মরমি ও লালন সাধক মকছেদ আলী সাঁই- বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে যাওয়া ৭১-এর শব্দ সৈনিক

মকছেদ আলী সাঁই: বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে যাওয়া ৭১-এর শব্দসৈনিক

সোনায় মোড়ানো বাংলা মোদের শ্মশান করেছে কে
ইয়াহিয়া তোমায় আসামির মত জবাব দিতেই হবে
শ্যামল বনানী সোনালী ফসলে ছিল যে সেদিন ভরা
নদী নির্ঝরে সদা বয়ে যেত পূতঃ অমৃত ধারা
অগ্নি দহনে সে সুখ-স্বপ্ন দগ্ধ করেছে কে?

১৯৭১-এ স্বাধীন বাংলা বেতারে কেন্দ্রের মুখে মুখে ফেরা গানগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি গান। মরমি ও সহজিয়া ভাষায় এই গানটি ছিল প্রতিবাদ ও জাতীয় চেতনার অনন্য প্রকাশ। রক্তে আগুন ধরানো গানটি লিখেছেন ও সুর করেছেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠশিল্পী, গীতিকার ও সুরকার, মরমি ও লালন সাধক মকছেদ আলী সাঁই। বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে যাওয়া অবিস্মরণীয় একজন শব্দ সৈনিক। আজকের এই লেখায়  চেষ্টা করব সাধক মকছেদ আলী সাঁই এবং তাঁর গান কথায় স্মরণ করার। 


মকছেদ আলী সাঁই জন্মগ্রহণ করেন জন্ম ১ মার্চ ১৯৩৫, খ্রিষ্টাব্দে কুষ্টিয়া শহরের হরিশঙ্করপুর গ্রামে। পিতা আবদুর রশিদ খান, মাতা নিগার নেছা। পারিবারিক পদবি ছিল “খান”, কিন্তু তিনি নিজে সাঁই পদটি নিজের নামে যোগ করেন সংগীত ও মরমি ধারার আত্মপরিচয়ের প্রতীক হিসেবে। ছোটবেলা থেকেই তাঁর সংগীতপ্রেম ছিল প্রবল। কুষ্টিয়ার গ্রামীণ পরিবেশে লোকগান, বাউলগান ও পালাগানের সুর তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। মকছেদ আলী সাঁই প্রথমে ওস্তাদ ওসমান গণি এর কাছে শাস্ত্রীয় সংগীত শেখেন। পাশাপাশি তিনি অনুশীলন করতেন গণসংগীত, নজরুলগীতি, ও যাত্রাগান। তরুণ বয়সে কিছুদিন একটি যাত্রাদলে শিল্পী হিসেবেও যুক্ত ছিলেন। ১৯৬২ সালে তিনি কুষ্টিয়া তহশিল অফিসে এসএ জরিপকালে অস্থায়ীভাবে চাকরি করেন, পরে আনসার কমান্ডার হিসেবে কাজ করেন। তবে সরকারি চাকরি নয়, তাঁর প্রাণের টান ছিল সংগীতে।
 

ষাটের দশকে কয়েকজন শুভানুধ্যায়ী বন্ধুর উৎসাহে মকছেদ আলী সাঁই লালনগীতির প্রতি গভীর মনোযোগী হন। তাঁর সংগীতজীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল লালনগীতিকে শাস্ত্রীয় সুরের ছোঁয়ায় নতুনভাবে পরিবেশন করা। বাংলার বাউলসংগীতের ইতিহাসে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ-পূর্ব সময়টিতে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। তার আগে সময়েই বিশিষ্ট লালনগীতির সাধক অমূল্য শাহ ডান হাতে একতারা এবং বাঁ হাতে বায়া বাজিয়ে দাঁড়িয়ে গান গাওয়ার এক অভিনব পদ্ধতি চালু করেন। যা লালনগীতিকে দেয় মঞ্চ উপযোগী উপস্থাপনার এক নতুন মাত্রা। এই ধারার উত্তরসূরি হন আরও কয়েকজন লালন অনুসারী বেহাল শাহ, নিমাই শাহ, ও খোদা বক্স শাহ (জাঁহাপুর)। তাঁদের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ হয়েছিল মকছেদ আলী সাঁইয়ের। যা তাঁর সংগীতজীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। মকছেদ আলী সাঁইয়ের সংগীতে একদিকে দেখা যায় অমূল্য শাহের গায়কি-ঢং এর প্রভাব। অন্যদিকে তিনি গভীরভাবে প্রভাবিত হন লালনশিষ্য ভোলাই শাহ এর প্রচলিত ছেঁউড়িয়া ঘরানা থেকে। এই ঘরানার প্রধান ধারক ছিলেন ইসমাইল ফকির, ফকির গোলাম ইয়াছিন, ও মোতাহার খন্দকার প্রমুখ। তাঁদের কাছ থেকে মকছেদ আলী সাঁই শেখেন লালনের গানের রাগ-রাগিণী, রামপ্রসাদী সুর, কীর্তন ও ধুয়া গানের ছন্দ যা লালনগীতিকে আরও সংগীতবহুল করে তোলে। এই মেলবন্ধন তাঁকে করে তোলে লালনগীতির এক পরিশীলিত কণ্ঠশিল্পী। 


যখন মকছেদ আলী সাঁই নিজস্ব ভঙ্গিতে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র তবলা, দোতারা, হারমোনিয়াম, একতারা, বায়া ইত্যাদির সংযোজন ঘটিয়ে লালনের গান পরিবেশন শুরু করলেন, তখন এটি ছিল লালনগীতির ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তিনি শুধু নিজে গান গাইলেন না, বরং অন্য শিল্পীদেরও শেখালেন সেই ভঙ্গিফলে ধীরে ধীরে এ ধরন জনপ্রিয় হয়ে ওঠে সারা দেশে। আজও বহু শিল্পী লালনগীতি পরিবেশনে মকছেদ আলী সাঁইয়ের ধরন ও সুরভঙ্গি অনুসরণ করেন। তাঁর উত্তরসুরিদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য নাম ফরিদা পারভীন, ইন্দ্রমোহন রাজবংশী, চন্দনা মজুমদার, কিরণচন্দ্র রায় যারা মঞ্চে লালনের গান গেয়ে আজও বহন করছেন তাঁর সেই সংগীতঋণ। 


অসহযোগ আন্দোলনের পর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মকছেদ আলী সাঁই মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে ভারতে গিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত হন। গীতিকার ও সুরকার হিসেবে তিনি বেতারে একাধিক দেশাত্মবোধক গান রচনা ও পরিবেশন করেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে তাঁর গানগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা জুগিয়েছে এবং মুক্তিকামী বাঙালির হৃদয়ে আশার আলো জ্বেলেছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় মকছেদ আলী সাঁই ভারতে গিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যুক্ত হন। তিনি সেখান থেকে এমন কিছু গান প্রচার করেছেন যা জনমনে অমর হয়ে রয়ে গেছে। 

উল্লেখযোগ্য গানসমূহ:
1️⃣ সোনায় মোড়ানো বাংলা মোদের শ্মশান করেছে কে
2️⃣ বাংলাদেশের খাঁটি মানুষ শেখ মুজিবুর জেনো ভাই
3️⃣ ওগো আগুন ওগো সূর্যের আলো
4️⃣ঘর থেকে আজ বাসনা বিলাসী মনটাকে দাও ছুটি
5️⃣ বন্ধু ওগো বন্ধু তোমার অগ্নিদীপ্ত দৃপ্ত পদধ্বনি
6️⃣ মাগো আমার কেঁদো নাকো তুমি
7️⃣ বিচারকের আসনে তুমি বিচারপতি সেজে
8️⃣ জাতীর জীবনে শুভাশীষ তুমি মুজিবর রহমান
9️⃣ আমায় তুমি খুঁজছ কি মা আকাশের তারায়
🔟 শান্তির দূত শ্বেত কপোত উড়ে যা বাংলাদেশ 


স্বাধীনতার পর তিনি ঢাকা বেতারে ‘ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিস’ বিভাগে সংগীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। সেখানে তিনি দেশের বিভিন্ন প্রান্তের অখ্যাত ও লোকজ শিল্পীদের গান সংগ্রহ ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন। এ কাজের মাধ্যমেই তিনি বাংলাদেশের লোকসংগীত সংরক্ষণের অন্যতম অগ্রদূত হয়ে ওঠেন। ১৯৭১ সালে কলকাতার ‘হিন্দুস্তান মিউজিক্যাল প্রোডাক্ট লিমিটেড’ থেকে দুটি লালনগীতি ‘গৌর প্রেম করবি যদি’ ও ‘আপন ঘরের খবর নে না’ গ্রামোফোন রেকর্ডে প্রকাশিত হয়। স্বাধীনতার পর তিনি ঢাকা বেতারে ‘ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিস’-এ সংগীত পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যেখানে তিনি দেশের অনেক অবহেলিত ও অখ্যাত শিল্পীর গান সংরক্ষণ ও রেকর্ড করার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। মকছেদ আলী সাঁই-এর লেখা গান বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া তিনি লালনশিষ্য জীবন ও লালনভিত্তিক নাটক ‘কীর্তি লালন’ রচনা করার পরিকল্পনা করেছিলেন। ১৭ জুন ১৯৮১ সালে হঠাৎ প্রয়াত হন। তাঁর অবদান শব্দসৈনিক হিসেবে যেমন স্মরণযোগ্য, তেমনি বাংলাদেশের লালনগীতি পরিবেশনার ধারা আন্তর্জাতিকভাবে প্রসারিত করায় তাঁর পথিকৃৎ ভূমিকা চিরস্মরণীয়। মকছেদ আলী সাঁই-এর গান আজও বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে স্বাধীনতার আবেগ ও সাংস্কৃতিক জ্ঞানের প্রতীক হিসেবে বেজে ওঠে। তাঁর রচনাশৈলী ও ভঙ্গি লালনগীতির নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের শব্দ সৈনিক লালন সাধক মকছেদ আলী সাঁই মহামান্য মহাজনের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি। 


সাধক মকছেদ আলী সাঁইয়ের লেখা স্বাধীন বাংলা বেতারে কেন্দ্রের গান: 

(১) 
সোনায় মোড়ানো বাংলা মোদের শ্মশান করেছে কে
কথা ও সুর- মকছেদ আলী সাঁ
কন্ঠ- মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার

সোনায় মোড়ানো বাংলা মোদের শ্মশান করেছে কে
ইয়াহিয়া তোমায় আসামির মত জবাব দিতে হবে।
শ্যামল বনানী সোনালী ফসলে 
ছিল যে সেদিন ভরা
নদী নির্ঝরে সদা বয়ে যেত 
পূতঃ অমৃত ধারা
অগ্নি দহনে সে সুখ-স্বপ্ন দগ্ধ করেছে কে?
আমরা চেয়েছি ক্ষুধার অন্ন
একটি স্নেহের নীড়
নগদ পাওনা হিসেব কষিয়া
ছিলনা লোভের ভিড়।
দেশের মাটিতে আমরা ফলাব
ফসলের কাঁচা সোনা
চিরদিন তুমি নিয়ে যাবে কেড়ে
হায় রে উন্মাদনা
এই বাঙালির বুকের রক্তে বন্যা বহালো কে
ইয়াহিয়া তোমায় আসামির মত জবাব দিতেই হবে।।

(২) 
বাংলাদেশের খাঁটি মানুষ, শেখ মুজিবুর জেনো ভাই
কথা ও সুর- মকছেদ আলী সাঁই
কন্ঠ- মকছেদ আলী সাঁই

বাংলাদেশের খাঁটি মানুষ 
শেখ মুজিবর জেনো ভাই
শেখের মত আর বাংলার বন্ধু নাই। 
তেইশ বছর অনেক নেতা
সেজে এলেন জাতির পিতা 
এখন মোদের খাটি ত্রাতা
শেখ সাহেবকেই দেখতে পাই।
দুই যুগ ধরে বাংলাবাসী 
ছিলাম মোরা উপবাসী 
শেষে নেতা মুজিব আসি
বাংলাদেশে করলেন রোশনাই। 
জালিম শোষক ইয়াহিয়া খান 
করলো মুজিবকে কারা প্রদান
এখন যায় যদি মোদের পরাণ
শেখ মুজিবের মুক্তি চাই।।

(৩) 
ওগো আগুন, ওগো সূর্যের আলো
কথা ও সুর- মকছেদ আলী সাঁই
কন্ঠ- মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার

ওগো আগুন ওগো সূর্যের আলো
তুমি  পুড়িয়ে ফেলনা আমার দূর্গা শ্যামা
ওরা হাসতো ভালবাসতো কাছে আসতো
যেন দুবাহু বাড়াতো সম্ভাষণে আমার নিরূপমা।
ওগো হিংসা  ওগো যুদ্ধ 
ওগো মারীভয় ওগো উল্লাস
নিশাষে তোমার শুকিয়ে দিওনা
কুসুম -মধুরসুবাস
বিশ্বান রেখো কৃতঘ্ন তার নাই কোনদিন ক্ষমা।
হাসনা হেনার গন্ধ-সেনায় সাজাও
কোকিলের গান বাঁশরীর তান সুর মঞ্জুরী বাজাও
পেলব কোমল স্নিগ্ধ প্রভাত
হোক তব শিরোনাম।

(৪) 
ঘর থেকে আজ বাসনা বিলাসী মনটাকে দাও ছুটি
কথা ও সুর- মকছেদ আলী সাঁই
কন্ঠ- মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার

ঘর থেকে আজ বাসনা বিলাসী মনটাকে দাও ছুটি
কর বিদ্রোহ
বিদ্রোহী মন রক্ত শপথে ঘাটি ।
লক্ষ অযুত গৃহহারা যত বাংলার সন্তান
বেয়োনেট আর গুলীর আঘাতে ধুলায় লুটনো প্রাণ
আজ বাংলার পথে প্রান্তরে 
রক্তের রাঙা ছাপ আছে পড়ে
তাই লাখে লাখে রক্তবীজের মিছিল এসেছি জুটি। 
সবুজ এদেশে অবুঝ মানুষ 
এতদিন ছিল ঘুমে 
স্বপন পশারী সে মন জেগেছে 
ব্যথা যত ছিল জমে। 
আজ নয় আর কামনা বিলাস এলো মুক্তির ডাক
সুখের পিয়াস সুরের মোহন বাঁশিটারে ফেলে রাখ
এসেছে পাগল আগল ভাঙিয়া
সম্মুখে যাও হাতে হাত দিয়া
বজ্র মুঠিতে ধর কশে আজ ধর শতরুর টুঁটি।।

(৫) 
বন্ধু ওগো বন্ধু তোমার অগ্নিদীপ্ত দৃপ্ত পদধ্বনি
কথা ও সুর- মকছেদ আলী সাঁই
কন্ঠ- মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার

বন্ধু ওগো বন্ধু তোমার অগ্নিদীপ্ত দৃপ্ত পদধ্বনি
পথে প্রান্তরে উত্থিতে যেন মুক্তির আবাহনী।
জানি না কেমনে কোন দেবলোক হতে
এসেছিলে তুমি মুক্তি-পতাকা হাতে 
আমরা তোমায় বঙ্গবন্ধু একটি নামেই জানি।
কবি রবীন্দ্র দেশবন্ধু
নজরুল তোমাতে মিশে 
বাংলা মায়ের মুক্তির সনদ
রূপে দেখা দিল শেষে। 
একটি চাহিদা অন্য চাহিনা কিছু
দীক্ষা নিল যে বালক বৃদ্ধ শিশু 
চাই স্বাধীনতা কোন অধীনতা     
মোরা আর নাহি মানি।।

(৬) 
মাগো আমার কেঁদো নাকো তুমি
কথা ও কন্ঠ- মকছেদ আলী সাঁই
সুর - সুজেয় শ্যাম

মাগো আমার কেঁদো নাকো তুমি
ফেলনা দীর্ঘ শ্বাস
রক্ত লেখায় লিখে যাব মোরা
মুক্তির ইতিহাস। 
লক্ষ মায়ের গুমোট কান্না শুনো
দেশ জননীর মুক্তির দিন গুনো
আসিবে সেদিন বিজয় বার্তা
ভরিবে সারাটা আকাশ।
কান পেতে শোনো দুয়ারে তোমার
রণ দুন্দুভি বাজে 
মুক্তি পাগল বিপ্লবী দল
সাজাও যুদ্ধ সাজে।
রক্তে রাঙানো আঁচল তোমার উড়াও
দেশ জননীর ভাঙ্গা বুকখানা জুড়াও
ঝরনা নামুক তোমার ঐ বুকে 
আশার বানীর সুবাস।।

(৭) 
বিচারকের আসনে তুমি বিচারপতি সেজে
কথা সুর কন্ঠ- মকছেদ আলী সাঁই

বিচারকের আসনে তুমি বিচারপতি সেজে
নির্বোধ ওরে শোননি কি ঐ প্রলয় বিষাণ বাজে।
এসেছে সময় হিসাব দেবার
ধ্বংশ মৃত্যু বন্দী সবার
মহা মানবের মহাধিকরণে 
দাঁড়ায়ে প্রহরী লাজে।
একটি পরানে রহিয়াছে গাঁথা
সাড়ে সাত কোটি প্রাণ
একটি মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে 
জীবন করিল দান। 
বঙ্গবন্ধু নয়কো যে একা
আয়নায় যায় সব মুখ দেখা 
আপন ফাঁসির রশিতে ঝুলিছে
দেখে নাও চোখ বুঁজে।

(৮) 
জাতীর জীবনে শুভাশীষ তুমি মুজিবর রহমান
কথা সুর কন্ঠ- মকছেদ আলী সাঁই

জাতীর জীবনে শুভাশীষ তুমি 
মুজিবর রহমান
বঙ্গবন্ধু নামই নয় শুধু বাংলার তুমি প্রাণ।
বাংলা বঞ্চিত আর ব্যথিত মানুষ যত
বরণ মালায় সাজালো তোমায় িবিজয়ী বীরের মত
মথিয়া বিশ্ব আনিবে মুক্তি 
অক্ষয় অম্লান।
আলোর ভূবন দেখালে মোদের 
জ্বালালে প্রেমের প্রদীপ 
দেশের মাটিতে উড়ালে পতাকা 
জাতীয়তার প্রতীক।
দেশ দ্রোহের কলংক টিপ পরালো তোমায় যারা
ধুলায় লুটায় তাদের দম্ভ ভাঙ্গিয়া কঠিন করা
আসিছে সুদিন হবেই হবে 
দুখ নিশা অবসান।।

(৯) 
আমায় তুমি খুঁজছ কি মা আকাশের তারায়
কথা সুর কন্ঠ- মকছেদ আলী সাঁই

আমায় তুমি খুঁজছ কি মা আকাশের তারায়
ওদের মাঝে তোমার বাছার মুখ কি দেখা যায়। 
জন্মে শিশু তোমার কোলে
ধুলায় বালুতে 
কৈশোরে তে দুষ্ট ছেলে
খেলার মাঠেতে
ওরা তোমার আঙিনাতে
আজও আসে যায়।
যৌবন মা দস্যু দামাল 
যুদ্ধ সাজ নিয়ে
মুক্তিবাহিনীতে একদিন 
মিশেছি যায়ে
রক্ত দিয়ে নাম লেখেছি
ধরণীর ধুলায়।
ভয় নাই মা বিফল যাবেনা 
আমার এই পরাণ
তারই বদলায় সোনার বাংলায়
উদয়াচলের গান
মুক্তি সূর্য রক্ত মানিক 
ঐ তো দেখা যায়।।

(১০) 
শান্তির দূত শ্বেত কপোত উড়ে যা বাংলাদেশ 
কথা সুর কন্ঠ- মকছেদ আলী সাঁই

শান্তির দূত শ্বেত কপোত 
উড়ে যা বাংলাদেশ 
বল বিনিদ্র এক গানের পাপিয়া
তারে বড় ভালবাসে।
বহু কামনার একই সে তৃপ্তি
হয় নিশ্বেস না হয় মুক্তি
ফেলে দিয়ে সব বৃদ্ধি যুক্তি
তারই পুতঃ উল্লাস।
মৃত্যু তো ছিলে মহাসত্য
এখন হয়েছে বৃদ্ধ 
কালে প্রহরী স্বাক্ষী গোপাল
হয়ে আক্রোশে ক্রদ্ধ।
না বলা কথার আজ সমারোহ
তাই সুরে সুরে ব্যথার প্রবাহ
প্রবাসী পরাণ কাঁদে অহরহ
অনুক্ত আশ্বাসে।।



সাধক মকছেদ আলী সাঁইয়ের লেখা বাউল ভাবধারার কয়েকটি গান: 

(১)
মাবুদ আল্লার খবর পাওয়া ভার
শূন্য ভুতল অতল তলে 
তিন কালে তার অধিকার।
বলছি সবাই আমি জানি
তুমি কেবল জানা জানি
সে নামে এক অচিন শুনি
আকার সাকার নিরাকার।
যাওয়া আসা রূপ রটনা
প্রকৃতির সকল ঘটনা     
ধর্ম কর্ম যোগ যপনা
আমার হলো মহাভার।
সুখ দুঃখ আর কান্না িহাসি
আপন পরের মিশা মিশি
বাজবে যেদিন শমন বাঁশি
মকছেদ থেকো হুশিয়ার।।

(২)
নিঠুর নিরালায় বাঁশি আর বাজায়োনা
নিঠুর বন্ধুয়া তুই তো আমার খবর নিলিনা
তোমায় ভালবেসে আমার ঘটলো যন্ত্রণা।
ভালবেসে বুকের পাটায় মন তুই
যারে দিলি ঠাঁই
সেই আপন তোর ভাঙলো রে বুক
বলার কিছু নাই।
যার জন্য এই লুকোচুরি পথে পথে মোর 
পেলে তারে যেত বুঝি নয়নের ঘোর
জন্মবাদী তুই বিবাদী বন্ধু দেখা দিলিনা। 
সাধন জোরে কর্ম ফাঁসি
কেটে যায় শুনি
জানবো কবে সাধন কথা 
বসে দিন গুনি
দয়া করে ডেকে মোরে সাধন কথা কও 
জ্ঞান নয়নে রূপ রসানে  মোরে দেখা দাও
বেদরদী সাধন  বিধি মোরে বললি না। 
দোহাই তোমার জীবন আমার 
ধন্য করোগো
ত্রিবেনীর পিছল ঘাটায়
আমায় ত্বরগো
সেই যে ঘাটের উল্টো  ধারে কাম-কুমিরের ভয়
কেউ বলে ভাই সেই ঘাটেতেই বন্ধুর দেখা হয়
নইলে সাধন ভজন সব অকারণ
মকছেদ বুঝলো না।।

(৩)
বাজার মিলায়ে তুমি বসে দোকানদার 
তুমি দোকান তুমি দ্রব্য তুমি খরিদ্দার।
আশা যাওয়া একই দশা
একই নিয়ম হিসাব কশা
শেষ কালে সব তলাফাঁসা
একই রূপান্তর। 
দিন দুয়েকের মাতব্বরি 
তাইতে আমার তকব্বরি 
রকম রকম কলমা জারী
শেষে একাকার।
এক বিনে দুই দেখা যায় না
তাহলে তো কুল পাবে না
কেউ দেখে কেউ দেখতে পায়না
মকছেদ সঙ্গী তার
চুলকিয়ে বরণ করা সব
মরণ সমাচার।।

(৪)
শুনে তোর প্রেমের বাঁশি রই উদাসী
এই বিষের হাসি আর হেসনা
দোহাই তোর ওরে নিঠুর সুর সু-মধুর
চরণ নূপুর বাজাইও না।
বেসনা কেউ যেন ভালো মনের আলো
নিভিয়ে কালো আর ডেকনা
অকুল মরবি কেঁদে সেধে সেধে
নয়ন বেধে আর ঘুরো না।
বুঝিনা কি কারসাজী ভোজের ভাজি
কেউ নয় রাজি নাম মস্তানা
হারিয়ে সকল ফন্দী হয়ে বন্দি
পায়না ছন্দি তাই পস্তানা।
যেজন তোমার আপনার হয় আশাতে রয়
তারে বোধহয় চোখে দেখনা 
মকছেদ তোর গেলরে কাল সামনে বিকাল 
তুইরে বেতাল তাও বোঝনা।।

(৫)
কার কাছে কই মনে কথা আমার
দুঃখ বোঝা মন পেলাম না
জানা শুনা অচিন চেনা
এই অহংকার গেল না।
এক দন্ডের খবর নাই
করি কেবল জ্ঞানের বড়াই
সুখ দুখের হিসাব কালে ভাই 
গোলেমালে তানা নানা।
মন বেপারীর কারীগুরি
না বুঝে বেশ দন্ডধারী 
যার যেমন মন সেই ফল তারি-
খেটে-মরা আনাগোনা।
যা হবার তা হলো এবার 
মানুষ জনম পাবো কি আর
আসা যাওয়া সখের কারবার
মকছেদের সাঙ্গ হবে কিসের বল না।।


--- বাউল পানকৌড়ি
সরদার আলাউদ্দিন আহমেদ- ভুলে যাওয়া স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের এক শব্দ সৈনিকের নাম---Click to Read


Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url