আয়, খেয়ে নে বেহেশতের সেই সরাবন তহুরাআল-কোরআনে আসলো প্রমান, আশেক-গাং তার ইশারাআয়, খেয়ে নে বেহেশতের সেই সরাবন তহুরা
সাধক শাহজাহান মুন্সি যাকে মানিকগঞ্জের তেওতায় সবাই তাকে পীর হিসেবে জানে। তাঁর প্রকৃত নাম শাহজাহান মিঞা। শাহজাহান মিঞা নামেই ফ্রান্স থেকে তাঁর প্রথম সিডি এ্যালবাম প্রকাশিত হয়। শাহজাহান মুন্সির ভাষ্য হচ্ছে তারা হচ্ছেন মিঞা বংশের লোক। তাঁর এক দাদা মিলাদ পড়াতেন, নামাজ পড়াতেন এজন্য সবাই তাকে মুন্সি বলে ডাকতো সেই কারণেই নিজের পছন্দে নিজেই নামের পাশে মুন্সি শব্দটি যোগ করেন।
দৃষ্টিহীনতা ও সুরের আলোকবর্তিকা
শাহ জাহান মুন্সি খুব অল্প বয়সেই টাইফয়েডে দৃষ্টি শক্তি হারান। কোন একদিন প্রতিবেশীর দোতারা বাজানো শুনে দোতারায় আকৃষ্ট হয়ে পড়েন দোতারা বাধ্যযন্ত্রটির শিখতে থাকে। তারপর থেকেই ওস্তাদ ধরে গান শিখেন এবং তাঁর সরল কথা এখন শিখছেন। তাঁর আগে তার বংশে আর কেউ গান সাধনায় যুক্ত ছিলেন না । নিজেকে বাউল বলেও পরিচয় দিতে পছন্দ করেন না। খুব বেশি পছন্দ করেন লালন ফকিরের গান পরিবেশন করতে। মাত্তাল রাজ্জাক দেওয়ান, রজ্জব আলী দেওয়ান, ক্বারী আলাউদ্দিন বয়াতী, বিজয় সরকার সহ মরমী সাধকদের গানে তার আগ্রহ বেশি।
জীবনের সুর ও তেওতার পীর
মানিকগঞ্জের তেওতা অঞ্চলের মাটি ও মানুষের সঙ্গে শাহজাহান মুন্সির সম্পর্ক কেবল একজন জনপ্রিয় শিল্পীর নয়, বরং এক আত্মিক পথপ্রদর্শকের। দৃষ্টিহীনতা যেখানে সাধারণ মানুষের জীবনে অন্ধকার নেমে আনে, সেখানে তিনি সেই অন্ধকারকেই রূপান্তর করেছেন অন্তরের আলোয়। তেওতার মানুষ তাঁকে ‘পীর’ হিসেবে মান্য করার মূল কারণ তাঁর সরল জীবনযাপন এবং সঙ্গীতের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক চেতনার বিস্তার। মিঞা বংশের সন্তান হয়েও দাদার ধর্মীয় ও সামাজিক কাজ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজের নামের সাথে 'মুন্সি' শব্দ জুড়ে দেওয়ার ঘটনাটি প্রমাণ করে, তিনি জন্মসূত্রে পাওয়া পরিচয়ের চেয়ে নিজের সাধনার পরিচয়কে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
ফ্রান্স থেকে প্রকাশিত অ্যালবাম (১৯৯২)
১৯৯২ সালে ফ্রান্স থেকে সিডি আকারে তাঁর প্রথম পূর্ণাঙ্গ অ্যালবাম প্রকাশ পাওয়াটি বাংলাদেশের লোকসঙ্গীতের ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা। সেই সময়ে যখন দেশের মাটিতে ক্যাসেটের যুগ পুরোদমে সচল, তখন ইউরোপের বুকে ডিজিটাল মাধ্যমে (সিডি) মরমী গান ও দোতারার সুর তুলে ধরা মোটেও সহজ ছিল না। বিশেষ করে অ্যালবামের প্রথম ট্র্যাক হিসেবে কোনো গান না রেখে শুধু বাদ্যযন্ত্রের (Instrumental) আবহ রাখাটা ছিল অত্যন্ত দূরদর্শী সিদ্ধান্ত।
১৯৯২ ফ্রান্স থেকে প্রকাশিক সিডি কভার
এর মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, ভাষার প্রাচীর পেরিয়ে কেবল সুরের মূর্ছনা দিয়েই আন্তর্জাতিক শ্রোতাদের হৃদয়ে প্রবেশ করা সম্ভব। ফরাসি শ্রোতাদের কাছে বাংলার মাটির গানকে পৌঁছে দিয়ে তিনি মরমী সংস্কৃতির এক নীরব দূত হিসেবে কাজ করেছিলেন। ১৯৯২ সালের ১লা জানুয়ারি ফ্রান্স থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম সিডি এ্যালবাম। একটি বাদ্যযন্ত্র (instrumental) এবং আটটি গানের ৫৬ মিনিটের একটি পূর্নাঙ্গ এ্যালবাম।
- বাদ্যযন্ত্র (instrumental)
- আয় মোহাম্মদ কামলীওয়ালা
- আয় খেয়ে নে বেহেস্তের সেই সুরাবান তহুড়া
- কই হইলো মোর মাছ ধরা
- কালায় আমায় পাগল করেছে
- শ্রীচরণ পাব বলে ভবকূলে
- ইতর পানা কার্য আমার
- না বুঝে মজো না পিরিতে
- আমি যে জ্বালাতে জ্বলে মরি
'এক জনা' ও জনপ্রিয়তার শীর্ষবিন্দু (২০০৩-২০০৪)
২০০৩-২০০৪ সালে একতারা মিউজিক থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর এ্যালবাম “এক জনা”। ফকির লালন সাঁই, রজ্জব আলী দেওয়ান এবং সংগ্রহীত ফোক গানের ১০টি গান নিয়ে একতার মিউজিক কোম্পানি এবং একতার মিউজিকের নিজস্ব কম্পোজিশনে এ্যালবামের প্রতিটি গান জনপ্রিয়তা পায়।
- রূপ সাগর
- আরশী নগর
- ছেড়ে দিয়ে রংপুর
- একজনা
- সহজ মানুষ
- অচিন পাখি
- যতন করে পুষলাম পাখি
- জাত গেল
- মন আমার দেহ ঘড়ি
- পার কর হে দয়াল
জনপ্রিয় গান: 'প্রেমের প্রতিদান' ও অন্যান্য
২০০৩-২০০৪ সালের দিকে ‘একতারা মিউজিক’ যখন বাংলাদেশের শহুরে তরুণদের মাঝে লোকসঙ্গীতকে নতুন আঙ্গিকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিল, তখন শাহজাহান মুন্সির ‘এক জনা’ অ্যালবামটি ছিল সেই বিপ্লবের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। মাটির খাঁটি সুরের সাথে আধুনিক পরিচ্ছন্ন কম্পোজিশনের মেলবন্ধন অ্যালবামটির প্রতিটি গানকে কালজয়ী করে তোলে। বিশেষ করে ‘প্রেমের প্রতিদান’ গানটিতে আলাউদ্দিন বয়াতীর বিরহী বাণী ও শাহজাহান মুন্সির কণ্ঠের আকুতি শ্রোতাদের এমনভাবে স্পর্শ করেছিল যা ফোক-মিক্সড ঘরানার গানকে জনপ্রিয়তার শীর্ষবিন্দুতে নিয়ে যায়।
শাহজাহান মুন্সির গান---
আয় খেয়ে নে বেহেশতের সেই সরাবন তহুরা
কথা: রজ্জব আলী দেওয়ান
কন্ঠ: শাহজাহান মুন্সি
আয়, খেয়ে নে বেহেশতের সেই সরাবন তহুরা।
আল-কোরআনে আসলো প্রমান, আশেক-গাং তার ইশারা,
আয়, খেয়ে নে বেহেশতের সেই সরাবন তহুরা।
বেহেশতে যা হয় ব্যবহার, সমাজে তা হল প্রচার,
আপনে খুলবে বেহেশ্তের দ্বার, সত্য মুমিন হবে যারা,
আয় খেয়ে নে বেহেশতের সেই সরাবন তহুরা।
মুমিনদের খেদমতের তরে, ইশকেরও পেয়ালা করে,
প্রেম অমৃত সুধা ভরে, কত, কূল গেলে, মান আছে খাড়া
আয়, খেয়ে নে বেহেশতের সেই সরাবন তহুরা।
নবী-অলি-পীর-সাধু পান করে তার এক বিন্দু,
ধ্যান ধরে এক দীনবন্ধু, কাটায় এক নেশাতেই জনমভরা,
আয়, খেয়ে নে বেহেশতের সেই সরাবন তহুরা।
রজ্জব-এ সেই নেশার ঝোকেই, মুখে আবোল-তাবোল বকে,
আবার জ্ঞান করে তা, জ্ঞানী লোকে, অজ্ঞানে কয় পাগল করা,
আয়, খেয়ে নে বেহেশতের সেই সরাবন তহুরা।
প্রেমের প্রতিদান / আমায় যত দেও হে ব্যাথা
কথা: আলাউদ্দিন বয়াতী
কন্ঠ: শাহজাহান মুন্সি
আমায় যত দাও হে ব্যাথা
হৃদয়ে রাখিবো গাঁথা
একদিন জানি ব্যাথার হবে অবসান।
প্রিয় বন্ধু বলে বুক ভাসিবে নয়ন জলে
দেহ ছেরে চলে যাবে যেদিন আলাউদ্দিন এর প্রাণ।
বাঁধিয়া মায়াডোরে কাঁদালি এমন করে
এই কি প্রেমের প্রতিদান ??
রাখিয়া তোমার কথা ছড়িলাম মাতা পিতা
হৃদয়ে রেখেছি তোমার প্রেমের বান।
কাঁদি দিবস-রাতি, মোর বাসরে নাই বাতি
গেল জাতি কুল ও মান।
বাঁধিয়া মায়াডোরে কাঁদালি এমন করে
এই কি প্রেমের প্রতিদান ??
প্রথম যেদিন হাতে ধরে বুকে টেনে নিলে মোরে
বলেছিলে হৃদয় মাঝে দিব স্থান
করে মিথ্যে অভিনয় পাগল মন করেছ জয়
করে মিথ্যে অভিনয় কোমল মন করেছ জয়
কেন সাজিলে পাষাণ।
বাঁধিয়া মায়াডোরে কাঁদালি এমন করে
এই কি প্রেমের প্রতিদান?
মানুষ রতন করো তারে যতন
কথা: রজ্জব আলী দেওয়ান
কন্ঠ: শাহজাহান মুন্সি
ভুলি নাই ভুলি নাই তোমারে দরদী
কথা: শাহজাহান মুন্সি
কন্ঠ: শাহজাহান মুন্সি
কেন পিরিতি বাড়াইলারে বন্ধু ছেড়ে যাইবা যদি
কথা: শাহ আব্দুল করিম
কন্ঠ: শাহজাহান মুন্সি
বাড়ির কাছে আরশী নগর এক ঘর পড়শিব সত করে
কথা: ফকির লালন সাঁই
কন্ঠ: শাহজাহান মুন্সি
জাত গেলো জাত গেলো বলে
কথা: ফকির লালন সাঁই
কন্ঠ: শাহজাহান মুন্সি
গুনে পড়ে সারলি দফা করলি রফা গোলেমালে
কথা: ফকির লালন সাঁই
কন্ঠ: শাহজাহান মুন্সি
সহজ মানুষ ভজে দেখ দেখি মন দিব্য জ্ঞানে
কথা: ফকির লালন সাঁই
কন্ঠ: শাহজাহান মুন্সি
সঙ্গীত দর্শন: নিজেকে বাউল নয়, সাধক মানেন
দৃষ্টিহীনতা সত্ত্বেও সাধক শাহজাহান মুন্সি বাংলাদেশের মরমি সংগীত জগতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। মানিকগঞ্জের তেওতায় পীর হিসেবে পরিচিত এই শিল্পী তাঁর নিজস্ব পছন্দেই 'মিঞা' থেকে 'মুন্সি' উপাধি গ্রহণ করেন। কৈশোরে প্রতিবেশীর দোতারা শুনে সঙ্গীতে আকৃষ্ট হওয়া এবং কঠোর সাধনার মধ্য দিয়ে তাঁর সঙ্গীতযাত্রা শুরু হয়। যদিও তিনি নিজেকে বাউল পরিচয় দিতে নারাজ, তাঁর কণ্ঠে ফকির লালন সাঁই, রজ্জব আলী দেওয়ান, আলাউদ্দিন বয়াতী সহ অন্যান্য মরমী সাধকদের গানের বাণী এক বিশেষ গভীরতা লাভ করে।
১৯৯২ সালে ফ্রান্স থেকে তাঁর প্রথম সিডি অ্যালবাম প্রকাশের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর পরিচিতি ঘটে। এরপর 'এক জনা' এবং 'প্রেমের প্রতিদান' গানগুলির মাধ্যমে তিনি দেশের ভেতরেও বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। শাহজাহান মুন্সির সরল, আবেগঘন পরিবেশনা এবং আধ্যাত্মিক গানের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ তাঁকে কেবল একজন শিল্পী নয়, বরং বাংলার লোক-সাধনা ও মরমি ঐতিহ্যের একজন বিশ্বস্ত ধারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাঁর সঙ্গীতজীবন প্রমাণ করে, প্রকৃত সাধকের জন্য শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কোনো বাধা নয়, বরং তা সাধনার পথকে আরও পরিশুদ্ধ করে তোলে।
লালন সাঁইজির ভাবাদর্শের প্রতি তাঁর অগাধ অনুরাগ থাকলেও নিজেকে ‘বাউল’ পরিচয়ের গণ্ডিতে না বেঁধে স্রেফ একজন ‘সাধক’ বা ‘সঙ্গীতের সেবক’ হিসেবে পরিচয় দেওয়াটা তাঁর চরম বিনয় ও উচ্চ আধ্যাত্মিক বোধের পরিচয় দেয়। তিনি বিশ্বাস করেন, গান কোনো প্রদর্শনের বিষয় নয়, এটি মনের ভেতরের অচিন পাখিকে চেনার এক পরম মাধ্যম। বর্তমানের দ্রুত পরিবর্তনশীল সঙ্গীত বাজারে, যেখানে লোকগান তার মৌলিকত্ব হারাচ্ছে, সেখানে শাহজাহান মুন্সির গাওয়া রজ্জব আলী দেওয়ান বা শাহ আব্দুল করিমের গানগুলো নতুন প্রজন্মের সঙ্গীত গবেষক ও শ্রোতাদের জন্য এক অমূল্য দলিল। তাঁর সুরের আলোকবর্তিকা আগামী বহু বছর ধরে বাংলার মরমি গানের আঙিনাকে আলোড়িত করবে।


.jpeg)


