বাংলার আকাশ-বাতাস চিরকালই মরমী গানে মুখরিত। এই মাটির সোঁদা গন্ধে মিশে আছেন এমন কিছু সাধক যাঁদের গান মানুষকে আধ্যাত্মিক জগতের সন্ধান দেয়, দেহ-মন-আত্মার এক অচেনা সংযোগ ঘটিয়ে দেয়। তেমনই একজন প্রবাদপ্রতিম বাউল সাধক ও গীতিকার হলেন রজ্জব আলী দেওয়ান। ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জের চরচন পাড়া গ্রামে জন্ম নেওয়া এই সাধকের জীবন ছিল সুর আর সাধনার এক অপূর্ব মেলবন্ধন। যেখানে গানের প্রতিটি চরণে লুকিয়ে আছে আত্মজ্ঞানের সন্ধান, গুরুভক্তির গভীরতা আর স্রষ্টার প্রতি নিঃস্বার্থ প্রেমের আকুলতা। জ্ঞানের প্রদীপ খেতাবপ্রাপ্ত এই মরমী সাধক ও বাউল কবি বাংলা বাউল ও সুফি ধারার গানে বাউল তত্ত্ব, মুর্শিদি ও আধ্যাত্মিক ভাবের যে গভীর প্রকাশ ঘটিয়েছেন, তা আজও লোকসংগীত-অনুরাগীদের হৃদয়ে অম্লান হয়ে আছে। আজকের এই লেখায় আমরা বিস্তারিতভাবে জানব রজ্জব আলী দেওয়ানের জন্ম-পরিবার, আধ্যাত্মিক জাগরণের কাহিনি, সংগীত জীবনের বাঁকবদল, তাঁর কালজয়ী সৃষ্টিসম্ভার এবং জীবনের অন্তিম অধ্যায় নিয়ে।
জন্ম, পরিবার ও শৈশবের সুরযাত্রা
সাধক রজ্জব আলী দেওয়ান ইংরেজি ১৯০৬ সালে (বাংলা ১৩১৩ এবং হিজরী ১৩২৭) মানিকগঞ্জের চরচন পাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম জহুর আলী দেওয়ান। এই গ্রামীণ পরিবেশ, নদী-খাল-বিল ঘেরা মাটির টান এসবই তাঁর ভবিষ্যৎ সৃষ্টির অন্তর্নিহিত সুরের বীজ বপন করেছিল বলা যায়। শৈশব থেকেই সুরের প্রতি তাঁর ছিল এক সহজাত, অপ্রতিরোধ্য টান। পিতার ঐকান্তিক উৎসাহ আর পল্লীর নিবিড় পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুবাদে মাত্র ১২ বছর বয়স থেকেই তিনি গান গাওয়া শুরু করেন যে বয়সে অধিকাংশ শিশু কেবল খেলাধুলায় মগ্ন থাকে, সে বয়সেই তাঁর ভেতরে জেগে ওঠে সুরের প্রথম আকুতি। তবে জীবন তাঁর জন্য সহজ ছিল না। মাত্র ২০ বছর বয়সে তিনি পিতাকে হারান, আর তার ৮ বছর পর মাতাকেও হারান। যৌবনের এই প্রান্তে এসে বাবা-মাকে হারানোর শোক তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল। কিন্তু তিনি দমে যাননি। শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে তিনি পূর্ণ উদ্যমে পুনরায় গান-বাজনায় ফিরে আসেন যেন সেই বেদনাই তাঁর গানের ভেতরকার গভীরতাকে আরও প্রখর করে তুলেছিল।
আধ্যাত্মিক জাগরণ ও আজমীর শরীফ যাত্রা
লোকমুখে প্রচলিত একটি কাহিনি অনুযায়ী, এক নিঝুম রাতে এক কামেল দরবেশের সাথে রজ্জব আলী দেওয়ানের সাক্ষাৎ ঘটে। এই সাক্ষাৎ ছিল তাঁর জীবনের এক টার্নিং পয়েন্ট। সেই দরবেশের নির্দেশেই তিনি তাঁর ছোট ভাই ইজ্জত আলীকে সঙ্গে নিয়ে সুদূর আজমীর শরীফে যাত্রা করেন, যেখানে তিনি খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী (র.)-এর ওরশ মোবারকে যোগ দেন। এই যাত্রা নিছক একটি তীর্থভ্রমণ ছিল না এটি তাঁর আধ্যাত্মিক জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। আজমীর থেকে ফেরার পর তিনি আরও গভীরভাবে আধ্যাত্মিকতার পথে অগ্রসর হন এবং পরবর্তীতে বারৈ খালির প্রখ্যাত সাধক হযরত মো. দয়াল আবদুল কাদের শাহ্ চিশতীর কাছে বায়াত গ্রহণ করেন। এই গুরু-শিষ্য সম্পর্কই পরবর্তীতে তাঁর সৃষ্টিকর্মের মূল প্রেরণা হয়ে ওঠে কারণ তাঁর অসংখ্য গানে গুরুভক্তির যে গভীর আকুতি ফুটে উঠেছে, তার শিকড় প্রোথিত এই আধ্যাত্মিক সম্পর্কেই।
সংগীত জীবন ও কালজয়ী সৃষ্টি
গুরুর আদেশে ১৯৬৬ সালের মার্চ মাস থেকে তিনি নিয়মিত গান লেখা শুরু করেন। তাঁর রচিত গানের ভাণ্ডার অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ১৯৬৬ সালেই তিনি রেডিও পাকিস্তানে মারফতী ও পল্লীগীতি গাওয়ার সুযোগ পান এবং হিজ মাস্টার রেকর্ড কোম্পানির মাধ্যমে তাঁর গানের রেকর্ড বের হয়। রজ্জব গীতি মূলত প্রখ্যাত বাউল কবি ও মরমী সাধক রজ্জব আলী দেওয়ানের রচিত আধ্যাত্মিক গানের এক অনন্য সংকলন। তাঁর এই সৃষ্টিগুলো বাউল দর্শনের এক শক্তিশালী ধারক হিসেবে কাজ করে, যেখানে নিগূঢ় সত্য সহজ ভাষায় ফুটে উঠেছে। রজ্জব আলী দেওয়ানের গানগুলোতে মূলত মারফতি, মুর্শিদী এবং দেহতত্ত্বের গভীর বিশ্লেষণ পাওয়া যায়। গানের প্রতিটি চরণে গুরুভক্তি, আত্মতত্ত্ব (নিজেকে চেনা) এবং স্রষ্টার প্রতি নিঃস্বার্থ প্রেমের আকুলতা প্রকাশ পেয়েছে। বাংলা লোকসঙ্গীতের ভাণ্ডারে এই গানগুলো এক বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে। তাঁর রচিত গানগুলো 'জ্ঞানের প্রদীপ রজ্জব গীতি' নামে মোট ৫টি খণ্ডে (১ম-৫ম) প্রকাশিত হয়েছে। এটি সংকলন করেছে 'বাউল কথা প্রকাশ'।
গানের মূল বিষয়বস্তু ও দর্শন
গানের প্রতিটি চরণে গুরুভক্তি, আত্মতত্ত্ব (নিজেকে চেনার সাধনা) এবং স্রষ্টার প্রতি নিঃস্বার্থ প্রেমের আকুলতা প্রকাশ পেয়েছে। এভাবেই বাংলা লোকসঙ্গীতের বিশাল ভাণ্ডারে তাঁর গানগুলো এক বিশেষ ও স্বতন্ত্র মর্যাদা লাভ করেছে। তাঁর রচিত এই বিপুল গানসম্ভার "জ্ঞানের প্রদীপ রজ্জব গীতি" নামে মোট ৫টি খণ্ডে (১ম থেকে ৫ম) প্রকাশিত হয়েছে, যা সংকলন করেছে "বাউল কথা প্রকাশ"। রজ্জব আলী দেওয়ানের গানগুলোতে মূলত তিনটি ধারার গভীর বিশ্লেষণ পাওয়া যায়:
- মারফতি - আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও উপলব্ধির গান
- মুর্শিদী - গুরু বা মুর্শিদের প্রতি ভক্তি ও আনুগত্যের গান
- দেহতত্ত্ব - দেহ ও আত্মার সম্পর্ক নিয়ে দার্শনিক অনুসন্ধান
উল্লেখযোগ্য রজ্জব গীতি
রজ্জব আলী দেওয়ানের রচিত অসংখ্য গানের মধ্যে নিচের গানগুলো বিশেষভাবে জনপ্রিয় ও উল্লেখযোগ্য:
- আয় মোহাম্মদ কামলে ওয়ালা, আয়রে আমার বুকে আয়
- আয় খেয়ে নে বেহেশতের সেই শরাবান তহুরা
- মেরাজেতে যাবি যদি মন মেরাজেতে যাবি
- তুই আমারে করলি পাগল আমার সকল নিয়া রে
- আমি ঘর বেঁধেছি বালুর চরে, পার ভাঙিয়া নেয় সাগরে
- রাত্রি শেষে ভোরে এমন কে গাহিল গান
- হে বারে খোদা মোর ফরিয়াদ তব দরবারে
- খাতুনে জান্নাত মাতা ফাতেমা আমার
- হৃদয় খুলে ও মমিন ভাই, নেওরে মধুর না
- কে যাবে মদিনার পথে, দয়াল নবীর রওয়াজায়
- ওরে নিশি তুমি কেন নিষ্ঠুর সাজিলে
- ঘুরে ভুবন পায়না সে ধন, জ্ঞান নয়ন না ফুটিলে
- আদম শহর মক্কা নগর, ফুটল কিসের ফুল
- ইয়া রাছুল আল্লাহ সেই দিনে তরাইও আমারে
- মুখে নেওরে আল্লাহর নাম
- পঞ্চ রসে রাখাল বেশে ফুটল ফুল আব্দুল্লাহর ঘরে
- মা আমেনার কোলের মাঝে ভাসল এসে কে
- পড় লাইলাহা ইল্লাল্লাহু নকসা যার আছে দীলে
- দিদারে আমার দে এলাহী, দিদার আমায় দে এলাহী
- মন তুমি খোঁজ যারে অতি দূরে সে যে তোমার আপন ঘরে
- পূবাল হাওয়া যাওরে বইয়া মদিনার কূলে
- মন তোর আপন ঘরে আছেন খোদা
- তুমি তো মকসুদ আমার সকলি কামেতে
- মানুষ রতন করো তারে যতন
- তুমি বাজাও বাঁশি কোন সুখে কলঙ্কিনী করে আমাকে
- ঘুমন্ত শিশু ওরে, দু'আঁখি বন্ধ করে
- অনিত্য দেহ থাকিতে, নিত্যের করণ হবে না
- গুরু নিত্য বস্তু সত্য জেনে মজ তার শ্রীচরণে
- আমার বন্ধুর বাঁকা নয়নে আমার শ্যামের বাঁকা নয়নে
এই গানগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি শাহজাহান মুন্সির কণ্ঠে গাওয়া হয়েছে, যেমন "আয় খেয়ে নে বেহেশতের সেই সরাবন তহুরা" এবং "মানুষ রতন করো তারে যতন" যা আজও শ্রোতামহলে বিশেষ জনপ্রিয়।
নির্বাচিত গানের কথা
নিচে রজ্জব আলী দেওয়ানের কয়েকটি বিখ্যাত গানের কথা তুলে ধরা হলো, যা তাঁর গানের গভীরতা ও সহজ-সরল প্রকাশভঙ্গির পরিচয় বহন করে।
আয় খেয়ে নে বেহেশতের সেই সরাবন তহুরা
রজ্জব গীতি| শাহজাহান মুন্সি
মানুষ রতন করো তারে যতন
রজ্জব গীতি| শাহজাহান মুন্সি
ঘুমান্ত শিশুর ডাক
ঘুমান্ত শিশুর ওরে
দু’আঁখি বন্ধ করে, আর কত ঘুম পার?
নিঝুম রাতের অন্ধকারে, নীরব হয়ে থাকবে ঘরে,
ঘুমান্ত শিশু ওরে।
কেটেছে আঁধার আভাস, পেয়েছে আলোর প্রকাশ
হাসছে আকাশ পূর্বান্তরে, ফুটন্ত ফুলের সুবাস
সুসময়ে বয় সুবাতাস, করেছে উদাস,
ভুবন জুড়ে মুগ্ধ করে, ঘুমন্ত শিশু ওরে।
সূর্য ডুবুডুবু লোহিত বরণ
সূর্য ডুবুডুবু লোহিত বরণ
নীরব নিস্তব্ধ নির্জন কানন
এহেন সময় এসে একাকিনী বনে
তোমার সৃজন সৃষ্টি দেখিনু নয়নে।
মাঠ ভরা ফুলে ফলে ভরা সেই বন
মধু নিতে উদাসিনী ভোমরা গুঞ্জন
হঠাৎ মনে যেন কী দিয়েছে সাড়া
মধু ফেলিয়ে বনে অমনি দিচ্ছে উড়।
এই দেহ পুরে হৃদয় মসজিদ ঘরে
এই দেহ পুরে হৃদয় মসজিদ ঘরে,
মনমিনারে পড়েছে আজান
শুনিয়ে সেই মধুর ধ্বনি,
নবীজি আপনি সেজেছে ইমাম।
আয় ছুটে যায় মুক্তাদিগণ, ধরিতে নবীজির দা’ওন,
পণ করে চল জীবন-মরণ, সৎ পথে বেঁধে ইমান।
বিষয়-চিন্তা রেখে দূরে,
যাইয়ে আব-হায়াতের পারে,
দিল দরিয়ার অযু করে, পাক হয়ে চল মুসলমান।
আয় মোহাম্মদ কামলে ওয়ালা
আয় মোহাম্মদ কামলে ওয়ালা, অায়রে আমার বুকে আয়।
ডাকেরে তোর কৃতদাসে শান্তি দা মোর কলিজায়।
চাঁদ সুরুজ আর গ্রহ -তারা, জীন -ইনছান আর ফেরেস্তারা
দিন রজনী চাহিছে তারা, ফুল তুলে দিদে গলায়।
ফকির, দরবেশ, বাদশা, অলি তুলিতে সেই ফুলের কলি,
স্কন্দে নিয়া বিক্ষার ঝুলি বাস করে বৃক্ষের তলায়।
আয়, খেয়ে নে বেহেশতের সেই সরাবন তহুরা
আয়, খেয়ে নে বেহেশতের সেই সরাবন তহুরা
আল-কোরআনে আসলো প্রমান, আশেক-গাং তার ইশারা
আয়, খেয়ে নে বেহেশতের সেই সরাবন তহুরা
বেহেশতে যা হয় ব্যবহার, সমাজে তা হল প্রচার,
আপনে খুলবে বেহেশ্তের দ্বার, সত্য মুমিন হবে যারা
আয় খেয়ে নে বেহেশতের সেই সরাবন তহুরা।
মুমিনদের খেদমতের তরে, ইশকেরও পেয়ালা করে,
প্রেম অমৃত সুধা ভরে, কত, কূল গেলে, মান আছে খাড়া
আয়, খেয়ে নে বেহেশতের সেই সরাবন তহুরা।
আদম শহর মক্কা নগর, ফুটল কিসের ফুল
আদম শহর মক্কা নগর, ফুটল কিসের ফুল
আঁধারে দিয়েছে আলো ব্রহ্মাণ্ড আকুল
নহে সে ফুল রক্তজবা গোলাপ নয় গোলাপের বাবা
জপিছে নাম রাত্র দিবা, আল্লাহ রাসুল
মানুষ নয় সে কর্ণ শুনি মানুষের শিরমণি
দেবতা নয় দৈববাণী, অকুলে দিয়েছে কূল
নয় সে অবলা বালা, নাহি তার সংসারের জ্বালা
না করে রাখাল খেলা, আশ্চর্য এক নুরের পুতুল
জ্ঞানী নয় সে জ্ঞানের দাতা, কেহ কেহ কয় বিধাতা
কলির জীবন উদ্ধারের কথা, বলে গিয়েছে দ্বীনের রাসুল
রজ্জব কয় সে ফুল তুলিতে, চল যাই কাননেতে
চাহে সেই ফুল আরশেতে, পাইতে নবীর পায়ের ধুল।
জীবনের অন্তিম অধ্যায় ও উত্তরাধিকার
বাংলার এই মহান মরমী সাধক ১৯৯২ সালে ইহলোক ত্যাগ করেন। দেহত্যাগ করলেও তাঁর কালজয়ী সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি আজও বেঁচে আছেন হাজারো শ্রোতার হৃদয়ে। বর্তমান প্রজন্মের শিল্পীরাও বেতার ও টেলিভিশনে তাঁর গানগুলো পরম শ্রদ্ধার সাথে পরিবেশন করে চলেছেন, যা প্রমাণ করে তাঁর সৃষ্টির কালোত্তীর্ণ আবেদন। রজ্জব আলী দেওয়ান কেবল একজন গায়ক বা গীতিকার ছিলেন না; তিনি ছিলেন একাধারে একজন সাধক ও দার্শনিক, যিনি নিজের জীবনের ব্যক্তিগত শোক-দুঃখকে অতিক্রম করে সৃষ্টিতে মগ্ন হয়েছিলেন এবং সহজ ভাষায় জটিল আধ্যাত্মিক সত্যকে তুলে ধরেছিলেন। তাঁর গানগুলো আমাদের শেখায় মাটির টান আর আধ্যাত্মিক প্রেমের গভীরতা। বাংলার লোকসংস্কৃতির ইতিহাসে তাঁর নাম চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
রজ্জব আলী দেওয়ান সর্ম্পকে প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন ১: রজ্জব আলী দেওয়ান কে ছিলেন?
উত্তর: রজ্জব আলী দেওয়ান ছিলেন বাংলার একজন প্রখ্যাত মরমী বাউল সাধক, গীতিকার ও সুরকার। তিনি বাউল, মারফতি ও মুর্শিদি ধারার গানে আধ্যাত্মিক ভাবের গভীর প্রকাশ ঘটিয়েছেন। তাঁর রচিত গানসমূহ 'জ্ঞানের প্রদীপ রজ্জব গীতি' নামে পাঁচ খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বাংলা লোকসংগীতের ইতিহাসে এক বিশেষ মর্যাদার অধিকারী।
প্রশ্ন ২: রজ্জব আলী দেওয়ানের জন্ম ও মৃত্যু সম্পর্কে জানতে চাই?
উত্তর: তাঁর জন্ম ১৯০৬ সালে (বাংলা ১৩১৩ এবং হিজরী ১৩২৭) মানিকগঞ্জ জেলার চরচন পাড়া গ্রামে। পিতার নাম জহুর আলী দেওয়ান। তিনি ১৯৯২ সালে ইহলোক ত্যাগ করেন। দেহত্যাগ করলেও তাঁর কালজয়ী সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি আজও বেঁচে আছেন হাজারো শ্রোতার হৃদয়ে।
প্রশ্ন ৩: 'জ্ঞানের প্রদীপ' খেতাবটি তিনি কীভাবে পেয়েছিলেন?
উত্তর: রজ্জব আলী দেওয়ানের অসাধারণ আধ্যাত্মিক জ্ঞান, গভীর দার্শনিক চিন্তা এবং অনন্য সৃষ্টিশীলতার কারণে তিনি 'জ্ঞানের প্রদীপ' খেতাবে ভূষিত হন। তাঁর গানগুলিতে আত্মতত্ত্ব, গুরুভক্তি ও স্রষ্টার প্রতি নিঃস্বার্থ প্রেমের যে গভীর বিশ্লেষণ রয়েছে, তা তাকে বাউল জগতে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
প্রশ্ন ৪: তাঁর আধ্যাত্মিক জাগরণ কীভাবে হয়েছিল?
উত্তর: লোকমুখে শোনা যায়, এক নিঝুম রাতে এক কামেল দরবেশের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। সেই দরবেশের নির্দেশে তিনি ছোট ভাই ইজ্জত আলীকে নিয়ে আজমীর শরীফে খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী (র.)-এর ওরশ মোবারকে যোগ দেন। এই যাত্রা তাঁর আধ্যাত্মিক জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। পরবর্তীতে তিনি বারৈ খালির প্রখ্যাত সাধক হযরত মো. দয়াল আবদুল কাদের শাহ্ চিশতীর কাছে বায়াত গ্রহণ করেন।
প্রশ্ন ৫: 'রজ্জব গীতি' কী এবং এটি কতটি খণ্ডে প্রকাশিত?
উত্তর: 'রজ্জব গীতি' হলো রজ্জব আলী দেওয়ানের রচিত আধ্যাত্মিক গানের এক অনন্য সংকলন। এই সংকলনে বাউল, মারফতি ও মুর্শিদি ধারার গভীর তত্ত্ব সহজ ভাষায় ফুটে উঠেছে। এটি 'বাউল কথা প্রকাশ' কর্তৃক মোট ৫টি খণ্ডে (১ম-৫ম) প্রকাশিত হয়েছে।
প্রশ্ন ৬: রজ্জব আলী দেওয়ানের উল্লেখযোগ্য গানগুলো কী কী?
উত্তর: তাঁর অসংখ্য কালজয়ী গানের মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য হলো — "আয় মোহাম্মদ কামলে ওয়ালা, আয়রে আমার বুকে আয়", "আয় খেয়ে নে বেহেশতের সেই শরাবান তহুরা", "মেরাজেতে যাবি যদি মন মেরাজেতে যাবি", "মানুষ রতন করো তারে যতন", "ঘুমন্ত শিশু ওরে, দু'আঁখি বন্ধ করে", "আমি ঘর বেঁধেছি বালুর চরে, পার ভাঙিয়া নেয় সাগরে" এবং "এই দেহ পুরে হৃদয় মসজিদ ঘরে"।
প্রশ্ন ৭: তাঁর গানের মূল বিষয়বস্তু কী?
উত্তর: তাঁর গানের মূল বিষয়বস্তু হলো মারফতি, মুর্শিদি ও দেহতত্ত্বের গভীর বিশ্লেষণ। প্রতিটি গানে রয়েছে গুরুভক্তি ও আত্মসমর্পণ, আত্মতত্ত্ব (নিজেকে চেনার সাধনা), স্রষ্টার প্রতি নিঃস্বার্থ প্রেমের আকুলতা, মানবতার জাগরণ এবং দেহ ও আত্মার সম্পর্ক।
প্রশ্ন ৮: তিনি কোথায় গান গাওয়ার সুযোগ পান?
উত্তর: ১৯৬৬ সালের মার্চ মাস থেকে তিনি গুরুর আদেশে নিয়মিত গান লেখা শুরু করেন। একই বছর তিনি রেডিও পাকিস্তানে মারফতী ও পল্লীগীতি গাওয়ার সুযোগ পান। এছাড়াও হিজ মাস্টার রেকর্ড কোম্পানি থেকে তাঁর গানের রেকর্ড প্রকাশিত হয়।
প্রশ্ন ৯: রজ্জব আলী দেওয়ান কীভাবে বাউল দর্শনে প্রভাব ফেলেছেন?
উত্তর: রজ্জব আলী দেওয়ান বাংলা বাউল ও সুফি ধারার গানে বাউল তত্ত্ব, মুর্শিদি ও আধ্যাত্মিক ভাবের এমন গভীর প্রকাশ ঘটিয়েছেন যা তাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তাঁর গানগুলো বাউল দর্শনের এক শক্তিশালী ধারক হিসেবে কাজ করে, যেখানে নিগূঢ় সত্য সহজ ভাষায় ফুটে উঠেছে। তিনি প্রমাণ করেছেন, আধ্যাত্মিক সাধনা ও শিল্পচর্চা একসঙ্গে চলতে পারে।
প্রশ্ন ১০: বর্তমান প্রজন্ম কীভাবে তাঁর গান সংরক্ষণ করছে?
উত্তর: বর্তমান প্রজন্মের শিল্পীরা বেতার ও টেলিভিশনে তাঁর গানগুলো পরম শ্রদ্ধার সাথে পরিবেশন করছেন। তাঁর রচিত গানের সংকলন 'জ্ঞানের প্রদীপ রজ্জব গীতি' আজও পাঠক ও গবেষকদের কাছে অমূল্য সম্পদ। এছাড়া বিভিন্ন বাউল মেলা ও আধ্যাত্মিক সঙ্গীত উৎসবে তাঁর গান নিয়মিত পরিবেশিত হয়, যা তাঁর সৃষ্টিকে জীবন্ত রাখছে।


