জীবনই অভিজ্ঞতা অভিজ্ঞতাই জীবনসবচেয়ে সুন্দর সত্য- সে সত্যটা জল জীবন--শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন
বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পকলার জনক হিসেবে খ্যাত জয়নুল আবেদিন (জন্ম: ২৯ ডিসেম্বর ১৯১৪, ময়মনসিংহ - মৃত্যু: ২৮ মে ১৯৭৬, ঢাকা) শুধু একজন শিল্পী নন, তিনি ছিলেন ইতিহাসের সাক্ষী। ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ বঙ্গীয় দুর্ভিক্ষ তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল আর সেই অভিজ্ঞতা থেকেই জন্ম নিয়েছিল বিখ্যাত দুর্ভিক্ষ-চিত্রমালা বা Famine Sketches।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ব্রিটিশ শাসিত ভারতে তীব্র খাদ্যসংকট দেখা দেয়। বিশেষ করে বাংলার গ্রামীণ অঞ্চলে চালের তীব্র ঘাটতি তৈরি হয়। কৃষিজমি থেকে খাদ্যশস্য সরাসরি সেনাবাহিনীর জন্য নিয়ে যাওয়া হয়, পরিবহন ব্যবস্থার ভাঙন ঘটে, আর তার ফলশ্রুতিতে লক্ষ লক্ষ মানুষ না খেয়ে মারা যায়।
বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লাখ মানুষ অনাহার ও রোগে প্রাণ হারায়। সেই ভয়াল সময় তরুণ শিল্পী জয়নুল আবেদিন তখন কলকাতা আর্ট স্কুলের ছাত্র। শিল্পী হিসেবে মনে হলো, এই মানবিক বিপর্যয় শুধু দেখা নয় সংরক্ষণও জরুরি।
একনজরে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন
- নাম: জয়নুল আবেদিন
- উপাধি: শিল্পাচার্য, শিল্পগুরু
- জন্ম: ২৯ ডিসেম্বর, ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দ
- জন্মস্থান: কেন্দুয়া উপজেলা, কিশোরগঞ্জ জেলা
- পিতা-মাতা: তমিজউদ্দিন আহমেদ (পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর) এবং জয়নাবুন্নেছা (গৃহিণী)
- দাম্পত্য ও পারিবারিক জীবন: স্ত্রী জাহানারা আবেদিন; তিন সন্তান (মৈনুল, খায়রুল ও সারোয়ার আবেদিন)।
শিক্ষাজীবন ও প্রারম্ভিক সংগ্রাম
- আর্ট স্কুলে ভর্তি: মায়ের গলার হার বিক্রি করা অর্থে ১৯৩৩ সালে কলকাতা গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টস-এ ভর্তি হন।
- স্নাতক: ১৯৩৮ সালে কলকাতার গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টস-এর ড্রইং অ্যান্ড পেইন্টিং বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।
কর্মজীবন ও প্রাতিষ্ঠানিক অবদান
- ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা: ১৯৪৮ সালে তাঁর উদ্যোগে পুরান ঢাকার জনসন রোডে 'গভর্নমেন্ট আর্ট ইনস্টিটিউট' (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ) প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ (১৯৪৮-১৯৬৬)।
- জাদুঘর ও সংগ্রহশালা: তাঁর আগ্রহ ও পরিকল্পনায় ১৯৭৫ সালে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে লোকশিল্প জাদুঘর এবং ময়মনসিংহে জয়নুল সংগ্রহশালা প্রতিষ্ঠিত হয়।
- চিত্রকর্মের সংখ্যা: অনুমান করা হয় ৩,০০০-এরও বেশি।
- বিখ্যাত শিল্পকর্ম: দুর্ভিক্ষ-চিত্রমালা, গুন টানা, মই টানা, ম্যাডোনা ৪৩, সংগ্রাম, সাঁওতাল রমণী, ঝড়, কাক, বিদ্রোহী, নৌকা, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং "দুই মুখ" (তাঁর আঁকা শেষ ছবি)।
- বিখ্যাত স্ক্রল: 'নবান্ন' (১৯৬৯ সালে আঁকা ৬৫ ফুট দীর্ঘ ছবি) এবং 'মনপুরা-৭০' (১৯৭৪)।
- সম্মাননা ও স্বীকৃতি
সরকারি খেতাব ও পুরস্কার:
- প্রাইড অফ পারফরম্যান্স (১৯৫৮, পাকিস্তান সরকার)
- হেলাল-ই-ইমতিয়াজ (১৯৫৮, তৎকালীন পাকিস্তানের সর্বোচ্চ খেতাব)
- জাতীয় অধ্যাপক (১৯৭৪, বাংলাদেশ সরকার)
- স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৭৭, মরণোত্তর, বাংলাদেশ সরকার)
- ২০০৯ সালে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়ন বুধ গ্রহের একটি জ্বালামুখের নাম তাঁর স্মরণে ‘আবেদিন জ্বালামুখ’ রাখে।
- তাঁর ১০৫তম জন্মদিনে গুগল ডুডল (Google Doodle) ফিচারের মাধ্যমে সম্মাননা জানায়।
- চিত্রকর্ম বিক্রির রেকর্ড
- ২০২৪ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কের 'সদেবি'স' নিলাম সংস্থায় তাঁর ‘মনপুরা ৭০’ সিরিজের একটি চিত্রকর্ম ৬ লাখ ৯২ হাজার ৪৮ ডলারে (প্রায় ৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা) বিক্রি হয়, যা কোনো বাংলাদেশি শিল্পীর চিত্রকর্মের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ রেকর্ড।
- এছাড়া ২০২৪ সালের মার্চ মাসে তাঁর ‘সাঁওতাল দম্পতি’ চিত্রকর্মটি ৩ লাখ ৮১ হাজার মার্কিন ডলারে বিক্রি হয়েছিল।
জীবনাবসান
- মৃত্যু: ২৮ মে, ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দ (বয়স: ৬১ বছর)।
- সমাধি: চারুকলা ইনস্টিটিউটে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের পাশে) তাঁকে সমাহিত করা হয়।
ক্যানভাসে ক্ষুধার হাহাকার: দুর্ভিক্ষ-চিত্রমালা
তিনি হাতে নিলেন কলম ও কালো কালি। কাগজে আঁকতে শুরু করলেন অনাহারক্লিষ্ট মানুষের শরীর, ক্ষুধায় মায়ের কোলের নিথর শিশু, কঙ্কালসার মুখশ্রী আর শূন্য দৃষ্টি। এই আঁকাগুলোই পরিচিত হয় “দুর্ভিক্ষ-চিত্রমালা” নামে।
এগুলোতে রঙের চাকচিক্য নেই, নেই অলংকার শুধু রেখা, আর সেই রেখায় খোদাই করা বাস্তবের নির্মমতা। এই চিত্রমালা দক্ষিণ এশিয়ার শিল্পকলায় এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শিল্প মানে শুধু সৌন্দর্য নয়, সমাজের দায়বদ্ধতাও হতে পারে প্রমাণ করেছিলেন জয়নুল আবেদিন।
তাঁর এই কাজ তাকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করে তোলে এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশে চারুকলার বিকাশে নেতৃত্ব দেওয়ার পথ সুগম করে। ১৯৪৮ সালে তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন এবং ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ঢাকা আর্ট কলেজ (বর্তমান চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)।
পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধসহ নানা প্রেক্ষাপটে তাঁর শিল্প মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। দুর্ভিক্ষ-চিত্রমালা আজও শুধু শিল্পকর্ম নয়; এগুলো ইতিহাসের দলিল, যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় মানুষের দুঃখ-দুর্দশার কথা এবং শিল্পীর মানবিক দায়িত্ববোধের গুরুত্ব।
বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে সংগৃহীত শিল্পাচার্যের শিল্পকর্মের সংখ্যা ৮০৭। বেঙ্গল ফাউন্ডেশানের সংগ্রহে প্রায় পাঁচশত চিত্রকর্ম এবং তাঁর পরিবারের কাছে এখনও চার শতাধিক চিত্রকর্ম সংরক্ষিত রয়েছে। ময়মনসিংহে জয়নুল সংগ্রহশালায় চিত্রকর্মের সংখ্যা ৬২।
এছাড়া পাকিস্তানের বিভিন্ন সংগ্রহশালায় তার বিপুল পরিমাণ চিত্রকর্ম সংরক্ষিত আছে। জয়নুল আবেদিনের আগ্রহে ও পরিকল্পনায় সরকার ১৯৭৫-এ নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে লোকশিল্প জাদুঘর ও ময়মনসিংহে জয়নুল সংগ্রহশালা প্রতিষ্ঠা করে।
জয়নুল আবেদিন ১৯৭৬ সালের ২৮ মে মৃত্যুবরণ করেন। চারুকলা ইনস্টিটিউটে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়। তার আঁকা শেষ ছবি “দুই মুখ”। আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
দুর্ভিক্ষের রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণের প্রতিফলন
জয়নুলের আঁকা এই স্কেচগুলো কেবল ছবি ছিল না, বরং তা ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীর ভুল নীতি, মজুদদারি এবং সাধারণ মানুষের ওপর যুদ্ধের প্রভাব কীভাবে বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দিয়েছিল, তা এই রেখাগুলোতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কৃষকের গোয়াল ভরা ধান যখন সেনাবাহিনীর রসদ হিসেবে চলে যাচ্ছিল, তখন বাংলার পথে-প্রান্তরে সাধারণ মানুষ এক মুঠো ভাতের জন্য লুটিয়ে পড়ছিল।
জয়নুল আবেদিন তাঁর তুলির আঁচড়ে ক্ষুধার সেই হাহাকারকে কেবল ব্যক্তিগত কষ্ট হিসেবে দেখাননি, বরং একে একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক দুর্যোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। তাঁর ছবিতে উঠে এসেছিল শোষণের সেই নির্মম অধ্যায়, যা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের কালো ইতিহাসকে আজও স্মরণ করিয়ে দেয়।
বিশ্ববিবেকের কাছে এক শিল্পীর আর্তনাদ
১৯৪৩ সালের বাংলার মন্বন্তরে যখন লাখো মানুষ খাদ্যাভাবে কঙ্কালে পরিণত হচ্ছিল, তখন এই তরুণ শিল্পী রঙের চাকচিক্য ছেড়ে সস্তা কাগজে কালো কালির টানে বিশ্ববিবেকের কাছে তুলে ধরেছিলেন ক্ষুধার্তের হাহাকার।জয়নুল আবেদিনের এই দুর্ভিক্ষ-চিত্রমালা খুব দ্রুতই বাংলার সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক মহলে পৌঁছে যায়।
যখন এই ছবিগুলো প্রদর্শিত হতে শুরু করল, তখন বিশ্ববাসী স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল বাংলার এই মানবিক বিপর্যয় দেখে। তাঁর এই কাজের মাধ্যমে জয়নুল দক্ষিণ এশিয়ার শিল্পকলাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। ইউরোপীয় এবং বিশ্ববিখ্যাত শিল্প সমালোচকরা জয়নুলকে 'দুর্ভিক্ষের চিত্রকর' হিসেবে স্বীকৃতি দেন।
এই চিত্রমালা তাঁকে কেবল একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেনি, বরং আধুনিক বিশ্বকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল যে, শিল্প কীভাবে শোষিত মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠতে পারে। তাঁর এই আর্তনাদই পরবর্তীতে বাংলাদেশের চারুকলার বিকাশ ও স্বাধিকার আন্দোলনের সাংস্কৃতিক ভিত্তি গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
জয়নুলের সেই 'দুর্ভিক্ষ-চিত্রমালা' আজও কেবল আর্ট গ্যালারির শোভা নয়, বরং শোষণের বিরুদ্ধে এক অমর দলিল। 'বাউল পানকৌড়ি'র আজকের আয়োজনে আমরা ফিরে দেখবো ব্রহ্মপুত্রের পাড় থেকে চারুকলা অনুষদ পর্যন্ত বিস্তৃত এক কিংবদন্তির অমর যাত্রাপথ।
কালো কালি ও সস্তা কাগজে আঁকা অমর সব চিত্রকর্ম
(১)
(২)
(৩)
(৪)
(৫)
(৬)
(৭)
(৮)
(৯)
(১০)
(১১)
(১২)
(১৩)
(১৪)
(১৫)
(১৬)
(১৭)
(১৮)
প্রজ্জ্বলিত চেতনার শ্রদ্ধাঞ্জলি
জয়নুল আবেদিন কেবল একটি নাম নয়, তিনি একটি প্রতিষ্ঠান। তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে মাটির কাছাকাছি থেকে মাটির মানুষের কথা ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলতে হয়। আজকের প্রজন্ম যখন চারুকলার উন্মুক্ত চত্বরে বসে স্বপ্ন আঁকে, তখন অবলীলায় সেই স্বপ্নের পেছনে ছায়া হয়ে দাঁড়ান শিল্পাচার্য।
তাঁর সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত শত শত ছবি আমাদের ইতিহাস ও শেকড়কে চেনার পথ দেখায়। 'দুই মুখ' আঁকতে আঁকতে যে শিল্পী চিরবিদায় নিয়েছিলেন, তিনি আসলে বিদায় নেননি; বরং রয়ে গেছেন প্রতিটি রেখায়, প্রতিটি সংগ্রামে আর গ্রাম-বাংলার প্রতিটি নবান্ন উৎসবে। আমাদের এই শ্রদ্ধাঞ্জলি তাঁর সেই প্রজ্জ্বলিত চেতনার প্রতি, যা হাজার বছর ধরে বাংলার শিল্পকলাকে পথ দেখাবে।



















