ফুটবলকে বলা হয় আফ্রিকানদের ডিএনএ। এই মহাদেশে ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, বরং আবেগ, পরিচয় ও গর্বের অংশ। আফ্রিকান ফুটবলের কথা উঠলেই নাইজেরিয়া, ক্যামেরুন, সেনেগাল কিংবা মরক্কোর মতো দেশের নাম স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে। তবে এই তারকাখচিত তালিকার আড়ালে রয়েছে এমন একটি দেশ, যার ফুটবল ইতিহাস আফ্রিকার আধুনিক ফুটবল বিকাশের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। দেশটি হলো কঙ্গো ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক সংক্ষেপে ডিআর কঙ্গো। বিশ্বকাপের মঞ্চে ডিআর কঙ্গোর উপস্থিতি সংখ্যায় খুব বেশি নয়, কিন্তু তাদের একমাত্র বিশ্বকাপ অংশগ্রহণই আফ্রিকান ফুটবলের ইতিহাসে তৈরি করেছে এক অনন্য অধ্যায়। সেই সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা, দেশের নাম পরিবর্তন, ফুটবলের উত্থান-পতন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের পরিচয় প্রতিষ্ঠার লড়াই সবকিছু মিলিয়ে কঙ্গোর ফুটবল ইতিহাস বেশ রোমাঞ্চকর। আজকের আলোচনায় থাকছে ডিআর কঙ্গোর ফুটবলের শিকড়, বিশ্বকাপে তাদের একমাত্র অংশগ্রহণ, সেই সময়ের রাজনৈতিক প্রভাব এবং দীর্ঘ অপেক্ষার পর আবারও বিশ্বকাপের মঞ্চে ফেরার স্বপ্নের গল্প।
কঙ্গো বনাম গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র: একটি জরুরি স্পষ্টীকরণ
বিশ্বকাপের ইতিহাসে যাওয়ার আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। ‘কঙ্গো’ নামটি শুনলে অনেকেই একটি দেশকে বোঝেন। কিন্তু মধ্য আফ্রিকায় একই ‘কঙ্গো’ নাম বহনকারী দুটি স্বাধীন ও প্রতিবেশী দেশ রয়েছে। তাদের অবস্থান, রাজধানী, রাজনৈতিক ইতিহাস এবং ফুটবল-পরিচয় একেবারেই আলাদা। তাই এই দুই দেশকে গুলিয়ে ফেললে কঙ্গোর বিশ্বকাপ ইতিহাস সম্পর্কেও সহজেই ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে।
- প্রথমটি হলো গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র (Democratic Republic of the Congo বা DR Congo/DRC)। এর রাজধানী কিনশাসা, যা কঙ্গো নদীর তীরে অবস্থিত এবং নদীর অপর পারে রয়েছে দ্বিতীয় কঙ্গো কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের রাজধানী ব্রাজাভিল। বিশাল আয়তনের এই দেশটি একসময় বেলজিয়ান কঙ্গো নামে পরিচিত ছিল। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দেশটির নামও পরিবর্তিত হয়েছে। বিশেষ করে ১৯৭১ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত দেশটি জাইরে (Zaire) নামে পরিচিত ছিল। ফুটবল বিশ্বকাপে তাদের ঐতিহাসিক অংশগ্রহণও হয়েছিল এই ‘জাইরে’ নামেই।
- দ্বিতীয় দেশটি হলো কঙ্গো প্রজাতন্ত্র (Republic of the Congo)। এর রাজধানী ব্রাজাভিল। দুই দেশের রাজধানী এত কাছাকাছি যে কিনশাসা ও ব্রাজাভিলকে প্রায়ই বিশ্বের সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থিত দুই রাজধানী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এই দেশটি ফুটবল অঙ্গনে অনেক সময় কঙ্গো-ব্রাজাভিল নামে পরিচিত, যাতে পাশের দেশ গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে পার্থক্য স্পষ্ট করা যায়।
ফুটবলের ক্ষেত্রেও দুই দেশের ইতিহাস আলাদা। ফিফা বিশ্বকাপের মূল পর্বে এখন পর্যন্ত কেবল গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রই জায়গা করে নিতে পেরেছে। ১৯৭৪ সালে তৎকালীন জাইরে আফ্রিকা থেকে বিশ্বকাপের মূল পর্বে অংশ নেওয়া প্রথম সাব-সাহারান আফ্রিকান দেশগুলোর অন্যতম হয়ে ইতিহাস তৈরি করে। সেই বিশ্বকাপ অভিযান পরবর্তীকালে নানা রাজনৈতিক ঘটনা, বিতর্ক এবং ফুটবলীয় উত্থান-পতনের কারণে আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র এখনো বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। ফলে ‘কঙ্গো বিশ্বকাপ খেলেছে’ এমন কথা বলা হলে মূলত ডিআর কঙ্গো বা তৎকালীন জাইরে-কেই বোঝানো হয়। এই ব্লগে তাই ‘কঙ্গো’ বলতে আমরা মূলত গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র (DR Congo/DRC)-কেই বোঝাব। তাদের ফুটবলের উত্থান, ১৯৭৪ বিশ্বকাপে ঐতিহাসিক অংশগ্রহণ, জাইরে নামের রাজনৈতিক অধ্যায়, সেই সময়ের নানা নাটকীয় ঘটনা এবং দীর্ঘ বিরতির পর বিশ্বকাপে ফেরার স্বপ্ন—এসব নিয়েই সামনে এগোবে আমাদের মূল আলোচনা।
১৯৭৪ সালের ঐতিহাসিক বিশ্বকাপ: জাইরের রূপকথা
১৯৭৪ সালের পশ্চিম জার্মানিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপটি আফ্রিকান ফুটবলের জন্য ছিল একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। সাব-সাহারা অঞ্চল বা কৃষ্ণ আফ্রিকা থেকে ইতিহাসের প্রথম দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের টিকিট কেটেছিল জাইরে (বর্তমান ডিআর কঙ্গো)। সে বছর তারা মরক্কো এবং জাম্বিয়ার মতো শক্তিশালী দলকে হারিয়ে আফ্রিকান চ্যাম্পিয়ন হিসেবে বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করে। তৎকালীন আফ্রিকান ফুটবলে জাইরে ছিল এক পরাশক্তি। ১৯৭৪ সালের আফ্রিকান কাপ অব নেশনস (AFCON) চ্যাম্পিয়ন হয়েই তারা বিশ্বমঞ্চে পা রেখেছিল। দলে ছিলেন এনদায়ে মুলাম্বার মতো কিংবদন্তি স্ট্রাইকার, যিনি এক টুর্নামেন্টে ৯ গোল করার অনন্য রেকর্ড গড়েছিলেন, যা আজ পর্যন্ত কেউ ভাঙতে পারেনি।
বিশ্বকাপের দুঃস্বপ্ন এবং সেই ফ্রি-কিক বিতর্ক
বিশ্বকাপের মূল পর্বে গিয়ে জাইরে গ্রুপ-২ এ পড়ে, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল স্কটল্যান্ড, যুগোস্লাভিয়া এবং বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। বিশ্বমঞ্চে জাইরের শুরুটা একেবারেই ভালো হয়নি।
- স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধে: প্রথম ম্যাচে স্কটল্যান্ডের কাছে ২-০ গোলে হেরে যায় জাইরে। তবে তাদের খেলা প্রশংসিত হয়েছিল।
- যুগোস্লাভিয়ার বিরুদ্ধে: দ্বিতীয় ম্যাচে জাইরে ফুটবল বিশ্বকে স্তব্ধ করে দেয়, তবে ইতিবাচকভাবে নয়। যুগোস্লাভিয়ার কাছে তারা ৯-০ গোলের বিশাল ব্যবধানে পরাজিত হয়।
স্বৈরাচারী শাসকের হুমকি এবং ব্রাজিলের বিরুদ্ধে সেই বিখ্যাত ম্যাচ
যুগোস্লাভিয়ার কাছে ৯-০ গোলে হারার পর জাইরের ফুটবলারদের ওপর নেমে আসে চরম বিপর্যয়। তৎকালীন কঙ্গোর (জাইরে) স্বৈরাচারী রাষ্ট্রপতি মবুতু সেসে সেকো খেলোয়াড়দের বার্তা পাঠান যে, ব্রাজিলের বিরুদ্ধে যদি তারা ৪ বা তার বেশি গোলের ব্যবধানে হারে, তবে তাদের কাউকেই দেশে ফিরতে দেওয়া হবে না এবং চরম শাস্তি ভোগ করতে হবে। এই ভয়ে এবং মানসিক চাপে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে ম্যাচে জাইরের খেলোয়াড়রা মরিয়া হয়ে রক্ষণভাগ সামলান। ম্যাচটিতে ব্রাজিল ৩-০ গোলে এগিয়ে ছিল। ম্যাচের ৮৫ মিনিটে ব্রাজিলের রিভেলিনো যখন একটি ফ্রি-কিক নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন জাইরের ডিফেন্ডার ইলুঙ্গা মুয়েপু রেফারির বাঁশি বাজার আগেই দৌঁড়ে এসে বলটিকে লাথি মেরে দূরে পাঠিয়ে দেন।
এই ঘটনাটি বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম অদ্ভুত এবং হাস্যকর মুহূর্ত হিসেবে গণ্য করা হয়। বিশ্ববাসী তখন মনে করেছিল আফ্রিকানরা ফুটবলের নিয়ম জানে না। কিন্তু আসল সত্য ছিল ভিন্নখেলোয়াড়রা প্রাণভয়ে সময় নষ্ট করার চেষ্টা করছিলেন যাতে ব্রাজিল আর কোনো গোল করতে না পারে। ম্যাচটি ৩-০ গোলেই শেষ হয় এবং খেলোয়াড়রা প্রাণে বেঁচে দেশে ফেরেন।
জাইরে থেকে ডিআর কঙ্গো: বিশ্বকাপের দীর্ঘ খরা
১৯৭৪ সালের পর থেকে আজ পর্যন্ত দীর্ঘ ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কঙ্গো আর কখনো বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, গৃহযুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট এবং ফুটবল ফেডারেশনের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির কারণে কঙ্গোর ফুটবল এক প্রকার অন্ধকারের অতলে হারিয়ে যায়। ১৯৯৭ সালে দেশের নাম জাইরে থেকে পরিবর্তন করে 'গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র' রাখা হলেও ফুটবলের ভাগ্যের চাকা খুব একটা ঘোরেনি। অন্যদিকে, প্রতিবেশী দেশ কঙ্গো প্রজাতন্ত্র (ব্রাজাভিল) ১৯৭২ সালে আফ্রিকান কাপ অব নেশনস জিতলেও, ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে তারা কখনোই নিজেদের মেলে ধরতে পারেনি এবং বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করা তাদের জন্য আজও একটি অধরা স্বপ্ন।
কঙ্গো ফুটবলের বর্তমান শক্তি ও সম্ভাবনা
দীর্ঘদিন অন্ধকূপে থাকার পর, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডিআর কঙ্গোর ফুটবলে আবার সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। ২০২৪ সালের আফ্রিকান কাপ অব নেশনসে (AFCON) ডিআর কঙ্গো সেমিফাইনালে খেলে তাদের শক্তিমত্তার জানান দিয়েছে। বর্তমানে কঙ্গোর বেশ কিছু খেলোয়াড় ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোতে খেলছেন। যেমন:
- চান্সেল এমবেম্বা (Chancel Mbemba): অলিম্পিক মার্শেইয়ের এই ডিফেন্ডার বর্তমানে কঙ্গো দলের মেরুদণ্ড।
- ইয়োনে উইসা (Yoane Wissa): ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব ব্রেন্টফোর্ডের হয়ে মাঠ মাতাচ্ছেন এই ফরোয়ার্ড।
এছাড়া ইউরোপে বেড়ে ওঠা অনেক কঙ্গোলিজ বংশোদ্ভূত খেলোয়াড় এখন নিজেদের শিকড়ে ফিরে এসে কঙ্গো জাতীয় দলের হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এটি কঙ্গোর ফুটবলকে টেকনিক্যালি এবং ট্যাকটিক্যালি অনেক শক্তিশালী করে তুলছে।
২০২৬ ও পরবর্তী বিশ্বকাপ: কঙ্গো কি পারবে ফিরতে
২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে ফিফা দলের সংখ্যা ৩২ থেকে বাড়িয়ে ৪৮ করেছে। এর ফলে আফ্রিকা মহাদেশ থেকে আগের ৫টি দলের জায়গায় এখন ৯টি (বা ১০টি) দল বিশ্বকাপে যাওয়ার সুযোগ পাবে। এই নতুন নিয়ম কঙ্গোর মতো উঠতি দলগুলোর জন্য এক বিশাল আশীর্বাদ। বর্তমানে কঙ্গো দল যেভাবে পুনর্গঠিত হচ্ছে, তাতে আগামী বিশ্বকাপগুলোতে তাদের মূল পর্বে দেখার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যদি তারা তাদের ঘরোয়া ফুটবল কাঠামোর উন্নয়ন করতে পারে এবং ইউরোপে খেলা প্রতিভাদের সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারে, তবে 'আফ্রিকান ফুটবলের এই ঘুমন্ত সিংহ' খুব শীঘ্রই আবার বিশ্বমঞ্চে গর্জে উঠবে।
গ্রুপ 'কে'-তে ডিআর কঙ্গোর
দীর্ঘ ৫০ বছর পর বিশ্বমঞ্চে ফিরে আসা ডিআর কঙ্গোর জন্য এই গ্রুপটি বেশ চ্যালেঞ্জিং হতে যাচ্ছে। ইউরোপের পরাশক্তি পর্তুগাল, লাতিন আমেরিকার লড়াকু দল কলম্বিয়া এবং এশিয়ার উদীয়মান শক্তি উজবেকিস্তানের বিরুদ্ধে কঙ্গো কেমন প্রতিরোধ গড়ে তোলে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
- ডিআর কঙ্গো (DR Congo)
- পর্তুগাল (Portugal)
- কলম্বিয়া (Colombia)
- উজবেকিস্তান (Uzbekistan)
গ্রুপ পর্বে ডিআর কঙ্গোর ম্যাচের সময়সূচি ও ভেন্যু
১৭ জুন, ২০২৬
- ম্যাচ: পর্তুগাল বনাম ডিআর কঙ্গো
- ভেন্যু: হিউস্টন স্টেডিয়াম, যুক্তরাষ্ট্র (Houston Stadium, USA)
২৩ জুন, ২০২৬
- ম্যাচ: কলম্বিয়া বনাম ডিআর কঙ্গো
- ভেন্যু: গুয়াদালাহারা স্টেডিয়াম, মেক্সিকো (Guadalajara Stadium, Mexico)
২৭ জুন, ২০২৬
- ম্যাচ: ডিআর কঙ্গো বনাম উজবেকিস্তান
- ভেন্যু: আটলান্টা স্টেডিয়াম, যুক্তরাষ্ট্র (Atlanta Stadium, USA)
ফুটবল বিশ্বকাপে কঙ্গোর ইতিহাস হয়তো একটি ট্রাজিক কমেডির মতো শোনাতে পারে, কিন্তু তাদের ফুটবল আবেগে কোনো কমতি নেই। ১৯৭৪ সালের সেই ভয় আর সংকোচ কাটিয়ে আজকের কঙ্গো অনেক বেশি পরিপক্ক এবং পেশাদার। ফুটবল বিশ্বের সমর্থকরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে সেই দিনের জন্য, যেদিন কঙ্গো আবার বিশ্বকাপের মাঠে নামবে তবে এবার আর কোনো স্বৈরাচারের ভয়ে নয়, বরং বুক চিতিয়ে ফুটবলকে ভালোবেসে বিশ্ব জয় করার জন্য।



