিনারে পড়েছে আজান
শুনিয়ে সেই মধুর ধ্বনি,
নবীজি আপনি সেজেছে ইমাম।
আয় ছুটে যায় মুক্তাদিগণ, ধরিতে নবীজির দা’ওন,
পণ করে চল জীবন-মরণ, সৎ পথে বেঁধে ইমান।
বিষয়-চিন্তা রেখে দূরে,
যাইয়ে আব-হায়াতের পারে,
দিল দরিয়ার অযু করে, পাক হয়ে চল মুসলমান।
আয় মোহাম্মদ কামলে ওয়ালা
আয় মোহাম্মদ কামলে ওয়ালা, অায়রে আমার বুকে আয়।
ডাকেরে তোর কৃতদাসে শান্তি দা মোর কলিজায়।
চাঁদ সুরুজ আর গ্রহ -তারা, জীন -ইনছান আর ফেরেস্তারা
দিন রজনী চাহিছে তারা, ফুল তুলে দিদে গলায়।
ফকির, দরবেশ, বাদশা, অলি তুলিতে সেই ফুলের কলি,
স্কন্দে নিয়া বিক্ষার ঝুলি বাস করে বৃক্ষের তলায়।
আয়, খেয়ে নে বেহেশতের সেই সরাবন তহুরা
আয়, খেয়ে নে বেহেশতের সেই সরাবন তহুরা
আল-কোরআনে আসলো প্রমান, আশেক-গাং তার ইশারা
আয়, খেয়ে নে বেহেশতের সেই সরাবন তহুরা
বেহেশতে যা হয় ব্যবহার, সমাজে তা হল প্রচার,
আপনে খুলবে বেহেশ্তের দ্বার, সত্য মুমিন হবে যারা
আয় খেয়ে নে বেহেশতের সেই সরাবন তহুরা।
মুমিনদের খেদমতের তরে, ইশকেরও পেয়ালা করে,
প্রেম অমৃত সুধা ভরে, কত, কূল গেলে, মান আছে খাড়া
আয়, খেয়ে নে বেহেশতের সেই সরাবন তহুরা।
আদম শহর মক্কা নগর, ফুটল কিসের ফুল
আদম শহর মক্কা নগর, ফুটল কিসের ফুল
আঁধারে দিয়েছে আলো ব্রহ্মাণ্ড আকুল
নহে সে ফুল রক্তজবা গোলাপ নয় গোলাপের বাবা
জপিছে নাম রাত্র দিবা, আল্লাহ রাসুল
মানুষ নয় সে কর্ণ শুনি মানুষের শিরমণি
দেবতা নয় দৈববাণী, অকুলে দিয়েছে কূল
নয় সে অবলা বালা, নাহি তার সংসারের জ্বালা
না করে রাখাল খেলা, আশ্চর্য এক নুরের পুতুল
জ্ঞানী নয় সে জ্ঞানের দাতা, কেহ কেহ কয় বিধাতা
কলির জীবন উদ্ধারের কথা, বলে গিয়েছে দ্বীনের রাসুল
রজ্জব কয় সে ফুল তুলিতে, চল যাই কাননেতে
চাহে সেই ফুল আরশেতে, পাইতে নবীর পায়ের ধুল।
জীবনের অন্তিম অধ্যায়
বাংলার এই মহান মরমী সাধক ১৯৯২ সালে ইহলোক ত্যাগ করেন। দেহত্যাগ করলেও তাঁর কালজয়ী সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি আজও বেঁচে আছেন হাজারো শ্রোতার হৃদয়ে। বর্তমান প্রজন্মের শিল্পীরাও বেতার ও টেলিভিশনে তাঁর গানগুলো পরম শ্রদ্ধার সাথে পরিবেশন করেন। রজ্জব আলী দেওয়ান কেবল একজন গায়ক বা গীতিকার ছিলেন না; তিনি ছিলেন একাধারে একজন সাধক ও দর্শনিক। তাঁর গানগুলো আমাদের শেখায় মাটির টান আর আধ্যাত্মিক প্রেমের গভীরতা। বাংলার লোকসংস্কৃতির ইতিহাসে তাঁর নাম চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
