লালন সাঁইয়ের জীবনদর্শন, মানবতা ও ভক্তির প্রকাশ– সংগৃহীত গান ও গানের কথা : পর্ব-১
লালন সাঁইয়ের জীবনদর্শন, মানবতা ও ভক্তির প্রকাশ– ১০টি সংগৃহীত গান ও গানের কথা :
লালন গান শুধু সঙ্গীত নয়, এটি জীবনের দর্শন, মানবতা, ভক্তি এবং মুক্তচিন্তার এক অমোঘ পাঠ। এই ধারাবাহিক পর্বে আমরা শুরু হল প্রথম যাত্রা। যেখানে থাকছে লালন সাধকদের কণ্ঠে শুদ্ধভাবে পরিবেশিত ১০টি অমৃত লালন বানী এবং তার সাথে গানের কথা।
👉 পর্ব-১
1️⃣ গুরু আমারে কি রাখবেন তোমার চরণের দাসী | ইতরপনা স্বভাব আমার
2️⃣ পাপীর ভাগ্যে এমন দিন কি আর হবে রে | দেখ দেখ মনরায় হয়েছে উদয়
3️⃣ হীরা মানিক জহুরা কোটিময় | সে চাঁদ লক্ষ যোজন ফাঁকে রয়
4️⃣ নবির ভেদ পেলে এক ক্রান্তি ঘুচে যেত মনের ভ্রান্তি | শুনি নবির অঙ্গে জগৎ পয়দা হয়
5️⃣ যার যার ধর্ম সেই সেই করে | সবাই কি আর ধর্মপরায়ণ
6️⃣ অমৃত সে বারি অনুরাগ নইলে কি যাবে ধরা | বারি নাম বারি এলাহি
7️⃣ পারে কে যাবি নবির নৌকাতে আয় | রূপকাষ্ঠের নৌকাখানি
8️⃣ আপন ঘরের খবর নে না | অনা'সে দেখতে পাবি কোনখানে সাঁইর বারামখানা
9️⃣ মন সহজে কি সই হবা | চিরদিন ইচ্ছা মনে আইল ডিঙ্গায়ে ঘাস খাবা
🔟 নিগূঢ় প্রেম কথাটি | যে প্রেমে তে আল্লাহ নবি মেরাজ করেছে
(১)
অমৃত লালন বানী
গুরু আমারে কি রাখবেন তোমার চরণের দাসী
ফকির নহির শাহ
আমারে কি রাখবেন তোমার চরণদাসী
ইতরপনা স্বভাব আমার ঘটে অহর্নিশি
গুরু আমারে কি রাখবেন তোমার চরণদাসী।
জঠরও যন্ত্রণা পেয়ে এসেছি মন কড়ার দিয়ে
সে সকল গেছি ভুলে ভবেতে আসি
গুরু আমারে কি রাখবেন তোমার চরণদাসী।
চিনলাম না মন গুরু কি ধন করলাম না তার সেবা পূজোন
ঘুরতে বুঝি হলো রে মন জনম চুরাশি
আমারে কি রাখবেন তোমার চরণদাসী।
গুরু যার যার স্মরন শমন বলে তার কিসের ভয়
লালন বলে মন তুই আমায় করিলি রে দোষী
গুরু আমারে কি রাখবেন তোমার চরণদাসী।।
(২)
অমৃত লালন বানী
পাপীর ভাগ্যে এমন দিন কি আর হবে রে
আব্দুল করিম শাহ ফকির
দেখ দেখ মনরায় হয়েছে উদয়
কী আনন্দময় এই সাধবাজারে
পাপীর ভাগ্যে এমন দিন কি আর হবে রে
যথা রে সাধুর বাজার
তথা সাঁইর বারাম নিরন্তর
হেন পদে যার, নিষ্ঠা না হয় আর
না জানি কপালে কী আছে রে
পাপীর ভাগ্যে এমন দিন কি আর হবে রে
এই পাপীর ভাগ্যে এমন।।
সাধুগুরু যে মহিমা
দেবা দিতে নাই রে সীমা
হেন সাধ-সভায় এনে মন আমায়ে
আমায় আবার যেন ফ্যারে ফেলিস না রে
পাপীর ভাগ্যে এমন দিন কি আর হবে রে
এই পাপীর ভাগ্যে এমন।।
সাধুরও বাতাসে রে মন
বনের কাষ্ঠ হয় রে চন্দন
ফকির লালন বলে মন
খোঁজ কি আর ধন
সাধুর সঙ্গে রঙ্গে দেশ করে রে
পাপীর ভাগ্যে এমন দিন কি আর হবে রে
এই পাপীর ভাগ্যে এমন।।
(৩)
অমৃত লালন বানী
হীরা মানিক জহুরা কোটিময় সে চাঁদ লক্ষ যোজন ফাঁকে রয়
ফকির আনু সাঁই
সে চাঁদ লক্ষ যোজন ফাঁকে রয়
হীরা মানিক জহুরা কোটিময়।
ঊনকোটি দেবতা সঙ্গে আছে গাঁথা
ব্রহ্মা বিষ্ণু শিব নারায়ণ জয় জয় জয়
সে চাঁদ পাতালে উদয় ভূ-মন্ডলে
সে চাঁদ মহেন্দ্র যোগে উদয় হয়
হীরা মানিক জহুরা কোটিময়।
ষোল-চক্র পরে আছে আদি বিধান তার
ভেদ করিয়ে সপ্ততলা পূর্ণ করবে ষোলকলা
তার উপরে বসে কালা, মহা প্রভুর গান গায়
যে জন শুদ্ধ সাধক হয় সে চাঁদ দেখিতে পায়
সে চাঁদ মৃণাল ধরে উজান ধায়
হীরা মানিক জহুরা কোটিময়।
নবলক্ষ ধেণু চরায় রাখালে
চাঁদের খবর সেই জানে
চাঁদ রয়েছে বৃন্দাবনে, শ্রীরাধার শ্রীকমলে
লালনের ফকিরি করা নয় ফিকিরি
দরবেশ সিরাজ সাঁই যদি ছায়া দেয়
হীরা মানিক জহুরা কোটিময়।।
(৪)
অমৃত লালন বানী
শুনি নবির অঙ্গে জগৎ পয়দা হয়
আব্দুর রব ফকির
সেই যে আকার কী হল তার কে করে নির্ণয়
শুনি নবির অঙ্গে জগৎ পয়দা হয়
আব্দুল্লার ঘরেতে বলো সেই নবির জন্ম হলো
মূল দেহ তার কোথায় ছিলো কারে শুধায়।
কী রূপে নবির জন্ম যুক্ত হন
আবহায়াত তার নাম লিখেছে
হাওয়া নাই সেথায়
শুনি নবির অঙ্গে জগৎ পয়দা হয়।
একজনে দুই কায়া ধরে
কেউ পাপ কেউ পুণ্যি করে
কী হবে তার রোজ হাসরে নিকাশের বেলায়
শুনি নবির অঙ্গে জগৎ পয়দা হয়।
নবির ভেদ পেলে এক ক্রান্তি
ঘুচে যেত মনের ভ্রান্তি
দৃষ্টি হত আলেকপান্তি
লালন ফকির কয়।।
(৫)
অমৃত লালন বানী
যার যার ধর্ম সেই সেই করে | সবাই কি আর ধর্মপরায়ণ
বাউল পাগলা বাবুল সাঁই
যার যা ধর্ম সেই সেই করে
তোমার বলা অকারণ
সবাই কি আর ধর্মপরায়ণ
ভবে সবাই কি আর ধর্মপরায়ণ।
ময়ূর পুচ্ছ কেউ চিত্র করে না
কাঁটার মুখ কেউ চাঁছে না
এমনি মত সব ঘটনা
যে যাতে আছে সৃজন।
শশক পুরুষ সত্যবাদী
মৃগ পুরুষ উর্দ্ধভেদী
অশ্ব-বৃষ বেহুশ নিরবধি
তাহার কুকর্মেতে সদায় মন।
চিন্তামনি পদ্মিনী নারী
এরা পতিসেবার অধিকারী
হস্তিনী শংখিনী নারী
কর্কট ভাষায় কয় বচন।
ধর্মকর্ম সব আপনার মন
করে ধর্ম মোমিনগন
ফকির লালন বলে ধর্ম কেমন
করলে প্রাপ্তি নিরাঞ্জন।
(৬)
অমৃত লালন বানী
অমৃত সে বারি অনুরাগ নইলে কি যাবে ধরা
টুনটুন ফকির
অমৃত সে-বারি অনুরাগ নইলে কি যাবে ধরা
সে-বারির পরশ হইলে হবে ভবের করণ সারা ।
বারি নামে বারি এলাহি নাই রে তার তুলনা নাহি
সহস্রদল পদ্মে সেহি মৃণাল-গতি বহে ধারা।
ছায়াহীন এক মহামুনি বলবো কিরে তার করণি
প্রকৃতি হইয়া তিনি হলেন বারি সেধে অমর গোরা।
আসমানে বরিষণ হলে দাঁড়ায় জল মৃত্তিকাস্থলে
লালন ফকির ভেবে বলে ও সে মাটি জিনবে ভাবুক যারা।।
(৭)
অমৃত লালন বানী
পারে কে যাবি নবির নৌকাতে আয়
মনসুর ফকির সাঁই
পারে কে যাবি নবির নৌকাতে আয়
রূপকাষ্ঠের নৌকাখানি নাই ডুবার ভয়
বেসরা নেয়ে যারা তুফানে যাবে মারা একই ধাক্কায়
কি করবে বদর গাজী থাকবে কোথায়।
নবি না মানে যারা
মোয়াহেদ কাফের তারা এই দুনিয়ায়।
ভজনে তার নাই মজুরী দলিলে ছাপ লেখা যায়
যেহি মুর্শিদ সেইতো রাসুল
ইহাতে নাই কোন ভুল, খোদাও সে হয়
লালন কয় না এমন কথা কোরানে কয়।।
(৮)
অমৃত লালন বানী
আপন ঘরের খবর নে না
বাউল সুকুমার
আপন ঘরের খবর নে না
অনা'সে দেখতে পাবি
কোন খানে সাঁইর বারামখানা।
কমলকোঠা কারে বলি
কোন মোকাম তার কোথা গলি
কোন সময় পড়ে ফুলি
মধু খায় সে অলিজনা।
সূক্ষ্মজ্ঞান যার ঐক্য মুখ্য
সাধকেরই উপলক্ষ
অপরূপ তার বৃক্ষ
দেখলে চোখের পাপ থাকে না।
শুক্লনদীর সুখ সরোবর
তিলে তিলে হয় গো সাঁতার
লালন কয় কীর্তিকর্মার
কীর্তিকর্মার কী কারখানা।।
(৯)
অমৃত লালন বানী
মন সহজে কি সই হবা
নিজাম শাহ ফকির
চিরদিন ইচ্ছা মনে আইল ডিঙ্গায়ে ঘাস খাবা
মন সহজে কি সই হবা
ডাবার পর মুগুর প’লে
সেইদিনে টের পাবা।
বাহার তো গেছে চলে পথে যাও ঠেলা পেড়ে
কোনদিনে পাতাল ধাবা
তবু দেখি গেলো না তোর ত্যাড়া চলন বদলোভা।
সুখের আশ থাকলে মনে
দুঃখের ভার নিদানে তুমি অবশ্যই মাথায় নিবা
সুখ চেয়ে সোয়াস্তি ভালো শেষকালে তে পস্তাবা।
ইল্লতে স্বভাব হলে পানিতে কি যায় রে ধুলে
খাজলতি কিসে ধুবা
লালন বলে হিসাব কালে সকল ফিকির হারাবা।।
(১০)
অমৃত লালন বানী
নিগূঢ় প্রেম কথাটি যে প্রেমে তে আল্লাহ নবি মেরাজ করেছে
ফকির শামসুল শাহ
যে প্রেমেতে আল্লাহ নবি মেরাজ করেছে
নিগূঢ় প্রেম কথাটি তাই আজ আমি
শুধাই কার কাছে
যে প্রেমেতে আল্লাহ নবি মেরাজ করেছে।
মেরাজ সে ভাবেরই ভুবন
গুপ্ত ব্যক্ত আলাপ হয়রে দুইজন
কে পুরুষ আকার কে প্রকৃতি তার
শাস্ত্রে প্রমাণ কি রেখেছে।
কোন প্রেমের প্রেমিকা ফাতেমা
করেন সাঁই কে পতি ভজনা।
কোন প্রেমের দায় ফাতেমাকে সাঁই
মা বোল বলেছে।
কোন প্রেমে গুরু হয় ভবতরী
কোন প্রেমে শিষ্য হয় কাণ্ডারি
না জেনে লালন প্রেমের উদ্দীপন
পিরিত করে মিছে।।