বরেন্দ্রভূমির শৌর্যবীর্যের নীরব সাক্ষীকালের সাক্ষী, গৌরবের প্রতীকনওগাঁর দিবর দিঘী ও দিব্যক জয়স্তম্ভ
বাংলাদেশের উত্তর জনপদের জেলা নওগাঁ। ধানের দেশ হিসেবে খ্যাত এই জেলাটি আসলে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের এক বিশাল খনি। পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার বা কুসুম্বা মসজিদের কথা আমরা সবাই জানি। আবার রবীন্দ্রস্মৃতি পতিসর কুঠিবাড়ির কথাও জানি। কিন্তু নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলার দিবর ইউনিয়নে এমন এক ঐতিহাসিক নিদর্শন লুকিয়ে আছে যা কেবল প্রাচীনই নয় বাঙালির শৌর্য-বীর্যের এক জীবন্ত দলিল।
সেটি হলো ঐতিহাসিক দিবর দিঘি এবং এর ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা বিশালাকার অখণ্ড পাথরের দিব্যক জয়স্তম্ভ। হাজার বছরের ইতিহাস, লোককথা, প্রত্নতাত্ত্বিক মতভেদ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সব মিলিয়ে উত্তরবঙ্গের অন্যতম আকর্ষণীয় ঐতিহাসিক স্থান। আজ থাকছে সেইসব কথা।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: কৈবর্ত বিদ্রোহ ও দিব্যকের উত্থান
এই স্তম্ভের ইতিহাস বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে একাদশ শতাব্দীতে। তখন বাংলায় পাল বংশের শাসন চলছে। পাল রাজা দ্বিতীয় মহিপাল ছিলেন একজন অযোগ্য এবং প্রজাপীড়ক শাসক। তাঁর শাসনামলে বরেন্দ্রভূমির (বর্তমান উত্তরবঙ্গ) মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। ঠিক সেই সময় ধীবর বা কৈবর্ত সম্প্রদায়ের নেতা দিব্যক (বা দিব্য) এক বিশাল গণবিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন।
ইতিহাসে এটি কৈবর্ত বিদ্রোহ নামে পরিচিত। ১০৭৫ থেকে ১১০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে সংঘটিত এই বিদ্রোহে দ্বিতীয় মহিপাল পরাজিত ও নিহত হন। বরেন্দ্রভূমি দখল করে দিব্যক সেখানে একটি স্বাধীন কৈবর্ত রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন। এই জয় ছিল সাধারণ মানুষের শক্তির বহিঃপ্রকাশ। আর সেই অভাবনীয় বিজয়কে স্মরণীয় করে রাখতেই দিবর দিঘির এই বিশাল জয়স্তম্ভটি নির্মাণ করা হয়েছিল বলে অধিকাংশ ঐতিহাসিকের ধারণা।
দিবর নামের উৎপত্তি
গবেষকদের মতে, ‘দিবর’ শব্দটির উৎপত্তি সংস্কৃত ‘ধীবর’ (কৈবর্ত) শব্দ থেকে। আবার ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম ধারণা করেন, ‘দিবর’ নামটি পাল রাজা দেবপালের নামের অপভ্রংশ হতে পারে। নামের এই ভিন্নমতই প্রমাণ করে, স্থানটি বহুস্তরীয় ইতিহাসের ধারক।
লোককথা ও জনশ্রুতি: এক রাতে তৈরি কি না
দিবর দিঘিটি প্রায় ৬০ বিঘা বা ২০ একর জমির ওপর অবস্থিত। দিঘিটি স্থানীয়দের কাছে কর্মকারের জলাশয় নামেও পরিচিত। লোকমুখে একটি চমৎকার কল্পকথা প্রচলিত আছে যে জনৈক বিষু কর্মা নামক এক বীর বা জিনের বাদশাহর হুকুমে মাত্র এক রাতেই এই বিশাল দিঘিটি খনন করা হয়েছিল।
বিজ্ঞানের যুগে এক রাতে এত বড় দিঘি খনন অসম্ভব মনে হলেও এই লোককথাটিই দিঘিটির প্রতি পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়িয়ে দেয়। দিঘির স্বচ্ছ নীল জলরাশি আর চারপাশের সবুজ বনভূমি বর্তমানে এক নয়নাভিরাম পরিবেশ তৈরি করেছে।
দিব্যক জয়স্তম্ভের স্থাপত্যশৈলী: অখণ্ড পাথরের বিস্ময়
দিবর দিঘির আসল রহস্য লুকিয়ে আছে এর ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা স্তম্ভটিতে। এটি কোনো সাধারণ ইটের তৈরি মিনার নয় একটি অখণ্ড (এক টুকরো) বিশাল গ্রানাইট পাথর কেটে এটি তৈরি করা হয়েছে। স্তম্ভটির গঠনশৈলী অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং বিজ্ঞানসম্মত। এত বড় অখণ্ড গ্রানাইট পাথরের স্তম্ভ বাংলাদেশে বিরল। বিস্ময়কর বিষয় হলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকলেও স্তম্ভটি আজও সোজা ও অটল অবস্থায় রয়েছে।
- উচ্চতা ও গভীরতা: স্তম্ভটির মোট উচ্চতা প্রায় ৩১ ফুট ৮ ইঞ্চি। এর মধ্যে পানির নিচে থাকে প্রায় ৬ ফুট ৩ ইঞ্চি এবং পানির ওপরে দৃশ্যমান অংশ প্রায় ২৫ ফুট ৫ ইঞ্চি। তবে ঋতুভেদে পানির উচ্চতা বাড়া-কমার সাথে এর দৃশ্যমান অংশের পরিবর্তন হয়। কিছু তথ্যমতে এটি মাটির গভীরেও প্রায় ১০-১১ ফুট প্রোথিত আছে।
- আকৃতি: এটি আটকোণ বিশিষ্ট একটি স্তম্ভ। প্রত্নতত্ত্ববিদ আলেকজান্ডার কানিংহামের মতে এর কোণ ৯টি। প্রতিটি কোণের মাপ প্রায় ১২ থেকে ১৫ ইঞ্চি।
- অলঙ্করণ: স্তম্ভের উপরিভাগ অত্যন্ত নান্দনিক। এর ওপরের অংশে তিনটি বলয়াকারের স্ফীত রেখা এবং একদম মাথায় মুকুট বা আমলকের মতো কারুকার্য রয়েছে, যা দূর থেকে দেখলে অনেকটা মিনারের মতো মনে হয়।
- লিপিহীন রহস্য: এই স্তম্ভের সবচেয়ে বড় রহস্য হলো এর গায়ে কোনো লিপি বা লেখা নেই। সাধারণত রাজারা তাদের বিজয়গাথা পাথরে খোদাই করে রাখতেন, কিন্তু এখানে কেন কোনো লেখা নেই তা আজও এক অমীমাংসিত প্রশ্ন।
নির্মাণের উদ্দেশ্য নিয়ে বিতর্ক
ইতিহাসবিদদের মধ্যে এই স্তম্ভ নির্মাণের উদ্দেশ্য নিয়ে তিনটি প্রধান মতবাদ রয়েছে:
- বিজয় স্মারক: কৈবর্ত নেতা দিব্যক রাজা দ্বিতীয় মহিপালকে পরাজিত করার স্মরণে এটি নির্মাণ করেন। ঐতিহাসিক দীনেশ চন্দ্র সেন তাঁর ‘বৃহৎ বঙ্গ’ গ্রন্থে এই মতকে সমর্থন করেছেন।
- রামপালকে পরাজয়: পাল রাজা রামপাল যখন বরেন্দ্রভূমি উদ্ধারে এসে দিব্যকের কাছে পরাজিত হন, সেই সাফল্যকে ধরে রাখতে এটি নির্মিত হয়।
- ভীমের শ্রদ্ধাঞ্জলি: দিব্যকের পর তাঁর ভাই রুদ্রক এবং পরবর্তীতে ভাগ্নে ভীম রাজা হন। অধ্যাপক শিরিন আখতারের মতে, ভীম তাঁর পিতৃব্য দিব্যকের স্মৃতি রক্ষার্থে এই স্তম্ভটি তাঁর নামে উৎসর্গ করেন।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বর্তমান অবস্থা
বর্তমানে দিবর দিঘিটি নওগাঁ জেলা প্রশাসনের অধীনে রয়েছে। দিঘির দুই পাশে সুন্দর শানবাঁধানো ঘাট এবং পর্যটকদের হাঁটার জন্য ইটের পথ তৈরি করা হয়েছে। দিঘির মাঝখানে গিয়ে স্তম্ভটি দেখার জন্য ইঞ্জিনচালিত নৌকার ব্যবস্থা আছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, দিঘিতে মাছ চাষের কারণে পানির স্বচ্ছতা নষ্ট হচ্ছে এবং স্তম্ভের গোড়া ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
দিবর দিঘিটি নওগাঁ শহর থেকে প্রায় ৫২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো হওয়ায় প্রতিদিন শত শত পর্যটক এখানে ভিড় করেন। বিশেষ করে শীতকালে বনভোজনের জন্য এটি একটি চমৎকার জায়গা। এর চারপাশের সামাজিক বনায়ন এলাকাটিকে আরও স্নিগ্ধ ও শীতল করে তুলেছে।
কেন দেখবেন দিবর দিঘি?
আপনি যদি ইতিহাসের ছাত্র হন কিংবা প্রাচীন স্থাপত্যের অনুরাগী, তবে এই অখণ্ড গ্রানাইট স্তম্ভটি আপনাকে মুগ্ধ করবেই। এটি কেবল একটি পাথরের খণ্ড নয়, এটি হাজার বছর আগের বাঙালির যুদ্ধের কৌশল, স্থাপত্য জ্ঞান এবং বিজয়ের প্রতীক। মাটির নিচে শত শত বছর ধরে বিন্দুমাত্র না হেলে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্তম্ভটি আমাদের পূর্বপুরুষদের কারিগরি দক্ষতার এক বড় প্রমাণ।
দিবর দিঘী ও দিব্যক জয়স্তম্ভ ভ্রমণ গাইড
- কিভাবে যাবেন: ঢাকার কল্যাণপুর, গাবতলী, আব্দুল্লাহপুর থেকে এসআর, শ্যামলী, হানিফ কিংবা মৌ এন্টারপ্রাইজের এসি/নন-এসি বাসে নওগাঁ যাওয়া যায়। বাসভেদে এসব এসি/নন-এসি বাসের ভাড়া লাগবে ৬৮০ টাকা থেকে ১৪০০ টাকা।
- নওগাঁ জেলা থেকে ৫২ কিলোমিটার দূরে এবং পত্নীতলা সদর থেকে ১৩ কিলোমিটার পশ্চিমে দিবর ইউনিয়নে এই জয়স্তম্ভটি অবস্থিত। নওগাঁ থেকে নজিপুর-সাপাহার হাইওয়ে দিয়ে সামনে আগালেই দিবর দিঘীর দক্ষিণ পাশে দিব্যক জয়স্তম্ভ দেখতে পাওয়া যায়।
- কোথায় থাকবেন: নওগাঁতে রাত্রিযাপনের জন্য বেশ কিছু বেসরকারি আবাসিক হোটেল রয়েছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: হোটেল প্লাবন, হোটেল যমুনা, হোটেল অবকাশ, মল্লিকা ইন, হোটেল ফারিয়াল, হোটেল রাজ ইত্যাদি।
- কোথায় খাবেন: পত্নীতলা উপজেলায় সাধারণ মানের বেশ কিছু খাবারের দোকান রয়েছে। এছাড়া নওগাঁর গোস্তহাটির মোড়ে খাবারের কয়েকটি ভালো মানের রেস্তোরাঁ পাওয়া যাবে।
বাঙালির শৌর্যবীর্যের অবিনাশী স্মারক
দিবর দিঘির এই ‘রহস্যময়’ স্তম্ভটি আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর সঠিক সংরক্ষণ এবং প্রচার করা গেলে এটি হতে পারে উত্তরবঙ্গের অন্যতম সেরা পর্যটন কেন্দ্র। তাই সময় সুযোগ পেলে একবার ঘুরে আসতে পারেন নওগাঁর পত্নীতলা থেকে।
ইতিহাসের পাতায় কৈবর্তদের যে বীরত্বের কথা লেখা আছে, তার চাক্ষুষ প্রমাণ এই দিব্যক জয়স্তম্ভ আপনাকে নিরাশ করবে না। হাজার বছরের পুরোনো এই স্তম্ভ আজও যেন বলছে “আমি বিজয়ের স্মারক, আমি ইতিহাসের প্রহরী।
কালের সাক্ষী, গৌরবের প্রতীক
দিবর দিঘির শান্ত জলরাশি আর তার বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা দিব্যক জয়স্তম্ভ কেবল পাথরের কোনো প্রাচীন কাঠামো নয়; এটি বাংলার অবহেলিত, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের এক অবিনাশী স্মারক। হাজার বছর আগে প্রজাপীড়ক শাসকের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের যে বজ্রকণ্ঠ জেগে উঠেছিল, এই স্তম্ভ তারই এক নীরব কিন্তু জোরালো ঘোষণা।
প্রযুক্তির ছোঁয়া ছাড়া কেবল অখণ্ড পাথর কেটে এমন এক বিস্ময় তৈরি করা আমাদের পূর্বপুরুষদের উন্নত কারিগরি দক্ষতারই প্রমাণ দেয়। নওগাঁর এই অনন্য প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন যথাযথ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও বৈজ্ঞানিক সংরক্ষণ। মাছ চাষের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে দিঘিটিকে মুক্ত করা এবং এর পর্যটন সুবিধা আরও উন্নত করা গেলে, এটি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।
ইতিহাস ও প্রকৃতির এই অপূর্ব মেলবন্ধন আমাদের মনে করিয়ে দেয় বাঙালি কখনো অন্যায় মেনে নেয়নি, যুগে যুগে বুক চিতিয়ে লড়াই করেছে। তাই ইতিহাসের এই জীবন্ত দলিলকে সচক্ষে দেখতে এবং হাজার বছরের প্রাচীন বিজয়ের স্বাদ নিতে জীবনের কোনো এক অবসরে দিবর দিঘির পাড়ে দাঁড়ানো প্রতিটি বাঙালির জন্য এক অন্যরকম অনুভূতির খোরাক জোগাবে।
