হে ক্যানেসা : গুরু আজম খানের পপ চেতনায় আন্দিজের ট্রাজেডির গান

বাংলাদেশের পপ সংগীতের ইতিহাসে যে নামটি সর্বপ্রথম উচ্চারিত হয় তিনি আমাদের সম্রাট পপ সম্রাট গুরু আজম খান। পুরো নাম মোহাম্মদ মাহবুবুল হক খান। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি ঢাকা উত্তরের সেকশন কমান্ডার হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সংগীতকে ভালোবেসেই তিনি গড়ে তোলেন ব্যান্ডদল উচ্চারণ। ১৯৭২ সালে বিটিভিতে সরাসরি প্রচারিত তাঁর প্রথম এত সুন্দর দুনিয়ায় কিছুই রবে না এবং চার কালেমা সাক্ষী দেবে হযরতের উম্মত। আর এর মাধ্যমে বাংলা ব্যান্ড সংগীত নতুন পরিচয় পেয়ে যায়। নটরডেম কলেজে ১৯৭২ সালে প্রথমবারের মতো দর্শকের সামনে গান করেন তিনি। ১৯৭৩ সালের ১ এপ্রিল ওয়াপদা মিলনায়তনে দেশের প্রথম বড় কনসার্টেও ছিলেন তিনি। তাঁর গান ফ্যাশন স্টাইল ও স্বকীয়তায় বদলে দিয়েছিলো দেশের সংগীতধারার দিক। বীর মুক্তিযোদ্ধা একজন অগ্রপথিক এবং ব্যান্ড সংগীতের পথিকৃত বাংলাদেশ যতদিন থাকবে তাঁর সুর বেঁচে থাকবে মানুষের হৃদয়ে। আজকে মূলত গুরুকে স্মরন নয় গুরুর একটি গান নিয়ে কথা।

গুরু আজম খান নিজে যেমন সহজ সরল জীবন যাপন করতেন। তাঁর গান গুলো তাঁর গানের কথা গুলিও খুব সহজ এবং সরল উপস্থাপন। তাঁর গান গুলোর মূল বিষয় গুলোতে দেখা যায় সময়, সমাজ, মানবিকতা ও সংগ্রামের ভাষা। এমনই ব্যতিক্রমী এক সৃষ্টি হলো হে ক্যানেসা যা ১৯৭২ সালের বিশ্ববিখ্যাত আন্দিজ বিমান দুর্ঘটনা এবং সেখানে মানবিক শক্তি ও বেঁচে থাকার মহাকাব্যিক গল্প থেকে নেওয়া বলতে ঐ পুরো ট্রাজিক গল্পটাই গানে আছে। ১৯৮২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম ক্যাসেট ‘এক যুগ’ অ্যালবামে ছিল গানটি। গানের আগে সেই ট্রাজেডিক গল্পটা বলি।


১৯৭২ সালের সে অক্টোবর মাসটি ছিল একদল তরুণ রাগবি খেলোয়াড়ের জন্য শুধু খেলায় অংশ নিতে চিলি ভ্রমণের আনন্দই নয় ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়েও ভরপুর। চিলির রাগবি ক্লাব ওল্ড বয়েজ এর আমন্ত্রণে উরুগুয়ের ওল্ড ক্রিশ্চিয়ানস ক্লাব মন্টেভিডিও থেকে আকাশে উড়ল উরুগুয়ে বিমানবাহিনীর চার্টার করা ফেয়ারচাইল্ড এফ-২২৭-৫৭১ বিমানে। বিমানটিতে খেলোয়াড় সমর্থক বন্ধু সহ মোট ৪৫ জন যাত্রী। সামনে তাদের গন্তব্য চিলির রাজধানী সান্তিয়াগো। ১২ অক্টোবর প্রথম যাত্রা-বিরতি শেষে পরদিন ১৩ অক্টোবর বিমানটি আবার উড়ে আর্জেন্টিনার বুয়েন্স আয়ার্স থেকে। কিন্তু আন্দিজ পর্বতমালার ভয়ানক আবহাওয়ায় পাইলট ভুল হিসাব করেন। আকাশে বাড়তে থাকে ঝোড়ো হাওয়া। দৃষ্টিসীমা কমে আসে আর এর মধ্যেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিমানটি ভয়াবহ শব্দে আছড়ে পড়ে আন্দিজ পর্বতমালার ১১ হাজার ফুট উচ্চতায়, আর্জেন্টিনা চিলি সীমান্তের কাছে। আন্দিজ হচ্ছে বিশ্বের দীর্ঘতম স্থলভাগের পর্বতমালা। যা দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম প্রান্ত ধরে প্রায় ৭,০০০ কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত। উত্তরে ভেনেজুয়েলা থেকে শুরু হয়ে কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, পেরু, বলিভিয়া, চিলি ও আর্জেন্টিনা পর্যন্ত প্রসারিত এই পর্বতশ্রেণি পৃথিবীর অন্যতম উচ্চতম পর্বতাঞ্চল। বিমান দূর্ঘটনার সাথে সাথে ১২ জন মারা যান। পরদিন আরও ৫ জন। বেঁচে থাকা যাত্রীরা আটকা পড়েন হিমশীতল নিঃসঙ্গ বরফাচ্ছন্ন আন্দিজের মৃত্যু উপত্যকায়। অলৌকিকভাবে বেঁচে থাকা কয়েকজন। ছিন্নভিন্ন বিমানের ভেতরেই বুঝে যায় এখন তাদের সামনে শুধু একটাই লক্ষ্য বেঁচে থাকা। শুরু হয় তাদের বেঁচে থাকার সংগ্রাম।


আঘাত এতটাই প্রচণ্ড ছিল যে মুহূর্তেই ১২ জন মারা গিয়েছিলেন। আহতদের কাতর আর্তনাদে কেঁপে ওঠে বরফে মোড়া নির্জন পাহাড়। পরদিন সকালেই আরও পাঁচজন চলে যান মৃত্যুর কোলে। অলৌকিকভাবে বেঁচে থাকা মানুষ, ছিন্নভিন্ন বিমানের ভেতরেই বুঝে যায় এখন তাদের সামনে শুধু একটাই লক্ষ্য বেঁচে থাকা বেঁচে ফেরা। চারদিকে যতদূর চোখ যায় শুধু বরফ আর পাহাড়। নেই কোনো খাবার, নেই কোনো উষ্ণতা, নেই কোনো আশ্রয়। খুব অল্প কিছু খাবার মজুদ ছিল যা কয়েক দিনের মধ্যেই ফুরিয়ে যায়। তীব্র শীতে, ক্ষুধায় কাঁপতে কাঁপতে যাত্রীদের সামনে আসে সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত বেঁচে থাকতে হলে মৃত বন্ধুদের মাংস খেতে হবে। মানসিক যন্ত্রণা, দ্বিধা, অপরাধবোধ সব ছাপিয়ে যায় প্রাণ রক্ষার মৌলিক আকুতি। এই অমানবিক পরিস্থিতির মাঝে দৃঢ় নেতৃত্ব দেখান দুই তরুণ নান্দো প্যারাডো ও রবার্তো ক্যানেসা। তারা বুঝেছিলেন, বসে থাকলে মৃত্যু অবধারিত। তাই প্রস্তুতি নিলেন অসম্ভব এক যাত্রার। বরফঢাকা ১২ হাজার ফুট উঁচু পথ পায়ে হেঁটে পার হতে হবে সভ্যতার খোঁজে। ১৯৭২ সালের ১২ ডিসেম্বর ৬০ দিনের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের পর দুজন শুরু করলেন তাদের মহাযাত্রা।তীব্র ঠান্ডা, ঝড়ো বাতাস, খোলা আকাশের নিচে রাত সব কিছুকে জয় করে টানা ১২ দিন পাহাড়ে হাঁটলেন তারা। শেষমেশ দেখা পেলেন সার্জিও কাতালান নামে চিলির এক কৃষকের। তাঁর সাহায্যেই তারা পৌঁছান নিকটবর্তী গ্রাম ও পুলিশ ফাঁড়িতে। তারপরই খবর যায় চিলির সেনাবাহিনীর কাছে। পাঠানো হয় উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার। ৭২ দিন পর বরফাবৃত মৃত্যুপাহাড় থেকে উদ্ধার করা হয় জীবিত থাকা ১৬ জনকে। এক অভূতপূর্ব মানবিক শক্তি সাহস টিকে থাকার প্রবল আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে ওঠে এই উদ্ধার। রবার্তো ক্যানেসা ও নান্দো প্যারাডো নিজেদের জীবন বাজি রেখে সেদিন শুধু নিজেদের নয় পুরো দলের জীবন বাঁচিয়ে এনেছিলেন। এই ঘটনা পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে পরিচিত হয় মিরাকল অফ দ্য আন্দিজ নামে। মানব ইতিহাসে টিকে থাকার সবচেয়ে অসম্ভব, হৃদয়বিদারক এবং অনুপ্রেরণাদায়ক ঘটনাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। এই গল্প নিয়ে সিনেমা হয়েছে গল্প উপন্যাস লেখা হয়েছে। সেবা প্রকাশনীর বই প্রকাশিত হয়েছিল আন্তেজে বন্দি নামে।


গুরু আজম খান এই গানটি বলা যায় মানবিকতার জয়গান। মৃত্যুর অন্ধকার থেকে আলো খোঁজার গল্প। বন্ধুত্ব, ত্যাগ ও মানবতার চরম রূপ আর অসম্ভবকে জয় করার শক্তি। 

হে ক্যানেসা  হে প্যারাডো 
কার্লি রদ্রিগেজ বেবি আর লিলিআন
সুসান আরাফ্রাজ সুসান আরাফ্রাজ।

রাগবির এক দল ছিল 
একদিন তার সবে চলছিল
উরুগুয়ে থেকে তারা চড়েছিল
রাগবি খেলতে চিল যাচ্ছিল
হঠাৎ সাদা এক ঝড় এসে
সুব সুখ ভেঙে দিল নিমিষে
ফেয়ার চাইল্ড ফেয়ার চাইল্ড
ফেয়ার চাইল্ড ফেয়ার চাইল্ড
ফেয়ার চাইল্ড ফেয়ার চাইল্ড।

তুষার ঘেরা ঐ আন্দিজে 
অন্ন পেলনা তারা খুঁজে খুঁজে
বন্ধু মৃত বন্ধুকে আহার করে
জীবন বাঁচালো
সেই তো আবার ফিরে এল
সুখে ভরা এই জগতে
ফেয়ার চাইল্ড ফেয়ার চাইল্ড
ফেয়ার চাইল্ড ফেয়ার চাইল্ড
ফেয়ার চাইল্ড ফেয়ার চাইল্ড।

ঈশ্বর নেমে এসেছিল
তারপর পথ খুঁজে পেয়েছিল
গিরিমালা তারা সবে পারিদিলো
সবুজ ঘাসের দেশ দেখা দিল
একটি কৃষক সেথা দাড়িয়ে
তাদের জীবন দিল ফিরিয়ে
ফেয়ার চাইল্ড ফেয়ার চাইল্ড
ফেয়ার চাইল্ড ফেয়ার চাইল্ড
ফেয়ার চাইল্ড ফেয়ার চাইল্ড।


সব শেষে বলি গুরু আজম খানের কণ্ঠে ক্যানেসা হয়ে ওঠে শুধু একটি চরিত্র নয় অসহায় মানুষের আশা, সংগ্রাম ও মুক্তির প্রতীক। বিশ্বের কোনো বাস্তব ট্র্যাজেডিকে এভাবে সংগীতে রূপ দেওয়ার নজির বাংলা সঙ্গীতে সত্যিই বিরল। আজম খান এই গানটির মাধ্যমে শুধু বীরত্বগাথাই বলেননি মানুষের সীমাহীন সম্ভাবনাকেও উচ্চারণ করেছেন। গুরু তোমায় সালাম।

--- বাউল পানকৌড়ি
কনসার্ট ফর ফাইটার্স ২০০৫ এবং একজন সঞ্জীব চৌধুরী--Click to Read
সমাজের প্রতিচ্ছবি আর প্রতিবাদের সুর--Click to Read
ইব্রাহিম আহমেদ কমল - পর্দার আড়ালে থেকে দেখি আমি সব--Click to Read

Read on mobile

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url