বাংলার লোক-ঐতিহ্যের অসীম আকাশে এমন কিছু বিরল নক্ষত্র চিরকাল জ্বলজ্বল করে জ্বলতে থাকে, যাঁদের আলো চর্মচক্ষে না দেখেও কেবল কণ্ঠের অলৌকিক মাধুর্যে অনুভব করা যায়। উপলব্ধি করা যায় হৃদয়ের অন্তস্তল থেকে। মানিকগঞ্জের সুপ্রাচীন তেওতা অঞ্চলের সাধক শাহজাহান মুন্সি নিঃসন্দেহে তেমনই এক অলৌকিক মরমী পুরুষ। নিষ্ঠুর প্রকৃতি যাঁর চোখের অমূল্য আলো নির্মমভাবে কেড়ে নিয়েছিল একেবারে বাল্যকালেই। ভাগ্যের সেই নির্দয় পরিহাস, সেই ঘোর দুর্যোগকে তিনি নিজের অসীম ধৈর্য ও আত্মিক শক্তিবলে রূপান্তরিত করেছেন অন্তর্দৃষ্টির অফুরন্ত ও অনির্বাণ আলোকশিখায়। মানিকগঞ্জের তেওতায় যাঁকে অগণিত ভক্ত ও সাধারণ মানুষ একডাকে শ্রদ্ধাভরে চেনেন কেবল 'পীর' অভিধায়, তাঁর প্রকৃত পরিচয় নিছক একজন প্রথাগত লোকশিল্পীর গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়।
তিনি এক প্রকৃত আত্মিক পথপ্রদর্শক, দোতারার প্রতিটি তারে তারে ঈশ্বরপ্রেমের চিরন্তন বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া এক নিভৃতচারী, নিরহংকারী মহাসাধক। প্রকৃত নাম শাহজাহান মিঞা হলেও জন্মসূত্রে অর্জিত বংশ-পরিচয়ের সংকীর্ণ বাঁধনকে বহু ঊর্ধ্বে ছাপিয়ে গিয়ে নিজের আত্মিক সাধনালব্ধ পরিচয়কেই তিনি অধিকতর মূল্যবান ও শ্রেয় জ্ঞান করেছেন। আর সেই গভীরতর, প্রজ্ঞাদীপ্ত উপলব্ধি থেকেই তিনি নিজ নামের শেষে সযত্নে সসম্মানে জুড়ে দিয়েছেন 'মুন্সি' অভিধাটি। দৃষ্টিহীনতার নিরেট, নিষ্ঠুর তমসাকে সাহসিকতার সঙ্গে জয় করে যিনি বাংলার সুবিশাল মরমি সংগীত-ভুবনে হয়ে উঠেছেন এক উজ্জ্বলতম চিরন্তন আলোকবর্তিকা। আজকে সুবিস্তৃত নিবন্ধে তুলে ধরা হলো তাঁর বর্ণাঢ্য জীবন, নিরলস সাধনা ও অমর সৃষ্টিকর্মের অমূল্য ইতিবৃত্তান্ত।
দৃষ্টিহীনতা ও সুরের আলোকবর্তিকা
খুব অল্প বয়সে টাইফয়েড ব্যাধির নির্মম আঘাতে চিরতরে দৃষ্টিশক্তি হারান শাহজাহান মুন্সি। কিন্তু নিয়তির সেই নিষ্ঠুর অন্ধকার তাঁর সাধনার পথকে স্তব্ধ করতে পারেনি। প্রতিবেশীর দোতারা বাজানোর করুণ সুর একদিন তাঁর কর্ণকুহরে প্রবেশ করে আর সেই মুহূর্তেই তিনি চিরতরে আকৃষ্ট হয়ে পড়েন এই আটপৌরে অথচ আত্মাস্পর্শী বাদ্যযন্ত্রটির প্রতি। সেখান থেকেই সূচনা হয় তাঁর নিরলস সঙ্গীত-সাধনার এক অসাধারণ অভিযাত্রা। ওস্তাদের সান্নিধ্যে গান শেখা শুরু করলেও তাঁর বংশে ইতিপূর্বে আর কেউ সুরের জগতে পদার্পণ করেননি সম্পূর্ণ পথটাই তিনি নির্মাণ করেছেন নিজস্ব অধ্যবসায় ও আত্মশক্তির বলে।
নিজেকে 'বাউল' অভিধায় ভূষিত করতে তিনি নারাজ, বরং এই পরিচয়ের গণ্ডিকে তিনি সচেতনভাবেই এড়িয়ে চলেন। তথাপি ফকির লালন সাঁইয়ের গান পরিবেশনে তাঁর অনুরাগ সর্বাধিক ও অকৃত্রিম। এছাড়াও মাত্তাল রাজ্জাক দেওয়ান, রজ্জব আলী দেওয়ান, ক্বারী আলাউদ্দিন বয়াতী এবং বিজয় সরকারের মতো কালজয়ী মরমী সাধকদের বাণীও তাঁর কণ্ঠস্বরে অর্জন করে এক অনন্য গভীরতা ও আধ্যাত্মিক মহিমা।
জীবনের সুর ও তেওতার পীর
মানিকগঞ্জের তেওতা অঞ্চলের মাটি ও মানুষের সঙ্গে শাহজাহান মুন্সির সম্পর্ক নিছক একজন জনপ্রিয় শিল্পীর নয়। বরং এক আত্মিক পথপ্রদর্শকের, এক নিরলস মানবপ্রেমিকের। দৃষ্টিহীনতা যেখানে সাধারণ মানুষের জীবনে গাঢ় অন্ধকার নামিয়ে আনে বলে জনশ্রুতি প্রচলিত। সেখানে তিনি সেই দুর্ভাগ্যের অন্ধকারকেই রূপান্তরিত করেছেন অন্তরের অনির্বাণ আলোয়। তাঁর সরল, নিরাভরণ জীবনযাপন এবং সঙ্গীতের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক চেতনার বিস্তারই মূল কারণ, যার জন্য তেওতার আপামর জনসাধারণ তাঁকে শ্রদ্ধাভরে 'পীর' হিসেবে মান্য করেন। মিঞা বংশের সন্তান হয়েও দাদার ধর্মীয়-সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজের নামের সঙ্গে 'মুন্সি' শব্দটি জুড়ে দেওয়ার এই তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাটিই প্রমাণ করে দেয়, তিনি জন্মলব্ধ পরিচয়ের চেয়ে নিজের কঠোর সাধনালব্ধ পরিচয়কে ঢের বেশি মূল্যবান ও সম্মানের বলে বিবেচনা করেছিলেন।
ফ্রান্স থেকে প্রকাশিত অ্যালবাম (১৯৯২)
১৯৯২ সালের ১লা জানুয়ারি ফরাসি ভূখণ্ড থেকে সিডি আকারে প্রকাশ পায় শাহজাহান মুন্সির প্রথম পূর্ণাঙ্গ অ্যালবাম। বাংলাদেশের লোকসঙ্গীতের ইতিহাসে যা নিঃসন্দেহে এক অভূতপূর্ব ও অনন্য ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত। যে সময়টায় দেশের মাটিতে ক্যাসেটের যুগ পুরোদমে সচল ছিল না। ইউরোপের বুকে ডিজিটাল মাধ্যমে (সিডি) মরমী গান ও দোতারার সুর তুলে ধরা মোটেও সহজসাধ্য কাজ ছিল না। বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য বিষয়, অ্যালবামের প্রথম ট্র্যাক হিসেবে কোনো গান না রেখে শুধু বাদ্যযন্ত্রের (instrumental) আবহই সংরক্ষিত রাখাটা ছিল অত্যন্ত দূরদর্শী ও শৈল্পিক সিদ্ধান্ত। এর মাধ্যমেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এক চিরন্তন সত্য। ভাষার দুর্ভেদ্য প্রাচীর অতিক্রম করে কেবল সুরের অপার্থিব মূর্ছনা দিয়েই আন্তর্জাতিক শ্রোতৃমণ্ডলীর হৃদয়ে প্রবেশ করা সম্ভব। ফরাসি শ্রোতাদের কাছে বাংলার মাটির গান পৌঁছে দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন মরমী সংস্কৃতির এক নীরব অথচ শক্তিশালী দূত।একটি বাদ্যযন্ত্র (instrumental) ও আটটি গান নিয়ে সুবিন্যস্ত এই ৫৬ মিনিটের সুবৃহৎ অ্যালবামের ট্র্যাকলিস্ট নিম্নরূপ:
- বাদ্যযন্ত্র (instrumental)
- আয় মোহাম্মদ কামলীওয়ালা
- আয় খেয়ে নে বেহেস্তের সেই সুরাবান তহুড়া
- কই হইলো মোর মাছ ধরা
- কালায় আমায় পাগল করেছে
- শ্রীচরণ পাব বলে ভবকূলে
- ইতর পানা কার্য আমার
- না বুঝে মজো না পিরিতে
- আমি যে জ্বালাতে জ্বলে মরি
'এক জনা' ও জনপ্রিয়তার শীর্ষবিন্দু (২০০৩-২০০৪)
২০০৩-২০০৪ সালে একতারা মিউজিক থেকে বাজারে আসে শাহজাহান মুন্সির চিরস্মরণীয় অ্যালবাম "এক জনা"। ফকির লালন সাঁই, রজ্জব আলী দেওয়ান এবং সংগৃহীত ফোক গান সমন্বিত করে মোট দশটি গান নিয়ে সজ্জিত এই অ্যালবামের প্রতিটি গানই অর্জন করে বিপুল ও ব্যাপক জনপ্রিয়তা। সেই সময় যখন 'একতারা মিউজিক' বাংলাদেশের শহুরে তরুণ প্রজন্মের মাঝে লোকসঙ্গীতকে অভিনব আঙ্গিকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রয়াস চালাচ্ছিল, তখন 'এক জনা' অ্যালবামটিই ছিল সেই সাংস্কৃতিক বিপ্লবের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। মাটির খাঁটি সুরের সঙ্গে আধুনিক পরিচ্ছন্ন কম্পোজিশনের নিপুণ মেলবন্ধন প্রতিটি সৃষ্টিকে করে তুলেছিল কালজয়ী ও অবিনশ্বর। বিশেষত 'প্রেমের প্রতিদান' গানে আলাউদ্দিন বয়াতীর বিরহকাতর বাণী ও শাহজাহান মুন্সির কণ্ঠের গভীর আকুতি শ্রোতৃকুলের হৃদয়কে এমনভাবে স্পর্শ করে যায়, যা ফোক-মিক্সড ঘরানার সংগীতকে নিয়ে যায় জনপ্রিয়তার শীর্ষবিন্দুতে।
কথা: রজ্জব আলী দেওয়ান
কন্ঠ: শাহজাহান মুন্সি
আয়, খেয়ে নে বেহেশতের সেই সরাবন তহুরা।
আল-কোরআনে আসলো প্রমান, আশেক-গাং তার ইশারা,
আয়, খেয়ে নে বেহেশতের সেই সরাবন তহুরা।
বেহেশতে যা হয় ব্যবহার, সমাজে তা হল প্রচার,
আপনে খুলবে বেহেশ্তের দ্বার, সত্য মুমিন হবে যারা,
আয় খেয়ে নে বেহেশতের সেই সরাবন তহুরা।
মুমিনদের খেদমতের তরে, ইশকেরও পেয়ালা করে,
প্রেম অমৃত সুধা ভরে, কত, কূল গেলে, মান আছে খাড়া
আয়, খেয়ে নে বেহেশতের সেই সরাবন তহুরা।
নবী-অলি-পীর-সাধু পান করে তার এক বিন্দু,
ধ্যান ধরে এক দীনবন্ধু, কাটায় এক নেশাতেই জনমভরা,
আয়, খেয়ে নে বেহেশতের সেই সরাবন তহুরা।
রজ্জব-এ সেই নেশার ঝোকেই, মুখে আবোল-তাবোল বকে,
আবার জ্ঞান করে তা, জ্ঞানী লোকে, অজ্ঞানে কয় পাগল করা,
আয়, খেয়ে নে বেহেশতের সেই সরাবন তহুরা।
প্রেমের প্রতিদান / আমায় যত দেও হে ব্যাথা
কথা: আলাউদ্দিন বয়াতী
কন্ঠ: শাহজাহান মুন্সি
আমায় যত দাও হে ব্যাথা
হৃদয়ে রাখিবো গাঁথা
একদিন জানি ব্যাথার হবে অবসান।
প্রিয় বন্ধু বলে বুক ভাসিবে নয়ন জলে
দেহ ছেরে চলে যাবে যেদিন আলাউদ্দিন এর প্রাণ।
বাঁধিয়া মায়াডোরে কাঁদালি এমন করে
এই কি প্রেমের প্রতিদান ??
রাখিয়া তোমার কথা ছড়িলাম মাতা পিতা
হৃদয়ে রেখেছি তোমার প্রেমের বান।
কাঁদি দিবস-রাতি, মোর বাসরে নাই বাতি
গেল জাতি কুল ও মান।
বাঁধিয়া মায়াডোরে কাঁদালি এমন করে
এই কি প্রেমের প্রতিদান ??
প্রথম যেদিন হাতে ধরে বুকে টেনে নিলে মোরে
বলেছিলে হৃদয় মাঝে দিব স্থান
করে মিথ্যে অভিনয় পাগল মন করেছ জয়
করে মিথ্যে অভিনয় কোমল মন করেছ জয়
কেন সাজিলে পাষাণ।
বাঁধিয়া মায়াডোরে কাঁদালি এমন করে
এই কি প্রেমের প্রতিদান?
মানুষ রতন করো তারে যতন
কথা: রজ্জব আলী দেওয়ান
কন্ঠ: শাহজাহান মুন্সি
ভুলি নাই ভুলি নাই তোমারে দরদী
কথা: শাহজাহান মুন্সি
কন্ঠ: শাহজাহান মুন্সি
কেন পিরিতি বাড়াইলারে বন্ধু ছেড়ে যাইবা যদি
কথা: শাহ আব্দুল করিম
কন্ঠ: শাহজাহান মুন্সি
বাড়ির কাছে আরশী নগর এক ঘর পড়শিব সত করে
কথা: ফকির লালন সাঁই
কন্ঠ: শাহজাহান মুন্সি
জাত গেলো জাত গেলো বলে
কথা: ফকির লালন সাঁই
কন্ঠ: শাহজাহান মুন্সি
গুনে পড়ে সারলি দফা করলি রফা গোলেমালে
কথা: ফকির লালন সাঁই
কন্ঠ: শাহজাহান মুন্সি
সহজ মানুষ ভজে দেখ দেখি মন দিব্য জ্ঞানে
কথা: ফকির লালন সাঁই
কন্ঠ: শাহজাহান মুন্সি
সঙ্গীত দর্শন: নিজেকে বাউল নয়, সাধক মানেন
দৃষ্টিহীনতার সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সাধক শাহজাহান মুন্সি বাংলাদেশের মরমি সংগীত জগতে এক উজ্জ্বলতম নক্ষত্র হিসেবে বিরাজমান। মানিকগঞ্জের তেওতায় পীর হিসেবে সুপরিচিত এই শিল্পী স্বকীয় ইচ্ছায় 'মিঞা' থেকে গ্রহণ করেন 'মুন্সি' উপাধিটি। কৈশোরে প্রতিবেশীর দোতারার সুর শুনে সঙ্গীতে আকৃষ্ট হওয়া এবং তারপর কঠোর ও নিরলস সাধনার মধ্য দিয়ে সূচনা হয় তাঁর দীর্ঘ সঙ্গীতযাত্রার। নিজেকে বাউল পরিচয় দিতে সম্পূর্ণ নারাজ হলেও, ফকির লালন সাঁই, রজ্জব আলী দেওয়ান, আলাউদ্দিন বয়াতী সহ অন্যান্য মরমী সাধকদের বাণী তাঁর কণ্ঠে অর্জন করে এক বিশেষ আধ্যাত্মিক গভীরতা। ১৯৯২ সালে ফ্রান্স থেকে প্রথম সিডি অ্যালবাম প্রকাশের মাধ্যমে তাঁর সুখ্যাতি বিস্তৃত হয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও। এরপরবর্তীতে 'এক জনা' ও 'প্রেমের প্রতিদান' গানের মাধ্যমে স্বদেশের অভ্যন্তরেও তিনি অর্জন করেন অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা।
তাঁর সরল অথচ আবেগঘন পরিবেশনা এবং আধ্যাত্মিক সংগীতের প্রতি অন্তহীন অনুরাগ তাঁকে কেবল একজন শিল্পী নয়, বরং বাংলার লোক-সাধনা ও মরমি ঐতিহ্যের এক বিশ্বস্ত ও নিষ্ঠাবান ধারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাঁর বর্ণাঢ্য সঙ্গীতজীবন প্রমাণ করে দেয় এক শাশ্বত সত্য প্রকৃত সাধকের নিকট শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কখনোই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না, বরং তা সাধনার পথকে করে তোলে আরও পরিশুদ্ধ ও তেজোদীপ্ত। লালন সাঁইজির ভাবাদর্শের প্রতি অপরিসীম অনুরাগ থাকা সত্ত্বেও নিজেকে 'বাউল' পরিচয়ের সংকীর্ণ গণ্ডিতে না বেঁধে স্রেফ একজন 'সাধক' বা 'সঙ্গীতের সেবক' হিসেবে পরিচয় দেওয়াটাই তাঁর পরম বিনয় ও উচ্চ আধ্যাত্মিক উপলব্ধির স্পষ্ট প্রতিফলন। তাঁর অটল বিশ্বাস সংগীত কোনো প্রদর্শনের বিষয় নয়, বরং তা মনের অন্তর্লীন অচিন পাখিকে চেনার এক পরম ও অব্যর্থ মাধ্যম। বর্তমানের দ্রুত পরিবর্তনশীল ও বাণিজ্যিকীকৃত সংগীত বাজারে, যেখানে লোকগান ক্রমশ তার আদি মৌলিকত্ব হারাচ্ছে, সেখানে শাহজাহান মুন্সির কণ্ঠে গীত রজ্জব আলী দেওয়ান বা শাহ আব্দুল করিমের গানগুলো নতুন প্রজন্মের সংগীত গবেষক ও শ্রোতাদের নিকট হয়ে থাকবে এক অমূল্য ও অক্ষয় দলিল।
উপসংহার
শাহজাহান মুন্সির জীবনকাহিনি শুধু একজন সংগীতশিল্পীর উত্থানের বৃত্তান্ত নয় এ যেন এক আত্মিক জয়যাত্রার মহাকাব্য, যেখানে দৈহিক অন্ধত্বকে অতিক্রম করে আত্মার অন্তর্দৃষ্টি হয়ে উঠেছে অধিকতর তীক্ষ্ণ ও প্রখর। তেওতার এই পীর প্রমাণ করে দিয়েছেন, ভাগ্যের নির্মমতম আঘাতও মানুষের সাধনার শিখাকে নির্বাপিত করতে পারে না বরং তা হয়ে উঠতে পারে সৃষ্টিশীলতার এক অফুরন্ত উৎস। তাঁর সুরের আলোকবর্তিকা আগামী বহু বছর ধরে বাংলার মরমি গানের আঙিনাকে আলোড়িত ও উদ্ভাসিত করে যাবে, এমনটাই প্রত্যাশা করা যায়।
শাহজাহান মুন্সি সম্পর্কে প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন ১: শাহজাহান মুন্সি কে ছিলেন?
শাহজাহান মুন্সি (প্রকৃত নাম শাহজাহান মিঞা) ছিলেন মানিকগঞ্জের তেওতার এক মরমি সাধক, দোতারা শিল্পী ও গীতিকার। দৃষ্টিহীন হয়েও তিনি তাঁর সুরের অপার মাধুর্যে বাংলার মরমি গানের জগতে হয়ে উঠেছেন এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। নিজেকে 'বাউল' না বলে 'সাধক' বা 'সঙ্গীতের সেবক' হিসেবে পরিচয় দিতেই তিনি চিরকাল পছন্দ করতেন।
প্রশ্ন ২: শাহজাহান মুন্সির জন্ম ও প্রাথমিক জীবন সম্পর্কে কী জানা যায়?
তিনি জন্মগ্রহণ করেন মানিকগঞ্জের তেওতা অঞ্চলে। খুব অল্প বয়সেই টাইফয়েড ব্যাধিতে তাঁর দৃষ্টিশক্তি সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে যায়। তবে প্রতিবেশীর দোতারা বাজানোর সুর শুনে তিনি এই বাদ্যযন্ত্রের প্রতি সীমাহীনভাবে আকৃষ্ট হন এবং সেখান থেকেই সূচনা হয় তাঁর সংগীতযাত্রা। কোনো আনুষ্ঠানিক সংগীত শিক্ষা লাভ না করলেও ওস্তাদের সান্নিধ্যে গান শিখে আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে ওঠেন।
প্রশ্ন ৩: 'শাহজাহান মিঞা' থেকে 'শাহজাহান মুন্সি' নামকরণের কারণ কী?
তাঁর পরিবার মিঞা বংশোদ্ভূত। তাঁর এক দাদা মিলাদ ও নামাজ পড়াতেন বলে গ্রামবাসী তাঁকে 'মুন্সি' নামে অভিহিত করতেন। সেই সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় শাহজাহান স্বকীয় পছন্দে নিজের নামের শেষে সংযুক্ত করেন 'মুন্সি' অভিধাটি।
প্রশ্ন ৪: ১৯৯২ সালে ফ্রান্স থেকে প্রকাশিত অ্যালবামের বিশেষত্ব কী?
সেই বছর দেশে ক্যাসেটের যুগ পুরোদমে বিদ্যমান থাকা অবস্থায় ইউরোপের ডিজিটাল মাধ্যমে (সিডি) তাঁর মরমি গান প্রকাশ পাওয়া ছিল ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব ঘটনা। প্রথম ট্র্যাক হিসেবে গান না রেখে কেবল ইনস্ট্রুমেন্টাল আবহ সংরক্ষণ করাটাও ছিল অত্যন্ত দূরদর্শী সিদ্ধান্ত, যা প্রমাণ করে ভাষা অনুধাবন না করেও নিছক সুরের মূর্ছনা দিয়েই আন্তর্জাতিক শ্রোতৃমণ্ডলীর হৃদয় জয় করা সম্ভব।
প্রশ্ন ৫: 'এক জনা' অ্যালবামটি কবে ও কতটি গান নিয়ে প্রকাশিত হয়?
২০০৩-২০০৪ সালে 'একতারা মিউজিক' থেকে প্রকাশিত এই অ্যালবামে অন্তর্ভুক্ত ছিল ফকির লালন সাঁই, রজ্জব আলী দেওয়ান ও সংগৃহীত ফোক গান মিলিয়ে সর্বমোট দশটি গান, যার প্রতিটিই শহুরে তরুণ প্রজন্মের কাছে লোকসংগীতকে অভিনব আঙ্গিকে পরিচিত করিয়ে দেয়।
প্রশ্ন ৬: তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় গান কোনগুলো?
"প্রেমের প্রতিদান" (আলাউদ্দিন বয়াতী), "আয় খেয়ে নে বেহেশতের সেই সরাবন তহুরা" (রজ্জব আলী দেওয়ান), "মানুষ রতন করো তারে যতন" (রজ্জব আলী দেওয়ান), "বাড়ির কাছে আরশী নগর" ও "জাত গেলো জাত গেলো বলে" (উভয়ই ফকির লালন সাঁই) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ও কালজয়ী।
প্রশ্ন ৭: শাহজাহান মুন্সি কেন নিজেকে 'বাউল' পরিচয় দিতে চাইতেন না?
লালন সাঁইয়ের ভাবাদর্শের প্রতি অগাধ অনুরাগী হলেও তিনি নিজেকে 'বাউল' পরিচয়ের সংকীর্ণ গণ্ডিতে বাঁধতে সম্পূর্ণ অনিচ্ছুক ছিলেন বরং 'সাধক' বা 'সঙ্গীতের সেবক' পরিচয়টিই তাঁর কাছে অধিকতর প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় ছিল। এই মনোভাবই তাঁর গভীর বিনয় ও উচ্চ আধ্যাত্মিক বোধের প্রকৃষ্ট পরিচয় বহন করে।
প্রশ্ন ৮: তিনি কোন মরমি সাধকদের গান বেশি পছন্দ করতেন?
ফকির লালন সাঁই, রজ্জব আলী দেওয়ান, মাত্তাল রাজ্জাক দেওয়ান, ক্বারী আলাউদ্দিন বয়াতী এবং বিজয় সরকার এই কালজয়ী সাধকদের গান তিনি নিজ কণ্ঠে পরিবেশন করে মরমি ঐতিহ্যকে পৌঁছে দিয়েছেন নতুন প্রজন্মের নিকট।
প্রশ্ন ৯: 'তেওতার পীর' হিসেবে তাঁর বিশেষত্ব কী?
মানিকগঞ্জের তেওতা অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল এক আত্মিক পথপ্রদর্শকের ন্যায়। দৃষ্টিহীনতা সত্ত্বেও সরল জীবনযাপন ও সংগীতের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক চেতনার বিস্তার ঘটানোর কারণেই তেওতাবাসী তাঁকে গভীর শ্রদ্ধাভরে 'পীর' হিসেবে মান্য করতেন।
প্রশ্ন ১০: শাহজাহান মুন্সি কেন আজও প্রাসঙ্গিক?
তিনি প্রমাণ করেছেন শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সাধনার পথে কখনোই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না, বাংলার মরমি গানের ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সগৌরবে তুলে ধরেছেন, এবং লোকগানের মৌলিকত্ব সংরক্ষণে হয়ে আছেন এক অনন্য ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত যা নতুন প্রজন্মের গবেষক ও শ্রোতৃমণ্ডলীর জন্য এক অমূল্য সম্পদ।



