সরদার আলাউদ্দিন আহমেদ ইতিহাসের এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের আকাশ-বাতাস যখন বারুদের গন্ধে ভারী। যখন সাড়ে সাত কোটি মানুষের গন্তব্য অনিশ্চিত এক যুদ্ধের বাঁকে তখন বন্দুকের নলের পাশাপাশি আরেকটি মারণাস্ত্র পাক হানাদার বাহিনীর ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। সেটি হলো সুর। সেই সুরের কারিগর ছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের একদল অকুতোভয় শব্দসৈনিক। তাঁদেরই একজন যার দরাজ কণ্ঠের গান শুনে রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের ধমনিতে বইত সাহসের রক্তধারা তিনি সংগীতশিল্পী সরদার আলাউদ্দিন আহমেদ।
মুন্সিগঞ্জের নিভৃত পল্লী থেকে উঠে আসা এই লোকসঙ্গীত শিল্পী কেবল একজন গায়ক ছিলেন না। তিনি ছিলেন এক অদম্য দেশপ্রেমিক। টাইফয়েডের ভয়াবহ অসুস্থতাকে উপেক্ষা করে, পরিবারের মায়া ত্যাগ করে মাত্র ৫০ টাকা সম্বল নিয়ে তিনি পাড়ি জমিয়েছিলেন যুদ্ধের ময়দানে। জগৎবাসী একবার বাংলাদেশকে যাও দেখিয় রে কিংবা এই নৌকার কাণ্ডারি আছে মুজিব রহমান-এর মতো কালজয়ী গানের মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন অবরুদ্ধ বাংলার কণ্ঠস্বর। অথচ স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে আজ এই নিভৃতচারী বীরের নাম ইতিহাসের ধুলোয় ধূসর। প্রচারের আলোহীনতা আর উত্তরসূরিদের বিস্মৃতিতে হারিয়ে যাওয়া এই শব্দসৈনিকের দেশপ্রেম ও সুরের লড়াইয়ের আখ্যান আজও আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক অনন্য কিন্তু উপেক্ষিত অধ্যায়।
অসুস্থ শরীর নিয়ে অদম্য যাত্রা
সরদার আলাউদ্দিন আহমেদ ছিলেন লোকসঙ্গীত শিল্পী ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দ সৈনিক। জন্ম: ৩০ জুলাই ১৯৪১ মুন্সিগঞ্জ জেলার শ্রীনগর থানার শ্রীধরপুর গ্রামে। তাঁর পিতার নাম মরহুম সরদার আহমেদ আলী এবং মাতার নাম মরহুমা মতিজান নেসা। ১৯৬৪ সালে ঢাকা বেতারে কণ্ঠশিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছিলেন। একাত্তরের শুরুর দিকে সরদার আলাউদ্দিন অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং চলে যান গ্রামে। তখন স্বাধীনতার আন্দোলনের উত্তাল তরঙ্গ বইছে সারাদেশে। টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হলেন তিনি। অসুস্থতার কারণে সরদার আলাউদ্দিন বেতার অনুষ্ঠান থেকে ছিলেন দূরে। কিন্তু বেশিদিন তিনি দূরে থাকতে পারলেন না। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু মহাসমাবেশ ডেকেছেন। সকল অসুস্থতা ভুলে সেই ডাকে সারা দিয়ে তিনি চলে এলেন ঢাকায়। মহাসমাবেশে অংশগ্রহণ করলেন এবং ১১ মার্চ ঢাকা বেতার কেন্দ্র থেকে গাইলেন দুটি গান। তার কিছু দিন পড়ে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়। সরদার আলাউদ্দিন ১৯৭১ মে মাসের শেষের দিকে অসুস্থ শরীর নিয়ে পরিবারের কাউকে না জানিয়ে ৫০ টাকা সম্বল করে স্বাধীন বাংলা বেতারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। এবং তার লক্ষ্যে পৌছাতে পারেন। ২৫ মে ১৯৭১ এর পর উচ্চশক্তির ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে বালিগঞ্জের বেতার কেন্দ্র থেকেই চলে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বিশ্বব্যাপী সম্প্রচার।
স্বাধীন বাংলা বেতারের বজ্রকণ্ঠ: রণাঙ্গনের প্রেরণা
সরদার আলাউদ্দিন আহমেদ যোগ দিয়েছিলেন বালিগঞ্জের বেতার কেন্দ্রে। পরিবারের সবাই সেদিন টেনশন মুক্ত হলে যেদিন সরদার আলাউদ্দিনের দরাজ কণ্ঠে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তাঁর কন্ঠ ভেসে আসলো। শুধু কি পরিবারের সদস্যরা সারা বাংলা উজ্জীবিত হয় তাঁর কন্ঠে তাঁর গানে। মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে শিল্পীর উদাত্ত কণ্ঠে গাওয়া-
- জগৎবাসী একবার বাংলাদেশকে যাও দেখিয়ারে
- রুখে দাঁড়াও রুখে দাঁড়াও রাখিতে সম্মান
- চল সমানে সমান
- বাংলা থেকে দুশমনদের দাও হটিয়ে দাও
- ও তোর ভয় নাইরে জোরে মারো টান
- এই নৌকার কাণ্ডারি আছে মুজিব রহমান
- এগিয়ে চলো বীরসেনানী
- আইলাম রে স্মরণে বাংলা মায়ের বরণে
- আরে দে দে মুজিব ভাই পায়ে ধরি ছাইড়া দে
- ওহে বিশ্ববাসী দেখিয়া যাও আসি
- ইয়াহিয়া চাচায় আনলো দুঃখের কাল নিশি
প্রভৃতি একক কণ্ঠের অগ্নিঝরা গান স্বাধীনতাকামী মানুষকে উজ্জীবিত করেছিলো।
বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন ও স্বাধীন বাংলায় প্রথম জন্মদিন
স্বাধীনতার পর ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ যেদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের মাটিতে ফিরে এলেন। সেদিন ঢাকা বেতার থেকে পরপর তিনটি গান গেয়ে তাঁকে স্বাগত জানান শব্দ সৈনিক শিল্পী সরদার আলাউদ্দিন।
- হই হই হই মুজিব এলো বাংলাদেশের প্রাণ এলো
- মাগো মা আজকে তুমি হাসো
- ও মাগো তোর অনেক ছেলে ফিরা আসে নাই
এছাড়াও স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর প্রথম জন্মদিনে তিনি দ্বৈতকণ্ঠে গেয়েছিলেন: হাইলা-জাইলা তাঁতির বন্ধু মুজিব রহমান।
৭৫-পরবর্তী উপেক্ষা ও অকাল প্রস্থান
সরদার আলাউদ্দিন জীবদ্দশায় খুব একটা স্বীকৃতি পাননি। ১৯৭৫ সালে মরণোত্তর “বঙ্গবন্ধু স্বর্ণপদক” পেলেও তার আগে কিংবা পরে তাকে প্রাপ্য মর্যাদায় স্মরণ করা হয়নি। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান নিয়ে যে এলপি ডিস্ক প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানেও বাদ পড়েছে তার গান। তার অধিকাংশ গানেই ‘শেখ মুজিব’ কিংবা ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দ ব্যবহৃত হওয়ায় ৭৫ পরবর্তীকালে তিনি অনেকটা অচ্ছুত হয়ে গেলেন, এমনই অভিযোগ তার পরিবারের।
স্বাধীন বাংলাদেশে বেশি দিন থাকা হলো না সরদার আলাউদ্দিনের। ১৯৭২ সালের অক্টোবরে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের এই বীর শব্দ সৈনিক। বঙ্গবন্ধু তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেও বিদেশে নেওয়ার আগেই ১ নভেম্বর ১৯৭২ তিনি পৃথিবী ছেড়ে যান। মৃত্যুর অল্প কিছুদিন আগে রেকর্ড করেছিলেন হৃদয়বিদারক একটি গান। গানটি তাঁর মৃত্যুর দিন সারাদিন বাজতে থাকে বাংলাদেশ বেতারে।
পাখি যাবে রে যাবেপাখি যাবে চলে তোমারে ভুলেখাঁচার দুয়ার খুলে পাখি যাবে রে চলেওরে খাঁচার দুয়ার খুলে পাখি যাবে রে চলে
শব্দ সৈনিক সরদার আলাউদ্দিন আহমেদ গান
(১)
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান
রুখে দাড়াও রুখে দাড়াও | চলো সমানে সমান বাংলার সন্তান
শিল্পী: সরদার আলাউদ্দিন আহমেদ
গীতিকার- শহিদুল ইসলাম
(২)
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান
জগৎবাসী একবার বাংলাদেশকে যাও দেখিয়ারে
শিল্পী: সরদার আলাউদ্দিন আহমেদ
কথা: জহির হোসেন
(৩)
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান
এই নৌকার কান্ডারী আছে মুজিব রহমান
শিল্পী: সরদার আলাউদ্দিন আহমেদ
(৪)
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান
আরে দে দে মুজিব ভাই পায়ে ধরি ছাইড়া দে ইয়াহিয়া মরে লাজেতে
শিল্পী: সরদার আলাউদ্দিন আহমেদ
কথা ও সুর- সলিল চৌধুরী
ইতিহাসকে ঋনমুক্ত করার সময় এখন
স্বাধীনতার প্রভাতে হারিয়ে যাওয়া সরদার আলাউদ্দিন কেবল এক শিল্পীর নাম নন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সুরের এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। জীবনের অকাল অবসান তাকে নিভিয়ে দিলেও তার কণ্ঠ আজও বাঙালির সাহস ও প্রেরণার প্রতীক হয়ে বেঁচে আছে। দুঃখজনক হলেও সত্য তার জন্ম-মৃত্যুদিন আসে যায় নীরবে। গণমাধ্যমে বাজে না তার গান। হারিয়ে গেছে বেতারের দেয়াল থেকেও তার ছবি। এটি শুধু এক শিল্পীকে বিস্মৃত করা নয় বরং নিজেদের ইতিহাসকেও অস্বীকার করা। এখন সময় এসেছে সরদার আলাউদ্দিনকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার, তার গানকে ফিরিয়ে আনার। কারণ জাতির মুক্তির ইতিহাস যেমন রক্তে লেখা, তেমনি লেখা আছে সুরের শক্তিতেও। আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
Tags

