ফুটবল বিশ্বকাপের ৯৬ বছরের ইতিহাসে এমন কিছু নাম খোদাই করা আছে, যারা সোনালী ট্রফিটা ছুঁয়ে দেখতে পারেননি। আবার কেউ কেউ ট্রফি জিতলেও, দলের অন্য কোনো মহাতারকার ছায়ায় তাদের অবদান কিছুটা ঢাকা পড়ে গেছে। তারা মাঠের পারফরম্যান্সে কোনো অংশে কম ছিলেন না।
কোনো কোনো আসরে একক শক্তিতে দলকে টেনে নিয়ে গেছেন ফাইনালে বা সেমিফাইনালে। আজকের ব্লগে আমরা আলোচনা করব ফুটবল ইতিহাসের এমন কিছু কিংবদন্তিকে নিয়ে, যারা বিশ্বমঞ্চে নিজেদের উজাড় করে দিয়েও ট্র্যাজেডির নায়ক হয়েই রয়ে গেছেন।
রাই (ব্রাজিল, ১৯৯৪)-মহাতারকার ছায়ায় ঢাকা পড়া এক জাদুকর
১৯৯৪ সালের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে ব্রাজিলের অধিনায়ক হিসেবে টুর্নামেন্ট শুরু করেছিলেন মিডফিল্ডার রাই (Raí)। কিংবদন্তি সক্রেটিসের ছোট ভাই রাই ছিলেন সে সময়ের অন্যতম সেরা প্লে-মেকার। টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচে রাশিয়ার বিরুদ্ধে পেনাল্টি থেকে গোলও করেছিলেন তিনি।
- কেন তিনি ট্র্যাজিক নায়ক?
টুর্নামেন্ট যত এগিয়েছে, ব্রাজিলের কোচ পারেইরা তাঁর রক্ষণাত্মক কৌশলের কারণে রাই-এর জায়গায় মাজিনহোকে দলে নিয়মিত করেন এবং অধিনায়কত্বের আর্মব্যান্ড চলে যায় দুঙ্গার হাতে। ব্রাজিল সেবার বিশ্বকাপ জিতেছিল।
কিন্তু পাদপ্রদীপের সব আলো কেড়ে নিয়েছিলেন রোমারিও আর বেবেতো জুটি। অথচ এই দলের ভিত্তি তৈরিতে এবং বাছাইপর্বে রাই-এর অবদান ছিল অনস্বীকার্য। তিনি ট্রফি জিতেও যেন স্পটলাইটের আড়ালে রয়ে যাওয়া এক নায়ক।
রবার্তো ব্যাজিও (ইতালি, ১৯৯৪)-এক পেনাল্টির ট্র্যাজেডিতে ঢাকা পড়া মহাকাব্য
ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে ১৯৯৪ সালের রবার্তো ব্যাজিও (Roberto Baggio)-এর চেয়ে বড় 'একক যোদ্ধা' খুব কমই দেখা গেছে। নকআউট পর্বে ইতালি যখনই বাদ পড়ার মুখে পড়েছে, তখনই দেবদূতের মতো হাজির হয়েছেন ব্যাজিও। নাইজেরিয়া, স্পেন আর বুলগেরিয়ার বিপক্ষে তাঁর জাদুকরী গোলগুলো ইতালিকে ফাইনালে তোলে।
- কেন তিনি ট্র্যাজিক নায়ক?
ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে টাইব্রেকারে তাঁর নেওয়া শেষ শটটি যখন ক্রসবারের ওপর দিয়ে চলে যায়, থমকে গিয়েছিল পুরো ইতালি। অথচ সেই বিশ্বকাপে ব্যাজিও না থাকলে ইতালি ফাইনাল খেলারই যোগ্যতা অর্জন করতে পারত না। একটিমাত্র পেনাল্টি মিস এই মহাতারকাকে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজিক হিরোতে পরিণত করে।
মাইকেল ব্যালাক (জার্মানি, ২০০২) - ট্র্যাজিক হিরোর চিরন্তন প্রতীক
২০০২ সালের কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপে জার্মানি দলটা কাগজে-কলমে খুব একটা শক্তিশালী ছিল না। কিন্তু মাঝমাঠে জেনারেলের মতো একাই পুরো দলকে টেনে ফাইনালে তুলেছিলেন মাইকেল ব্যালাক (Michael Ballack)। কোয়ার্টার ফাইনালে যুক্তরাষ্ট্র এবং সেমিফাইনালে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে তাঁর করা একমাত্র গোলেই জয় পায় জার্মানি।
- কেন তিনি ট্র্যাজিক নায়ক?
দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে সেমিফাইনালে দলের প্রয়োজনে একটি ট্যাকটিক্যাল ফাউল করে হলুদ কার্ড দেখেন ব্যালাক, যার ফলে কার্ড জটিলতায় ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে তাঁর খেলা নিষিদ্ধ হয়ে যায়। ফাইনালে ব্যালাকহীন জার্মানি রোনালদো নাজারিওর ব্রাজিলের কাছে ২-০ গোলে হেরে যায়।
জার্মানিকে ফাইনালে তুলেও ফাইনালে খেলতে না পারার এই ক্ষত ব্যালাককে বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম ট্র্যাজিক নায়কের মর্যাদা দেয়।
লুইস ফিগো (পর্তুগাল, ২০০৬) - সোনালী প্রজন্মের শেষ যুদ্ধ
পর্তুগালের ফুটবলের 'সোনালী প্রজন্ম' বা Golden Generation-এর নেতা ছিলেন লুইস ফিগো (Luís Figo)। ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপে একঝাঁক তরুণকে (যার মধ্যে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোও ছিলেন) সাথে নিয়ে পর্তুগালকে সেমিফাইনালে তোলেন এই ব্যালন ডি'অর জয়ী তারকা।
- কেন তিনি ট্র্যাজিক নায়ক?
পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত ড্রিবলিং আর লিডারশিপ দিয়ে পর্তুগালকে ৪-০ ব্যবধানে গ্রুপ পর্ব পার করান এবং নকআউটে নেদারল্যান্ডস ও ইংল্যান্ডের মতো পরাশক্তিদের বিদায় করেন। কিন্তু সেমিফাইনালে জিনেদিন জিদানের ফ্রান্সের কাছে পেনাল্টি গোলে হেরে বিদায় নিতে হয় ফিগোকে।
নিজের শেষ বিশ্বকাপে পর্তুগালকে ট্রফি এনে দিতে না পারলেও তাঁর সেই লড়াই ফুটবলপ্রেমীরা চিরকাল মনে রাখবে।
ডেভিড বেকহ্যাম (ইংল্যান্ড, ১৯৯৮ ও ২০০৬) - প্রত্যাশা আর ট্র্যাজেডির দোলাচল
ডেভিড বেকহ্যাম (David Beckham) শুধু একজন ফুটবলার ছিলেন না, ছিলেন গ্লোবাল সুপারস্টার। কিন্তু ইংল্যান্ডের হয়ে বিশ্বকাপে তাঁর গল্পটা সবসময়ই ছিল বীরত্ব আর ট্র্যাজেডিতে ঘেরা।
- কেন তিনি ট্র্যাজিক নায়ক?
১৯৯৮ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ডিয়েগো সিমিওনেকে লাথি মেরে লাল কার্ড পাওয়ার পর পুরো ইংল্যান্ডের খলনায়কে পরিণত হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ২০০২ সালের বাছাইপর্বে গ্রিসের বিপক্ষে সেই বিখ্যাত ফ্রি-কিক এবং মূল পর্বে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে পেনাল্টি গোলে জয় এনে দিয়ে নিজেকে প্রমাণ করেন।
আবার ২০০৬ বিশ্বকাপে অধিনায়ক হিসেবে কোয়ার্টার ফাইনালে পর্তুগালের বিপক্ষে ইনজুরি নিয়ে যখন অশ্রুসিক্ত চোখে মাঠ ছাড়েন, তখন তাঁর বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন চিরতরে শেষ হয়ে যায়। ইংল্যান্ডের 'সোনালী প্রজন্ম'-এর সেরা চালিকাশক্তি হয়েও তিনি রয়ে গেলেন ট্রফিহীন।
পাভেল নেদভেদ (চেক রিপাবলিক, ২০০৬) - ক্ষণজন্মা এক জাদুকরের বিদায়
২০০৩ সালের ব্যালন ডি'অর জয়ী পাভেল নেদভেদ (Pavel Nedvěd) ছিলেন চেক ফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার। আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিলেও শুধুমাত্র দেশের প্রয়োজনে অবসর ভেঙে ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপে খেলতে এসেছিলেন তিনি।
- কেন তিনি ট্র্যাজিক নায়ক?
২০০৬ বিশ্বকাপে চেক রিপাবলিকের দলটা চোট জর্জরিত ছিল। স্ট্রাইকার জান কোলার ও মিলান বারোসের ইনজুরির পর বুড়ো হাড়ের ভেলকি দেখিয়ে মাঝমাঠ একাই সামলান নেদভেদ। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ইতালির জিয়ানলুইজি বুফনকে একের পর এক দূরপাল্লার শটে পরীক্ষা নিয়েছিলেন তিনি।
কিন্তু দুর্বল দলের কারণে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয় এই কিংবদন্তিকে। ম্যাচ শেষে ইতালির খেলোয়াড়দের তাঁকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেওয়ার দৃশ্যটি ছিল সেই বিশ্বকাপের অন্যতম আবেগঘন মুহূর্ত।
ওয়েসলি স্নাইডার (নেদারল্যান্ডস, ২০১০) - অন্যায়ের শিকার এক মাস্টারমাইন্ড
২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসকে ফাইনালে তোলার মূল কারিগর ছিলেন ওয়েসলি স্নাইডার (Wesley Sneijder)। ক্লাব ফুটবলে ইন্টার মিলানের হয়ে ট্রেবল জিতে বিশ্বকাপে আসা স্নাইডার ছিলেন সেই টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের একজন (৫টি গোল)।
- কেন তিনি ট্র্যাজিক নায়ক?
কোয়ার্টার ফাইনালে হট-ফেভারিট ব্রাজিলের বিপক্ষে জোড়া গোল করে দলকে জেতান তিনি। ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে আরিয়েন রবেনকে ওয়ান-টু-ওয়ান পাসটি তিনিই বাড়িয়েছিলেন (যা রবেন মিস করেন)।
অতিরিক্ত সময়ের গোলে স্পেন চ্যাম্পিয়ন হলে স্নাইডারের বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন ভাঙে। সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, সে বছর বিশ্বকাপ ও ক্লাব ফুটবলে অসাধারণ খেলেও তাঁকে ব্যালন ডি'অর দেওয়া হয়নি, যা ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় বিতর্ক।
ডিয়েগো ফোরলান (উরুগুয়ে, ২০১০) - জাবুলানি বলের একমাত্র চাবুক
২০১০ বিশ্বকাপের অফিশিয়াল বল 'জাবুলানি' নিয়ে যখন বিশ্বের বাঘা বাঘা স্ট্রাইকাররা সমালোচনা করছিলেন, তখন সেই বলকেই নিজের পোষা পাখির মতো নাচিয়েছেন উরুগুয়ের ডিয়েগো ফোরলান (Diego Forlán)।
- কেন তিনি ট্র্যাজিক নায়ক?
উরুগুয়েকে একক শক্তিতে সেমিফাইনালে তোলেন ফোরলান। দূরপাল্লার একেকটি বাঁকানো শটে গোল করে তিনি টুর্নামেন্টে ৫টি গোল করেন। দল চতুর্থ হলেও ফোরলান জিতে নেন বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরষ্কার 'গোল্ডেন বল'।
চ্যাম্পিয়ন বা রানার্সআপ দলের বাইরে থেকে গোল্ডেন বল জেতা ফোরলান ছিলেন ২০১০ বিশ্বকাপের আসল বিনোদনদাতা, যিনি ট্রফি না পেয়েও কোটি ভক্তের হৃদয় জিতেছিলেন।
হাভিয়ের মাশ্চেরানো (আর্জেন্টিনা, ২০১৪) - আলবিসেলেস্তেদের আসল 'লিডার'
২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ফাইনাল যাত্রায় লিওনেল মেসির ৪ গোলের অবদান যেমন ছিল, ঠিক তেমনি রক্ষণভাগে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হাভিয়ের মাশ্চেরানো (Javier Mascherano)।
- কেন তিনি ট্র্যাজিক নায়ক?
সেমিফাইনালে নেদারল্যান্ডসের আরিয়েন রবেন যখন ম্যাচের শেষ মুহূর্তে নিশ্চিত গোলের শট নিচ্ছিলেন, তখন অবিশ্বাস্য এক স্লাইড দিয়ে দলকে বাঁচান মাশ্চেরানো (যাতে তিনি নিজেই মারাত্মক চোট পেয়েছিলেন)। মাঠে তাঁর চিৎকার, সতীর্থদের উজ্জীবিত করা আর নেতৃত্ব ছিল চোখে পড়ার মতো।
ফাইনালে জার্মানির কাছে অতিরিক্ত সময়ের গোলে হেরে যখন মেসিরা রানার্সআপ হন, তখন মাশ্চেরানোর সেই রক্তাক্ত লড়াই আর কান্না আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে এক ট্র্যাজিক মহাকাব্য হয়ে চিরদিন রয়ে যায়।
এই খেলোয়াড়রা ট্রফি পাননি সত্য, কিংবা ট্রফি পেলেও স্পটলাইটের একদম কেন্দ্রে ছিলেন না। কিন্তু ফুটবল ইতিহাস তাদের "আনসাং" বা উপেক্ষিত রাখবে না। বিশ্বকাপ ট্রফির চেয়েও তাদের এই হার না মানা লড়াইয়ের গল্পগুলো ফুটবল রোমান্টিকদের হৃদয়ে চিরকাল অমলিন থাকবে।
