বাংলা লোকসংগীত ও লালনচর্চার জগতে অরূপ রাহী একটি স্বতন্ত্র নাম। তিনি একই সঙ্গে সহজিয়া-বস্তুবাদী কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সঙ্গীতশিল্পী। পেশাগত জীবনের দীর্ঘ দশ বছর সাংবাদিকতায় কাটানোর পর নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত করেছেন লেখালিখি, গবেষণা ও সঙ্গীতে। বাংলা লোকসাহিত্য ও লোকসংগীতের গভীরে প্রবেশ করে তিনি শুধু গবেষণা করেননি, সেই ঐতিহ্যকে নিজের কণ্ঠ ও সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে সমকালীন শ্রোতার কাছেও পৌঁছে দিয়েছেন। অরূপ রাহী ‘রক সাঁইজি’ নামেও পরিচিত। তাঁর গানের দল লীলা। লীলার প্রথম একক অ্যালবাম ‘নায়ক’ প্রকাশের মধ্য দিয়ে তাঁর সঙ্গীতচর্চা পেয়েছে নতুন মাত্রা। পাশাপাশি তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন স্বেচ্ছাসেবী গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ অধ্যয়ন কেন্দ্র, যেখানে বাংলা লোকসাহিত্য ও লোকসংগীত নিয়ে গবেষণা ও চর্চা করা হয়। অরূপ রাহীর জন্ম ১৯৭৬ সালের ২৪ জুলাই। জন্মের পর থেকে আজ পর্যন্ত তাঁর সৃষ্টিশীল পথচলা বাংলা সংস্কৃতির লোকায়ত ধারার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
সাংবাদিকতা থেকে গবেষণা ও সঙ্গীতে
অরূপ রাহীর কর্মজীবনের শুরু সাংবাদিকতা দিয়ে। প্রায় এক দশক সাংবাদিক হিসেবে কাজ করার পর তিনি উপলব্ধি করেন, তাঁর প্রকৃত আগ্রহ বাংলা ভাষা, লোকসংস্কৃতি, গান ও মানুষের জীবনদর্শনের গভীরে। এরপর পেশাগত সাংবাদিকতার গণ্ডি পেরিয়ে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে লেখালিখি, গবেষণা ও সঙ্গীতে নিয়োজিত করেন। এই পরিবর্তন কেবল পেশা পরিবর্তনের ঘটনা নয়; বরং তাঁর চিন্তা ও জীবনদর্শনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। লোকসংগীতকে তিনি শুধুমাত্র বিনোদনের বিষয় হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে লোকগান মানুষের জীবন, সমাজ, দর্শন, প্রেম, দেহতত্ত্ব এবং অস্তিত্বের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
লালনচর্চায় অরূপ রাহীর নিজস্ব পথ
ফকির লালন সাঁইয়ের দর্শন অরূপ রাহীর সঙ্গীতচর্চার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। তবে তাঁর লালনচর্চা শুধুমাত্র পুরোনো গান গেয়ে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি লালনের ভাব ও দর্শনকে আধুনিক নাগরিক জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করেছেন। লালনের গানে মানুষ, দেহ, প্রেম, গুরু, সমাজ ও ধর্মের নানা প্রশ্ন উঠে আসে। অরূপ রাহী সেই প্রশ্নগুলোকে সমকালীন শ্রোতার সামনে নতুনভাবে উপস্থাপন করেন। তাঁর গায়কীতে তাই একদিকে রয়েছে লোকজ সুরের মাটির গন্ধ, অন্যদিকে রয়েছে আধুনিক বাদ্যযন্ত্র ও নাগরিক সংগীতবোধ। এই কারণেই তাঁর লালনচর্চা অনেক শ্রোতার কাছে নান্দনিকতার পাশাপাশি আত্মিক প্রকাশ ও চিন্তার অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে।
রক সাঁইজি’ ও আধুনিক সঙ্গীতভাবনা
অরূপ রাহীর পরিচয়ের সঙ্গে ‘রক সাঁইজি’ নামটি বিশেষভাবে যুক্ত। এই পরিচয়ের মধ্যেই তাঁর সংগীতভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রকাশ পায়। লোকজ দর্শন ও ঐতিহ্যকে আধুনিক রক ও সমকালীন সঙ্গীতের ভাষার সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়াস তাঁর পরিবেশনায় লক্ষ করা যায়। এখানে লালন হারিয়ে যান না; বরং নতুন প্রজন্মের শ্রবণভঙ্গির সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হন। একতারার ভাবনা আধুনিক গিটারের সুরের সঙ্গে মিশে তৈরি করে একটি আলাদা সংগীতভাষা।
‘লীলা’ ও অ্যালবাম
অরূপ রাহীর গানের দল লীলা তাঁর সংগীতচর্চার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। লীলার প্রথম একক অ্যালবাম ‘নায়ক’ তাঁর সংগীতজীবনের উল্লেখযোগ্য সংযোজন।এছাড়া তাঁর গানের অ্যালবামের মধ্যে রয়েছে—
- রবে না এ ধন জীবন যৌবন — লালন ফকিরের গান
- নায়ক
- লোকায়ত
এই অ্যালবামগুলো তাঁর লোকসংগীত, লালনচর্চা এবং সমকালীন সংগীতভাবনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরে।
বাংলাদেশ অধ্যয়ন কেন্দ্র
অরূপ রাহীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ বাংলাদেশ অধ্যয়ন কেন্দ্র। এটি একটি স্বেচ্ছাসেবী গবেষণা প্রতিষ্ঠান, যেখানে বাংলা লোকসাহিত্য ও লোকসংগীতের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গবেষণা ও চর্চা করা হয়। বাংলার লোকজ সংস্কৃতি সংরক্ষণ, তার ইতিহাস অনুসন্ধান এবং নতুন প্রজন্মের কাছে লোকঐতিহ্যের গুরুত্ব তুলে ধরার ক্ষেত্রে এ ধরনের উদ্যোগ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
অরূপ রাহীর সাহিত্যকর্ম
সঙ্গীতের পাশাপাশি অরূপ রাহী একজন কবি ও প্রাবন্ধিক হিসেবেও কাজ করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্য ও সঙ্গীতকর্মের মধ্যে রয়েছে—
- খনার বিজ্ঞান
- রূপপুর
- প্রেমের হাট
- অকৈতবের গান
- লুঙ্গি কাহিনি
এসব কাজের মধ্যেও তাঁর নিজস্ব চিন্তা, সমাজ পর্যবেক্ষণ এবং লোকায়ত জীবনবোধের প্রতিফলন দেখা যায়।
নাগরিক জীবনে লালনের প্রতিধ্বনি
অরূপ রাহীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান সম্ভবত এখানেই তিনি লালনকে কেবল অতীতের সাধক হিসেবে দেখেন না। তাঁর কাছে লালন বর্তমানেরও একজন জীবন্ত চিন্তক। কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার আখড়া থেকে ঢাকার ব্যস্ত নগরজীবন সবখানেই লালনের প্রশ্নগুলো প্রাসঙ্গিক। মানুষ কে? মানুষে মানুষে বিভেদ কেন? বাহ্যিক পরিচয়ের বাইরে মানুষের সত্যিকারের পরিচয় কোথায়? প্রেম ও মানবতার অবস্থান কোথায়? অরূপ রাহীর পরিবেশনা ও গবেষণায় এসব প্রশ্ন নতুনভাবে সামনে আসে।
অরূপ রাহীর কণ্ঠে নির্বাচিত কিছু অমৃত লালন বাণী
অরূপ রাহীর লালন গানে ফকির লালন সাঁই-এর ভাব ও দর্শন আধুনিক পরিমণ্ডলে ফুটে ওঠে। আজকের থাকছে অরূপ রাহীর কিছু নির্বাচিত লালন গান।
বিনা কার্যে ধন উপার্জন কে করিতে পারে
বিনা কার্যে ধন উপার্জন কে করিতে পারে
প্রেমের প্রেমিক না হলে
গুরু গত না হলে
সে ধন পায় না রে।
একই ইস্কুলে দশজনা পড়ে
গুরুমনের এই বাসনা
সব সমান করে
কেউ পিছে এসে আগে গেল
পরীক্ষায় চিনা যায় তারে।
বাংলা কিতাব কতই জনে পড়ে
আরবি ফারসি নাগরি বুলি
কে বুঝতে পারে
আবার শিখবি যদি নাগরি বুলি
বাংলা নেওগে পাশ করে।
বিষম্বরে বিষ পান করে
তাড়কায় করে বিছা হজম
কাকে কি পারে
ফকির লালন বলে রসিক হলে
বিষ খেয়ে হজম করে।।
মানুষতত্ত্ব যার সত্য হয় মনে
সেকি অন্য তত্ত্ব মানে
মানুষতত্ত্ব সত্য হয় যার মনে।
মাটির ঢিবি কাঠের ছবি
ভূত ভবিষ্যৎ দেবাদেবী
ভোলে না সে এসব রূপী
মানুষ ভজে দিব্যজ্ঞানে।
জোরোই সরোই লুলা ঝোলা
পেঁচাপেঁচী িএলোভোলা
তাতে নয় সে ভোলনেওয়ালা
মানুষ রতন যে জন চেনে।
ফেয়োফেপি ফ্যাকসা যারা
ভাকা ভোকায় ভোলে তারা
লালন তেমনি চটামারা
ঠিক দাঁড়ায় না একখানে।।
মন জানে আর জানে মরম
মনের কথা বলবো কারে
মন জানে আর জানে মরম
মজেছি মন দিয়ে যারে
মনের কথা বলবো কারে।
মনেরও তিনটি বাসনা
নদীয়ায় করবো সাধনা
নইলে মনের বিয়োগ যায় না
তাইতে ছিদাম এই হাল মনে।
কটিতে কোপিন পরিবো
করেতে করঙ্গ নিবো
মনের মানুষ মনে রাখবো
কর যোগে মনের সিদ্ধি।
যে দায়ের দায় আমার এ মন
রসিক বিনে বুঝবে কোন জন
গৌড় হয়ে নন্দের নন্দন
লালন কয় বিনয় করে।।
সোনার মান গেলো রে ভাই
শাল ফটকের কপালের ফের
কুষ্টার বানাত দেশ জুড়েছে
সোনার মান গেল রে ভাই
বেঙ্গা এক পিতলের কাছে।
বাজিল কলির আরতি
প্যাঁচ প’লো ভাই মানীর প্রতি
ময়ূরেরও নৃত্য দেখি
পেঁচায় পেখম ধরতে বসে ৷
শাল গ্রামকে করে নোড়া
ভূতের ঘরে ঘন্টা নাড়া
কলির তো এমনি দাঁড়া
স্থুল কাজে সব ভুল পড়েছে ৷
সবাই কিনে পিতলদানা
জহরের মূল্য হল না
লালন কয় গেল জানা
চটকে জগৎ মেতেছে ৷
দিল দরিয়ার মাঝে দেখলাম আজব কারখানা
দিল দরিয়ার মাঝে দেখলাম আজব কারখানা
ডুবলে পরে রতন পাবে
সেথায় ডুবলে পরে রতম পাবে
ভাসলে পরে পাবে না
দিল দরিয়ার মাঝে দেখলাম আজব কারখানা।
দেহের মধ্যে বাড়ি আছে
সেই বাড়ীতে চোর লেগেছে
ছয় জনাতে সিঁদ কাটিছে
চুরি করে একজনা
দিল দরিয়ার মাঝে দেখলাম আজব কারখানা।
এই দেহের মধ্যে নদী আছে
সেই নদীতে নৌকা চলছে
ছয় জনাতে গুণ টানিছে
হাল ধরেছে একজনা
দিল দরিয়ার মাঝে দেখলাম আজব কারখানা।
এই দেহের মধ্যে বাগান আছে
সেই বাগানে কত রকমের ফুল ফুটেছে
ফুলের সৌরভে জগৎ মেতেছে
লালনের মন মাতলো না
দিল দরিয়ার মাঝে দেখলাম আজব কারখানা।
প্রেম জানো না প্রেমের হাটের বোল বোলা
কথায় করো ব্রহ্ম-আলাপ
মনে মনে খাও মন কলা
প্রেম জানো না
প্রেমের হাটে বোল-বোলা।
বেশ করে হয় বোস্টমগিরি
রস নাহি তার যষ্টি ভারি
হরি নামের ঢুঢু তারি
তিন গাছি জপের মালা।
খাঁদা-বাঁধা ভূত চালানি
সেই যে বটে গণ্য জানি
সাধুর হাটে ঘুসঘুসানি
কি বলিতে কি বলা।
মন মাতওয়াল মদন-রসে
সদাই থাকে সেই আবেশে
লালন বলে সকল মিছে
লব-লবানে প্রেম উত্তালা।
যে খুঁজে মানুষে খোদা সেই তো বাউল
যে খুঁজে মানুষে খোদা, সেই তো বাউল
বস্তুতে যে ঈশ্বর আছে, করে তারই উল।
পূর্ব-পুনর্জনম না মানে, চক্ষু না দেয় অনুমানে
মানুষ ভজে দিব্যজ্ঞানে, হয় রে কবুল।
বেদ-তুলসীমালা টিপা, এ সকল খাস পঞ্চে ধোঁকা
শয়তানে দেয় রে ধাপ্পা, সব করে রে ভুল।
মানুষে সকল মেলে, দেখে-শুনে এ কথা বাউলে বলে
দীন দুদ্দু কি আর বলে, ফকির লালন সাঁইজীর কুল।
নিঠুর গরজী
নিঠুর গরজী
ও তুই ফুল ফুটাবি বাস ছুটাবি
ফুল ফুটাবি বাস ছুটাবি
সবুর বিহনে
মানস মুকুল ভাজবি আগুনে।
দেখ না আমার পরমগুরু সাঁই
যুগযুগান্তে ফুটায় মুকুল তাড়াহুড়া নাই
ও তোর লোভ প্রচন্ড ভরসা দন্ড
এর আছে রে কোন উপায়
কয় রে মদন শোন নিবেদন
দিস নে বেদন
শ্রীগুরুর মনে
ও তার সহজধারা আপনহারা
তার বাণী শোনে রে গরজী।
কোন মিস্ত্রি নাও বানাইছে
ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূরপঙ্খী নাও
কোন মেস্তরি নাও বানাইলো এমন দেখা যায়
ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূরপঙ্খী নাও।
চন্দ্র-সূর্য বান্ধা আছে নাওয়েরই আগায়
দূরবীনে দেখিয়া পথ মাঝি-মাল্লায় বায়
ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূরপঙ্খী নাও।
রঙ-বেরঙের কতো নৌকা ভবের তলায় আয়
রঙ-বেরঙের সারি গাইয়া ভাটি বাইয়া যায়
ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূরপঙ্খী নাও।
হারা-জিতা-ছুবের বেলা কার পানে কে চায়
মদন মাঝি বড়ই পাজি কতো নাও ডুবায়
ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূরপঙ্খী নাও ।
বাউল আব্দুল করিম বলে বুঝে উঠা দায়
কোথা হতে আসে নৌকা কোথায় চলে যায়
ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূরপঙ্খী নাও।
শেষকথা
অরূপ রাহী বাংলা লোকসংগীত ও লালনচর্চার জগতে এমন একজন শিল্পী, যিনি ঐতিহ্যকে শুধু সংরক্ষণ করতে চাননি; বরং তাকে সমকালীন জীবনের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেছেন। কবিতা, প্রবন্ধ, গবেষণা ও সংগীত—সব ক্ষেত্রেই তাঁর কাজের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ এবং মানুষের জীবনদর্শন। তাঁর কণ্ঠে লালনের গান তাই শুধু গান নয়; হয়ে ওঠে ভাবনার দরজা। লোকজ সুরের সঙ্গে আধুনিক সংগীতের সংযোগ এবং লালনের মানবতাবাদী দর্শনের সমকালীন ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে অরূপ রাহী নিজস্ব একটি সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরি করেছেন। কবি, গবেষক ও সঙ্গীতশিল্পীর প্রতি রইল শ্রদ্ধা ও শুভকামনা।


.jpg)