আব্দুল লতিফ শাহ ফকির চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলার জাঁহাপুর গ্রামে জন্ম। একজন প্রখ্যাত লালন সাধক, লালন গানের শিল্পী, বাউল, কবি, দার্শনিক, আলোচক, গবেষক। আব্দুল লতিফ শাহ এসব পরিচয়ের বাহিরে একজন পরিবেশবাদী এবং নদ-নদী ও পরিবেশ সুরক্ষা সংগঠনের সক্রিয় সদস্য। ফকির লালন সাইয়ের জীবন ও কর্মের উপর নির্মিত “মনের মানুষ” চলচ্চিত্রে লালনের গানে কন্ঠ দিয়ে অর্জন করেছেন জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক অনেক পুরস্কার প্রশংসা এবং পেয়েছেন ভক্ত সাধারনের অংসখ্য ভালবাসা। আব্দুল লতিফ শাহের আরেকটা পরিচয় হচ্ছে মরমী সুর সাধক ২১শে পদকপ্রাপ্ত খোদাবক্স শাহের সুযোগ্য সন্তান। ।
লালন দর্শনের এক নিভৃতচারী পথিকৃৎ
বাংলার আকাশ-বাতাস মরমী সাধকদের সুর ও বাণীতে যুগ যুগ ধরে মুখরিত। সেই অবিনাশী সুরের ধারায় এক উজ্জ্বল নক্ষত্র আব্দুল লতিফ শাহ ফকির। চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার জাঁহাপুর গ্রামে জন্ম নেওয়া এই সাধক কেবল একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রখ্যাত মরমী গায়ক খোদাবক্স শাহের সুযোগ্য সন্তানই নন, বরং তিনি নিজে লালন দর্শনের এক জীবন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া। আব্দুল লতিফ শাহের পরিচয় বহুমুখী—তিনি একাধারে সুকণ্ঠী শিল্পী, গবেষক, দার্শনিক এবং সক্রিয় পরিবেশবাদী।
ফকির লালন সাঁইজির জীবন ও কর্মের ওপর নির্মিত ‘মনের মানুষ’ চলচ্চিত্রে তাঁর দরদী কণ্ঠ বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছে। তাঁর সাধনা কেবল মঞ্চের গানে সীমাবদ্ধ নয়, বরং নদী ও প্রকৃতি রক্ষার সামাজিক আন্দোলনেও তিনি এক অগ্রণী সৈনিক। মরমী চেতনার এই নিরলস সাধককে নিয়ে আমাদের আজকের এই বিশেষ সংকলন, যেখানে তাঁর কণ্ঠে জনপ্রিয় হওয়া লালন সাঁইজির কিছু অমর সৃষ্টির আধ্যাত্মিক সুধা পরিবেশন করা হয়েছে।
আব্দুল লতিফ শাহ ফকির এর কন্ঠে লালন বানী
(১)
এলাহি আলমিন গো আল্লাহ বাদশাহ আলমপনা তুমি
কন্ঠ- লতিফ শাহ ফকির
তুমি ডুবায়ে ভাসাইতে পারো
ভাসায়ে কিনার দাও কারো
রাখো মারো হাত তোমার ও
তাইতে তোমায় ডাকি আমি
এলাহি আলমিন গো আল্লাহ
বাদশাহ আলমপনা তুমি।
নূহ নামের এক নবীরে
ভাসাইলে অকুল পাথারে
আবার তারে মেহের করে
আপনি লাগান কিনারে
জাহের আছে ত্রিসংসারে
আমায় দয়া করো স্বামী
এলাহি আলমিন গো আল্লাহ
বাদশাহ আলমপনা তুমি।
নিজাম নামে বাটপার সে তো
পাপেতে ডুবিয়া রইতো
তার মনে সুমতি দিলে
কুমতি তার গেলো চলে
আউলিয়া নাম খাতায় লিখলে
জানা গেল ঐ রহমই
এলাহি আলমিন গো আল্লাহ
বাদশাহ আলমপনা তুমি।
নবি না মানিলো যারা
মোয়াহেদ কাফেরও তারা
সেই মোয়াহেদ দায়মোল হবে
বে-হিসাব দোজখে যাবে
আবার তারা খালাস দিবে
লালন কয় মোর কি হয় জানি
এলাহি আলমিন গো আল্লাহ
বাদশাহ আলমপনা তুমি।
(২)
পাখি কখন জানি উড়ে যায়
কন্ঠ- লতিফ শাহ ফকির
পাখি কখন জানি উড়ে যায়
একটা বদ হাওয়া লেগে খাঁচায়
পাখি কখন জানি উড়ে যায়।
খাঁচার আড়া পরলো ধসে
পাখি আর দাঁড়াবে কী সে।
ঐ ভাবনা ভাবছি বসে
চমক ঝড়া বইসে গায়।
ভেবে অন্ত নাহি দেখি
কার বা খাঁচায় কেবা পাখি
আমার এই আঙ্গিনায় থাকি
আমারে মজাতে চায়।
আগে যদি যেত জানা
জোংলা কভু পোষ মানে না
তবে উহার সনে প্রেম করতাম না
লালন ফকির কেঁদে কয়।
(৩)
ডুবে দেখ দেখি মন কি রূপ লীলাময়
কন্ঠ- লতিফ শাহ ফকির
কিরূপ লীলাময়
ডুবে দেখ দেখি মন কি রূপ লীলাময়
যারে আকাশ-পাতাল খুঁজিস যারে
এ দেহে সে রয়।
লাম আলিফ লুকায় যেমন
মানুষে সাঁই আছে তেমন
তা নইলে কি সব নূরীত্বন
আদম তনে সেজদা জানায়।
আহাদে আহমদ হলো
মানুষের সাঁই সে জন্ম নিল
লালন মহা ফেরে পড়লো
সিরাজ সাঁইজির অন্ত না পাওয়ায়।
(৪)
ফকিরি করবি ক্ষ্যাপা কোন রাগে
কন্ঠ- লতিফ শাহ ফকির
ফকিরি করবি ক্ষ্যাপা কোন রাগে
আছে হিন্দু-মুসলমান দুই ভাগে
হিন্দু-মুসলমান দুই ভাগে
ফকিরি করবি ক্ষ্যাপা কোন রাগে।
বেহস্তের আশায় মোমিনগণ
হিন্দুরা দেয় স্বর্গেতে মন
বেহেস্ত স্বর্গ ফাটুক সমান
কার বা তা ভাল লাগে।
সেই ফকিরি সাধন করা
খোলসা রয় হজুরে
চল কী সে অটল মোকাম
নিহাজ করে জান আগে।।
অটল প্রাপ্তি কিসে হয়
মুরশিদের ধরে জানিতে হয়
সিরাজ সাঁই তাই লালন সাঁইয়ে
যেনো পড়িস নে ভবের ভোগে।
(৫)
খেয়েছি বে-জেতে কচু না বুঝে
কন্ঠ- লতিফ শাহ ফকির
এখন তেঁতুল কোথা পাই খুঁজে
খেয়েছি বে-জেতে কচু না বুঝে
এখন তেঁতুল কোথা পাই খুঁজে
খেয়েছি বে-জেতে কচু না বুঝে।
কচু এমন মান গোঁসাই
তারে কেউ চিনলে নারে ভাই
খেয়ে হলাম পাগলপারা
এখন চুপনি ঘরা চুলকাচ্ছে।
ভবে নিমবৃক্ষ
ওতে দেই চিনির সার
তাতে কি হয় আর মিঠা
এমনি কচুর বংশ যে।
যত সব ভেড়ুয়া বাঙ্গালি
কচুকে মান গোঁসাই বলে
লালন ভেঁড়ো খেয়ে দেখলো
ঐ কথায় কি মন মজে ॥
লালন দর্শনের জীবন্ত বাহক ও মানবতার জয়গান
আব্দুল লতিফ শাহ ফকির কেবল একজন কণ্ঠশিল্পী নন, তিনি লালন সাঁইজির জীবনদর্শন ও আধ্যাত্মিক চেতনার এক জীবন্ত বাহক। একুশে পদকপ্রাপ্ত সাধক খোদা বক্স শাহের উত্তরসূরি হিসেবে তিনি যেভাবে শুদ্ধ লালন চর্চাকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরেছেন, তা আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এক অমূল্য সম্পদ। ‘মনের মানুষ’ চলচ্চিত্রের সেই দরদী কণ্ঠ থেকে শুরু করে নদী ও পরিবেশ রক্ষার সামাজিক আন্দোলনসবখানেই তাঁর সরব উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, প্রকৃত বাউল বা সুফি সাধক কেবল ঘরের কোণে বসে থাকেন না, বরং তিনি সমাজের প্রতিটি সংকটে আলোর দিশারী হয়ে কাজ করেন। চুয়াডাঙ্গার মাটি থেকে উঠে আসা এই মহান শিল্পীর সুর ও দর্শন আগামী প্রজন্মের কাছেও মানবতার জয়গান গেয়ে যাবে।
আব্দুল লতিফ শাহ ফকির কেবল উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সুরকে বয়ে চলেননি, বরং লালন সাঁইজির অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী দর্শনকে ধারণ করেছেন নিজের জীবন ও মননে। তাঁর গাওয়া প্রতিটি গান তা দেহ তত্ত্ব হোক কিংবা সৃষ্টিতত্ত্ব শ্রোতাকে নিয়ে যায় এক গভীর আত্মিক জগতের দোরগোড়ায়। চুয়াডাঙ্গার মাটি থেকে উঠে আসা এই গুণী শিল্পী আজ শুদ্ধ লালন চর্চার এক বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান। তাঁর এই কণ্ঠ ও জীবনবোধ আগামী প্রজন্মের কাছেও শুদ্ধ সংস্কৃতি ও মানবতার আলোকবর্তিকা হয়ে বেঁচে থাকবে। ‘বাউল পানকৌড়ি’ ব্লগের এই সংকলন তাঁর সেই মরমী সাধনা ও জীবনবোধের প্রতি এক বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।


.jpeg)