বাংলা আমার তৃষ্ণার জল তৃপ্ত শেষ চুমুকআমি একবার দেখি বার বার দেখিদেখি বাংলার মুখআমি বাংলায় গান গাইআমি বাংলার গান গাইআমি আমার আমিকে চিরদিন এই বাংলায় খুঁজে পাই
বাংলা ভাষা ও বাঙালির শেকড়ের কথা বলতে গেলে যে গানটি আমাদের হৃদয়ে সবার আগে কড়া নাড়ে, তা হলো আমি বাংলায় গান গাই। প্রয়াত শিল্পী প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের খালি গলায় গাওয়া এই গানটি শুধু একটি দেশাত্মবোধক গান বাঙালির অস্তিত্ব সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক। প্রতুল মুখোপাধ্যায় জন্ম ২৫ জুন ১৯৪২ অবিভক্ত বাংলার বরিশাল জেলায়। মৃত্যু ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫। মানুষের জন্য মানুষের গান মানুষের পক্ষের গান একজন প্রতুল মুখোপাধ্যায় ছিলেন একাধারে গায়ক, কবি, গীতিকার এবং একজন বিপ্লবী। গান লিখতেন গান করতেন সাধারন জনগনের ভাষায়।
কিছুকাল ব্যাংকে চাকরি করছেন। ১৯৯৩ সাল যা বাংলা ১৪০০ বঙ্গাব্দ কোন একদিন ব্যাংকে কাজের ফাঁকেই লিখে ফেলেন বাংলার ইতিহাসে কালজয়ী গান আমি বাংলায় গান গাই। বিবিসি বাংলার সর্বকালের ষষ্ঠ শ্রেষ্ঠ বাংলা গান হিসেবে নির্বাচিত। ডিঙ্গি ভাসাও, ছোকরা চাঁদ জোয়ান চাঁদ, আলু বেচোঁ ছলা বেচোঁ আরো অনেক বিখ্যাত গান বা মঙ্গল চরণ চট্টোপাধ্যায়ের ‘আমি ধান কাটার গান গাই’ কবিতাকে গানের সুরে ফেলা। আজকে থাকছে প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের মুখেই সেই কালজয়ী গানের জন্মকথা।
নতুন শতকের পয়লা বৈশাখ: ১৪০০ বঙ্গাব্দের গল্প
প্রতুল মুখোপাধ্যায় এক সাক্ষাৎকারে জানিয়ে ছিলেন গানটি তৈরি হয়েছিল ১৪০০ বঙ্গাব্দের পয়লা বৈশাখে। নতুন শতককে স্বাগত জানাতে সেদিন কলকাতার ঐতিহাসিক কফি হাউসে আয়োজন করা হয়েছিল একটি বিশেষ অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানে গান পরিবেশনের কথা ছিল প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের। তাঁর সঙ্গে উপস্থিত থাকার কথা ছিল পীযূষ কান্তি সরকারেরও। সেই সময় তাঁর মাথায় আসে এক অনন্য ভাবনা বাংলাকে নিয়ে যদি একটা গান লেখা যায়? আর সেখান থেকেই শুরু হয় ইতিহাস।
অফিসের কাজের ফাঁকে জন্ম নেয় অমর গান
সেই সময় প্রতুল মুখোপাধ্যায় চাকরি করতেন ব্যাংকে। অফিসের ব্যস্ততার মাঝেও তাঁর মাথার ভেতর চলছিল গানের কথা। একদিকে রিপোর্ট লিখছেন, অন্যদিকে আরেকটি কাগজে টুকটাক করে লিখছেন গানের লাইন। প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের কথায় সেদিন অফিসের কাজ করছিলেন। একটা রিপোর্ট লিখতে গিয়ে সেই সময় তাঁর মাথার মধ্যে গানের বিষয়টা চলছিল। এক জায়গায় কথাগুলো লিখছিলেন অনেকটা রামপ্রসাদের মতো! প্রথম লাইনটা আমি বাংলায় গান গাই, বাংলার গান গাই। এইভাবেই ধীরে ধীরে তৈরি হতে থাকে বাংলা গানের ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী সৃষ্টি।
কফি হাউসের অনুষ্ঠানে গানটি গাওয়া হয়নি!
মজার ব্যাপার হলো গানটি তৈরি হলেও পয়লা বৈশাখের সেই মূল অনুষ্ঠানে প্রতুল মুখোপাধ্যায় ‘আমি বাংলায় গান গাই’ গানটি পরিবেশন করেননি। সেদিন তিনি গেয়েছিলেন অন্য একটি গান। তবে বিকেলে কফি হাউসেই এক ঘরোয়া আড্ডায় তিনি প্রায় ১৫–২০ জন বন্ধুর সামনে প্রথমবার গানটি গেয়ে শোনান প্রথমবার শুনে শ্রোতারা খুব একটা উচ্ছ্বসিত হয়নি। আজ যে গান শুনে আমরা আবেগে ভেসে যাই সেই গান প্রথমবার শোনার সময় শ্রোতাদের প্রতিক্রিয়া ছিল বেশ ঠান্ডা।
প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের কথায়- যাঁরা শুনছিলেন তাঁদের আহামরি কোনো রেসপন্স ছিল না। কেউ কেউ বলছিলেন গানটা একটু বড় হয়ে গেছে। সেদিন কেউই বুঝতে পারেননি এই গান একদিন হয়ে উঠবে বাঙালির চেতনার কণ্ঠস্বর। সমালোচনা হয়েছিল কেউ বলেছিলেন নজরুলসংগীতের মতো! গানটি নিয়ে সমালোচনা কম হয়নি। অনেকেই মন্তব্য করেছিলেন গানটি নাকি নজরুলসংগীতের মতো শোনায়, গানটি খুব বড় হয়ে গেছে বা কিছু অংশে অতিরিক্ত নাটকীয়তা আছে। প্রতুল মুখোপাধ্যায় নিজের বিশ্বাসে অটল ছিলেন। তিনি জানতেন, গানটি ঠিক পথেই আছে।
বিবিসি বাংলার জরিপে সর্বকালের সেরা বাংলা গানের তালিকায় ষষ্ঠ
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে গানটি হয়ে ওঠে বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রতীক। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বিবিসি বাংলার জরিপে সর্বকালের সেরা বাংলা গানের তালিকায় এটি ৬ষ্ঠ স্থান অর্জন করে। খালি গলায় গাওয়া গানটির সবচেয়ে বড় জাদু। ‘আমি বাংলায় গান গাই’ গানটির আরেকটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এটি কোনো বাদ্যযন্ত্র ছাড়াই খালি গলায় গাওয়া। প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠের সেই গভীর আবেগ, সহজ সুর ও উচ্চারণ গানটিকে আরও বেশি হৃদয়স্পর্শী করে তোলে।
বাংলাদেশে নতুন করে জনপ্রিয়তা পায় একুশে টেলিভিশনের মাধ্যমে। বাংলাদেশে গানটির জনপ্রিয়তা নতুনভাবে ছড়িয়ে পড়ে ২০০০ সালে একুশে টেলিভিশনের একটি আয়োজনে বাংলাদেশের শিল্পী মাহমুদুজ্জামান বাবু গানটি পরিবেশন করেন। এরপর থেকেই বাংলাদেশে প্রতুল মুখোপাধ্যায় নতুনভাবে পরিচিত হয়ে ওঠেন এবং গানটি ঘরে ঘরে জনপ্রিয় হয়ে যায়।
- গানটির নাম: আমি বাংলায় গান গাই
- রচয়িতা ও সুরকার: প্রতুল মুখোপাধ্যায়
- সৃষ্টির সময়: ১ বৈশাখ, ১৪০০ বঙ্গাব্দ
- প্রথম পরিবেশনা: (আড্ডায়) কফি হাউস, কলকাতা
- স্বীকৃতি: বিবিসি বাংলার জরিপে ৬ষ্ঠ সেরা বাংলা গান
- বাংলাদেশে জনপ্রিয়তা: ২০০০ সালে একুশে টিভিতে মাহমুদুজ্জামান বাবুর কণ্ঠে।
আমি বাংলায় গান গাই আমি বাংলার গান গাই
প্রতুল মুখোপাধ্যায়
আমি বাংলায় গান গাই
আমি বাংলায় গান গাই
আমি বাংলার গান গাই
আমি আমার আমিকে চিরদিন এই বাংলায় খুঁজে পাই।
আমি বাংলায় দেখি স্বপ্ন
আমি বাংলায় বাঁধি সুর
আমি এই বাংলার মায়াভরা পথে হেঁটেছি এতটা দূর।
বাংলা আমার জীবনানন্দ
বাংলা প্রাণের সুখ
আমি একবার দেখি, বার বার দেখি, দেখি বাংলার মুখ।
আমি বাংলায় কথা কই
আমি বাংলার কথা কই
আমি বাংলায় ভাসি, বাংলায় হাসি, বাংলায় জেগে রই।
আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে
করি বাংলায় হাহাকার
আমি সব দেখে শুনে ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার।
বাংলা আমার দৃপ্ত স্লোগান
ক্ষিপ্ত তীর ধনুক
আমি একবার দেখি, বার বার দেখি, দেখি বাংলার মুখ।
আমি বাংলায় ভালোবাসি
আমি বাংলাকে ভালোবাসি
আমি তারি হাত ধরে সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে আসি।
আমি যা কিছু মহান বরণ করেছি
বিনম্র শ্রদ্ধায়
মেশে তেরো নদী সাত সাগরের জল গঙ্গায় পদ্মায়।
বাংলা আমার তৃষ্ণার জল
তৃপ্ত শেষ চুমুক
আমি একবার দেখি, বার বার দেখি, দেখি বাংলার মুখ।
আমি বাংলায় গান গাই’ গানটির জন্ম হয়েছিল এক ব্যস্ত অফিস সময়ের মধ্যে একটি সাধারণ দিনের ফাঁকে। কিন্তু সেই সাধারণ মুহূর্ত থেকেই জন্ম নিয়েছিল এক অসাধারণ সৃষ্টি, যা আজও বাংলা ভাষাভাষী মানুষের হৃদয়ে অমলিন। প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে এই গান শুধু সংগীত নয় এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, ভালোবাসা এবং সংস্কৃতির এক অমর দলিল। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে ভালোবাসার প্রতীক হয়ে এই গান যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকবে।
সীমানা পেরিয়ে বাঙালির একতার সুর
এই গানের অন্তর্নিহিত শক্তি কেবল ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে আবদ্ধ থাকেনি। রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত দুই বাংলার মানুষকে এক সুতোয় বাঁধার এক জাদুকরী ক্ষমতা রয়েছে এই গানের প্রতিটি চরণে। যখন প্রতুল মুখোপাধ্যায় গেয়ে ওঠেন "মেশে তেরো নদী সাত সাগরের জল গঙ্গায় পদ্মায়", তখন গঙ্গা আর পদ্মা যেন কেবল দুটি নদী থাকে না; তা হয়ে ওঠে দুই বাংলার মিলনমেলা এবং সম্প্রীতির এক অবিনশ্বর সেতু। কাঁটাতারের ব্যবধান ভুলে এই একটি গান কোটি বাঙালিকে মনে করিয়ে দেয় যে, তাদের ভাষা এক, তাদের আবেগ এক এবং তাদের শিকড়ও এক।
সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও দ্রোহের হাতিয়ার
‘আমি বাংলায় গান গাই’ কেবল আত্মপরিচয়ের গান নয়, এটি স্বাধিকার আন্দোলন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার এক দারুণ অনুপ্রেরণা। গানের একটি অংশে বলা হয়েছে "আমি সব দেখে শুনে ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার / বাংলা আমার দৃপ্ত স্লোগান ক্ষিপ্ত তীর ধনুক"। এই লাইনগুলো প্রমাণ করে, বাংলা ভাষা কেবল প্রেমের বা প্রকৃতির ভাষা নয়, এটি প্রয়োজনে শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ও দ্রোহের ভাষা। বাংলাদেশে বিভিন্ন ছাত্র আন্দোলন, সাংস্কৃতিক উৎসব কিংবা ভাষা দিবসের আয়োজনে এই গানটি তরুণ প্রজন্মের মাঝে এক নতুন উদ্দীপনার জন্ম দেয়।
একটি গানের চিরন্তন উত্তরাধিকার
২০০৬ সালে বিবিসি বাংলার জরিপে যখন গানটি সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাংলা গানের তালিকায় ষষ্ঠ স্থান পায়, তখন তা বিশ্বমঞ্চে বাংলা গানের মর্যাদাকে আরও উঁচুতে নিয়ে যায়। বাদ্যযন্ত্রহীন, নিছক খালি গলার এই গানটি আমাদের শেখায় যে, খাঁটি সুর আর হৃদয়ের গভীর থেকে আসা কথামালা যদি সত্য হয়, তবে তা যুগ যুগ ধরে মানুষের মনে স্থান করে নেয়। প্রতুল মুখোপাধ্যায় আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর এই অমর সৃষ্টি কোটি বাঙালির কণ্ঠে, চিন্তায় এবং চেতনায় চিরকাল বেঁচে থাকবে। যতদিন পৃথিবীজুড়ে বাংলা ভাষা থাকবে, ততদিন এই গান থাকবে বাঙালির পরম আশ্রয় হয়ে।
