বিশ্বকাপ ফুটবলে আফ্রিকার জাগরণ ৯০-এর ক্যামেরুন থেকে ২০২২-এর মরক্কো
ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে আফ্রিকা মহাদেশের দেশগুলো শুধু অংশগ্রহণকারী নয়, তারা স্বপ্ন, সংগ্রাম, সাহস ও বিস্ময়ের এক অনন্য প্রতীক। ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার দীর্ঘদিনের আধিপত্যের মাঝেও আফ্রিকার দলগুলো বারবার দেখিয়ে দিয়েছে প্রতিভা, আত্মবিশ্বাস এবং অদম্য লড়াইয়ের মানসিকতা থাকলে অসম্ভব বলে কিছু নেই। কখনও তারা শক্তিশালী পরাশক্তিকে হারিয়ে বিশ্বকে বিস্মিত করেছে, আবার কখনও ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেমিফাইনালের দুয়ার থেকে বিদায় নিতে হয়েছে। তবুও প্রতিটি বিশ্বকাপেই আফ্রিকার প্রতিনিধিরা নতুন স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নেমেছে এবং কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়ে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে।
১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপে ক্যামেরুনের ‘অদম্য সিংহ’দের ঐতিহাসিক কোয়ার্টার ফাইনাল যাত্রা বিশ্ব ফুটবলের দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দেয়। এরপর নাইজেরিয়া, সেনেগাল, ঘানা, আলজেরিয়া ও আইভরি কোস্টের মতো দলগুলোও নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ রেখে গেছে। বিশেষ করে ২০১০ সালে ঘানার হৃদয়বিদারক বিদায় এবং ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে মরক্কোর ঐতিহাসিক সেমিফাইনাল নিশ্চিত করা আফ্রিকান ফুটবলের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় রচনা করেছে। মরক্কো প্রথম আফ্রিকান ও প্রথম আরব দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের শেষ চারে উঠে প্রমাণ করেছে, আফ্রিকার ফুটবল আর শুধু সম্ভাবনার গল্প নয় এটি এখন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী বাস্তবতা।
এই নিবন্ধে বিশ্বকাপের ইতিহাসে আফ্রিকার দেশগুলোর অংশগ্রহণ, সাফল্য, স্মরণীয় ম্যাচ, অবিস্মরণীয় মুহূর্ত এবং মহাদেশটির ফুটবল ঐতিহ্যের অনুপ্রেরণাদায়ক যাত্রা তুলে ধরা হয়েছে।
বিশ্বকাপে আফ্রিকার প্রথম পদচারণা: অন্ধকারের অবসান (১৯৩৪ ও ১৯৭০)
বিশ্বকাপের বর্তমান উন্মাদনায় আফ্রিকার দলগুলোর দাপট আজ স্বীকৃত বাস্তবতা হলেও শুরুটা ছিল মোটেও সহজ নয়। বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরে অংশগ্রহণের অধিকার পেতেই আফ্রিকার দেশগুলোকে দীর্ঘদিন বৈষম্য, সীমিত সুযোগ এবং কঠিন বাছাইপর্বের বাধা অতিক্রম করতে হয়েছে। তবুও তারা হার মানেনি। প্রতিটি বিশ্বকাপেই নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণের দৃঢ় সংকল্প নিয়ে মাঠে নেমেছে আফ্রিকার প্রতিনিধিরা। সেই সংগ্রামের পথ ধরেই একসময় ক্যামেরুন, নাইজেরিয়া, সেনেগাল, ঘানা এবং সর্বশেষ মরক্কোর মতো দল বিশ্বমঞ্চে ইতিহাস গড়েছে। আফ্রিকার বিশ্বকাপ যাত্রার সূচনা তাই শুধু ফুটবলের নয়, সমান অধিকার, আত্মবিশ্বাস ও অদম্য লড়াইয়েরও এক অনুপ্রেরণাময় ইতিহাস।
- মিশরের ঐতিহাসিক সূচনা (১৯৩৪): বিশ্বকাপের দ্বিতীয় আসরেই অর্থাৎ ১৯৩৪ সালের ইতালি বিশ্বকাপে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে অংশ নেয় মিশর। নকআউট পদ্ধতির সেই টুর্নামেন্টে তারা হাঙ্গেরির কাছে ৪-২ ব্যবধানে হেরে বিদায় নিলেও বিশ্বমঞ্চে আফ্রিকার উপস্থিতির খাতাটি খুলে দেয়। মিশরের আব্দুল রহমান ফাওজি একাই দুই গোল করে বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম আফ্রিকান গোলদাতা হিসেবে নিজের নাম অমর করে রাখেন।
- ফিফার বৈষম্য ও ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক বয়কট: মিশরের সেই অভিষেকের পর দীর্ঘ ৩৬ বছর বিশ্বকাপে আফ্রিকার কোনো স্থায়ী বা সরাসরি জায়গা ছিল না। এশিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলের সাথে আফ্রিকার দলগুলোকে মিলিয়ে মাত্র একটি টিকিটের জন্য লড়তে হতো। এই চরম বৈষম্যের প্রতিবাদে ১৯৬৬ সালের ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ সম্পূর্ণ বয়কট করে আফ্রিকার ১৫টি দেশ। মহাদেশটির এই ঐক্যবদ্ধ অবস্থান ফিফাকে বাধ্য করে তাদের সিদ্ধান্ত বদলাতে।
- মরক্কোর হাত ধরে নতুন দিগন্ত (১৯৭০): আফ্রিকার তীব্র প্রতিবাদের মুখে ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো আফ্রিকার জন্য একটি সরাসরি কোটা বরাদ্দ করা হয়। সেই সুযোগে বিশ্বকাপে আসে মরক্কো। তারা পশ্চিম জার্মানির মতো পরাশক্তির বিপক্ষে প্রথমে লিড নিয়ে চমকে দেয়। যদিও ম্যাচটি ২-১ ব্যবধানে হেরেছিল। তবে বুলগেরিয়ার সাথে ১-১ গোলে ড্র করে বিশ্বকাপের মঞ্চে আফ্রিকার প্রথম পয়েন্ট এনে দেয় এই ‘আটলাস লায়ন্স’রাই।
- এরপর ১৯৭৮ বিশ্বকাপে তিউনিসিয়া মেক্সিকোকে ৩-১ গোলে হারিয়ে আফ্রিকার ফুটবল ইতিহাসে প্রথম জয়ের স্বাদ পায়। এই প্রাথমিক পদচারণাগুলোই পরবর্তীতে আফ্রিকান ফুটবলের মহীরুহ হয়ে ওঠার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল।
অদম্য ক্যামেরুন: আফ্রিকার ফুটবল বিপ্লবের সূর্যোদয় (১৯৯০)
আফ্রিকান ফুটবলের প্রকৃত বিস্ফোরণ ঘটে ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপে। ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনাকে স্তব্ধ করে দেওয়া। উদ্বোধনী ম্যাচেই সে সময়ের রানিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে চমকে দিয়ে ১-০ গোলে জয় পেয়ে যায়। ওয়ামামের সেই গোল আর ক্যামেরুনের শারীরিক ও আক্রমণাত্মক ফুটবল পুরো বিশ্বকে বার্তা দিয়েছিল আফ্রিকা তৈরি।
রজার মিলার কোমর দুলানো নাচ। ৩৮ বছর বয়সী রজার মিলা ছিলেন ১৯৯০ বিশ্বকাপের মহানায়ক। সুপার-সাব হিসেবে নেমে একে একে গোল করা আর কর্নার ফ্ল্যাগের পাশে তার সেই বিখ্যাত নাচ আজও বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা আইকনিক দৃশ্য।
রোমানিয়া এবং কলম্বিয়াকে হারিয়ে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছায় ক্যামেরুন। সেমিফাইনালের খুব কাছে গিয়েও ইংল্যান্ডের কাছে ৩-২ ব্যবধানে হেরে বিদায় নিতে হয় তাদের। তবে তবুও ক্যামেরুন দেখিয়ে দেয় যে আফ্রিকান দলগুলো আর কেবল অংশগ্রহণ করতে আসে না তারা জিততেও পারে।
নাইজেরিয়ার সোনালি প্রজন্ম
১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে নাইজেরিয়া দুর্দান্ত ফুটবল উপহার দেয়। জে-জে ওকোচা, রশিদি ইয়েকিনি এবং ড্যানিয়েল আমোকাচির মতো তারকাদের নিয়ে গড়া দলটি তাদের আক্রমণাত্মক ফুটবলের জন্য প্রশংসা পায়।
নাইজেরিয়া গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠলেও ইতালির বিপক্ষে শেষ মুহূর্তে হার মানে। ১৯৯৮ সালেও তারা আবার নকআউট পর্বে পৌঁছায়। ফলে নাইজেরিয়া আফ্রিকান ফুটবলের অন্যতম ধারাবাহিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
সেনেগালের রূপকথা এবং তেরাঙ্গার সিংহদের গর্জন (২০০২)
ক্যামেরুনের ঠিক ১২ বছর পর, ২০০২ সালের জাপান-দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বকাপে বিশ্ববাসী দেখল আরেক আফ্রিকান বিস্ময় সেনেগাল। আলিউ সিসের নেতৃত্বে একঝাঁক তরুণ ফুটবলার প্রথমবার বিশ্বকাপে এসেই ইতিহাস ওলটপালট করে দেন।
- বিশ্বচ্যাম্পিয়ন বধ: উদ্বোধনী ম্যাচেই তারা ১-০ গোলে হারিয়ে দেয় ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে। পাপা বুবা দিওপের সেই গোল এবং খেলোয়াড়দের গোল উদযাপনের দৃশ্য ফুটবলপ্রেমীদের মনে চিরকাল দাগ কেটে থাকবে।
- গতি আর ট্যাকটিক্সের মিশেল: গ্রুপ পর্বে ডেনমার্ক এবং উরুগুয়ের সাথে ড্র করে নকআউট পর্বে ওঠে তারা। এরপর Sweden-কে হারিয়ে ক্যামেরুনের পর দ্বিতীয় আফ্রিকান দেশ হিসেবে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেয় সেনেগাল।
ঘানার ‘ব্ল্যাক স্টার্স’: মাত্র এক ইঞ্চির জন্য আফসোস (২০১০)
২০১০ সালে প্রথমবার আফ্রিকার মাটিতে (দক্ষিণ আফ্রিকা) বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়। পুরো মহাদেশের আশা-ভরসার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিল ঘানার ‘ব্ল্যাক স্টার্স’রা। লুইস সুয়ারেজের সেই বিতর্কিত হ্যান্ডবল না হলে আফ্রিকার ইতিহাস হয়তো ২০১০ সালেই অন্যভাবে লেখা হতো। গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে বিদায় করে কোয়ার্টার ফাইনালে উরুগুয়ের মুখোমুখি হয় ঘানা।
ম্যাচের শেষ মুহূর্তে নিশ্চিত গোলের শট গোললাইন থেকে হাত দিয়ে আটকে লাল কার্ড পান উরুগুয়ের লুইস সুয়ারেজ। ঘানা পেনাল্টি পায়। কিন্তু আসামোয়াহ গায়ানের সেই পেনাল্টি শট বারে লেগে প্রতিহত হলে স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো ফুটবল বিশ্ব। পরবর্তীতে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নেয় ঘানা।
মরক্কোর আটলাস লায়ন্স: ইতিহাস পুনর্লিখন (২০২২)
ক্যামেরুন, সেনেগাল বা ঘানা যা পারেনি ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে তাই করে দেখিয়েছে উত্তর আফ্রিকার দেশ মরক্কো। প্রথম আফ্রিকান এবং আরব দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠে তারা ফুটবল ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয়।
কোচ ওয়ালিদ রেগ্রাগুই দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র কয়েক মাস পর দলকে বিশ্বকাপে নিয়ে যান। গ্রুপ পর্বে তারা বেলজিয়ামকে হারায় এবং ক্রোয়েশিয়ার সাথে ড্র করে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে নকআউটে ওঠে। পরাশক্তিদের একের পর এক পতন। নকআউট পর্বে মরক্কো যা করল, তা রূপকথাকেও হার মানায়।
- স্পেন বধ: শেষ ষোলোতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনকে টাইব্রেকারে টাইট ডিফেন্সে আটকে দেয় মরক্কো। গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনো হয়ে ওঠেন চীনের প্রাচীর।
- রোনালদোর কান্না: কোয়ার্টার ফাইনালে ইউসুফ এন-নেসিরির আকাশছোঁয়া হেডের কোলে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগালকে ১-০ ব্যবধানে বিদায় করে মরক্কো। ম্যাচ শেষে রোনালদোর কেঁদে মাঠ ছাড়ার দৃশ্য মরক্কোর শ্রেষ্ঠত্বেরই প্রমাণ ছিল।
যদিও সেমিফাইনালে ফ্রান্সের কাছে এবং তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ক্রোয়েশিয়ার কাছে হেরে তারা চতুর্থ হয় তবুও আশরাফ হাকিমি, হাকিম জিয়েচ আর সোফিয়ান আমরাবাতদের এই দল আফ্রিকার ফুটবলের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করে।
কালো মহাদেশে বিশ্বকাপের মহোৎসব: দক্ষিণ আফ্রিকা (২০১০)
আফ্রিকান ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়টি রচিত হয় ২০১০ সালে। দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে প্রথমবার আফ্রিকার মাটিতে বসে ফুটবল বিশ্বকাপের আসর। নেলসন ম্যান্ডেলার দেশ দক্ষিণ আফ্রিকায় আয়োজিত এই বিশ্বকাপটি ছিল পুরো মহাদেশের জন্য একটি আবেগঘন উৎসব।
স্বাগতিক হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকা প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায় নিলেও, সফলভাবে এই মেগা ইভেন্ট আয়োজন করে তারা প্রমাণ করেছিল আফ্রিকা শুধু মাঠেই নয়, মাঠের বাইরেও বিশ্বমানের। পপ সম্রাজ্ঞী শাকিরার 'ওয়াকা ওয়াকা' গান আর গ্যালারিতে আফ্রিকান দর্শকদের ঐতিহ্যবাহী 'ভুবুজেলা'র গগনবিদারী আওয়াজ।
পুরো বিশ্বকে এক অন্যরকম আফ্রিকান উন্মাদনায় ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। উদ্বোধনী ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার সিফিওয়ে শাবালালার সেই বুলেট গতির গোল এবং গোল উদযাপনের আফ্রিকান নাচ আজও বিশ্বকাপের অন্যতম আইকনিক দৃশ্য।
বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া আফ্রিকান দেশগুলোর তালিকা (২০২৬ পর্যন্ত)
ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে এ পর্যন্ত (২০২৬ সালের আসরসহ) আফ্রিকা মহাদেশ থেকে সর্বমোট ১৩টি দেশ বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রতিনিধিত্ব করতে পেরেছে। নিচে তাদের তালিকা ও অংশগ্রহণের সংখ্যা দেওয়া হলো:
- ক্যামেরুন: ৮ বার (আফ্রিকার মধ্যে সর্বোচ্চ)
- মরক্কো: ৬ বার
- নাইজেরিয়া: ৬ বার
- তিউনিসিয়া: ৬ বার
- আলজেরিয়া: ৪ বার
- ঘানা: ৪ বার
- মিশর: ৩ বার
- সেনেগাল: ৩ বার
- আইভরি কোস্ট (কোত দিভোয়ার): ৩ বার
- দক্ষিণ আফ্রিকা: ৩ বার (২০১০ সালের আয়োজকসহ)
- অ্যাঙ্গোলা: ১ বার (২০০৬)
- টোগো: ১ বার (২০০৬)
- জায়ারে (বর্তমান গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র): ১ বার (১৯৭৪)
আফ্রিকান ফুটবলের আকাশছোঁয়া সুপারস্টাররা
আফ্রিকান ফুটবলের এই দীর্ঘ যাত্রায় মাঠ কাঁপানো কয়েকজন কিংবদন্তি সুপারস্টার, যারা শুধু আফ্রিকায় নয়, বিশ্ব ফুটবলেই নিজেদের রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন:
- রজার মিলা (ক্যামেরুন): ১৯৯০ বিশ্বকাপের আসল নায়ক। ৩৮ বছর বয়সে বুট ঝুলিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ভেঙে দলে ফিরে ৪টি গোল করেছিলেন এবং ক্যামেরুনকে কোয়ার্টার ফাইনালে তুলেছিলেন। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ৪২ বছর বয়সে গোল করে তিনি বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক গোলদাতার রেকর্ড নিজের করে রাখেন।
- দিদিয়ের দ্রগবা (আইভরি কোস্ট): চেলসির এই কিংবদন্তি স্ট্রাইকার শুধু মাঠেরই সেরা ছিলেন না, ছিলেন নিজ দেশের গৃহযুদ্ধ থামানো এক মহানায়ক। আইভরি কোস্টকে ২০০৬ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে তোলার পেছনে তার অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি। তার শারীরিক শক্তি ও নিখুঁত ফিনিশিং ডিফেন্ডারদের জন্য ছিল এক আতঙ্কের নাম।
- স্যামুয়েল ইতো (ক্যামেরুন): বার্সেলোনা ও ইন্টার মিলানের হয়ে একাধিক চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ী এই স্ট্রাইকারকে আফ্রিকার ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় মনে করা হয়। ক্যামেরুনের হয়ে চারটি ভিন্ন বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছেন এবং দেশের হয়ে রেকর্ড গোলদাতা তিনি।
- সাদিও মানে (সেনেগাল): আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা উইঙ্গার। লিভারপুলের হয়ে ইউরোপ জয় করা মানে ২০২২ সালে সেনেগালকে আফ্রিকান কাপ অব নেশনস জেতান এবং দলকে বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করান। মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি নিজের উপার্জিত অর্থ দিয়ে নিজ গ্রামে হাসপাতাল ও স্কুল বানিয়ে মানবতা তৈরিতেও তিনি এক সুপারস্টার।
- মোহাম্মদ সালাহ (মিশর): 'মিশরীয় রাজা' বা 'ইজিপশিয়ান কিং' নামে পরিচিত সালাহ আধুনিক ফুটবলের অন্যতম গোলমেশিন। লিভারপুলের হয়ে গোলবন্যা বইয়ে দেওয়া সালাহ দীর্ঘ ২৮ বছর পর ২০১৮ সালে মিশরকে একক নৈপুণ্যে বিশ্বকাপে নিয়ে যান।
আফ্রিকার বিশ্বকাপ স্বপ্ন কতদূর?
বর্তমানে আফ্রিকার ফুটবল অবকাঠামো, খেলোয়াড় উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী। ইউরোপের বড় বড় ক্লাবে এখন নিয়মিত খেলছেন আফ্রিকান ফুটবলাররা। সেনেগাল, মরক্কো, মিশর, ঘানা, নাইজেরিয়া, ক্যামেরুন এবং আইভরি কোস্টের মতো দেশগুলো ধারাবাহিকভাবে বিশ্বমানের খেলোয়াড় তৈরি করছে।
অনেক ফুটবল বিশ্লেষকের বিশ্বাস, আগামী কয়েকটি বিশ্বকাপের মধ্যেই কোনো আফ্রিকান দল সেমিফাইনালের গণ্ডি পেরিয়ে ফাইনালেও পৌঁছাতে পারে। আফ্রিকান দলগুলোর বিশ্বকাপ ইতিহাস শুধু ফলাফলের গল্প নয়; এটি সাহস, আত্মবিশ্বাস এবং অসম্ভবকে চ্যালেঞ্জ করার গল্প। আলজেরিয়ার প্রতিবাদ, ক্যামেরুনের বিপ্লব, সেনেগালের রূপকথা, ঘানার হৃদয়ভাঙা মুহূর্ত এবং মরক্কোর ঐতিহাসিক সেমিফাইনাল।
সব মিলিয়ে আফ্রিকার বিশ্বকাপ যাত্রা ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম অনুপ্রেরণাদায়ক অধ্যায়। হয়তো খুব শিগগিরই বিশ্বকাপ ট্রফি কোনো আফ্রিকান অধিনায়কের হাতে উঠবে। আর সেদিন এই দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতিটি অধ্যায় নতুন অর্থ খুঁজে পাবে।
