সঞ্জীব চৌধুরী ও ‘কনসার্ট ফর ফাইটার্স’: যেখানে গান হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদের বুলেট
দিনটি ছিল ২০০৫ সালের কোনো এক সন্ধা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে হাজার হাজার মানুষের ভিড়। ক্ষমতায় তখন বিএনপি-জামাত জোট সরকার। চারদিকে যখন ভয়ে সবাই কুঁকড়ে আছে, ঠিক তখনই মাইক্রোফোনের সামনে এসে দাঁড়ালেন সঞ্জীব চৌধুরী। তিনি কেবল গান গাইতে আসেননি, এসেছিলেন ক্ষমতাকে চোখে আঙুল দিয়ে সত্য বলতে। ‘আমার স্বপ্নেরই কথা বলতে চাই’ গানটির ফাঁকে ফাঁকে তিনি যেভাবে তাজুল ইসলাম হত্যা, কর্নেল তাহেরের ফাঁসি আর তৎকালীন আইনমন্ত্রীর ভণ্ডামিকে তুলে ধরেছিলেন, তা আজও বাংলাদেশের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ প্রতিবাদের উদাহরণ। সেই কালজয়ী বক্তব্য ও গানের শব্দগুলো পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো। সঞ্জীব চৌধুরী প্রেম, বিরহ, সমাজ, রাজনীতি, প্রতিবাদ, দ্রোহ এবং একজন বিপ্লবী। কবি, সাংবাদিক, গীতিকার, সুরকার এবং একজন গায়ক। জন্ম : ২৫ ডিসেম্বর ১৯৬৪ এবং মৃত্যু: ১৯ নভেম্বর ২০০৭।
কনসার্ট ফর ফাইটার্স ২০০৫ এবং একজন সঞ্জীব চৌধুরী:
২০০৫ সালে প্রথমবার অনুষ্ঠিত হয় ‘কনসার্ট ফর ফাইটার্স’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ত্রাসবিরোধী রাজু স্মারক ভার্স্কযের পাদদেশে যার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সঞ্জীব চৌধুরী। সময় ও সাল ছিলো ২০০৫ বিএনপি রাস্ট্রের ক্ষমতায় তাদের সঙ্গী জামাত ইসলাম। বিপ্লবী সঞ্জীব চোধুরী এই কনসার্টে তাঁর আমার স্বপ্নেরই কথা বলতে চাই গানটার সাথে গীতিকবিতার মিশ্রনে একটি বক্তব্য দিয়েছিলেন তৎকালীন রাজনৈতিক দল 'বিএনপি'-জামাত জোটের শাসন,উচ্ছৃঙ্খলা ও নানান অনৈতিক কার্যকলাপ নিয়ে কি ভয়ংকর সাহসী এক প্রতিবাদের ভাষা ব্যবহার করে ছিলেন সঞ্জীব চৌধুরী।
গান গীতিকবিতা ও বক্তব্যের কথাগুলো--
আমি ঘুরিয়া ঘুরিয়া সন্ধান করিয়াস্বপ্নের'ই পাখি ধরতে চাই
আমার স্বপ্নেরই কথা বলতে চাই
আমার অন্তরের কথা বলতে চাই....
এবার আমি বক্তিতা দিবো- ওরা বলে, ঐ গাড়িতে করে আমাদের জন্য খাদ্য ও পানীয় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে,আমাদের জন্য খাদ্য আর পানীয়। কিন্তু বিশ্বাস করুন বন্ধুগণ আমি জানি ঐ গাড়িতে আমাদের জন্য কোন খাদ্য ছিল না,আমাদের জন্য কোন পানীয় ছিল না। তিনশ'টি লাশ ঠান্ডা হিম, যাদের গুম করে ফেলা হবে। আমি বলতে চেয়েছিলাম সেই সমস্ত কথা আর তখনি আমার দিকে এগিয়ে আসে উদ্যত রাইফেল আমার পুলিশ বন্ধুরা কোথায় আমার দিকে এগিয়ে আসে উদ্যত বেয়নেট ওরা বলে,খামোশ! আমাকে চুপ করতে হয় বেয়নেটের খোঁচায় খোঁচায় আমাকে চুপ করিয়ে দেওেয়া হয়। বাংলা ভাই হাঁটে বাংলা ভাইকে কেউ ধরে না। আমি যখন বলি তখন আমাকে ধরে। আমি বলতে চেয়েছিলাম সেই সমস্ত কথা। আমার দিকে এগিয়ে আসে উদ্যত রাইফেল এগিয়ে আসে উদ্যত বেয়নেট তারপরেও, তবুও বন্ধুগন আমার বিবেক আপনাদের বিবেক
আমার স্বপ্নেরই কথা বলতে চাই
আমার অন্তরের কথা বলতে চাই
আমি ঘুরিয়া ঘুরিয়া সন্ধান করিয়া
স্বপ্নের'ই পাখি ধরতে চাই....
কি যে মরা পোড়া ঠাডার দেশ। অন্ধকার নেমে আসে, অন্ধকার নেমে আসে সারা বাংলাদেশ জুড়ে আর সেই অন্ধকারের ভেতর একজন তাজুল ইসলাম কে খুন করা হয়। জানেন তাজুল ইসলাম কে? আমাদের স্মরন শক্তি বড় কম। ঢাকা ইউনিভাসির্টতে ইকনোমিক্সের ফাস্ট ক্লাশ ফাস্ট। ঢাকা ইউনিভাসির্টিতে কখন চাকরি নেন নাই তিনি ছিলেন আদমজীতে তাকে এরশাদের গুন্ডা পান্ডারা পিটিয়ে মেরে ফেলেছিলো। তখন উপ-প্রধানমন্ত্রি কে ছিলেন আপনাদের কি মনে আছে? নাম বলেন- মওদুদ আহমেদ তিনি এখন আইন মন্ত্রি। খুবই ভাল আইন জানেন। তাকে ধরার জন্য ধর ধর এরশাদের চামচাগোরে ধর ছিলোনা ভুলে গেছেন সব কিছু। সেই মওদুদ আহমেদ এখন আমদেরকে আইন শিখান।
একজন তাজুল ইসলামকে পিটিয়ে মারা হয় তাকে খুন করা হয় স্বাক্ষি আদমজী। একজন ভালো মানুষ মাঝরাতে বাড়ি ফিরে এলো না। আমি বলতে চেয়েছিলাম সেই সমস্ত কথা আর তখনই আমার দিকে এগিয়ে আসে উদ্যত রাইফেল কোথায় আমার বন্ধুরা আমার পুলিশ বন্ধুরা কোথায়। আমাকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বেয়নট বিদ্ধ করা হয় কারন তারা বেতন ভুগ। উনারা কার পয়সাায় বেতন পায় আপনার আমার পয়সায় তেবন উনারা পায় এবং উনারাই আমাদেরকে মারেন। তারপরও বন্ধুগন আমি বলতে চেয়েছিলাম সেই সমস্ত কথা আর তখনি আমার দিকে এগিয়ে আসে উদ্যত রাইফেল আমার আমার দিকে এগিয়ে আসে উদ্যত বেয়নেট আর আপনরা কি বলেন খামোশ! পৃথিবীতে শান্তি রক্ষিত হোক। আমাদের আইন মন্ত্রি বলেন পৃথিবীতে শান্তি রক্ষিত হোক। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি কারীকে ধরিয়ে দিন। আমাকে চুপ করতে হয় আমাকে চুপ করিয়ে দেওেয়া হয়। তারপরও বন্ধুগণ...
আমার অন্তরের কথা বলতে চাই...
একটি ছেঁড়া সুটক্যাস কেমন ডান্ডি ডাইং হয়ে যায়। বিবেক কি বলে আপনার বিবেক কি বলে একটা ছেঁড়া সুটক্যাস থেকে ডান্ডি ডাইং হয়ে যায়। বলেন বলেন ! আরেকজন কর্নেল তাহেড়কে বন্ধি করা হয়। কে করছিলো কর্নেল তাহেড়কে বন্ধি। বলেন বলেন চিৎকার করে বলেন বিবেক দিয়ে বলেন নিজের মায়ের নামে শপথ নিজের মাটির নামে শপথ। বলেন এই মানুষটিকে কে খুন করছিলো বলেন, যদি না বলতে পাড়েন আমি গান না গেয়ে এখােন থেকে চলে যাবো আমি শুনতে পাইনা নামটা আবার বলেন। আর একজন কর্নেল তাহেড়কে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। আর একজন বসুনিয়া ঐ ঐ জায়গায় মুখ থুবড়ে পড়েজান। আমি কি কোন মিছা কথা কইলাম আমি কি কোন মিছা কথা কইলাম ভাইজান। আমি কোন মিছা কথা কই নাই স্বাক্ষি আপনার সবাই। আমি তো ঐ কথাই কইতে চাইছিলাম আর তখনি আমার দিকে এগিয়ে আসে উদ্যত বেয়নেট আমার দিকে এগিয়ে আসে উদ্যত রাইফেল ওরা বলে খামোশ। আমি নাকি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি কারী সো স্বরাস্ট্রমন্ত্রী কি বলেন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি কারীকে ধরিয়ে দিন।
আমার স্বপ্নেরই কথা বলতে চাই
আমার অন্তরের কথা বলতে চাই
আমি ঘুরিয়া ঘুরিয়া সন্ধান করিয়া
স্বপ্নের'ই পাখি ধরতে চাই।
সঞ্জীব চৌধুরী আমাদের শিখিয়ে গেছেন, শিল্পী মানে কেবল বিনোদনকারী নয়, শিল্পী মানে সমাজের বিবেক। "খামোশ" বলে দাবিয়ে রাখা শাসকদের মুখে দাঁড়িয়ে তিনি যেভাবে জনগনের ট্যাক্সের টাকায় চলা পুলিশের বেয়নেটকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলেন, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। আজ যখন আমরা তাঁর এই গানের কথাগুলো পড়ি বা তাঁর কণ্ঠ শুনি, তখন মনে হয় স্বপ্ন দেখার সাহসটুকু হারানো যাবে না। মওদুদ আহমেদ বা এরশাদের আমলের সেই অন্ধকার দিনের কথা তিনি ভুলে যাননি, আমাদেরও ভুলতে দেননি। তাজুল ইসলাম বা কর্নেল তাহেরের মতো মানুষদের আত্মত্যাগকে তিনি সুরের সুতায় গেঁথে অমর করে গেছেন। সঞ্জীব চৌধুরীর এই দ্রোহী সত্তা চিরকাল সত্যের পথে চলা মানুষদের প্রেরণা হয়ে থাকবে। তাঁর প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।
-- বাউল পানকৌড়ি
সঞ্জীব চৌধুরীর লেখা গান: সময়কে অতিক্রম করা সুর ও দ্রোহের লিরিক্স –পর্ব ১কফিল আহমেদ এর গানের কথা : পাখির ডানায় ঘাসফড়িংয়ের চোখে
