আমি আর আমার ছবি আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু। আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, এটাই আমার স্বর্গ - শম্ভু আচার্য
বাংলার প্রাচীন লোকশিল্পের অন্যতম উজ্জ্বল ধারা পটচিত্র। এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাঁচিয়ে রেখেছে মুন্সিগঞ্জের মীরকাদিম পৌরসভার কালিন্দীপাড়ার আচার্য পরিবার। প্রায় ৪৬০ বছরের ধারাবাহিকতায় এ পরিবারের প্রজন্মের পর প্রজন্ম পটচিত্র আঁকছেন। সেই ঐতিহ্যের নবম পুরুষ শিল্পী শম্ভু আচার্য। তিনি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রিধারী শিল্পী নন, বরং বংশপরম্পরায় বয়ে চলা এক প্রাচীন শিল্পধারার সারথী। শম্ভু আচার্যের মতো পটুয়ারা যখন নিভৃতে ছবি আঁকেন, তখন যেন সেই তুলির আঁচড়ে অলক্ষ্যে বেজে ওঠে হারিয়ে যাওয়া পটের গানের করুণ সুর। পটচিত্র কেবল দেখার বস্তু নয়, এটি শোনবার এবং অনুধাবনের এক গভীর জীবনদর্শন।
অক্ষরজ্ঞানের আগে রং-তুলির সাথে মিতালি
১৯৫৪ সালে জন্ম নেওয়া শম্ভু আচার্যের শিল্পশিক্ষা শুরু হয়েছিল মায়ের কোলে আর বাবার আঙিনায়। যে বয়সে শিশুরা বর্ণমালা শিখতে হিমশিম খায়। সেই অ আ শেখার আগেই তিনি শিখেছিলেন ফুল, পাখি আর লতাপাতা আঁকতে। তাঁর কাছে শিল্প কোনো পেশা নয় সহজাত এক প্রবৃত্তি। ছোটবেলায় ইট ঘষে লাল রং আর কয়লা দিয়ে কালো রং বানিয়ে তিনি যখন দেয়ালে ছবি আঁকতেন। পাড়া-প্রতিবেশী অবাক হয়ে ভাবত রং-তুলি ছাড়া এমন নিখুঁত ছবি কীভাবে সম্ভব। তাঁর শৈশবের এক মজার স্মৃতি হলো প্রতিবেশী এক রাগী ঠাকুমার নতুন দেয়ালে ছবি আঁকা। সেই অপরাধে মায়ের কাছে কানপড়া খাওয়া আর শাস্তিস্বরূপ দেয়াল মোছার ঘটনা আজও তাঁর মনে অম্লান। জেদ আর শিল্পতৃষ্ণা যার রক্তে তাকে কি আর থামিয়ে রাখা যায়। দেয়াল মোছার পর জানালার শিকে ধরে উপরে উঠে তিনি আবার ছবি আঁকতেন। সেই অবাধ্য কিশোরই আজ বাংলাদেশের পটচিত্রের প্রধানতম পুরুষ। তাঁর বাবা সুধীর কুমার আচার্য এবং মা কমলাবালা আচার্য দু’জনই ছিলেন পটশিল্পী। ছোটবেলা থেকেই তিনি বেড়ে উঠেছেন আঁকাআঁকির পরিবেশে। অনেক সময় এসব আঁকাআঁকির জন্য বকাও খেতে হয়েছে। কিন্তু সেই আঁকাই ধীরে ধীরে তাঁকে গড়ে তোলে একজন পটুয়া শিল্পীতে।
পারিবারিক ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার
আচার্য পরিবারের পটশিল্পের ধারাটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এসেছে। শম্ভু আচার্যের পূর্বপুরুষরা একে একে এই শিল্পকে লালন করেছেন। তাঁর দাদা প্রাণকৃষ্ণ আচার্য ও বাবা সুধীর আচার্য ছিলেন এই ধারার গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী। শম্ভু আচার্য নিজেও তাঁর বাবা-মায়ের কাছ থেকেই পটচিত্র আঁকার শিক্ষা পেয়েছেন। তিনি কখনো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিল্প শিক্ষা নেননি। তাঁর ভাষায়-আমার সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান আমার পরিবার। প্রায় ৪৬০ বছরের ধারাবাহিকতায় এ পরিবারের প্রজন্মের পর প্রজন্ম পটচিত্র আঁকছেন। সেই ঐতিহ্যের নবম পুরুষ শিল্পী শম্ভু আচার্য।
শিল্পী শম্ভু আচার্য গাজীর পট ও লোককাহিনির জগৎ
বাংলার পটচিত্রের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারা গাজীর পট। গ্রামীণ জীবনের সহজ সরল সৌন্দর্য, মানুষের আবেগ, প্রেম এবং প্রকৃতির রঙিন জগৎ তাঁর ছবিতে বিশেষভাবে ফুটে ওঠে। পটচিত্র মূলত কাপড়ের ওপর আঁকা ধারাবাহিক আখ্যান। বাংলাদেশে মূলত 'গাজীর পট' এবং পশ্চিমবঙ্গে 'কালীঘাটের পট' জনপ্রিয়। শম্ভু আচার্য কেবল পৌরাণিক কাহিনী বা ধর্মীয় আখ্যান যেমন মহাভারত, মনসামঙ্গল বা রাণায়ণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। তিনি সমসাময়ীয় ইতিহাস ও গ্রামীণ জীবনকে পটে তুলে এনেছেন। শম্ভু আচার্য এই ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী হিসেবে পরিচিত। তাঁর পটচিত্রে উঠে আসে বাংলার লোককথা, পৌরাণিক কাহিনি, গ্রামীণ জীবন ও মানবিকতার গল্প। তার ছবিতে দেখা যায়—
🎨 বাঘের পিঠে গাজী পীর
🎨 মানিক পীর ও কালু পীর
🎨 বনবাসিনী সীতা
🎨 বেহুলা ও লক্ষ্মীন্দর
🎨 গ্রামীণ জীবনের নানা দৃশ্য
🎨 কৃষ্টিপট: জেলে, কামার, কুমার, তাঁতী এবং গ্রামীণ বধূদের দৈনন্দিন জীবনের গল্প নিয়ে তাঁর আঁকা ছবিগুলো ‘কৃষ্টিপট’ হিসেবে সমাদৃত।
পটের গান আসলে কী?
পটের গান হচ্ছে সুর ও রেখার এক অবিচ্ছেদ্য মেলবন্ধন। বাংলার লোকসংস্কৃতির এক অনন্য বৈশিষ্ট্য যেখানে চিত্র আর সংগীত হাত ধরাধরি করে চলে। পট মানে কেবল আঁকা ছবি নয়। এর সাথে জড়িয়ে আছে একটি পরিবেশনা শিল্প যার নাম পটের গান। যারা এই গান গেয়ে বেড়ান এবং ছবি আঁকেন তাঁদের বলা হয় পটুয়া। গবেষকদের মতে এটি বাংলার অন্যতম প্রাচীন এক শিল্পমাধ্যম। যা একসময় গ্রামবাংলার বিনোদনের প্রধান উৎস ছিল। পটের গান হলো এক ধরনের বর্ণনাত্মক লোকগীতি। পটুয়ারা দীর্ঘ কাপড়ের ওপর (যাকে জড়ানো পট বলা হয়) খণ্ড খণ্ড চিত্রে কোনো কাহিনী এঁকে আনেন। আসরে যখন সেই পটটি ধীরে ধীরে খোলা হয় এবং শিল্পী প্রতিটি ছবির ওপর হাত রেখে সুর করে সেই কাহিনীর বর্ণনা দেন। অর্থাৎ এটি একই সাথে শ্রবণ ও দর্শনের এক অপূর্ব সমন্বয়। আধুনিক যুগের অডিও-ভিজ্যুয়াল বা সিনেমার এক আদিম ও শৈল্পিক সংস্করণ বলা যেতে পারে এই পটের গানকে। পটের গানে সাধারণত পৌরাণিক ও সামাজিক কাহিনী উঠে আসে। তবে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছে গাজীর পট। পীর পালোয়ান গাজীর বীরত্বগাথা, বাঘের পিঠে চড়ে তাঁর বনের রাজা হওয়ার গল্প এবং অলৌকিক ক্ষমতার বর্ণনা এই গানের মূল উপজীব্য। এছাড়া রামায়ণ, মহাভারত, মনসামঙ্গল বা মহররমের কাহিনীও পটের গানে গেয়ে শোনানো হয়। বর্তমানে বিলুপ্তির পথে এক শিল্পধারা। একসময় প্রতিটি গ্রামেই পটের গানের আসর বসত। বিশেষ করে মেলা, উৎসব বা লোকজ পার্বণে পটওয়ারা গান শুনিয়ে চাল-ডাল বা অর্থ সংগ্রহ করতেন। কিন্তু কালক্রমে আধুনিক প্রযুক্তির দাপট, রেডিও-টেলিভিশনের বিস্তার এবং আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবে এই পটুয়া সংগীত আজ প্রায় বিলুপ্ত। খুলনা ও বৃহত্তর বঙ্গে এখনো কিছু পটুয়া পরিবার এই গানকে টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সম্প্রতি সুইডেনের ক্রাউন প্রিন্সেস ভিক্টোরিয়ার বাংলাদেশ সফরকালে তাঁকে এই পটের গান শুনিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়, যা আবারো বিশ্বদরবারে আমাদের এই ঐতিহ্যের জানান দিয়েছে।
প্রকৃতির রঙে আঁকা ক্যানভাস
শম্ভু আচার্যের কাজের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো এর উপকরণ। তিনি বাজার থেকে কেনা কোনো কৃত্রিম রং বা তুলি ব্যবহার করেন না।
🖌️ রং: তেঁতুল বিচি, ইটের গুঁড়ো, বেল, চালতার কষ এবং বিভিন্ন লতাপাতার নির্যাস দিয়ে তিনি নিজেই রং তৈরি করেন।
🖌️ তুলি: ছাগলের লোম দিয়ে তৈরি করা হয় তাঁর তুলি। তাঁর মতে, এই ভেষজ রংই প্রকৃত বাংলার কথা বলে, হৃদয়ের কথা বলে। এর স্থায়িত্ব আর ঔজ্জ্বল্য আধুনিক রাসায়নিক রঙের চেয়ে অনেক বেশি।
দেশ-বিদেশে স্বীকৃতি
শম্ভু আচার্যের কাজ আজ কেবল মুন্সিগঞ্জের কালিন্দীপাড়ায় সীমাবদ্ধ নেই। তাঁর আঁকা পটচিত্র স্থান পেয়েছে ব্রিটিশ মিউজিয়াম, ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়াম (লন্ডন), জাপানের শিতামাসি জাদুঘর এবং চীনের সাংহাই জাদুঘরে। দেশের বরেণ্য শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, মুর্তজা বশীররাও তাঁর কর্মশালায় ছাত্র হিসেবে বসে তাঁর কাছ থেকে দেশজ রঙের কৌশল শিখেছেন। তবে বর্তমান সময়ে এই শিল্পের মৌলিকত্ব নিয়ে তিনি কিছুটা শঙ্কিত। আজকাল অনেকেই এক্রাইলিক রং ব্যবহার করে পটচিত্রের নকল করছেন, যা এই প্রাচীন শিল্পের মাহাত্ম্য নষ্ট করছে। শম্ভু আচার্য চান না তাঁর ছবিতে নাগরিক জীবনের কৃত্রিমতা আসুক। তাই তিনি বড় বড় সুযোগ ত্যাগ করে আজও শিকড়ের টানে নিজের গ্রামেই পড়ে আছেন। দেশের বাইরে তাঁর প্রথম প্রদর্শনী হয়েছিল ১৯৯৮ সালে ইন্দোনেশিয়ায়।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পটে
🎨 বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ তাঁর শিল্পীজীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে তিনি তৈরি করেছেন একটি বিশাল পটচিত্র সিরিজ—মহাপুরুষের অন্তর্ধান: সহি শহীদ মুজিবনামা। ১৮৫৭ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ইতিহাসের নানা ঘটনাকে তিনি ২৪ খণ্ডে কয়েক হাজার ছবিতে ফুটিয়ে তুলেছেন।
পটের ভাষা যখন আন্তর্জাতিক মাধ্যম
শম্ভু আচার্য প্রমাণ করেছেন, শিল্পের কোনো সীমানা নেই। একবার চীনে গিয়ে এক অদ্ভুত সমস্যায় পড়েছিলেন তিনি। ভাষা না বোঝার কারণে রেস্তোরাঁয় পছন্দমতো খাবার পাচ্ছিলেন না। তখন তিনি বুদ্ধি করে কাগজে শুয়োর ও গরুর ছবি এঁকে তাতে ক্রস চিহ্ন দিলেন এবং ধানগাছ ও চিংড়ি মাছের ছবি এঁকে ইশারায় বুঝিয়ে দিলেন তিনি কী খেতে চান। ছবি দেখেই ওয়েটাররা সব বুঝে ফেলল এবং ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত হাজির করল। এই ঘটনাই প্রমাণ করে, চিত্রকলার ভাষা পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সর্বজনীন ভাষা।
ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা
এক সময় পটচিত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিল পটের গান বা পটুয়া সঙ্গীত। পটুয়ারা ছবি খুলে খুলে দেখাতেন এবং সেই গল্প গান আকারে বর্ণনা করতেন। কালের পরিক্রমায় এই ঐতিহ্য আজ প্রায় বিলুপ্তপ্রায় হয়ে গেছে।
ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বর্তমানে শম্ভু আচার্যের ছেলে ও মেয়েরাও পটশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ আচার্য পরিবারের দশম প্রজন্মও এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। চার শতাধিক বছরের এই পারিবারিক শিল্পধারা শুধু একটি শিল্প নয়, বরং বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং লোকঐতিহ্যের এক অমূল্য উত্তরাধিকার।
তুলির আঁচড়ে বেঁচে থাক বাংলার লোকজ প্রাণ
বাংলার লোকজ শিল্প ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি ধারা হলো পটচিত্র, আর সেই ঐতিহ্যকে যুগের পর যুগ ধরে বাঁচিয়ে রেখেছে মুন্সীগঞ্জের আচার্য পরিবার। প্রায় সাড়ে চারশ’ বছরের ধারাবাহিকতায় নবম প্রজন্মের শিল্পী শম্ভু আচার্য তাঁর পূর্বপুরুষদের শিল্পরীতি, প্রাকৃতিক রঙের ব্যবহার এবং লোকজ কাহিনিনির্ভর চিত্রভাষাকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরছেন। তাঁর পটচিত্রে যেমন ফুটে ওঠে পৌরাণিক আখ্যান, তেমনি দেখা যায় গ্রামীণ জীবনের সরল সৌন্দর্য, মানবিকতা এবং বাংলার সংস্কৃতির গভীর ছাপ। নিজস্ব মুনশিয়ানায় তিনি ঐতিহ্যবাহী গাজীর পটকে শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পরিচিত করে তুলেছেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই পারিবারিক শিক্ষালয় থেকে পাওয়া শিল্পবোধ এবং অকৃত্রিম নিষ্ঠাই তাঁকে এই উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। শম্ভু আচার্যের শিল্পকর্ম প্রমাণ করে যে লোকজ শিল্প কেবল অতীতের স্মৃতি নয়, বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই পটচিত্রের এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও প্রসারে তাঁর অবদান বাংলার শিল্পসংস্কৃতিতে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
