হেনা ইসলাম: দ্রোহ, প্রেম ও সময়চেতনার এক কিংবদন্তি গীতিকবি
বৃহত্তর চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে যাঁদের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয় গীতিকার হেনা ইসলাম তাঁদের অন্যতম। মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী সময়ের উত্তাল রাজনৈতিক-সামাজিক বাস্তবতায় তাঁর কলম থেকে জন্ম নিয়েছে শত শত গান। কখনও রণাঙ্গনের দ্রোহে উজ্জীবিত, কখনও নিভৃত প্রেম ও মানবিক অনুভূতিতে স্নিগ্ধ। হেনা ইসলামের গানের শক্তি ছিল তাঁর সময়চেতনা। মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং স্বাধীনতার পর সমাজ বদলের স্বপ্নে তিনি লিখেছেন প্রতিবাদের গান। আবার মানুষের হৃদয়ের গভীর অনুভূতিকে স্পর্শ করে লিখেছেন প্রেমের গান। একসময় বেতার কেন্দ্র, ক্যাম্পাস কিংবা সাংস্কৃতিক আসরে ঘুরেফিরে গাওয়া হতো এই গীতিকার-মুক্তিযোদ্ধার গান। তাঁর গান ছিল আন্দোলনের প্রেরণা আবার ব্যক্তিগত অনুভবের আশ্রয়। বাংলাদেশের ব্যান্ড সঙ্গীতের শুরুর দিকের অনেক কালজয়ী গানই তার কলম থেকে আসা। জনপ্রিয় ব্যান্ড সোলস (Souls) এর জনপ্রিয় গান কলেজের করিডোরে, দরগায় মোম দিলে কী হবে কিংবা ফরেস্ট হিলের এক দুপুরের মতো গানগুলো আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে গেঁথে আছে। কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চুর প্রথম একক অ্যালবাম রক্ত গোলাপ এর টাইটেল সহ আরও চারটি গানের কথা ছিল হেনা ইসলামের লেখা। আজকে থাকছে কালজয়ী গীতিকবি হেনা ইসলামকে নিয়ে কিছু কথা ।
এক নজরে হেনা ইসলাম: সংক্ষিপ্ত পরিচয়
হেনা ইসলাম কেবল একজন গীতিকার ছিলেন না তিনি ছিলেন সময়কে ধারণ করা এক কালজয়ী শিল্পী। তার সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত নিচে তুলে ধরা হলো:
- প্রকৃত নাম ও ডাকনাম: তার ভালো নাম ছিল আজিজুল ইসলাম এবং প্রিয়জনদের কাছে তিনি বাদশা নামে পরিচিত ছিলেন।
- জন্ম ও প্রয়াণ: তিনি ১৯৪৬ সালের ১১ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন এবং ২০০০ সালের ২৭ ডিসেম্বর এই গুণী শিল্পী পরলোকগমন করেন।
- মুক্তিযোদ্ধা ও গীতিকার: তিনি ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এবং পরবর্তী সময়ে তিনি শত শত গান রচনা করেছেন। তার গান একসময় বেতার কেন্দ্র এবং চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল।
- কাব্যপ্রতিভা: তার কলমে রণাঙ্গনের দ্রোহ ও বিপ্লবের গান যেমন প্রাণ পেয়েছে, তেমনি প্রেম ও প্রকৃতির নিবিড় অনুভূতিগুলোও সমানভাবে ফুটে উঠেছে।
- রাজনৈতিক ও সামাজিক দর্শন: তিনি বিশ্বাস করতেন সমাজ পরিবর্তনের রাজনীতিতে। তার গানের প্রতিটি ছত্রে মানবিক মূল্যবোধ, সাম্য ও শোষিত মানুষের অধিকারের কথা প্রতিধ্বনিত হয়েছে।
গীতি কবি হেনা ইসলামের কালজয়ী দশটি গানের লিরিক্স
১. রাত কত রাত জানিনা ( আইয়ুব বাচ্চু)
২. রক্ত গোলাপ (আইয়ুব বাচ্চু)
৩. সারাঘর জুড়ে কান্ন আমার (আইয়ুব বাচ্চু)
৪. বুকের আগুন (আইয়ুব বাচ্চু)
৫. দরগাহে মোম জ্বেলে কি হবে (সোলস)
৬. মনে কর (সোলস)
৭. ফরেস্ট হিলে এক দুপুরে (সোলস)
৮. কলেজের করিডোরে (সোলস)
৯. এখন আমি সুখে আছি (সোলস)
১০. চাঁদ এসে উঁকি দিল জানালায় (সোলস)১. রাত কত রাত জানি না
কথা: হেনা ইসলাম
কন্ঠ: আইয়ুব বাচ্চু
অ্যালবাম: রক্ত গোলাপ (১৯৮৬)
রাত কত রাত জানিনা
ভীরু পায়ে তুমি এলে ভুবনে আমার।
মায়াময় রাত জোছনার আলো ছড়ানো
তোমার সুখের মাধুরী চোখে জড়ানো
পলক পড়েনা তাই
ভালোবাসা তুমি যে আমার।
ঘুমে জাগরণে বারেবারে তুমি এসে
হিয়ারও বাধনে বেঁধেছ যে হেসে হেসে
মরেছি তোমার প্রেমে
ভালোবাসা তুমি যে আমার।।
২. রক্ত গোলাপ
কথা: হেনা ইসলাম
কন্ঠ: আইয়ুব বাচ্চু
অ্যালবাম: রক্ত গোলাপ (১৯৮৬)
রক্ত গোলাপ ছিল হৃদয়ে
এখন সেখানে শুনি হাহাকার
বৃষ্টির মতো রক্ত ঝরে
শুনবে সেখানে গান কান্নার।
আকাশে কেটে যাওয়া ঘুড়ির মতো
মনে হয় আমি বড় একাকী
অসহায় চোখ নিয়ে চেয়ে দেখি
সুবিশাল আকাশের পারাপার।
রাতেরও ভূবন জুড়ে ঘুরে ঘুরে
পাড়াগাঁর আমি যেন জোনাকি
বুকেরও আগুন জ্বলে থেকে থেকে
সে আলোকে পথ চলি আঁধারে।।
৩. সারাঘর জুড়ে কান্না আমার
কথা: হেনা ইসলাম
কন্ঠ: আইয়ুব বাচ্চু
অ্যালবাম: রক্ত গোলাপ (১৯৮৬)
সারাঘর জুড়ে কান্না আমার
বাঁশির মতো বাজে
জোছনার আলো হারিয়ে গেছে
আঁধার ঘরের মাঝে।
খুঁজে বেড়াই সেই
পলাতক ভালবাসা
আঘাতের উপসম দিয়ে
যে গেছে হারিয়ে
অশ্রু ঝরিয়ে দিয়ে
নিশীথ আঁধারেই।
আকাশে বাতাসে তা
স্মৃতি গুলো পাখি হয়ে
বেদনার সুবাস দিয়ে
আমাকে কাঁদায়ে
কাঁদায় আমায় মোরে
নিশীথ আঁধারেই।।
৪. বুকেরও আগুন দিয়ে
কথা: হেনা ইসলাম
কন্ঠ: আইয়ুব বাচ্চু
অ্যালবাম: রক্ত গোলাপ (১৯৮৬)
বুকেরও আগুন দিয়ে
আমাকে জ্বালিয়ে তুমি
সুখের বাসর গড়েছ
পোড়ানো হৃদয় তাই
প্রেমেরও প্রদীপ জ্বেলে রেখেছি।
কি হবে জানিনা ভাঙা মন নিয়ে
বেঁচে থেকে বেদনা বয়ে
তবুও তুমি সুখি থাক
আমিতো তোমার
বুকের আগুনে জ্বলে মরেছি।
আমার মরণ যদি আলো হয়ে জ্বলে
তাই নিয়ে সুখে থাক সে আলো তোমার
যুগ যুগ গান গেয়ে যাব
আমিতো আমার
মরণ নিজেই খুঁজে নিয়েছি।।
৫. দরগাহে মোম জ্বেলে কি হবে
কথা: হেনা ইসলাম
কন্ঠ: তপন চৌধুরী
ব্যান্ড: সোলস
অ্যালবাম: সুপার সোলস (১৯৮২)
দরগাহে মোম জ্বেলে কি হবে
মিথ্যে ফকির সেজে কি হবে
অন্তর যদি না হয় সুন্দর
বিফল হবে সাধনা কি হবে
কি হবে কি হবে কি হবে।
দেশে দেশে হায় ঘুরে ফিরে
হবে ছাড়া এক ভুল পথে
খুঁজে মর খুঁজে মর মাজার খোলা মনে
মিথ্যে ফকির সেজে সেজেই।
ঘর ছেড়ে হায় পথে পথে
তারে খোজ এক দোষী মনে
সেই জন সেই জন রয়েছে অন্তরে
সাদা মনে তারে খোঁজ পাবে পাবেই।।
৬. মনে কর
কথা: হেনা ইসলাম
কন্ঠ: তপন চৌধুরী
ব্যান্ড: সোলস
অ্যালবাম: কলেজের করিডোরে (১৯৮৪)
মনে করো মনে করো
এখন অনেক রাত
পৃথিবী ভীষণ ক্লান্ত
মনে করো ঘুমে বিভোর
কেউ জেগে নেই
শুধু তুমি আর আমি।
আকাশের রুপলী চাঁদ মায়াময়
কিছু আলো নদীর জলে ঝিকিমিকি
স্বপ্নে বিভোর হই দুজনায়
শুধু তুমি আর আমি।
ঠিকানা বিহীন হয়ে সারারাত
আলো জল নদির জলে ঢেউ গুলি
নৌকো ভাসিয়ে দেই দুজনায়
শুধু তুমি আর আমি।
৭. কলেজের করিডোরে
কথা: হেনা ইসলাম
কন্ঠ: তপন চৌধুরী
ব্যান্ড: সোলস
অ্যালবাম: কলেজের করিডোরে (১৯৮৪)
কলেজের করিডোরে দেখেছি
চোখদুটি ছিলো যার সুন্দর
মোনালিসা হাসি দিয়ে বেঁধেছে
সে যে এই বিরহের অন্তর।
আলাপের প্রয়োজনে একদিন
শিরীষ গাছের নিচে দাড়িয়ে
নির্জনে একা পেয়ে বললাম
লজ্জার আবরন সরিয়ে
তুমি তো বোঝালে
জীবনের মানে কত সুন্দর।
দুপুরের খর রোদে সেই চোখ
দীঘির জলের মত শান্ত
দু\’জনেই মুখোমুখি দাড়িয়ে
মুখে নেই নেই কোন শব্দ
তুমি তো হারালে
আমাকে দিয়ে কিছু রোদ্দুর।।
৮. ফরেস্ট হিলে
কথা: হেনা ইসলাম
কন্ঠ: তপন চৌধুরী
ব্যান্ড: সোলস
অ্যালবাম: কলেজের করিডোরে (১৯৮৪)
ফরেস্ট হিলে এক দুপুরে
কথা ছিলো তুমি আসবে
সব চোখ ফাঁকি দিয়ে
বুকে ভালোবাসা নিয়ে
আসবে আমায় ভালোবাসবে।
অনেক প্রহর নিঃসঙ্গ
সাঁওতালী গানের সুরে
কাটিয়ে দিলাম তোমায় ভেবে
ঝাউ মহুয়ার বনে
কথা দিয়ে তুমি এলে না যখন
এখন আমার কি হবে
বিষন্নতা সঙ্গী এখন
দুঃখ গলার মালা
তোমার স্মৃতিগুলো আগুন হয়ে
বাড়ায় বুকেরই জ্বালা
হায় তুমি ছাড়া জীবন আমার
এখন বাঁচি কিভাবে।।
৯. এখন আমি সুখে আছি
কথা: হেনা ইসলাম
কন্ঠ: তপন চৌধুরী
ব্যান্ড: সোলস
অ্যালবাম: মানুষ মাটির কাছাকাছি (১৯৮৭)
এখন আমি সুখে আছি
সুখি আমার এই মনটা
শুভ্র ফুলের ভালবাসায়
হৃদয়ে রজনীগন্ধা।
দিন যায় মাস যায়
খুশির জোয়ারে ভেসে
কথার নূপড়ে উদাস দুপুরে
হারিয়ে পথের শেষে
ছড়াবো কুসুম ভালবাসা
হৃদয়ে রজনীগন্ধা।
কিছু গান কিছু সুর
বাতাসে ছড়িয়ে দিয়ে
সুখের দোলাতে ফুলের মেলাতে
হৃদয়ে ভরিয়ে দিলে
হারাবো দু’জন ভালবাসা
হৃদয়ে রজনীগন্ধা।
১০. চাঁদ এসে উঁকি দিল জানালায়
কথা: হেনা ইসলাম
কন্ঠ: তপন চৌধুরী
ব্যান্ড: সোলস
অ্যালবাম: ইস্ট এন্ড ওয়েস্ট (১৯৮৮)
চাঁদ এসে উঁকি দিল জানালায়
ভালবাসা যেন ছুঁয়েছে আমায়।
মাঝরাতে ঘুম চোখে
চেয়ে দেখলাম ভীরু মনে তার
হাতে হাত রাখলাম
কত যে পথ ঘুরে
কত যে নদী ছেড়ে
নিয়ে এল চাঁদ জানি না কোথায়।
কত সুখ ফুল হয়ে
জড়ে মন পিয়াল জোছনা আলো যেন
বৃষ্টি হয়ে মাতাল
চাঁদ আমি দুজনে
কেটে গেল স্বপনে
নিয়ে এল চাঁদ জানি না কোথায়।
হেনা ইসলাম ছিলেন এমন একজন গীতিকবি, যাঁর সৃজনশীলতা সময়ের সীমা অতিক্রম করে আজও প্রাসঙ্গিক। মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা-পরবর্তী সমাজবাস্তবতা সবকিছুকেই তিনি ধারণ করেছেন তাঁর গানে। দ্রোহ ও প্রেম, প্রতিবাদ ও মানবিকতা এই দুই বিপরীত স্রোতকে তিনি এক সুতোয় বেঁধে গড়ে তুলেছিলেন এক অনন্য গীতিসত্তা। ব্যক্তি হিসেবে তিনি যেমন ছিলেন সমাজ পরিবর্তনে বিশ্বাসী, তেমনি শিল্পী হিসেবে ছিলেন মানুষের অনুভূতির বিশ্বস্ত ভাষ্যকার। তাই হেনা ইসলাম শুধু বৃহত্তর চট্টগ্রামের নয়, বাংলা গানের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য নাম যাঁকে স্মরণ করা মানেই একটি সময়, একটি আদর্শ এবং একটি সংগ্রামী সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে স্মরণ করা।
