বাংলাদেশের দাবা খেলার গৌরবের প্রতীক: সম্মানিত গ্র্যান্ডমাস্টারদের তালিকা
বাংলাদেশে দাবার সূচনা ঘটে স্বাধীনতার পরপরই। ঢাকার বিভিন্ন ক্লাবে তখন দাবা খেলা জনপ্রিয় হতে থাকে। ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ দাবা ফেডারেশনের যাত্রা শুরু হয়। যা পরবর্তীতে দেশজুড়ে দাবার প্রসার ঘটায়। ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো ওয়ার্ল্ড চেস অলিম্পিয়াডে অংশ নেয়। এই অংশগ্রহণ ছিল বাংলাদেশের দাবা ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়। ধরি বাংলাদেশের দাবা আন্তর্জাতিক সূচনা হয় ১৯৮৩ সাল থেকেই। এর চার বছর পর ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশে যাকে বলা যায় জীবন্ত কিংবদন্তি নিয়াজ মোরশেদ। তিনি ১৯৮৭ সালে শুধু বাংলাদেশের একজন না দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার (GM) উপাধি অর্জনকারী। অবশ্যই সবোর্চ্চ গর্বের এক অর্জন। কষ্টের হল এর পর থেকে আজকে পর্যস্ত আমাদের অজর্ন তাকে সহ মাত্র পাঁচ জন। সময়ের পার্থক্যটা বলি ১৯৮৭ সালে ১ম গ্র্যান্ডমাস্টার তারপর ২য় ২০০২, ৩য় ২০০৬, ৪র্থ ২০০৭ এবং ৫ম ২০০৮ সালে শেষ গ্র্যান্ডমাস্টার (GM) উপাধি অর্জন করে। ২০০৮ থেকে আজকে ২০২৫ মানে ১৭ বছর এই অজর্ন আমাদের কাছ থেকে দূরে। কি তাঁর কারন মেধার না খেলার না কৌশল না ফেডারেশনের তা কে বলতে পারে।
গ্র্যান্ডমাস্টার (GM) হচ্ছে দাবা খেলার সর্বোচ্চ উপাধি। এটি আন্তর্জাতিক দাবা সংস্থা (FIDE) কর্তৃক প্রদত্ত একটি আজীবন মর্যাদাসূচক উপাধি যা শুধুমাত্র বিশ্বের সবচেয়ে দক্ষ দাবাড়ুরাই পান। অন্যভাবে বলতে গ্র্যান্ডমাস্টার বলা হয় সেই দাবাড়ুকে যিনি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অসাধারণ দক্ষতা, কৌশল, রেটিং এবং ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের মাধ্যমে দাবা বিশ্বের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি অর্জন করেন। আজকের লেখায় আমাদের দাবায় গৌরবের প্রতীক সম্মানিত গ্র্যান্ডমাস্টারদের তালিকা থাকলো আর পরিচয়।
গ্র্যান্ডমাস্টার নিয়াজ মোর্শেদ:
বাংলাদেশের প্রথম দাবার গ্র্যান্ড মাস্টার। জন্ম: ১৩ মে ১৯৬৬ যিনি মোর্শেদ নামে পরিচিত বাংলাদেশের দাবার ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। অতি অল্প বয়সেই বড় ভাইয়ের অনুপ্রেরণায় দাবার প্রতি গভীর ভালোবাসা জন্মে তাঁর মনে। প্রতিবেশী ও তৎকালীন জাতীয় চ্যাম্পিয়ন জামিলুর রহমান তাঁকে দাবা শেখার অনুকূল পরিবেশে বড় হতে সহায়তা করেন। লেখক আহমদ ছফার রচনায় উল্লেখ আছে, ছোটবেলায় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গেও তিনি দাবা খেলতেন। ১৯৮৩ সালে সেন্ট জোসেফ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এস.এস.সি এবং ১৯৮৫ সালে ঢাকা কলেজ থেকে এইচ.এস.সি পাস করেন। ক্রীড়াক্ষেত্রে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারে ভূষিত করে।
মাত্র নয় বছর বয়সে জাতীয় দাবা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে নজর কাড়েন নিয়াজ। যদিও প্রথমবারেই সাফল্য পাননি তাঁর খেলার দক্ষতা সবাইকে মুগ্ধ করে। ১২ বছর বয়সের মধ্যেই তিনি বাংলাদেশের শীর্ষ দাবাড়ুদের একজন হয়ে ওঠেন। ১৯৭৮ সালে জাতীয় প্রতিযোগিতায় যৌথভাবে প্রথম হলেও টাইব্রেকে তৃতীয় হন আর ১৯৭৯ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত চারবার একাধারে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেন। ১৯৭৯ সালে ভারতের কলকাতায় প্রথম আন্তর্জাতিক দাবা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন নিয়াজ। ১৯৮১ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত এশিয়ান জুনিয়র চ্যাম্পিয়নশিপে যুগ্মভাবে প্রথম হয়ে টাইব্রেকে দ্বিতীয় হন। একই বছর তিনি ইন্টারন্যাশনাল মাস্টার (IM) নর্ম অর্জন করেন। ১৯৮২ সালে বিশ্ব জুনিয়র চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণ করে ডেনমার্কের লার্স স্কানডর্ফের বিরুদ্ধে তাঁর খেলা টুর্নামেন্টের সেরা ম্যাচ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তিনি বাংলাদেশ দলের হয়ে ১৯৮৪, ১৯৯০, ১৯৯৪, ১৯৯৬, ২০০২ ও ২০০৪ সালের দাবা অলিম্পিয়াডে প্রতিনিধিত্ব করেন।
১৯৮৪ সালে সাবেক যুগোস্লাভিয়ায় অনুষ্ঠিত বেলা ক্রোভা ওপেনে প্রথম নর্ম অর্জন করেন নিয়াজ।১৯৮৬ সালে দ্বিতীয় নর্ম পাওয়ার পর ধারাবাহিক সফলতায় তিনি নিজেকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন। অবশেষে ১৯৮৭ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে, বিশ্ব দাবা সংস্থা (FIDE) তাঁকে গ্র্যান্ডমাস্টার খেতাব প্রদান করে যা তাঁকে শুধু বাংলাদেশের নয় পুরো দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার হিসেবে ইতিহাসে স্থান দেয়। তিনি তখন ছিলেন এশিয়ার পঞ্চম গ্র্যান্ডমাস্টার। গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার পর নিয়াজ যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। পড়াশোনার সময় তিনি খুব অল্প কয়েকটি প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর পুনরায় দাবায় ফিরে এসে তাঁর খেলোয়াড়ি জীবনের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয়। ৯০ এর দশকে তিনি একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় উজ্জ্বল পারফরম্যান্স দেখান। মোট ছয়বার বাংলাদেশের জাতীয় দাবা চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা অর্জন করেন। ক্লাব পর্যায়ে তিনি মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে খেলেছেন। নিয়াজ মোরশেদ সাধারণত দাবার ক্লাসিকাল ও পজিশনাল স্টাইলে খেলা পছন্দ করেন। তিনি প্রতিপক্ষের ভুল না করে ছোট ছোট সুবিধা কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে বিজয়ের পরিবেশ তৈরি করেন। নিখুঁত কৌশল ও ধৈর্যশীল খেলার জন্য তাঁকে চিন্তাশীল দাবাড়ু হিসেবে বর্ণনা করা হয়। নিয়াজ মোরশেদ কেবল দাবায় নয়, সঙ্গীত ও কবিতার জগতে ও অনন্য প্রতিভার পরিচয় রেখেছেন। তার জীবনের গল্প প্রমাণ করে ধৈর্য, অধ্যবসায় ও সৃজনশীলতা দিয়ে যে কোনো ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন সম্ভব। তিনি শুধু একজন গ্র্যান্ডমাস্টার নন বাংলাদেশের দাবা ইতিহাসের পথপ্রদর্শক। তাঁর অর্জন নতুন প্রজন্মের দাবাড়ুদের অনুপ্রেরণা জোগায় প্রতিদিন। বাংলাদেশের দাবার যে কোনো সাফল্যের মূলেই আজও অনুরণিত হয় তাঁর নাম নিয়াজ মোরশেদ এক অনন্য কিংবদন্তি।
গ্র্যান্ডমাস্টার জিয়াউর রহমান:
জিয়াউর রহমান (১ মে ১৯৭৪-৫ জুলাই ২০২৪) ছিলেন বাংলাদেশের একজন খ্যাতনামা দাবাড়ু ও গ্র্যান্ডমাস্টার (জিএম)। তিনি দেশের দাবা ইতিহাসে অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে পরিচিত। ২০০৫ সালের অক্টোবর মাসে তিনি ২৫৭০ ফিদে রেটিং অর্জন করে বাংলাদেশের দাবাড়ুদের মধ্যে সর্বোচ্চ রেটিংধারী হিসেবে রেকর্ড গড়েন।
জিয়াউর রহমান ঢাকার সেন্ট যোসেফ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। শৈশব থেকেই দাবার প্রতি গভীর অনুরাগ ছিল তার, যা পরবর্তীতে তার জীবনের কেন্দ্রে পরিণত হয়। জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের দাবার ইতিহাসে এক অনন্য প্রতিভা। তিনি চৌদ্দবার জাতীয় দাবা চ্যাম্পিয়ন হন-১৯৮৮, ১৯৯৯, ২০০১, ২০০২, ২০০৪, ২০০৫, ২০০৮, ২০০৯, ২০১১, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে। বাংলাদেশের হয়ে তিনি ১৫টি দাবা অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণ করেন (১৯৮৬–১৯৮৮, ১৯৯২–২০০৮, ২০১২–২০১৮)। এছাড়া তিনি তিনবার এশিয়ান টিম চ্যাম্পিয়নশিপেও দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন (১৯৮৭, ১৯৯১ ও ২০০৯)। তিনি ১৯৯৩ সালে ইন্টারন্যাশনাল মাস্টার (IM) ও ২০০২ সালে গ্র্যান্ডমাস্টার (GM) খেতাব অর্জন করেন যা ছিল তার অসাধারণ ধারাবাহিকতার ফল। জিয়াউর রহমান চারবার দাবা বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। ২০২২ সালে ৪৪তম দাবা অলিম্পিয়াডে জিয়াউর রহমান ও তাহসিন তাজওয়ার জিয়া একসঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন যা ছিল দেশের দাবা ইতিহাসে প্রথম পিতা পুত্র যুগল অংশগ্রহণের নজির।
২০২৪ সালের ৫ জুলাই, জাতীয় দাবা চ্যাম্পিয়নশিপের ১২তম রাউন্ডে খেলার সময় জিয়াউর রহমান হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। বিকাল ৫টা ৫২ মিনিটে তিনি বোর্ডে লুটিয়ে পড়েন। দ্রুত তাকে শাহবাগের ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার এই আকস্মিক মৃত্যু বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া ফেলে। আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
গ্র্যান্ডমাস্টা ররিফাত বিন সাত্তার:
জন্ম: ২৫ জুলাই ১৯৭৪। তিনি দাবায় বাংলাদেশের তৃতীয় গ্র্যান্ডমাস্টার হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন। ২০০৬ সালে এই মর্যাদাপূর্ণ খেতাব অর্জনের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের দাবার জগতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। রিফাত বিন সাত্তার ঢাকার সেন্ট যোসেফ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরে তিনি নটর ডেম কলেজে ভর্তি হয়ে ১৯৯২ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। উচ্চ শিক্ষার জন্য তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং ১৯৯৭ সালে সেখান থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন।
রিফাত ১৯৯৩ সালে আন্তর্জাতিক মাস্টার (IM) খেতাব অর্জন করেন। দীর্ঘ প্রস্তুতি ও ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের পর ২০০৬ সালে তিনি আন্তর্জাতিক গ্র্যান্ডমাস্টার (GM) খেতাব লাভ করেন যখন তাঁর ফিদে রেটিং ২৫০০ অতিক্রম করে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো তাঁর তিনটি গ্র্যান্ডমাস্টার নর্মই ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতাগুলোতে অর্জিত হয়। বাংলাদেশের দাবা অঙ্গনে তিনি নিয়াজ মোরশেদ ও জিয়াউর রহমানের পর তৃতীয় গ্র্যান্ডমাস্টার হিসেবে দেশকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব করেন। দাবা ছাড়াও রিফাত পেশাগত জীবনে অত্যন্ত সফল। বর্তমানে তিনি একটি আন্তর্জাতিক নন প্রফিট সংস্থায় প্রোগ্রাম ডেভেলপমেন্ট ও কোয়ালিটি বিভাগে কর্মরত আছেন। দাবার পাশাপাশি সমাজসেবা ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমেও তিনি যুক্ত রয়েছেন। রিফাত বিন সাত্তার বাংলাদেশের দাবা ইতিহাসে এক অনন্য নাম। তাঁর অধ্যবসায়, মেধা ও সাফল্য দেশীয় দাবা অঙ্গনকে আন্তর্জাতিক মানে তুলে ধরেছে। নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের জন্য তিনি এক উজ্জ্বল অনুপ্রেরণা।
গ্র্যান্ডমাস্টা আবদুল্লাহ আল রাকিব:
মোল্লা আবদুল্লাহ আল রাকিব (জন্ম: ১৯৮০) একজন খ্যাতনামা বাংলাদেশি দাবাড়ু। তিনি ২০০৭ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক দাবা সংস্থা ফিদে (FIDE) কর্তৃক গ্র্যান্ডমাস্টার খেতাব অর্জন করেন। এর মাধ্যমে তিনি নিয়াজ মোরশেদ, রিফাত বিন সাত্তার ও জিয়াউর রহমানের পর বাংলাদেশের চতুর্থ গ্র্যান্ডমাস্টার হিসেবে স্বীকৃতি পান। রাকিবের গ্র্যান্ডমাস্টার খেতাব প্রাপ্তি প্রক্রিয়াটি কিছুটা বিলম্বিত হয়েছিল। ২০০৭ সালের এপ্রিলে ফিদে বোর্ডের সভার পরই তার এই খেতাব নিশ্চিত হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু কিছু প্রশাসনিক ভুল বোঝাবুঝির কারণে বিষয়টি বিলম্বিত হয়। পরে মেক্সিকোয় অনুষ্ঠিত ফিদে বোর্ড মিটিংয়ে (১৩–১৪ সেপ্টেম্বর ২০০৭) আনুষ্ঠানিকভাবে তার গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়া নিশ্চিত হয়।
গ্র্যান্ডমাস্টার হলো একটা নির্দিষ্ট খেতাব। এর মানে এই নয় যে আমার দাবা খেলাটা এখানেই শেষ। আমি জানি আমার অনেক দুর্বলতা আছে, সেগুলো ঠিক করতে হবে। দাবাড়ু হিসেবে নিজেকে আরও উন্নত করতে হবে। রাকিব তার প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার নর্ম অর্জন করেন ২০০১ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত ২য় এশীয় দাবা প্রতিযোগিতায়। দ্বিতীয় নর্ম পান ২০০৪ সালে লিওনাইন চেস ক্লাব আয়োজিত গ্র্যান্ডমাস্টার দাবা টুর্নামেন্টে। তৃতীয় নর্ম অর্জন করেন ২০০৭ সালের এপ্রিলে ঢাকায় অনুষ্ঠিত জাতীয় দাবা চ্যাম্পিয়নশিপে।
বাংলাদেশের পঞ্চম গ্র্যান্ডমাস্টার এনামুল হোসেন রাজিব (জন্ম: ১৯৮১)। বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিভাবান দাবাড়ু। তিনি ১৯৯৭ ও ২০০৬ সালে জাতীয় দাবা চ্যাম্পিয়নশিপে বিজয়ী হন। তাঁর ধারাবাহিক সাফল্য তাঁকে দেশের শীর্ষ দাবা খেলোয়াড়দের কাতারে স্থান করে দেয়। ২০০২ সালে আন্তর্জাতিক মাস্টার (IM) খেতাব অর্জনের মাধ্যমে রাজিবের আন্তর্জাতিক দাবা যাত্রা নতুন মাত্রা পায়। একই বছর স্লোভেনিয়ায় অনুষ্ঠিত দাবা অলিম্পিয়াডে তিনি তার প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার (GM) নর্ম অর্জন করেন। এরপর আবুধাবীতে অনুষ্ঠিত একটি গ্র্যান্ডমাস্টার প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় নর্ম লাভ করেন।
রাশিয়ায় ২০০৭ সালের দাবা বিশ্বকাপে তিনি বিশ্বের ১৯তম র্যাঙ্কধারী ইউক্রেনীয় গ্র্যান্ডমাস্টার পাভেল এলজানভকে পরাজিত করে তৃতীয় নর্মের পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেন। অবশেষে, ২০০৮ সালের ৪ মে রাজিব তার তৃতীয় ও চূড়ান্ত নর্ম অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশের পঞ্চম গ্র্যান্ডমাস্টার (GM) হিসেবে ইতিহাসে নাম লেখান। তাঁর আগে নিয়াজ মোরশেদ, জিয়াউর রহমান, রিফাত বিন সাত্তার ও আবদুল্লাহ আল রাকিব এই মর্যাদা অর্জন করেছিলেন। এনামুল হোসেন রাজিব অনলাইনে “Enamul” নামে ইন্টারনেট চেস ক্লাবে (ICC) দাবা খেলেন এবং আন্তর্জাতিক দাবা অঙ্গনে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করে আসছেন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে দাবা অলিম্পিয়াডের পুরুষ বিভাগে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ছিল ইসরায়েল। ফিলিস্তিনে আগ্রাসনের প্রতিবাদে ইসরায়েলের বিপক্ষে দশম রাউন্ডের ম্যাচ বয়কট করেন বাংলাদেশের গ্র্যান্ডমাস্টার এনামুল হোসেন রাজিব। দশম রাউন্ডে রাজিবের খেলার কথা ছিল ইসরায়েলের গ্র্যান্ডমাস্টার তামির নাবাটির বিপক্ষে। তবে ম্যাচের আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে তিনি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে খেলবেন না। #BoycottIsrael এবং #StandWithJustice হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে রাজিব লিখেন, ২০২২ সালের চেন্নাই দাবা অলিম্পিয়াডসহ ২০২৪ সালের হাঙ্গেরি দাবা অলিম্পিয়াডে রাশিয়া ও বেলারুশ দল হিসেবে অংশ নিতে পারেনি। তাহলে বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসরায়েল কীভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে? কালকে তাদের খেলা বাংলাদেশের সঙ্গে পড়েছে। আমি বয়কট করলাম। রাজিবের এই সিদ্ধান্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। অনেকেই তাঁর অবস্থানকে মানবতার পক্ষে সাহসী পদক্ষেপ’ হিসেবে দেখছেন।
বাংলাদেশের দাবা এক সময় দক্ষিণ এশিয়ার গর্ব ছিল। উপমহাদেশের প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার নিয়াজ মোরশেদ ১৯৮৭ সালে, বয়স ২১ বছর। কিন্তু তারপরের ২০২৫ পর্যন্ত বাংলাদেশ মাত্র পাঁচ জন গ্র্যান্ডমাস্টার পেয়েছে। পরবর্তী গ্র্যান্ডমাস্টারের অপেক্ষা বাংলাদেশে।
---বাউল পানকৌড়ি
ক্রিকেটে বাংলাদেশি বোলারদের হ্যাটট্রিক রেকর্ড--Click to Read