ফজলু ওস্তাদের মুখের বুলিএসো সবাই হকি খেলি
ফজলু ওস্তাদ যার পুরো নাম হাজি মো. ফজলুল ইসলাম। কিন্তু এই নামে তাঁকে খুব কম মানুষই চেনে। হকির জগতে ওস্তাদ ফজলু নামেই অধিক পরিচিত ছিলেন। বাংলাদেশের হকির তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায় সব জায়গায় এক অনন্য পরিচয় সৃষ্টি করা মানুষ। ছোটবেলা থেকে স্টিক আর বলের প্রতি যে ভালোবাসা জন্মেছিল
মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেই ভালোবাসা তিনি কখনও হারাননি। আরমানিটোলা হাইস্কুলের দেয়ালে গ্রাফিতি আছে তার মুখের সেই অমলিন বুলি ফজলু ওস্তাদের মুখের বুলি এসো সবাই হকি খেলি। আজকে লেখা তাঁকে স্মরন করে। তাঁকে নিয়ে ফজলু ওস্তাদকে নিয়ে।
পুরান ঢাকার আরমানিটোলার নাবালক মিয়া লেনে জন্ম নেওয়া ওস্তাদ ফজলু উনারা ছিলেন পাঁচ ভাই-বোন। অবস্থানগত দিক থেকে সবার ছোট ছিলেণ তিনি। হকির প্রতি আগ্রহ হবার পেছনে তিনি বারবারই বলতেন আব্দুর রাজ্জাক সোনা মিয়ার কথা। ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় একদিন হঠাৎই আরমানিটোলা স্কুলে হকি খেলা দেখতে যান। সোনা মিয়ার খেলা দেখতেই মাঠে প্রতিদিন হাজির হতেন ফজলু।
মাঠের বাইরে যাওয়া বল কুড়িয়ে তিনি আবার মাঠে ফিরিয়ে দিতেন। এভাবেই সোনা মিয়ার নজরে আসেন তিনি। সোনা মিয়া তাঁকে খেলার প্রস্তাব দিলে কোনো দ্বিধা ছাড়াই ফজলু লুফে নেন। হকিস্টিক বা জার্সি কিছুই ছিল না তাঁর। পরে সোনা মিয়া দুটি ভাঙা স্টিক এনে জোড়া দিয়ে খেলতে বলেন। ফজলু ওস্তাদের হকি জীবনের শুরু ছিল ওই দুই ভাঙা স্টিকেই।
দুই ভাঙা স্টিকে স্বপ্নের শুরু
ভাঙা স্টিক পেয়েও তার আনন্দের সীমা ছিল না। ভালো খেলার সুবাদে তিনি আরমানিটোলা স্কুল দলের হয়ে খেলতে শুরু করেন। আক্রমণভাগে খেলে স্কুল হকিতে তিনবার চ্যাম্পিয়ন করেন আরমানিটোলা উচ্চ বিদ্যালয়কে। আরমানিটোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে দারুণ খেলার সুবাদে এলাকায় নামডাক পড়ে যায় ফজলুল ইসলামের। ঢাকার প্রথম বিভাগ হকি লিগে সরাসরি খেলার সুযোগ আসে। ১৯৭৭ সাল থেকে সেই যে ঢাকার হকিতে নিজের নাম লিখিয়েছেন। প্রথম বিভাগ পেরিয়ে প্রিমিয়ার ডিভিশনে খেলারও সুযোগ মিলে যায়।
পিডব্লিউ দিয়ে শুরু করে এরপর একে একে ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাব, সাধারণ বীমা ক্রীড়া সংঘ, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব, উষা ক্রীড়া চক্র, ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে খেলেন। এর মধ্যে প্রথম বিভাগে সাধারণ বীমার হয়ে শিরোপা জেতার রেকর্ড রয়েছে তার। পিডব্লিউডি, সাধারণ বীমা, ভিক্টোরিয়া সব দলের জার্সি গায়ে মাঠ মাতিয়েছেন তিনি। তাঁর হাতে গড়া অনেক খেলোয়াড় এখন জাতীয় দলে খেলছেন। গরিব ছেলে-মেয়েদের বিনা পয়সায় প্রশিক্ষণ দিতেন। নিজের টাকায় জার্সি, জুতা কিনে দিতেন। সিনিয়রদের পুরনো স্টিক কেটে ছোট করে দিতেন নবীনদের হাতে। তাঁর মুখের বুলি চলো সবাই হকি খেলি পুরান ঢাকার অলিগলিতে সবার মুখে মুখে ছড়িয়ে ছিল।
মাঠ কাঁপানো খেলোয়াড় থেকে প্রথম বিভাগ জয়
১৯৮৪ সালের কথা। প্রথম বিভাগে সাধারণ বীমায় খেলার সময় দুর্দান্ত ফর্মে ছিলেন ফজলুল ইসলাম। তার একক নৈপুণ্যে দল চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করে। সেই সুবাদে সুযোগ পেয়ে যান জুনিয়রদের জাতীয় দলে খেলার। খেলতে যেতে হবে মালয়েশিয়ায়।
সে সময় চলছে লিগের খেলা। ভিক্টোরিয়া বনাম ঊষার খেলা চলছিল। খেলা শেষ হওয়ার মিনিট সাতেক আগে চোখের ওপর লাগে স্টিকের আঘাত। গুনে গুনে ১৩টা সেলাই। ‘সেই চোটের কারণেই পরে আর জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপাতে পারিনি,। সেই দুঃখ তাঁর আজীবন ছিলো।
কারিগর যখন কোচ: নতুন প্রজন্মের রত্ন তৈরি
জাতীয় দলে খেলার দুঃখ ঘোচাতে নেমে পড়লেন খেলোয়াড় তৈরিতে। একটি স্বপ্ন ভেঙে গিয়ে আরেকটি স্বপ্নের শুরু হলো এখানেই। নিজের জাতীয় দলে খেলা স্বপ্নটি পূরণ করতে না পারার কষ্ট আর যন্ত্রণা শিষ্যদের দিয়েই পূরণ করতে চান। একের পর এক রত্ন উপহার দিয়ে গিয়েছেন ‘ওস্তাদ ফজলু’। যা থেকে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হচ্ছে দেশের হকি। বয়সভিত্তিক হকি মানেই ছিলেন ওস্তাদ ফজলু। যার ফল প্রথম পায় আরমানিটোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়।
হকির জন্য বিখ্যাত এই স্কুলটি স্কুল হকিতে একাধিকবার শিরোপা জিতেছে। ঢাকার হকিতে ঢাকা ওয়ান্ডারার্স, কমবাইন্ড স্পোর্টিং ক্লাব, বাংলাদেশ পুলিশ দলের কোচের দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের প্যানেলভূক্ত কোচ হিসেবে নতুনদের নিয়ে কাজ করছেন। খেলা ছাড়ার পর কোচিংটি একেবারে রক্তের মধ্যে ঢুকে গিয়েছিলো। তৃণমূল পর্যায়ে হকির মৌলিক বিষয়গুলো শেখানোতে ওস্তাদ ফজলুর যে কোনো জুড়ি ছিলো না। সেটি ফেডারেশনের কর্মকর্তারা অবলীলায় স্বীকার করেন এখন।
বাড়ির ছাদেই হকি মাঠ: এক অদ্ভুত প্যাশন
পুরান ঢাকার বেগম বাজারের গলি পেরিয়ে সামনে এগোতেই ‘ওস্তাদ ফজলু’র বাড়ি। একেবারে ছিমছাম আর সাদামাটা মানুষের মতোই তার গোলাপি রঙের বাড়িটি। দেয়ালে দেয়ালে সাজানো রয়েছে খেলোয়াড়ি জীবন থেকে শুরু করে প্রথম জীবনের ক্যারিয়ারে পাওয়া সাফল্যের স্মারকগুলো। এখানকার ৮ নম্বর নাবালক মিয়া লেনে তার পরিচিতি একটু বেশি।
সব বয়সের মানুষের কাছেই তার পরিচিতি ছিলেন ‘ওস্তাদ’ হিসেবে। বাড়িতে পুরান ঢাকার ঐতিহ্য অনেকটাই ধরে রাখা হয়েছে। তবে তিনতলার ছাদে গেলে অনেকটা হতচকিত হওয়ার মতো অবস্থা হবে সবার। বাড়ির ছাদে শখ করে সবাই বাগান করে; কিন্তু তিনি করেছিলেন হকির আস্ত একটি মাঠ।
স্বীকৃতি ও শেষ বিদায়: অবহেলার আড়ালে এক নক্ষত্র
জাতীয় স্কুল হকি, জাতীয় যুব হকি কিংবা মেয়েদের নতুন করে খেলা শেখাতে ডাক পড়ে অভিজ্ঞ এই কোচের। হকির জন্য নিজেকে নিবেদন করা এ মানুষটিকে ২০১২ সালে সম্মাননা দিয়েছে বাংলাদেশ হকি ফেডারেশন। ২০১৬ সালে তৃণমূলে কোচ হিসেবে পুরস্কার দিয়েছে বাংলাদেশ ক্রীড়ালেখক সমিতি। দেশের হকির তারকা রফিকুল ইসলাম কালাম, রাসেল মাহমুদ জিমিরা উঠে এসেছেন ফজলু ওস্তাদের হাত ধরে।
বাংলাদেশের হকিতে নিবেদিত প্রাণ ওস্তাদ ফজলু মাত্র ৫৭ বছর বয়সে ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪ পারি জমান না ফেরার দেশে। রাস্ট্র তাঁর মত তাদের মত নিবেদিত মানুষদের কখনই জাতীয় ভাবে সম্মানিত করে নাই বা করে না। নাকি তাদের মত লোকদের কথা রাস্ট্র জানতেই পারে না। এই এক আজব রহস্য। তাঁর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
FAQ: ওস্তাদ ফজলু (হাজি মো. ফজলুল ইসলাম) সম্পর্কে সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর
প্রশ্ন ১: ওস্তাদ ফজলুর পুরো নাম কী?
উত্তর: ওস্তাদ ফজলুর পুরো নাম হাজি মো. ফজলুল ইসলাম। বাংলাদেশের হকি অঙ্গনে তিনি ‘ওস্তাদ ফজলু’ নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন।
প্রশ্ন ২: ওস্তাদ ফজলু কেন বিখ্যাত?
উত্তর: তৃণমূল পর্যায় থেকে অসংখ্য হকি খেলোয়াড় তৈরি করার জন্য ওস্তাদ ফজলু বাংলাদেশের হকির অন্যতম শ্রদ্ধেয় কোচ ও কারিগর হিসেবে পরিচিত।
প্রশ্ন ৩: ওস্তাদ ফজলুর বিখ্যাত স্লোগান কী ছিল?
উত্তর: তাঁর মুখের অমলিন বুলি ছিল— “এসো সবাই হকি খেলি।” এই স্লোগানটি আরমানিটোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের দেয়ালে গ্রাফিতি হিসেবেও রয়েছে।
প্রশ্ন ৪: ওস্তাদ ফজলুর হকি জীবনের শুরু কীভাবে হয়েছিল?
উত্তর: ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় আরমানিটোলা স্কুলে হকি খেলা দেখতে গিয়ে তাঁর হকির প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়। পরে আব্দুর রাজ্জাক সোনা মিয়ার দেওয়া দুটি ভাঙা স্টিক জোড়া দিয়ে তাঁর খেলোয়াড়ি জীবন শুরু হয়।
প্রশ্ন ৫: ওস্তাদ ফজলু কোন কোন ক্লাবে খেলেছেন?
উত্তর: তিনি পিডব্লিউডি, ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাব, সাধারণ বীমা ক্রীড়া সংঘ, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব, উষা ক্রীড়া চক্র ও ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে খেলেছেন।
প্রশ্ন ৬: ওস্তাদ ফজলু কি জাতীয় দলে খেলেছিলেন?
উত্তর: খেলোয়াড় হিসেবে জাতীয় দলের জার্সি পরার স্বপ্ন তাঁর পূরণ হয়নি। ১৯৮৪ সালে জুনিয়র জাতীয় দলে মালয়েশিয়া যাওয়ার সুযোগ পেলেও চোখে গুরুতর আঘাত পাওয়ায় সেই সুযোগ হাতছাড়া হয়।
প্রশ্ন ৭: ওস্তাদ ফজলুর সবচেয়ে বড় অবদান কী?
উত্তর: খেলোয়াড় তৈরি করাই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান। তাঁর হাত ধরে রফিকুল ইসলাম কালাম, রাসেল মাহমুদ জিমিসহ অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড় উঠে এসেছেন।
প্রশ্ন ৮: ওস্তাদ ফজলু কোথায় নিজের হকি মাঠ তৈরি করেছিলেন?
উত্তর: পুরান ঢাকার বেগম বাজারের নাবালক মিয়া লেনে নিজের বাড়ির তিনতলার ছাদে তিনি শখ করে একটি হকি মাঠ তৈরি করেছিলেন।
প্রশ্ন ৯: ওস্তাদ ফজলু কবে মারা যান?
উত্তর: বাংলাদেশের হকির নিবেদিতপ্রাণ এই মানুষটি ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪ সালে ৫৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
প্রশ্ন ১০: ওস্তাদ ফজলু কেন স্মরণীয় হয়ে থাকবেন?
উত্তর: নিজের ক্যারিয়ারের সীমাবদ্ধতা ভুলে নতুন প্রজন্মের হকি খেলোয়াড় তৈরিতে আজীবন কাজ করার কারণে ওস্তাদ ফজলু বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
