ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে যদি কোনো দলকে সবচেয়ে নাটকীয়, রোমাঞ্চকর এবং প্রভাবশালী বলা হয় তবে তাতে ফ্রান্সের নাম থাকবে একদম ওপরের সারিতে। ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপের প্রথম গোল থেকে শুরু করে ১৯৯৮ আর ২০১৮ সালের বিশ্বজয় ফরাসি ফুটবলের গল্পটা যেন কোনো টানটান উত্তেজনার সিনেমার চেয়ে কম নয়।
ফ্রান্স ফুটবল টিম, ডাকনাম ‘লে ব্লু’ (Les Bleus) যারা শুধু ইউরোপ নয়, গোটা বিশ্বের ফুটবলে রং তুলেছে তাদের অনন্য শৈলীতে। দুইবার বিশ্বকাপ জয় (১৯৯৮, ২০১৮), দুইবার ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ (১৯৮৪, ২০০০) ইতিহাসে ফ্রান্স অন্যতম সফল দল।
আজ আমরা জানব তাদের ওঠাপড়ার গল্প, তারকা খেলোয়াড়দের কথা, এবং শেষে থাকছে একটি কুইজ নিজেকে পরখ করে দেখুন কতটা চেনেন ফ্রান্স ফুটবল টিমকে!
বিশ্বকাপের ইতিহাসের প্রথম গোলদাতা এক ফরাসি!
বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাস শুরুই হয়েছিল ফ্রান্সের হাত ধরে। ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত ইতিহাসের প্রথম ম্যাচে মেক্সিকোকে ৪-১ ব্যবধানে হারিয়েছিল ফ্রান্স। সেই ম্যাচের ১৯তম মিনিটে ফরাসি ফরোয়ার্ড লুশিয়েন লরেন্ট গোল করে ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বপ্রথম গোলটি করার অমর গৌরব অর্জন করেন।
জুঁ ফন্টেইনের এক আসরে ১৩ গোলের অতিমানবীয় রেকর্ড
১৯৫৮ সালের সুইডেন বিশ্বকাপে ফ্রান্সের স্ট্রাইকার জুঁ ফন্টেইন এক অবিশ্বাস্য কীর্তি গড়েছিলেন। তিনি এক আসরেই একাই করেছিলেন ১৩টি গোল, যা আজ পর্যন্ত বিশ্বকাপের ইতিহাসে একটি একক আসরে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড। সেবার সেমিফাইনালে পেলের ব্রাজিলের কাছে হারলেও, তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে পশ্চিম জার্মানিকে ৬-৩ ব্যবধানে হারিয়ে ব্রোঞ্জ পদক জিতেছিল ফ্রান্স।
Les Bleus ভক্তদের জন্য কুইজ
Les Bleus | ফ্রান্স ফুটবল কুইজ
🏆 আপনার স্কোর
০ / ১০
ইতিহাসের প্রথম 'গোল্ডেন গোল'
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ম্যাচ দ্রুত শেষ করার জন্য একসময় 'গোল্ডেন গোল' (যে আগে গোল করবে সে-ই জিতবে) নিয়ম ছিল। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম গোল্ডেন গোলের মাধ্যমে ম্যাচ জয়ের রেকর্ডটি ফ্রান্সের। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে প্যারাগুয়ের লড়াকু রক্ষণভাগ এবং গোলরক্ষক চিল্যাভার্টকে পরাস্ত করে ১১৪তম মিনিটে এই ঐতিহাসিক গোলটি করেছিলেন ডিফেন্ডার লরেন্ট ব্লাঙ্ক।
৯৮-এর ফাইনালে ব্রাজিলকে হারিয়ে বিশ্বজয়
১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে জিনেদিন জিদানের দুটি দুর্দান্ত হেডের কথা সবার মনে আছে। কিন্তু ফ্রান্স যে ব্রাজিলকে ৩-০ ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়েছিল, সেই ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে (৯৩ মিনিটে) কাউন্টার অ্যাটাক থেকে তৃতীয় গোলটি কে করেছিলেন? তিনি ছিলেন আর্সেনালের তৎকালীন তারকা মিডফিল্ডার ইমানুয়েল পেটিট।
২০০২ সালের চ্যাম্পিয়নদের ট্র্যাজেডি ও সেনেগাল রূপকথা
১৯৯৮-এর চ্যাম্পিয়ন এবং ২০০০-এর ইউরো জয়ী ফ্রান্স দল ২০০২ বিশ্বকাপে খেলতে নেমেছিল হট ফেভারিট হিসেবে। কিন্তু উদ্বোধনী ম্যাচেই নবাগত আফ্রিকান দল সেনেগাল-এর কাছে ১-০ ব্যবধানে হেরে স্তব্ধ হয়ে যায় বিশ্ব। জিনেদিন জিদানের ইনজুরি এবং অভ্যন্তরীণ সমস্যার কারণে ফ্রান্স সেবার গ্রুপ পর্বের ৩ ম্যাচে একটি গোলও না করতে পেরে বিদায় নেয়।
২০০৬ ফাইনাল: জিদানের লাল কার্ড এবং ত্রেজেগের সেই পেনাল্টি মিস
২০০৬ বিশ্বকাপ ফাইনালটি জিনেদিন জিদানের মাতেরাজ্জিকে দেওয়া ঢুস (Headbutt) এবং লাল কার্ডের জন্য ইতিহাসের পাতায় আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। তবে ম্যাচটি টাইব্রেকারে গড়ালে ফ্রান্সের হয়ে একমাত্র পেনাল্টি মিসটি করেছিলেন ডেভিড ত্রেজেগে। তার শটটি ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে এবং ইতালি চ্যাম্পিয়ন হয়। অথচ ২০০০ সালের ইউরো ফাইনালে এই ইতালির বিপক্ষেই গোল্ডেন গোল করে ফ্রান্সকে জিতিয়েছিলেন ত্রেজেগে!
খেলোয়াড় ও কোচ হিসেবে বিশ্বজয়ের অনন্য কীর্তি
ইতিহাসে মাত্র তিনজন ব্যক্তি খেলোয়াড় এবং কোচ—উভয় হিসেবেই বিশ্বকাপ জয় করার অনন্য কীর্তি গড়েছেন। মারিও জাগালো এবং ফ্রাঞ্জ বেকেনবাউয়ারের পর তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে এই তালিকায় নাম লেখান ফ্রান্সের বর্তমান কোচ দিদিয়ের দেশম। তিনি ১৯৯৮ সালে অধিনায়ক হিসেবে এবং ২০১৮ সালে প্রধান কোচ হিসেবে ফ্রান্সকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেন।
এক নজরে ফ্রান্সের আরও কয়েকটি অজানা বিশ্বকাপ তথ্য
- ২০১৮ ফাইনালে এমবাপ্পের সেই ২৫ গজের দূরপাল্লার শট :২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে কিলিয়ান এমবাপ্পে পেলের পর প্রথম টিনেজার (১৮-১৯ বছর বয়সী) হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনালে গোল করার রেকর্ড গড়েন। ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে ফাইনালে তিনি পেনাল্টি বক্সের ঠিক বাইরে থেকে, প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে এক মাটি ঘেঁষা নিখুঁত শটে গোল করে ফ্রান্সের ৪-২ ব্যবধানের জয় সুনিশ্চিত করেছিলেন।
- ১৯৫৪ সালের সান্ত্বনার জয়: ১৯৫৪ বিশ্বকাপে ফ্রান্স গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়। তবে বিদায়ের আগে তারা উত্তর আমেরিকার দেশ মেক্সিকোকে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়ে একটি সান্ত্বনার জয় পেয়েছিল।
- ১৯৮৬-এর ব্রাজিল বনাম ফ্রান্স রোমাঞ্চ: ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্স ও ব্রাজিলের ম্যাচটি টাইব্রেকারে গড়ায়। ব্রাজিলের কিংবদন্তি মিডফিল্ডার সক্রেটিস তাঁর বিখ্যাত 'নো-রানআপ' পেনাল্টি শটটি মিস করেছিলেন, যা ফরাসি কিপার জোয়েল বাটস আটকে দেন।
- ২০১৪ সালে জার্মানির বাধা: ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্স জার্মানির কাছে ১-০ ব্যবধানে হেরে বিদায় নেয়। ম্যাচের একমাত্র গোলটি করেছিলেন জার্মান ডিফেন্ডার ম্যাটস হুমেলস।
- এমবাপ্পের কাতার বিশ্বকাপের হ্যাটট্রিক: ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ ফাইনালে কিলিয়ান এমবাপ্পে ঐতিহাসিক হ্যাটট্রিক করেন। এই ৩টি গোলের মধ্যে ২টি গোল এসেছিল পেনাল্টি থেকে এবং অন্যটি ছিল এক চোখধাঁধানো লাইভ ভলি।
- অন্যের জার্সি ধার করে খেলা ফরাসিরা! ১৯৭৮ বিশ্বকাপে হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে ম্যাচে জার্সি বিভ্রাট ঘটেছিল (উভয় দলই সাদা জার্সি নিয়ে আসে)। বাধ্য হয়ে ফ্রান্স দল স্থানীয় একটি ক্লাব 'ক্লাব অ্যাটলেটিকো কিম্বার্লি'-এর সবুজ-সাদা স্ট্রাইপযুক্ত জার্সি ধার করে ম্যাচটি খেলেছিল!
- পাভার্ডের সেই 'গোল অব দ্য টুর্নামেন্ট': ২০১৮ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে ৪-৩ ব্যবধানে জেতা ম্যাচে ফরাসি রাইট-ব্যাক বেঞ্জামিন পাভার্ড বক্সের বাইরে থেকে এক অবিশ্বাস্য হাফ-ভলি গোল করেছিলেন, যা সেবারের টুর্নামেন্টের সেরা গোল নির্বাচিত হয়।
- ফ্রান্সের কনিষ্ঠতম গোলদাতা: বিশ্বকাপের ইতিহাসে ফ্রান্সের হয়ে সবচেয়ে কম বয়সে গোল করার রেকর্ডটি কিলিয়ান এমবাপ্পের দখলে। ২০১৮ বিশ্বকাপে পেরুর বিরুদ্ধে মাত্র ১৯ বছর ১৮৩ দিন বয়সে তিনি এই গোলটি করেন।
- বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা ফরাসি: ফ্রান্সের সাবেক অধিনায়ক ও গোলরক্ষক উগো লরিস বিশ্বকাপে মোট ২০টি ম্যাচ খেলেছেন, যা যেকোনো ফরাসি খেলোয়াড়ের জন্য সর্বোচ্চ।
- ১৯৩৮ সালের স্বাগতিকদের বিদায়: ১৯৩৮ সালে ফ্রান্স যখন এককভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করে, তখন তারা কোয়ার্টার ফাইনালে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ইতালির কাছে ৩-১ ব্যবধানে হেরে বিদায় নিয়েছিল।
- অঁরির রেকর্ড ভাঙলেন জিরু: ২০২২ বিশ্বকাপে পোল্যান্ডের বিরুদ্ধে রাউন্ড অব সিক্সটিনে গোল করে অলিভিয়ের জিরু ফ্রান্সের হয়ে তাঁর ৫২তম গোলটি করেন এবং থিয়েরি অঁরির (৫১ গোল) রেকর্ড ভেঙে ফ্রান্সের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন।
- ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে ফ্রান্স দল ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় লজ্জার মুখোমুখি হয়। মেক্সিকোর বিরুদ্ধে ম্যাচের হাফ-টাইমে কোচ রেমন্ড ডোমেনেকের সাথে তীব্র বাদানুবাদের কারণে স্ট্রাইকার নিকোলাস আনেলকা-কে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এর প্রতিবাদে অধিনায়ক প্যাট্রিক ইভরাসহ পুরো দল অনুশীলন বয়কট করে। এই ঘটনাটি (Knysna mutiny) নামে পরিচিত। ফ্রান্স সেবারও গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেয়।
- ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে কিলিয়ান এমবাপ্পে পেলের পর প্রথম টিনেজার (১৮-১৯ বছর বয়সী) হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনালে গোল করার রেকর্ড গড়েন। ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে ফাইনালে তিনি পেনাল্টি বক্সের ঠিক বাইরে থেকে, প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে এক মাটি ঘেঁষা নিখুঁত শটে গোল করে ফ্রান্সের ৪-২ ব্যবধানের জয় সুনিশ্চিত করেছিলেন।
বিশ্বকাপ গ্রুপ পর্ব ফিক্সচার
ফ্রান্সের বিশ্বকাপ ইতিহাস মানেই উত্থান-পতন, ট্র্যাজেডি আর রাজকীয় প্রত্যাবর্তনের এক অদ্ভুত মিশ্রণ। কখনো তারা নিজেদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ধ্বংস হয়েছে, আবার কখনো দুর্দান্ত ফুটবল খেলে বিশ্বকে শাসন করেছে।
ফ্রান্স ফুটবল টিম শুধু একটি দল নয় এটি প্রতিভা, সাহস ও নাটকের এক অনন্য মিশ্রণ। ২০২৬ বিশ্বকাপেও তারা বড় চ্যালেঞ্জ হবে। আপনার কত উত্তর মিলেছে? কমেন্টে জানান আর ব্লগটি বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন!”
