কল্পনা করুন, প্রত্নতাত্ত্বিক খনন করতে গিয়ে আপনি এমন একটি প্রাচীন ফলক খুঁজে পেলেন, যার গায়ে সারি সারি অদ্ভুত চিহ্ন খোদাই করা। চিহ্নগুলো এলোমেলো নয়। কোথাও একই প্রতীক বারবার এসেছে, কোথাও মানুষের মুখ, পাখি কিংবা জ্যামিতিক আকৃতির মতো সংকেত রয়েছে। স্পষ্ট বোঝা যায়, এগুলো কোনো এক সময়ের মানুষের তৈরি। অথচ বহু চেষ্টা করেও আপনি বুঝতে পারছেন না, সেখানে কী লেখা আছে। এটি কোনো কল্পবিজ্ঞানের গল্প নয়। বাস্তব পৃথিবীতেই এমন বহু প্রাচীন লিপি রয়েছে, যেগুলোর অর্থ আজও গবেষকদের কাছে পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। কিছু লিপির চিহ্ন শনাক্ত করা গেলেও সেগুলো কোন ভাষা প্রকাশ করত, তা জানা যায়নি। আবার কোথাও লেখার নমুনা এত কম যে ভাষার গঠন সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ধারণা তৈরি করাই কঠিন।
এসব লিপিতে হয়তো লুকিয়ে আছে হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার শাসনব্যবস্থা, বাণিজ্য, ধর্মীয় বিশ্বাস কিংবা দৈনন্দিন জীবনের বিবরণ। অথচ সেই ইতিহাসের দরজা খোলার চাবিটি এখনো আমাদের হাতে নেই। প্রাচীন মিশরের হায়ারোগ্লিফিক লিপি পাঠোদ্ধারে রোসেটা স্টোন যেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, তেমন কোনো সহায়ক সূত্র অনেক রহস্যময় লিপির ক্ষেত্রে এখনো পাওয়া যায়নি। আধুনিক কম্পিউটার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নতুন সম্ভাবনা তৈরি করলেও সমস্যার সমাধান এত সহজ নয়। চলুন, পরিচিত হই পৃথিবীর এমন সাতটি লিখনপদ্ধতি ও ভাষার সঙ্গে, যেগুলোর পাঠোদ্ধার এখনো অসম্পূর্ণ, বিতর্কিত অথবা যেগুলোর প্রকৃত অর্থ নিয়ে গবেষণা চলছে।
পড়ার আগে জরুরি কথা: "অপাঠোদ্ধারকৃত" শব্দটি সব লিপির ক্ষেত্রে সমান অর্থে খাটে না। কোনো লিপির অক্ষর পড়া যাওয়া (যেমন ইট্রুস্কান), কোনো লিপির আংশিক ও বিতর্কিত পাঠ থাকা (যেমন এপি-ওলমেক), আর কোনো লিপির লেখা সম্পর্কে প্রায় কিছুই না জানা (যেমন ফাইস্টোস ডিস্ক)- এই তিনটি পরিস্থিতি আলাদা। তাই নিচে প্রতিটি লিপির "বর্তমান অবস্থা" আলাদা করে বলা হয়েছে।
এক নজরে সাতটি লিপি
প্রাচীন সভ্যতার ইতিহাস জানার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো তাদের ব্যবহৃত লিপি। তবে পৃথিবীর সব প্রাচীন লিখনপদ্ধতির রহস্য এখনো উন্মোচিত হয়নি। কিছু লিপির আংশিক পাঠোদ্ধার সম্ভব হলেও অনেকগুলোর ভাষা, অর্থ ও ব্যবহার আজও গবেষকদের কাছে ধাঁধা হয়ে রয়েছে। নিচের টেবিলে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি অপাঠিত ও আংশিক পাঠোদ্ধার হওয়া প্রাচীন লিপির অঞ্চল, সময়কাল এবং বর্তমান গবেষণা-অবস্থা এক নজরে তুলে ধরা হয়েছে।
| লিপি |
অঞ্চল |
আনুমানিক সময় |
বর্তমান অবস্থা |
| এপি-ওলমেক |
দক্ষিণ মেক্সিকো |
খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দ থেকে খ্রিষ্টীয় প্রথম কয়েক শতক |
আংশিক পাঠের প্রস্তাব আছে, তবে বিতর্কিত |
| সিন্ধু লিপি |
দক্ষিণ এশিয়া |
আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ২৬০০–১৯০০ |
অপাঠিত; লিখনপদ্ধতির প্রকৃতি নিয়েও বিতর্ক |
| রোঙ্গোরোঙ্গো |
রাপা নুই (ইস্টার দ্বীপ) |
লিপির উৎপত্তিকাল অনিশ্চিত; ফলকের কাঠ ১৫শ–১৯শ শতকের |
অপাঠিত |
| লিনিয়ার এ ও ক্রিটান হায়ারোগ্লিফ |
ক্রিট, গ্রিস |
খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দ |
ভাষা অজানা; কিছু চিহ্নের ধ্বনিমূল্য অনুমান করা যায় |
| ফাইস্টোস ডিস্ক |
ক্রিট, গ্রিস |
আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ১৮৫০–১৬০০ |
অপাঠিত; একটিমাত্র নিদর্শন |
| ইট্রুস্কান |
মধ্য ইতালি |
খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তম শতক থেকে |
অক্ষর পড়া যায়; ভাষা আংশিক বোঝা যায় |
| প্রোটো-এলামাইট |
ইরান |
আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ৩১০০–২৯০০ |
সংখ্যা ও হিসাবের কাঠামো আংশিক বোঝা গেছে; ভাষা অজানা |
টেবিল নোট: সময়কালগুলো আনুমানিক। কোনো লিপির চিহ্ন শনাক্ত করা, তার ধ্বনিমূল্য অনুমান করা এবং সংশ্লিষ্ট ভাষা সম্পূর্ণ পাঠোদ্ধার করা- এগুলো পৃথক বিষয়।
১. এপি-ওলমেক লিপি: মেক্সিকোর প্রাচীন ইতিহাসের বিতর্কিত পাঠ
মধ্য আমেরিকার প্রাচীন সভ্যতাগুলোর ইতিহাসে ওলমেক ও পরবর্তী এপি-ওলমেক সংস্কৃতির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। বর্তমান মেক্সিকোর দক্ষিণাঞ্চলে, বিশেষ করে ভেরাক্রুজ ও তার আশপাশে, এই সংস্কৃতির নানা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া গেছে। এপি-ওলমেক লিপিকে ইস্তমিয়ান লিপি বা লা মোহারা লিপিও বলা হয়।
এই লিপির সবচেয়ে দীর্ঘ নিদর্শনগুলোর মধ্যে রয়েছে লা মোহারা স্টেলা ১ (১৯৮৬ সালে আবিষ্কৃত) ও টুসট্লা মূর্তি। এসব লেখায় প্রাচীন মানুষের রাজনৈতিক জীবন, শাসক ও ধর্মীয় আচার সম্পর্কে তথ্য থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো, দীর্ঘ লেখার নিদর্শন খুব কম। পর্যাপ্ত নমুনা না থাকলে একই চিহ্ন বিভিন্ন জায়গায় কী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, তা তুলনা করা কঠিন।
তবে একে একেবারে অজানা বলা ঠিক নয়। ১৯৯৩ সালে গবেষক জন জাস্টেসন ও টেরেন্স কাউফম্যান লা মোহারা স্টেলার লেখার একটি আংশিক পাঠোদ্ধারের প্রস্তাব দেন। তাঁদের মতে, লিপিটি মিক্সে-জোকিয়ান ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত প্রাচীন একটি জোকিয়ান ভাষা প্রকাশ করত।
কিন্তু এই প্রস্তাব সর্বজনস্বীকৃত নয়। ১৯৯৮ সালে স্টিফেন হিউস্টন ও মাইকেল কো তাঁদের পদ্ধতি অন্য একটি এপি-ওলমেক লেখায় প্রয়োগ করে সফল হননি এবং প্রস্তাবের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাই বর্তমানে এটিকে "আংশিক ও বিতর্কিত পাঠ" বলাই সবচেয়ে নিরাপদ। আরও দীর্ঘ লেখা কিংবা নতুন প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে।
২. সিন্ধু সভ্যতার লিপি: হরপ্পার মানুষ কী লিখত?
দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে সিন্ধু সভ্যতা এক অসাধারণ অধ্যায়। বর্তমান পাকিস্তান, উত্তর-পশ্চিম ভারত ও আফগানিস্তানের কিছু অংশে বিস্তৃত এই সভ্যতার হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোর মতো নগরকেন্দ্র উন্নত পরিকল্পনা, নির্মাণকৌশল ও সংগঠিত জীবনযাত্রার পরিচয় দেয়। কিন্তু এই সভ্যতার মানুষের লিখিত ভাষা এখনো অমীমাংসিত রহস্যগুলোর একটি।
সিন্ধু লিপি পাওয়া গেছে পাথরের সিলমোহর, মাটির পাত্রের টুকরা, তামার ফলক ও অন্যান্য প্রত্নবস্তুতে। এ পর্যন্ত চার হাজারের বেশি লিপিযুক্ত বস্তু পাওয়া গেছে, কিছু মেসোপটেমিয়ার মতো দূরবর্তী অঞ্চলেও। অনেক সিলমোহরে কোনো প্রাণীর ছবি এবং তার ওপরে বা পাশে কয়েকটি চিহ্ন দেখা যায়। গবেষকেরা সাধারণত মনে করেন, লেখা ডান দিক থেকে বাঁ দিকে হতো। মোট মৌলিক চিহ্নের সংখ্যা নিয়ে মতভেদ আছে; প্রচলিত অনুমান প্রায় ৪০০ থেকে ৬০০।
তাহলে সেগুলোর অর্থ কী? কেউ মনে করেন, এগুলো পূর্ণাঙ্গ ভাষা প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত হতো। কোনো কোনো গবেষক (যেমন ২০০৪ সালে ফার্মার, স্প্রোট ও উইটজেল) প্রশ্ন তুলেছেন, চিহ্নগুলো আদৌ ভাষা লেখার পদ্ধতি ছিল কি না, নাকি অন্য ধরনের প্রতীকব্যবস্থা। যদিও পরবর্তী কিছু পরিসংখ্যানভিত্তিক গবেষণা ভাষাসুলভ কাঠামোর ইঙ্গিত দিয়েছে, বিতর্কের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। কেউ কেউ লিপিটিকে দ্রাবিড় ভাষার সঙ্গে সম্পর্কিত মনে করেন, কেউ অন্য ব্যাখ্যা দেন। এসব কোনোটিই সর্বজনস্বীকৃত নয়।
সমস্যার বড় কারণ হলো, অধিকাংশ লেখাই অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত; গড়ে মাত্র পাঁচটির মতো চিহ্ন। এত অল্প চিহ্ন থেকে বাক্যের গঠন, শব্দের অর্থ কিংবা ব্যাকরণ বোঝা কঠিন। তার ওপর এমন কোনো নির্ভরযোগ্য দ্বিভাষিক নিদর্শন পাওয়া যায়নি, যেখানে একই বক্তব্য সিন্ধু লিপি ও পরিচিত কোনো ভাষায় লেখা রয়েছে।
এই লিপির পাঠোদ্ধার সম্ভব হলে দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান বদলে যেতে পারে। জানা যেতে পারে, সিন্ধু সভ্যতার মানুষ নিজেদের কী নামে পরিচয় দিত, তাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থা কেমন ছিল কিংবা তারা কোন ভাষায় কথা বলত।
৩. রোঙ্গোরোঙ্গো: ইস্টার দ্বীপের কাঠের ফলকে লেখা রহস্য
প্রশান্ত মহাসাগরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত রাপা নুই, যা ইস্টার দ্বীপ নামেও পরিচিত, তার বিশাল পাথরের মূর্তি (মোয়াই)-র জন্য পৃথিবীজুড়ে বিখ্যাত। কিন্তু দ্বীপটির আরেকটি বিস্ময়কর ঐতিহ্য হলো রোঙ্গোরোঙ্গো নামের রহস্যময় লিখনপদ্ধতি।
রোঙ্গোরোঙ্গোর নিদর্শনগুলো প্রধানত কাঠের ফলকে খোদাই করা। এসব লেখায় পাখি, মানুষের অবয়ব ও নানা ধরনের প্রতীকী চিহ্ন দেখা যায়। বাইরের মানুষ এই লিপির কথা জানতে পারে উনিশ শতকের মাঝামাঝি, ১৮৬৪ সালে। বর্তমানে এই লিপি সংবলিত ৩০টিরও কম বস্তু টিকে আছে (সাধারণত ২৭টির মতো ফলকের কথা বলা হয়), এবং এর একটিও রাপা নুইয়ে সংরক্ষিত নেই।
রোঙ্গোরোঙ্গো কি পূর্ণাঙ্গ লিখনপদ্ধতি ছিল? প্রতিটি চিহ্ন কি কোনো শব্দ বা ধ্বনি প্রকাশ করত? নাকি কিছু চিহ্ন স্মৃতি থেকে দীর্ঘ বক্তব্য মনে করতে সাহায্য করত? এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো নিশ্চিত নয়।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে Scientific Reports জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণা এ বিষয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দেয়। সিলভিয়া ফেরারার নেতৃত্বাধীন দল রোমে সংরক্ষিত চারটি রোঙ্গোরোঙ্গো ফলকের কাঠের রেডিওকার্বন কালনির্ণয় করে। তিনটি ফলকের কাঠ ১৮শ–১৯শ শতকের। কিন্তু একটি ফলকের কাঠ পাওয়া গেছে ১৪৯৩ থেকে ১৫০৯ সালের মধ্যে কাটা গাছ থেকে। ইউরোপীয়রা রাপা নুইয়ে পৌঁছায় ১৭২০-এর দশকে, অর্থাৎ ওই কাঠ তার আগের। এটি ইঙ্গিত দেয়, লিপিটি ইউরোপীয় প্রভাব ছাড়াই স্থানীয়ভাবে উদ্ভাবিত হয়ে থাকতে পারে।
তবে এখানে দুটি সতর্কতা জরুরি। প্রথমত, কাঠ কাটার সময় আর তাতে লেখা খোদাইয়ের সময় এক নয়। দ্বিতীয়ত, গবেষকেরা শনাক্ত করেছেন, ওই কাঠ এমন একটি প্রজাতির (Podocarpus latifolius), যা রাপা নুইয়ে জন্মায় না; তাই এটি ভেসে আসা কাঠ হয়ে থাকতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ফলাফল লিপির প্রাক-ইউরোপীয় উৎপত্তির পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন দেয়, কিন্তু চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। আর ফলকের বয়স জানা গেলেও তাতে কী লেখা আছে, সেই প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। রোঙ্গোরোঙ্গো আজও অতীতের একটি অপঠিত কণ্ঠস্বর।
৪. মিনোয়ান সভ্যতার লিপি: লিনিয়ার এ ও ক্রিটান হায়ারোগ্লিফ
ভূমধ্যসাগরের ক্রিট দ্বীপে গড়ে উঠেছিল মিনোয়ান সভ্যতা। প্রাসাদ, শিল্পকলা, বাণিজ্য ও উন্নত সামাজিক সংগঠনের জন্য এই সভ্যতা বিশেষভাবে পরিচিত। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা সেখানে একাধিক লিখনপদ্ধতির নিদর্শন পেয়েছেন, যার মধ্যে লিনিয়ার এ এবং ক্রিটান হায়ারোগ্লিফিক লিপি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এই দুই লিপির পাঠ এখনো উদ্ধার করা যায়নি।
ক্রিটান হায়ারোগ্লিফিক লিপিতে অপেক্ষাকৃত ছবিসদৃশ চিহ্ন দেখা যায় এবং এটি আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের শুরুর দিকের। লিনিয়ার এ আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ১৮০০ থেকে ১৪৫০ সালের মধ্যে ব্যবহৃত হতো। মাটির ফলকসহ বিভিন্ন প্রত্নবস্তুতে এর চিহ্ন পাওয়া গেছে। এসব লেখার বড় অংশে হিসাব-নিকাশ বা প্রশাসনিক তথ্য থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু লিপিটির ভাষা নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা যায়নি।
এখানে লিনিয়ার বি লিপির সঙ্গে তুলনা প্রয়োজন। মাইসেনীয় সভ্যতার সঙ্গে সম্পর্কিত এই লিপি ১৯৫২ সালে মাইকেল ভেনট্রিস পাঠোদ্ধার করেন (জন চ্যাডউইকের সহযোগিতায়), এবং দেখা যায় এটি প্রাচীন গ্রিকের একটি রূপ, যাকে মাইসেনীয় গ্রিক বলা হয়। লিনিয়ার বি লিনিয়ার এ থেকে অভিযোজিত হয়েছিল বলে দুই লিপির বহু চিহ্নের মিল আছে।
কিন্তু লিনিয়ার বি পড়তে পারা মানেই লিনিয়ার এ-ও বোঝা যাচ্ছে, এমন নয়। মিল থাকা চিহ্নগুলোর সম্ভাব্য উচ্চারণ অনুমান করে লিনিয়ার এ লেখার ধ্বনি কিছুটা পড়া যায়, কিন্তু লিনিয়ার এ-র ভাষা গ্রিক নয় বলেই ধরা হয়, তাই শব্দের অর্থ বোঝা যায় না। পরিচিত একটি লিপির সঙ্গে মিল গবেষণাকে এগিয়ে দেয়, কিন্তু সেটি অজানা ভাষার চূড়ান্ত চাবিকাঠি নয়।
লিনিয়ার এ এবং ক্রিটান হায়ারোগ্লিফিক লিপির পাঠোদ্ধার হলে মিনোয়ান সমাজের মানুষ নিজেদের কীভাবে পরিচয় দিত, তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস কী ছিল এবং প্রশাসনিক জীবন কীভাবে চলত, সে সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
৫. ফাইস্টোস ডিস্ক: একটি চাকতি, অসংখ্য প্রশ্ন
১৯০৮ সালের ৩ জুলাই গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের ফাইস্টোসে মিনোয়ান প্রাসাদ খননের সময় ইতালীয় প্রত্নতাত্ত্বিক লুইজি পের্নিয়ে পান পোড়ামাটির একটি গোলাকার চাকতি, যা এখন ফাইস্টোস ডিস্ক নামে পরিচিত। এর ব্যাস প্রায় ১৬ সেন্টিমিটার। বর্তমানে এটি ক্রিটের হেরাক্লিয়ন প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরে রাখা আছে।
চাকতির দুই পাশে সর্পিল আকারে সাজানো মোট ২৪১টি (অনেক গবেষক ২৪২টি গণনা করেন) চিহ্ন রয়েছে, যেগুলো ৪৫টি আলাদা চিহ্নের পুনরাবৃত্তি। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, প্রতিটি চিহ্ন আলাদা আলাদা সিল বা স্ট্যাম্প নরম মাটিতে চেপে বসানো হয়েছিল, তারপর চাকতিটি পোড়ানো হয়। অনেকে একে আধুনিক মুদ্রণের মতো "মুভেবল টাইপ" ধারণার প্রাচীন উদাহরণ মনে করেন। প্রাপ্তিস্থানের স্তর অনুযায়ী এর সময় ধরা হয় আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ১৮৫০ থেকে ১৬০০ সালের মধ্যে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এই চিহ্নগুলোর সঙ্গে সম্পূর্ণ মেলে এমন আর কোনো নিদর্শন পাওয়া যায়নি। ক্রিটের আরকালোখোরি কুড়ালে খোদাই করা প্রায় ১৫টি চিহ্নের কিছু ফাইস্টোস ডিস্কের কথা মনে করিয়ে দেয়, কিন্তু সেগুলো সরাসরি মেলে না। মাত্র ২৪১টি চিহ্ন দিয়ে কোনো প্রস্তাবিত পাঠ যাচাই করার মতো যথেষ্ট তথ্য নেই।
চাকতিটি কি ধর্মীয় বার্তা, প্রার্থনা, গান, প্রশাসনিক নথি, নাকি সম্পূর্ণ অন্য উদ্দেশ্যে তৈরি? এ নিয়ে বহু ব্যাখ্যা আছে, কিন্তু কোনোটিই সর্বজনস্বীকৃত নয়। কিছু গবেষক এটিকে জাল বলে সন্দেহ করেছেন, তবে অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ একে খাঁটি নিদর্শন বলেই মনে করেন। ফাইস্টোস ডিস্কের রহস্য তাই শুধু চিহ্নের অর্থ নিয়ে নয়; বস্তুটি আসলে কী কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল, সেটিও একটি বড় প্রশ্ন।
৬. ইট্রুস্কান ভাষা: পাঠযোগ্য অক্ষর, অস্পষ্ট অর্থ
রোমানদের উত্থানের আগে মধ্য ইতালিতে, বিশেষ করে বর্তমান তুস্কানা ও আশপাশের অঞ্চলে, গড়ে উঠেছিল ইট্রুস্কান সভ্যতা। তাদের সমাধি, দর্পণ, মৃৎপাত্র ও অন্যান্য প্রত্নবস্তুতে হাজার হাজার শিলালিপি পাওয়া গেছে।
তবে ইট্রুস্কান ভাষার রহস্য অন্য অনেক অজানা লিপির চেয়ে আলাদা। ইট্রুস্কান বর্ণমালা গ্রিক বর্ণমালার একটি রূপ থেকে এসেছিল, তাই এর অক্ষর শনাক্ত করা সম্ভব এবং গবেষকেরা বহু শিলালিপি পড়তেও পারেন। কিন্তু অক্ষর পড়তে পারা আর ভাষা বুঝতে পারা এক বিষয় নয়।
ইট্রুস্কান একটি অ-ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা। এর সঙ্গে আল্পস অঞ্চলের রেটিক এবং এজিয়ান সাগরের লেমনস দ্বীপের লেমনিয়ান ভাষার সম্পর্ক ধরে ১৯৯৮ সালে হেলমুট রিক্স "টিরসেনিয়ান ভাষা পরিবার"-এর প্রস্তাব দেন। কিন্তু এই পরিবারের বাইরে ইট্রুস্কানের অন্য কোনো আত্মীয় ভাষা শনাক্ত হয়নি, যা অর্থ উদ্ধারকে কঠিন করেছে।
অর্থ বোঝার কিছু সূত্র অবশ্য আছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ১৯৬৪ সালে পিরগিতে পাওয়া তিনটি স্বর্ণপাত, যাতে ইট্রুস্কান ও ফিনিশীয় ভাষায় লেখা আছে। যদিও পাঠগুলো শব্দে শব্দে হুবহু অনুবাদ নয়, এগুলো নাম, দেবতার উপাধি ও উৎসর্গের সূত্র বুঝতে সাহায্য করেছে। এ ছাড়া গ্রিক ও রোমান লেখকদের সংরক্ষিত কয়েকটি ইট্রুস্কান শব্দ এবং পুনরাবৃত্ত ধর্মীয় সূত্রও কাজে লেগেছে। তবু অধিকাংশ শিলালিপি ছোট ও নামসর্বস্ব (বিশেষ করে সমাধিলিপি), তাই ভাষার বড় অংশ এখনো যথেষ্ট বোঝা যায়নি।
তাই ইট্রুস্কানকে একেবারে অপাঠোদ্ধারকৃত বলা ঠিক হবে না। বলা যায়, এর অক্ষর ও বহু শিলালিপি পড়া গেলেও ভাষাটির ব্যাকরণ ও শব্দভান্ডারের বড় অংশ আংশিকভাবে বোঝা গেছে। ইট্রুস্কান ভাষার আরও ভালো ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে প্রাচীন ইতালির ধর্ম, সামাজিক জীবন ও রোমান সভ্যতার আগের সাংস্কৃতিক ইতিহাস সম্পর্কে নতুন তথ্য জানা সম্ভব হবে।
৭. প্রোটো-এলামাইট: প্রাচীন ইরানের হিসাবের খাতা
বর্তমান ইরানের ভূখণ্ডে প্রাচীনকালে গড়ে ওঠা সমাজগুলোর ইতিহাসে প্রোটো-এলামাইট লিপি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এটি পৃথিবীর প্রাচীনতম পরিচিত লিখনপদ্ধতিগুলোর একটি এবং ইরানে বিকশিত প্রথম লিখনপদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত।
আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ৩১০০ থেকে ২৯০০ সালের মধ্যবর্তী সময়ের এই লিপি সুসা, মালিয়ান (প্রাচীন আনশান), তেপে ইয়াহিয়া, শাহর-ই সোখতা, সিয়ালক প্রভৃতি স্থানে পাওয়া মাটির ফলকে দেখা যায়। ফলকগুলো মূলত প্রশাসনিক হিসাব-নিকাশের নথি; পণ্য, পরিমাণ ও সম্পদের হিসাব রাখাই ছিল এর কাজ। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, লিপির সংখ্যাসূচক ব্যবস্থার একাংশ ও কিছু হিসাবকাঠামো গবেষকেরা বুঝতে পেরেছেন, কিন্তু চিহ্নগুলো কোন ভাষা প্রকাশ করত, তা জানা যায়নি।
গবেষকদের হাতে এখন দেড় হাজারের বেশি (অক্সফোর্ডের ডিজিটাল গ্রন্থাগারে প্রায় ১,৭০০) ফলক রয়েছে। এত বিপুল নিদর্শন থাকার পরও পূর্ণাঙ্গ পাঠোদ্ধার সম্ভব হয়নি, কারণ চিহ্নের অর্থ নির্ণয় এবং সেগুলোর সঙ্গে ভাষার সম্পর্ক বোঝা কঠিন।
এখানে আরেকটি সতর্কতা প্রয়োজন। প্রোটো-এলামাইট নাম শুনে একে পরবর্তী এলামাইট ভাষার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ধরে নেওয়া উচিত নয়। এলামাইট ভাষা পরে লিখিত হয়েছিল কিউনিফর্ম এবং আলাদা একটি লিপি, লিনিয়ার এলামাইট, দিয়ে। ২০২২ সালে ফ্রাঁসোয়া দেসে ও তাঁর আন্তর্জাতিক দল লিনিয়ার এলামাইটের প্রায় সম্পূর্ণ পাঠোদ্ধারের প্রস্তাব প্রকাশ করেন, যা এখনো গবেষকদের মধ্যে আলোচিত ও পর্যালোচিত হচ্ছে। কিন্তু সেটি প্রোটো-এলামাইটের সমাধান নয়, কারণ দুই লিপির মধ্যে হাজার বছরের ব্যবধান এবং সম্পর্কও নিশ্চিত নয়।
প্রোটো-এলামাইট গবেষণায় ডিজিটাল পদ্ধতি বড় ভূমিকা রাখছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যাকব ডাল ও সহকর্মীরা লুভর জাদুঘরে রাখা প্রায় ১,১০০টি ফলকের উচ্চমানের ছবি তুলে অনলাইনে প্রকাশ করেছেন। এর ফলে বিশ্বজুড়ে গবেষকেরা চিহ্নের ধরন ও পুনরাবৃত্তি পরীক্ষা করতে পারছেন। সাইমন ফ্রেজার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় (২০২৩) যন্ত্রশিক্ষণ পদ্ধতিতে এই লেখার অভ্যন্তরীণ কাঠামো বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এগুলো অগ্রগতি, তবে এখনো চূড়ান্ত পাঠোদ্ধার নয়।
প্রোটো-এলামাইটের রহস্য উন্মোচিত হলে প্রাচীন ইরানের প্রশাসনিক ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক কার্যক্রম এবং লেখার ইতিহাসের প্রাথমিক পর্যায় সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা যেতে পারে।
কেন এই লিপিগুলোর অর্থ উদ্ধার করা এত কঠিন?
একটি অজানা ভাষা বা লিখনপদ্ধতি পাঠোদ্ধার করতে শুধু চিহ্নগুলো দেখতে পারলেই চলে না। গবেষকদের কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হয়:
- চিহ্নগুলো কী প্রকাশ করে? এগুলো কি ধ্বনি, শব্দ, শব্দাংশ, নাকি কোনো ধারণার প্রতীক?
- লেখা কোন দিক থেকে পড়তে হয়?
- কোন ভাষায় লেখা? তার সঙ্গে কোনো পরিচিত ভাষার সম্পর্ক আছে কি না?
সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো পর্যাপ্ত নমুনার অভাব। সিন্ধু লিপির মতো বহু লেখা কয়েকটি চিহ্নেই সীমাবদ্ধ। এত অল্প তথ্য থেকে শব্দের পুনরাবৃত্তি, বাক্যগঠন কিংবা ব্যাকরণের নিয়ম নির্ণয় করা কঠিন।
দ্বিভাষিক শিলালিপি পাওয়া গেলে কাজ সহজ হয়। রোসেটা স্টোন এর বিখ্যাত উদাহরণ। এতে খ্রিষ্টপূর্ব ১৯৬ সালের একটি রাজকীয় ঘোষণা হায়ারোগ্লিফিক, ডেমোটিক ও প্রাচীন গ্রিক, এই তিন লিখনরীতিতে লেখা ছিল। ১৭৯৯ সালে এটি আবিষ্কৃত হয়। গ্রিক ভাষা জানা থাকায় গবেষকেরা অন্য দুটি লিখনরীতির পাঠোদ্ধারে এগোতে পারেন এবং ১৮২২ সালে জাঁ-ফ্রাঁসোয়া শাঁপলিয় হায়ারোগ্লিফ পাঠের মূল পদ্ধতি প্রকাশ করেন (থমাস ইয়াংসহ আরও গবেষকের অবদানও ছিল)।
তবে দ্বিভাষিক লেখা না থাকলেই পাঠোদ্ধার অসম্ভব, এমন নয়। রাজাদের নাম, স্থাননাম, দেবতার নাম, তারিখ, পুনরাবৃত্ত বাক্যাংশ এবং প্রত্নতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট থেকেও সূত্র মেলে। লিনিয়ার বি-ই তার প্রমাণ: এতে কোনো দ্বিভাষিক নিদর্শন ছিল না। অ্যালিস কোবারের মতো গবেষকের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ এবং পরে মাইকেল ভেনট্রিসের সঠিক অনুমান একত্রে ১৯৫২ সালে সাফল্য এনে দেয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি অতীতের কোড ভাঙতে পারবে?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ, একই চিহ্নের বিভিন্ন রূপ শনাক্ত, পুনরাবৃত্তির ধরন খুঁজে বের করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত লেখার সম্ভাব্য বিন্যাস পরীক্ষার কাজে ব্যবহার করা যায়।
ধরা যাক, কোনো লিপির হাজার হাজার চিহ্নের ছবি ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এআই একই ধরনের চিহ্নকে একত্র করতে পারে, কোন চিহ্ন কোন অবস্থানে বেশি আসে তা গণনা করতে পারে এবং বিভিন্ন বস্তুর লেখার মধ্যে মিল খুঁজতে পারে। এতে গবেষকদের সময় বাঁচে এবং নতুন অনুমান পরীক্ষা করা সহজ হয়।
কিন্তু এআইয়েরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে:
- নমুনা খুব কম হলে নির্ভরযোগ্য নিয়ম খুঁজে পাওয়ার মতো তথ্যই থাকে না।
- প্রমাণ অপর্যাপ্ত হলে কম্পিউটার সম্ভাব্য ব্যাখ্যা তৈরি করলেও সেটি সত্য কি না, তা নিশ্চিত করতে পারে না।
- এআই কোনো পরিচিত ভাষার কাঠামোর সঙ্গে মিল পেলে গবেষকেরা কাকতালীয় সাদৃশ্যকে প্রকৃত সম্পর্ক ভেবে ভুল করতে পারেন।
তাই এআইয়ের দেওয়া সম্ভাব্য পাঠকে প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ, ভাষাবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ও স্বাধীন গবেষণার মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। বিশেষজ্ঞদের সমালোচনামূলক যাচাই ছাড়া শুধু কম্পিউটারের তৈরি ব্যাখ্যাকে আবিষ্কার বলা যায় না।
প্রোটো-এলামাইটের মতো লিপিতে ডিজিটাল নথিবদ্ধকরণ ও গণনাভিত্তিক বিশ্লেষণ নতুন দিশা দেখাচ্ছে। এপি-ওলমেকের মতো ক্ষেত্রে দীর্ঘ লেখার পুনরাবৃত্ত কাঠামো কাজে লাগলেও তার ফলাফল নিয়ে বিতর্ক আছে, যা দেখায় যে যন্ত্র বা পদ্ধতি যতই উন্নত হোক, যাচাইয়ের কাজ বিশেষজ্ঞদেরই করতে হয়। ভবিষ্যতে আরও নিদর্শন আবিষ্কৃত হলে এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা বাড়তে পারে।
শেষ কথা: অতীতের নীরবতা কি একদিন ভাঙবে?
প্রাচীন লিপির রহস্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রযুক্তিগত উন্নতি সত্ত্বেও ইতিহাসের অনেক প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। একসময় মিশরের হায়ারোগ্লিফিক লিপিও গবেষকদের কাছে দুর্বোধ্য ছিল। পরে রোসেটা স্টোনের মতো নিদর্শন সেই রহস্য উন্মোচনের পথ খুলে দেয়।
আজকের অমীমাংসিত লিপিগুলোর ক্ষেত্রেও নতুন আবিষ্কার, উন্নত প্রত্নতাত্ত্বিক পদ্ধতি, ভাষাবিজ্ঞান ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সব রহস্যের সমাধান যে দ্রুত পাওয়া যাবে, তার নিশ্চয়তা নেই। হয়তো কোনো একদিন নতুন কোনো পাথরের ফলক, কাঠের ট্যাবলেট অথবা মাটির ভাঙা টুকরা বহু শতাব্দীর অজানা ইতিহাসকে পাঠযোগ্য করে তুলবে। আবার কিছু লিখনপদ্ধতি চিরকালই আংশিকভাবে দুর্বোধ্য থেকে যেতে পারে।
তবু গবেষণা থেমে নেই। কারণ অতীতের মানুষ কী লিখেছিল, কী বিশ্বাস করত এবং কীভাবে তাদের সমাজ চলত, এসব জানার চেষ্টা কেবল পুরোনো অক্ষরের অর্থ উদ্ধার করা নয়। এটি মানুষের নিজের ইতিহাসকে আরও গভীরভাবে বোঝার এক নিরন্তর অনুসন্ধান।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় অমীমাংসিত লিপি কোনটি?
একটিকে নিশ্চিতভাবে সবচেয়ে রহস্যময় বলা কঠিন। তবে সিন্ধু লিপি, রোঙ্গোরোঙ্গো, লিনিয়ার এ, ফাইস্টোস ডিস্ক ও প্রোটো-এলামাইট দীর্ঘদিন ধরে গবেষকদের বিশেষ আগ্রহের বিষয়।
২. সিন্ধু সভ্যতার লিপি কি পুরোপুরি পাঠোদ্ধার হয়েছে?
না। এর চিহ্নের অর্থ, ভাষা ও লিখনপদ্ধতির প্রকৃতি সম্পর্কে এখনো সর্বজনস্বীকৃত পাঠোদ্ধার নেই। বিভিন্ন গবেষক নানা প্রস্তাব দিয়েছেন, কিন্তু কোনোটিই বৃহত্তর গবেষক সমাজে গৃহীত হয়নি।
৩. রোসেটা স্টোন কেন গুরুত্বপূর্ণ?
রোসেটা স্টোনে একই ঘোষণার পাঠ তিনটি লিখনরীতিতে ছিল। পরিচিত প্রাচীন গ্রিক ভাষার সঙ্গে তুলনা করে গবেষকেরা মিশরের হায়ারোগ্লিফিক লিপি পাঠোদ্ধার করতে সক্ষম হন।
৪. রোঙ্গোরোঙ্গো কি ইউরোপীয়দের আসার আগেই লেখা হয়েছিল?
২০২৪ সালের গবেষণায় একটি ফলকের কাঠ ১৫শ শতকের শেষ বা ১৬শ শতকের শুরুর বলে পাওয়া গেছে, যা লিপির প্রাক-ইউরোপীয় উৎপত্তির পক্ষে জোরালো ইঙ্গিত। তবে কাঠের বয়স আর লেখার সময় এক নয়, এবং কাঠটি ভেসে আসা হতে পারে; তাই বিষয়টি এখনো চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত নয়।
৫. লিনিয়ার এ ও লিনিয়ার বি কি একই লিপি?
না। লিনিয়ার বি প্রাচীন গ্রিক (মাইসেনীয় গ্রিক) প্রকাশ করত এবং ১৯৫২ সালে পাঠোদ্ধার হয়েছে। লিনিয়ার এ-র ভাষা অজানা এবং এর পাঠোদ্ধার হয়নি, যদিও দুই লিপির অনেক চিহ্নে মিল আছে।
৬. ইট্রুস্কান ভাষা কি একেবারেই অপাঠোদ্ধারকৃত?
না। ইট্রুস্কান বর্ণমালা এবং অনেক শিলালিপি পড়া যায়। তবে ভাষাটির বহু শব্দের অর্থ ও ব্যাকরণ সম্পর্কে জ্ঞান এখনো অসম্পূর্ণ।
৭. প্রোটো-এলামাইট ও লিনিয়ার এলামাইট কি একই?
না। প্রোটো-এলামাইট আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ৩১০০–২৯০০ সালের হিসাবনিকাশের লিপি। লিনিয়ার এলামাইট পরবর্তী সময়ের আলাদা লিপি, যার প্রায় সম্পূর্ণ পাঠোদ্ধারের প্রস্তাব ২০২২ সালে দেওয়া হয়েছে। দুটির সম্পর্ক নিশ্চিত নয়।
৮. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি অজানা ভাষা অনুবাদ করতে পারে?
এআই চিহ্নের পুনরাবৃত্তি বিশ্লেষণ, সম্ভাব্য কাঠামো শনাক্ত এবং গবেষণার অনুমান পরীক্ষা করতে পারে। কিন্তু পর্যাপ্ত নমুনা ও যাচাইযোগ্য প্রমাণ ছাড়া তার তৈরি অনুবাদকে নির্ভরযোগ্য বলা যায় না।
৯. প্রাচীন লিপির পাঠোদ্ধার হলে কী লাভ হবে?
এতে প্রাচীন সভ্যতার ভাষা, ধর্ম, রাজনীতি, বাণিজ্য, সামাজিক সম্পর্ক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া যেতে পারে। এমনকি পরিচিত ইতিহাসের কিছু ধারণাও সংশোধিত হতে পারে।
তথ্যসূত্র
- Ferrara, S. et al. (2024), "The invention of writing on Rapa Nui (Easter Island). New radiocarbon dates on the Rongorongo script", Scientific Reports 14, 2794:
- Archaeology Magazine ও World Archaeology: রোঙ্গোরোঙ্গো ফলকের রেডিওকার্বন কালনির্ণয় সংক্রান্ত প্রতিবেদন (২০২৪)
- Justeson, J. & Kaufman, T. (1993), "A Decipherment of Epi-Olmec Hieroglyphic Writing", Science; এবং Houston, S. & Coe, M. (১৯৯৮) এর সমালোচনা
- Parpola, A. ও Mahadevan, I. এর সিন্ধু লিপির সংকলন; Farmer, Sproat & Witzel (2004)
- Pernier, L. (1909), ফাইস্টোস ডিস্কের প্রথম প্রকাশনা; Nature (2008) প্রতিবেদন
- Rix, H. (1998), টিরসেনিয়ান ভাষা পরিবার; পিরগি স্বর্ণপাত সংক্রান্ত গবেষণা
- Dahl, J. L. ও Cuneiform Digital Library Initiative (CDLI), অক্সফোর্ড: প্রোটো-এলামাইট গবেষণা; Born, L. (2023), Simon Fraser University
- Desset, F. et al. (2022), লিনিয়ার এলামাইট পাঠোদ্ধারের প্রস্তাব