তিনি মাঠে থাকা মানেই খেলোয়াড়রা জানত যে এখানে কোনো অন্যায় হবে না। কোলিনা ছিলেন ফুটবলের এক পরম নির্ভরতার প্রতীক- অলিভার কান (জার্মানির কিংবদন্তি গোলরক্ষক)
ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে বহু কিংবদন্তি খেলোয়াড় ও কোচের নাম আমরা রোমন্থন করি। পেলে, ম্যারাডোনা, মেসি বা জিদানের জাদুকরী মুহূর্তগুলো নিয়ে চায়ের কাপে ঝড় ওঠে। কিন্তু যে মাঠের ২২ জন তারকাকে যিনি এক সুতোয় বাঁধেন। যার সেকেন্ডের ভগ্নাংশে নিতে হয় সিদ্ধান্তে সেই ‘রেফারি’দের নিয়ে আলোচনা খুব কমই হয়। অথচ মাঠে বাঁশি হাতে তাদের উপস্থিতি হচ্ছে ফুটবলের নিয়ম ও সৌন্দর্যের শেষ কথা।
ফুটবল বিশ্বকাপের এক শতাব্দীর ইতিহাসে বহু রেফারি মাঠ কাঁপিয়েছেন। বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ রেফারি কে? এই প্রশ্নের উত্তরে ফুটবলপ্রেমী, বোদ্ধা, ফিফা (FIFA) সবার মুখেই একটি নাম আগে আসে পিয়েরলুইজি কোলিনা (Pierluigi Collina)। তাকে বলা হয় ফুটবলের ইতিহাসের সেরা ‘ম্যান-ম্যানেজার’ এবং সর্বকালের শ্রেষ্ঠ রেফারি।
ইতালির পিয়েরলুইজি কোলিনা নিজেকে নিয়ে গেছেন এমন এক উচ্চতায়। যেখানে তিনি নিজেই ছিলেন একটি ব্র্যান্ড। মাঠে তার উপস্থিতি ছিল এতটাই প্রভাবশালী ছিল যে বিশ্বের সেরা ফুটবলাররাও তাকে সম্মান করতেন আবার কিছুটা ভয়ও পেতেন। ফুটবলের নিয়মের প্রতি অবিচল আনুগত্য, অসাধারণ ব্যক্তিত্ব এবং চাপের মুহূর্তে নির্ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার কারণে কোলিনাকে অনেকেই সর্বকালের সেরা রেফারি বলে মনে করেন। আজকে থাকছে তাকে নিয়ে লেখা।
পিয়েরলুইজি কোলিনা শুরুটা যেভাবে
ইতালির বোলোনিয়া শহরে ১৯৬০ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন পিয়েরলুইজি কোলিনা। পেশাগতভাবে তিনি অর্থনীতি ও ব্যবসা প্রশাসন নিয়ে পড়াশোনা করেন। কিন্তু ভাগ্য তাকে নিয়ে আসে ফুটবলের জগতে। ১৭ বছর বয়সে রেফারিং কোর্সে ভর্তি হওয়ার মধ্য দিয়েই তার যাত্রা শুরু হয়। অবশ্য তরুণ বয়সে সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার হিসেবে ফুটবল খেলতেন।
কিন্তু ১৯৮৭ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি বুঝতে পারেন খেলোয়াড় হিসেবে যতটা না তার চেয়ে রেফারি হিসেবেই তিনি ফুটবলকে বেশি কিছু দিতে পারবেন। এরপর তিনি রেফারির কোর্স সম্পন্ন করেন এবং ইতালির আঞ্চলিক লিগ থেকে শুরু করে দ্রুতই সিরি-এ (Serie A) লিগে ম্যাচ পরিচালনার যোগ্যতা অর্জন করেন।
১৯৮৮ সালে কোলিনা এক জটিল রোগে আক্রান্ত হন যার ফলে তার মাথার চুল, ভ্রু এবং চোখের পাপড়ি সম্পূর্ণ পড়ে যায়। এই বিশেষ শারীরিক অবয়বের কারণে মাঠের খেলোয়াড়দের কাছে তিনি এক অনন্য এবং কিছুটা ভীতিকর ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। তবে তার এই রূপ কেবল ভয় জাগাত না বরং মাঠে তার অখণ্ড কর্তৃত্ব ও শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করত।
কেন তিনি শ্রেষ্ঠ? অনন্য গুণাবলী
কোলিনা কেবল তার অবয়বের কারণে সেরা ছিলেন না। তার ম্যাচ পরিচালনার ধরন ছিল আধুনিক ফুটবলের টেক্সটবুক।
- অসাধারণ ম্যান-ম্যানেজমেন্ট: কোলিনা মাঠে খেলোয়াড়দের সাথে কথা বলতেন। তিনি শুধু কার্ড দেখাতেন না, খেলোয়াড়দের বোঝাতেন কেন তাদের ফাউলটি ভুল ছিল। মাঠের সবচেয়ে রাগী খেলোয়াড়টিও কোলিনার চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত হয়ে যেতে বাধ্য হতো।
- অটল নিরপেক্ষতা এবং সাহসিকতা: গ্যালারির লক্ষাধিক দর্শক বা মাঠের সুপারস্টারদের চাপ তাকে কখনো স্পর্শ করতে পারত না। যেকোনো কঠিন সিদ্ধান্ত তিনি সেকেন্ডের মধ্যে নিতে পারতেন এবং একবার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তার চোখে কোনো দ্বিধা দেখা যেত না।
- ম্যাচের আগে অক্লান্ত পরিশ্রম: কোলিনা আধুনিক রেফারিংয়ের সংজ্ঞা বদলে দিয়েছিলেন। ম্যাচের আগে তিনি দুই দলের খেলোয়াড়দের খেলার ধরন, কোন খেলোয়াড় বেশি ফাউল করেন, কে ডাইভ দিতে ওস্তাদ সবকিছু নিখুঁতভাবে স্টাডি করতেন। ফলে মাঠে কারোর পক্ষেই তাকে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব ছিল না।
বিশ্বকাপ ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে কোলিনার মহাকাব্য
কোলিনা ১৯৯৫ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক ফুটবলের মঞ্চে রাজত্ব করেছেন। ফুটবলের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় আন্তর্জাতিক ফুটবল ফেডারেশন (IFFHS) তাকে টানা ছয়বার (১৯৯৮-২০০৩) ‘বিশ্বের সেরা রেফারি’র খেতাব পেয়েছেন। যা আজ পর্যন্ত একটি রেকর্ড।
তার ক্যারিয়ারের শ্রেষ্ঠ সময় ছিল ২০০২ সালের কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপ। সেই বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচটি ছিল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম হাই-ভোল্টেজ ম্যাচ। ব্রাজিল বনাম জার্মানি। রোনালদো, রিভালদো, রোনালদিনহো বনাম অলিভার কান, মিরোস্লাভ ক্লোসার সেই ব্লকবাস্টার ম্যাচটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় কোলিনাকে।
সেই ফাইনালে কোলিনার রেফারিং ছিল নিখুঁত ও নিষ্কলঙ্ক। কোনো বিতর্ক ছাড়াই বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ব্রাজিল। ম্যাচ শেষে ব্রাজিলের খেলোয়াড়দের ট্রফি উদযাপনের পাশাপাশি কোলিনার ম্যাচ পরিচালনার ভূয়সী প্রশংসা করেছিল গোটা বিশ্ব। এছাড়া ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপেও তিনি অসাধারণ কিছু ম্যাচ উপহার দিয়েছিলেন।
বড় ম্যাচের বড় রেফারি
বিশ্বকাপ ফাইনাল ছাড়াও কোলিনা পরিচালনা করেছেন অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ। ২০০১ সালের উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল, ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের ম্যাচ এবং ইতালিয়ান সিরি আ-এর বহু হাই-ভোল্টেজ লড়াই তার ক্যারিয়ারকে সমৃদ্ধ করেছে। বড় ম্যাচে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ করা সব রেফারির পক্ষে সম্ভব হয় না। কিন্তু কোলিনা যেন চাপের মধ্যে আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতেন।
তার উপস্থিতি খেলোয়াড়দের মনে করিয়ে দিত মাঠে নিয়মের শাসন প্রতিষ্ঠিত আছে। রেফারিদের অনেক সময় খেলোয়াড় ও দর্শকদের সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। কিন্তু কোলিনার ক্ষেত্রে চিত্রটা ছিল ভিন্ন। তার একটি বড় শক্তি ছিল যোগাযোগ দক্ষতা। তিনি খেলোয়াড়দের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করতেন, কিন্তু প্রয়োজনে কঠোরতাও দেখাতে দ্বিধা করতেন না।
তিনি কখনো অহংকার দেখাতেন না, আবার কাউকেও নিয়মের ঊর্ধ্বে মনে করতেন না। বিশ্ব ফুটবলের কিংবদন্তি খেলোয়াড়রাও কোলিনার সিদ্ধান্তকে সম্মান করতেন। কারণ তারা জানতেন, তিনি কোনো দলের পক্ষে নন; তিনি শুধু খেলার পক্ষে।
রেফারিংয়ের বিবর্তন: কোলিনা বনাম আধুনিক যুগ (VAR)
আজকের ফুটবলে রেফারিদের সাহায্য করার জন্য এসেছে VAR (Video Assistant Referee) প্রযুক্তি। মাঠের রেফারি ভুল করলে পর্দার আড়ালে থাকা প্রযুক্তি তা শুধরে দেয়। কিন্তু কোলিনার সময়ে কোনো ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিল না। মাঠের সবুজ ঘাসে দাঁড়িয়ে নিজের দুটি চোখ এবং রানিং পজিশনের ওপর ভিত্তি করেই তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হতো।
মজার বিষয় হলো, কোলিনাকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল VAR নিয়ে তার মতামত কী। তিনি বলেছিলেন, প্রযুক্তি রেফারিদের জীবন সহজ করে দিয়েছে কিন্তু মাঠের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার যে মানবিক দক্ষতা ও সাহস এর বিকল্প কোনো প্রযুক্তি হতে পারে না। বর্তমান যুগে ফিফার রেফারিং কমিটির প্রধান হিসেবে কোলিনাই রেফারিদের আধুনিকায়ন এবং VAR-এর সঠিক ব্যবহারের দেখভাল করছেন।
শেষ বাঁশি ও কোলিনার লিগ্যাসি
২০০৫ সালে ৪৫ বছর বয়সে কোলিনা রেফারিং থেকে অবসর নেন। সাধারণত ইতালিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের নিয়ম অনুযায়ী ৪৫ বছরই ছিল রেফারির সর্বোচ্চ বয়সসীমা। কিন্তু কোলিনার জন্য তারা এই নিয়ম শিথিল করতে চেয়েছিল। যা প্রমাণ করে ফুটবলে তার গুরুত্ব কতটা ছিল। তবে সততার প্রতীক কোলিনা কোনো বিশেষ সুবিধা না নিয়ে নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে অবসরে যান।
ফুটবল মাঠে রেফারিদের সাধারণত খলনায়ক হিসেবে দেখা হয়। কোনো দল হারলে গালিগালাজ জোটে রেফারির কপালে। কিন্তু পিয়েরলুইজি কোলিনা ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি রেফারি হিসেবে মাঠে নামলে দর্শকরা তালি দিতেন, খেলোয়াড়রা তাকে সমীহ করতেন। ২০০৫ সালে রেফারিং ক্যারিয়ার থেকে অবসর নেন পিয়েরলুইজি কোলিনা।
কিন্তু ফুটবল থেকে কখনো দূরে সরে যাননি। পরে তিনি ফি ফা ও উয়েফার বিভিন্ন রেফারিং কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। আধুনিক ফুটবলে রেফারিদের প্রশিক্ষণ, মানোন্নয়ন এবং প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে তার অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজকের প্রজন্মের অনেক রেফারি কোলিনাকে আদর্শ হিসেবে অনুসরণ করেন।
ফুটবলের এক অমর চরিত্র
ফুটবল ইতিহাসে হাজারো গোল, অসংখ্য ট্রফি এবং অগণিত কিংবদন্তির গল্প রয়েছে। কিন্তু খুব কম রেফারিই আছেন যাদের নাম খেলোয়াড়দের সমান মর্যাদায় উচ্চারিত হয়। পিয়েরলুইজি কোলিনা সেই বিরল ব্যতিক্রম। তিনি প্রমাণ করেছেন, একজন রেফারিও খেলার সৌন্দর্য রক্ষা করে কিংবদন্তি হয়ে উঠতে পারেন।
বিশ্বকাপের উজ্জ্বল মঞ্চে তিনি ছিলেন ন্যায়বিচারের প্রতীক, শৃঙ্খলার রক্ষক এবং ফুটবলের প্রকৃত অভিভাবক। তাই ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে যখন সর্বকালের সেরা রেফারির নাম উচ্চারিত হবে, তখন সবার আগে যে নামটি উঠে আসবে, সেটি নিঃসন্দেহে—পিয়েরলুইজি কোলিনা, বাঁশি হাতের সেই জাদুকর।
