আসাদুল্লাহ দেহলভী: জেমসের গুরু হয়ে ওঠার নেপথ্যের গীতিকার

বাউল পানকৌড়ি
নব্বইয়ের দশকে যাঁরা জেমসের গান শুনে কৈশোর ও তারুণ্য পার করেছেন, তাঁদের কাছে নগরবাউল জেমস কেবল একজন সংগীতশিল্পীর নাম নয় বরং এক আবেগের নাম। তাঁর দরাজ কণ্ঠ, বিদ্রোহী পরিবেশনা, ব্লুজ রক ও সাইকেডেলিক রকের প্রভাবসমৃদ্ধ সুর বাংলা ব্যান্ডসংগীতে তৈরি করেছিল এক স্বতন্ত্র জগৎ। সেই জগতের গান আজও শ্রোতাদের মুগ্ধ করে। তবে জেমসের সংগীতজীবনের এমন একটি অধ্যায় রয়েছে, যার গভীরতা বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হবে তাঁর নব্বইয়ের দশকের অ্যালবাম ও গানগুলোর দিকে। প্রেম, বিরহ, নিঃসঙ্গতা, জীবনবোধ, বাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও কাব্যিক কল্পনায় সমৃদ্ধ সেই গানগুলোর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন গীতিকার আসাদুল্লাহ দেহলভী।

১৯৯৬ সালের নগর বাউল এবং ১৯৯৭ সালের দুঃখিনী দুঃখ করো না, জেমসের সংগীতজীবনের এই দুটি উল্লেখযোগ্য অ্যালবামের মোট ২৪টি গানের মধ্যে ১৬টির গীতিকার ছিলেন দেহলভী। তাঁর ব্যতিক্রমী শব্দচয়ন, গভীর জীবনবোধ ও অভিনব কল্পনা জেমসের গানের স্বাতন্ত্র্য নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ‘বাংলার লাঠিয়াল’, ‘যে পথে পথিক নেই’, ‘যাত্রা’, ‘নাগ নাগিনীর খেলা’, ‘দুঃখিনী দুঃখ করো না’ ও ‘জিকির’-এর মতো গানে ফুটে উঠেছে তাঁর লেখনীর বৈচিত্র্য। অথচ জেমসের গানের জনপ্রিয়তার আড়ালে থাকা এই প্রতিভাবান গীতিকার আজকের অনেক শ্রোতার কাছেই প্রায় অপরিচিত।

আসাদুল্লাহ দেহলভী কে? জেমসের সঙ্গে তাঁর সংগীতযাত্রা কীভাবে শুরু হয়েছিল? কীভাবে তাঁর লেখা গানের কথা নব্বইয়ের দশকের শ্রোতাদের আবেগ, প্রেম, বিরহ ও জীবনবোধের অংশ হয়ে উঠেছিল? আর জেমসের জন্য একের পর এক স্মরণীয় গান লেখা এই গীতিকারের সৃষ্টির জগৎ কেমন ছিল? নগর বাউল ও দুঃখিনী দুঃখ করো না অ্যালবামের স্মৃতি এবং জেমসের পুরোনো গানের সূত্র ধরে এই লেখায় ফিরে দেখা হবে বাংলা ব্যান্ডসংগীতের কিংবদন্তি এক গীতিকারের গল্প।

আসাদুল্লাহ দেহলভীর ছবি ও জেমসের গানের অ্যালবাম কভার

আসাদুল্লাহ দেহলভী: পরিচিতি

আসাদুল্লাহ দেহলভী একজন কবি ও গীতিকার। স্কুলজীবন কেটেছে রংপুর জিলা স্কুলে। এরপর রাজশাহী সরকারি কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে পড়ে এইচএসসি শেষ করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, সেখানে অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং ছিলেন এফ রহমান হলের ছাত্র। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ ওকে ইউনিয়নের সভাপতি। নব্বইয়ের দশকে জেমস ও ফিলিংসের এলবামগুলোতে তাঁর কলমে যে গানগুলো এসেছিল, সেগুলোই তাঁকে বাংলা ব্যান্ডসংগীতের শ্রোতাদের কাছে স্মরণীয় করে রেখেছে। অ্যালবামের ক্রেডিটে তাঁর নাম থাকত শুধু "দেহলভী"। 

জেমস ও আসাদুল্লাহ দেহলভী: এক ব্যতিক্রমী গীতিকাব্যের গল্প

একজন শিল্পী তাঁর কণ্ঠ, সুর ও পরিবেশনা দিয়ে গানকে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দেন। কিন্তু সেই গানের কথায় যখন জীবনের অভিজ্ঞতা, প্রেম, বিরহ, বিদ্রোহ, আধ্যাত্মিকতা ও সমাজের নানা বাস্তবতা একাকার হয়ে যায়, তখন তার পেছনে থাকা গীতিকারের অবদানও আলাদা করে মনে রাখার দাবি রাখে। জেমসের নব্বইয়ের দশকের গানগুলোর দিকে ফিরে তাকালে আসাদুল্লাহ দেহলভীর নামটি বিশেষভাবে সামনে আসে। তাঁর লেখা গানে কখনো পাওয়া যায় পথের মানুষের জীবন, কখনো প্রেম ও বিচ্ছেদের ব্যক্তিগত অনুভূতি, আবার কখনো সমাজ, ধর্ম ও মানুষের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন। এসব গীতিকথা জেমসের কণ্ঠ ও ব্যান্ডের সংগীতায়োজনে পেয়েছিল স্বতন্ত্র প্রকাশ।

আসাদুল্লাহ দেহলভী:জেমসের অ্যালবাম তালিকা

জেমসের জনপ্রিয়তার কথা বলতে গিয়ে আমরা সাধারণত তাঁর দরাজ কণ্ঠ, মঞ্চে উপস্থিতি এবং অসংখ্য শ্রোতাপ্রিয় গানের কথা বলি। কিন্তু সেই গানের কথাগুলো যাঁরা লিখেছেন, তাঁদের প্রত্যেকের অবদান সমানভাবে আলোচনায় আসে না। আসাদুল্লাহ দেহলভী তাঁদেরই একজন- যাঁর লেখা গান শ্রোতার মনে জায়গা করে নিলেও গীতিকার হিসেবে তাঁর পরিচিতি তুলনামূলকভাবে আড়ালে রয়ে গেছে।
ক্রম অ্যালবাম অ্যালবামের ধরন সাল লেখা গানের সংখ্যা
১ স্ক্রু ড্রাইভার ব্যান্ড-মিক্সড ১৯৯৬ ৩টি
২ নগর বাউল ব্যান্ড-ফিলিংস ১৯৯৬ ৭টি
৩ ক্যাপসুল ৫০০ ব্যান্ড-মিক্সড ১৯৯৬ ১টি
৪ দুঃখিনী দুঃখ করো না সোলো-জেমস ১৯৯৭ ৯টি
৫ মিক্সড অ্যালবাম মিক্সড অ্যালবাম-৩টি ১৯৯৭ ৫টি

📱 সম্পূর্ণ টেবিলটি দেখতে ডানে-বামে স্ক্রল করুন।

টেবিল নোট:গীতিকার দেহলভীর লেখা জেমসের মোট গান ২৫টি

‘স্ক্রু ড্রাইভার’: জেমস ও দেহলভীর পথচলার শুরু

দেহলভীর সঙ্গে জেমসের পথচলা শুরু হয় ১৯৯৬ সালে, এলআরবি ও ফিলিংসের অংশগ্রহণে প্রকাশিত ব্যান্ড মিক্সড অ্যালবাম ‘স্ক্রু ড্রাইভার’-এর মাধ্যমে। এই অ্যালবামে দেহলভীর লেখা তিনটি গান ছিল। 
  • অ্যালবাম:স্ক্রু ড্রাইভার
    • বাংলা লাঠিয়াল
    • যে পথে পথিক নেই
    • বেদুঈন আমি এক

বাংলার লাঠিয়াল- দেহলভী

গানের ভাষা, বিষয় ও উপস্থাপনা- সবকিছুতেই ছিল নতুনত্ব।গ্রামীণ সমাজে জমি দখল, প্রভাব বিস্তার কিংবা বিভিন্ন বিরোধে লাঠিয়ালদের ভূমিকা ছিল। সেই লাঠিয়ালদের নিয়ে যে রক গান হতে পারে, তা তখন অনেকের কল্পনারও বাইরে ছিল।  ২০০৩ সাল পর্যন্তও জেমসকে কনসার্টে এই গান গাইতে দেখেছি। নব্বইয়ের দশকে জেমস প্রায় প্রতিটি বড় কনসার্টেই এটি ছিল দর্শক মাতানো গানগুলোর একটি।

“দেখো বুকের ভেতর চিতা হুংকার দিয়ে ওঠে
এ জমি আমার, বলে আজগর মাতবর
কতবার ছেড়েছি, ছাড়ব না এবার
বাংলার লাঠিয়াল বাংলার লাঠিয়াল

যে পথে পথিক নেই- দেহলভী

‘স্ক্রু ড্রাইভার’ অ্যালবামে দেহলভীর লেখা আরেকটি গান জেমসের অন্যতম সেরা গান বলে আমার মনে হয়। গানটির নাম ‘যে পথে পথিক নেই’। কবি কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ এর কবিতার কাছাকাছি অনেকটা।  নিঃসঙ্গতা ও কল্পনার এমন অভিনব প্রকাশ বাংলা গানের কথায় তখন ছিল বিরল অভিজ্ঞতা।

“চুপচাপ নিশ্চুপ চারিধার বসে আছি এই আমি,
এক গ্লাস জোছনা আর এক গ্লাস অন্ধকার হাতে,
যে পথে পথিক নেই  বসে আছি সেই পথে।”

বেদুইন আমি এক- দেহলভী

এই অ্যালবামে দেহলভীর লেখা প্রিয় গান ছিল ‘বেদুইন আমি এক মরুপথের যাত্রী’। গানটির কথায়ও ছিল পরিচিত গণ্ডির বাইরে গিয়ে ভাবার এক অনন্য ক্ষমতা। বেদুঈন আমি এক আলেয়ার পিছে চায়, মরিচিকায় ফিরে তাকায় আর কেটে যায় রাত্রি আমার। সবি মরিচিকা।

আলোর সঙ্গমে- ক্লান্ত বিকেলে
মেঘহীন আকাশে- জলন্ত সূর্যে
দীর্ঘ চুম্বনে- বালুতে চিত্রানো গানে
মিষ্টি-লু হাওয়া বয় -যেন একমুঠো শান্তি..।

ক্যাপসুল ৫০০ এমজি: হে পাগলী

এল আর বি ও ফিলিংসের আরেক বিখ্যাত মিক্সড অ্যালবাম ক্যাপসুল ৫০০ এমজি-তে দেহলভীর লেখা জেমসের একমাত্র গান হে পাগলী। প্রেমে গভীরভাবে আঘাত পাওয়া, সব বিশ্বাস হারানো এক যুবকের গান।
  • অ্যালবাম: ক্যাপসুল ৫০০ এমজি
    • হে পাগলী
প্রেমে প্রতারিত হওয়ার অভিজ্ঞতা নতুন কিছু নয়। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতাকে এমন সরাসরি, তীব্র অথচ সংগীতময় ভাষায় প্রকাশ করার মধ্যে ছিল দেহলভীর স্বাতন্ত্র্য। জেমসের কণ্ঠ ও সুর সেই অভিমানকে আরও তীব্র করে তুলেছিল।

“হে পাগলী, তুমিও কি মিথ্যেবাদী?
কথা দিয়ে তুমিও কি কথা রাখোনি?
তোমাকে সত্য ভেবে ভুলে ছিলাম।”

আসাদুল্লাহ দেহলভীর লেখা গানের অ্যালবাম-স্ক্রু ড্রাইভার ও ক্যাপসুল এর কাভার

‘নগর বাউল’: যে অ্যালবাম বদলে দিয়েছিল বাংলা রকের শ্রোতাদের অভিজ্ঞতা

ফিলিংসের তৃতীয় অ্যালবাম নগর বাউল বাংলাদেশের সঙ্গীতের ইতিহাসে একটা বাঁক। ১২টি গানের সাতটিই দেহলভীর লেখা গান।
  • অ্যালবাম: নগর বাউল
    • হারাগাছের নূরজাহান
    • হোমায়রার নি:শ্বাস
    • একটা প্রেম দাও
    • নাগ-নাগিনীর খেলা
    • যাত্রা পালা
    • নব জীবনের কথা বলছি
    • তবে বন্ধু নৌকা ভেড়াও

যাত্রা পালা আর  নাগ নাগিনীর খেলা

নব্বইয়ের দশকে জেমসের কনসার্ট মানেই যাত্রা। ২০০৩ সাল পর্যন্ত এই গানের অন্তত একটা অংশ ছাড়া তাঁর কোনো শো হয়েছে বলে মনে পড়ে না। গ্রামবাংলার যাত্রাপালার জৌলুশ, দর্শকের হই-হুল্লোড়, নাচ আর গান, সবই আছে এখানে। কিন্তু দেহলভী শুধু উৎসবের ছবি আঁকেননি। রাত যত গভীর হয়, আসরের সুর কীভাবে বদলে যায়, আধুনিক যাত্রায় কীভাবে নোংরামি ঢুকে পড়েছে, সেটাও এক-দুটি লাইনেই ইঙ্গিত করে গেছেন। লোকসংস্কৃতির একটা পরিচিত অনুষঙ্গকে রকগানের বিষয় বানানো এবং তার ভেতরে সমালোচনার ঝাঁঝ মিশিয়ে দেওয়া, এখানেই তাঁর সৃজনশীলতা। কনসার্টে সবচেয়ে বেশি নাচানাচি হতো এই গানেই।-- হৈ হৈ কান্ড রৈ রৈ ব্যাপার, নাচে গানে মন মাতবে সবার। আহা!

বেদে সম্প্রদায়ের জীবন এই গানের আদ্যোপান্ত। সাপের মেলা, বীণের সুর, যাযাবর জিপসি জীবনের চেনা ছবি। কথার সাথে মিশেছে জেমসের উন্মাতাল সুর, ফলে ক্যাসেট প্লেয়ারে শোনার সময় হোক বা কনসার্টের ভিড়ে, স্থির থাকা প্রায় অসম্ভব ছিল। গ্রামের মেলায় যে বেদের বহর আমরা দেখেছি বা গল্পে শুনেছি, গানটা তাকেই সরাসরি মঞ্চে তুলে এনেছিল।-- নাগ নাগীনির খেলা সর্পরাজের খেলা,বিষধর তোলে ফনা ছোবলে বিষের জ্বালা।

তবে বন্ধু নৌকা ভেড়াও

একেবারে উল্টো মেজাজের গান। এখানে কোনো উন্মাদনা নেই, আছে এক আশ্রয়ের প্রতিশ্রুতি। পথভোলা কেউ থাকলে নৌকা ভেড়াতে বলা, আর বন্ধু হয়ে সবার দুঃখ মুছে দেওয়ার কথা দেওয়া। উদাস সুরের সাথে মিলে গানটা জেমসকে অনেক শ্রোতার কাছে শুধু গায়ক হিসেবে রাখেনি, করে তুলেছিল গানের বন্ধু। মনে হতো, আমাদের মন খারাপের কথা শোনার মতো একজন আছেন।--তবে বন্ধু নৌকা ভেড়াও মুছিয়ে দেবো দুঃখ জ্বালা।

দুই নারী: নূরজাহান ও হোমায়রা- 

দেহলভীর গানে তিনজন নারী চরিত্র আছে, তার প্রথম দুজন নগর বাউল অ্যালবামে। হোমায়রার নিঃশ্বাস অন্য জগতের, শহুরে এক নারীর প্রতিমূর্তি। যার জন্য ওড়াবে ব্যথার ঘুড়ি অন্য আকাশে।

বহুদিন ধরে আমি খুঁজছি যারে
লালন মনটারে পালন করে
দেখা হলো তার সাথে
সব দিতে চাইলাম, উজাড় করে
হোমায়রার নিঃশ্বাস চুরি হয়ে গেছে

হারাগাছের নূরজাহান নদীর জলে স্নান করা সেই মেয়েটি। উদাসী খেয়ালী-এলোকেশে সারাগাও ছোটাছুটি করে দুনিয়া দেখে রুপ নয়ন ভরে।

পলি জমা তার পাললিক মোহ
টোল পড়া গাল বিরু দু নয়ন
হারাগাছের নুরজাহান
গাঙ্গের জলে করে স্নান..

নবজীবনের কথা বলছি ও একটা প্রেম দাও

এই এলবামে দেহলভীর বাকি দুটি গান নবজীবনের কথা বলছি আর প্রেম দাও। প্রথমটি আমার কাছে অনুপ্রেরণার এক বিরল গান। অসম্ভবের যুগে জন্ম নিয়েও নতুন জীবনের কথা বলার সেই জেদে জেমসের ভেতরের সুপ্ত বিদ্রোহী সত্তাকে খুঁজে পাওয়া যায়, আর দেহলভীর কলম সেই সত্তাকে ভাষা দিয়েছিল। আর একটা প্রেম দাও নীল আকাশের মত বিশাল।

আসাদুল্লাহ দেহলভীর লেখা গান জেমসের ব্যান্ড অ্যালবাম নগর বাউল কাভার

‘দুঃখিনী দুঃখ করো না’: দেহলভীর সৃষ্টির স্বর্ণযুগ

১৯৯৭ সালে প্রকাশিত হলো জেমসের একক অ্যালবাম ‘দুঃখিনী দুঃখ করো না’। এই অ্যালবাম জেমসকে এনে দিয়েছিল বিপুল জনপ্রিয়তা। ১২টি গানের মধ্যে নয়টির গীতিকার ছিলেন আসাদুল্লাহ দেহলভী। এই অ্যালবামের গানগুলোতেই দেহলভীর বহুমাত্রিক প্রতিভার অসাধারণ প্রকাশ ঘটেছিল। এখানে আছে বাংলার লোকজ সংস্কৃতি, নারীর মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, আধ্যাত্মিকতা, ধর্মীয় সহনশীলতা, প্রেম, বিরহ, নিঃসঙ্গতা এবং কল্পনার এক বিস্তৃত জগৎ।
  • অ্যালবাম: দুঃখিনী দুঃখ করো না
    • দুঃখিনী দুঃখ করো না
    • জিকির
    • লুটপাট
    • সুস্মিতার সবুজ ওড়না
    • ঈশ্বর আছে
    • সুলতানা বিবিয়ানা
    • তুমি যদি নদী হও
    • যার যার ধর্ম
    • যদি কখনো ভুল

দুঃখিনী দুঃখ করো না

অ্যালবাম টাইটেল ট্র্যাক। দেহলভীর কথায় জেমস সব দুঃখিনী নারীকে জেগে উঠতে, সমাজের সব বাধা পেরিয়ে পথে নামতে বলেছিলেন। নারীদের জন্য সাহসী আহ্বানও ছিল এতে। ঠিক বব মার্লের No Woman, No Cry- না, নারী কেদঁনা আর আমাদের দেহলভীর দু:খিনী দু:খ করো না- চেয়ে দেখ রংধনু চেয়ে দেখ সাত রং।

জিকির

অ্যালবামের জিকির গানটা ছিল অন্য রকম ভাল লাগার। কেয়ামতের দৃশ্য, এক অদ্ভুত আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি করা গান। 
“প্রলয়ের শিঙ্গায় ফুঁ দিয়ে ওঠে ইস্রাফিলে,
চারদিক থেকে কলবে কলবে রোল পড়ে যায়,
তলে তলে, তল্লাটে তল্লাটে জিকির ওঠে।”

ঈশ্বর আছে

মানুষের শ্রম, মায়ের সংগ্রাম, নিঃস্ব মানুষের বেঁচে থাকা কিংবা ঘরছাড়া পথিকের অনিশ্চিত যাত্রার মধ্যে ঈশ্বরের উপস্থিতি খুঁজে পাওয়ার এই ভাবনা গানটিকে এক অনন্য মানবিক মাত্রা দিয়েছে।

খেটে খাওয়া মজুরের ঘামে ভেজা ফসলে ঈশ্বর আছে,
ঈশ্বর আছে দুঃখিনী মায়ের একমুঠো সম্বলে,
সবহারা মানুষের বুকের মাঝে ঈশ্বর আছে,
ঘরছাড়া পথিকের অচেনা পথে ঈশ্বর আছে।”

যার যার ধর্ম

কথাগুলো খুব সহজ এবং সরল। কিন্তু এর সত্যতা ও গুরুত্ব আজও অমলিন। মানুষ যদি অন্যের বিশ্বাস, ধর্ম ও পরিচয়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে পারত, তাহলে পৃথিবীর অনেক জটিলতা হয়তো এতটা ভয়াবহ হয়ে উঠত না। সময়ের পরিবর্তনে গানটির বক্তব্য আরও বেশি প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়। দেহলভী সহজ ভাষায় এমন একটি কথা বলেছিলেন, যা আজও মানুষের মনে রাখা প্রয়োজন।

“আমাদের ধর্ম আমাদের কাছে,
তোমাদের ধর্ম তোমাদের কাছে,
যার যার ধর্ম তার তার কাছে,
যার যার ভাষা তার তার দেশ।”

লুটপাট

ভালোবাসাকে ডাকাতির সঙ্গে তুলনা করার এই অভিনব কল্পনা প্রেমের পরিচিত ভাষাকে একেবারে অন্য জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল। নব্বইয়ের দশকের কত শহুরে তরুণ যে এমন কথা মনে মনে কিংবা প্রিয় মানুষটিকে বলেছিল, তা কল্পনা করা কঠিন নয়। --এই চোখে তাকিয়ো না,লুটপাট হয়ে যাবে।

তুমি যদি নদী হও

খুব প্রিয় একটি গান, যেখানে নদী ও চর, গতি ও অনন্ত পথের উপমায় প্রেমের কথা বলা হয়েছে। সম্পর্কের গভীরতা, আকাঙ্ক্ষা এবং ভালোবাসার মানুষকে ঘিরে নিজের অস্তিত্ব কল্পনা করার এমন সুন্দর প্রকাশ দেহলভীর লেখাকে আলাদা করে চিনিয়ে দেয়।

আমার চাতক চোখে
তুমি হবে দূরের আকাশ।
তুমি যদি নদী হও
আমি হব জেগে থাকা চর

যদি কখনো ভুল

মুসাফির মনের ঘর ছাড়ার যে লুকিয়ে থাকা সাধ সবার থাকে, তারই উদাসী প্রকাশ। ঘর ছেড়ে দূরে চলে যাওয়ার ইচ্ছা, অজানার প্রতি আকর্ষণ কিংবা পরিচিত জীবনের বাইরে অন্য কোনো পথে হারিয়ে যাওয়ার গোপন বাসনা- গানটির কথায় যেন এসব অনুভূতিরই প্রকাশ ঘটেছে।

“মুসাফির আমি খুঁজে খুঁজে ভুল পথে,
যদি হারিয়ে যাই একদিন,
হয়তো কখনো আর ফেরা হবে না,
অভিমানী পথ চেয়ে দিন গুনো না।”

সুস্মিতার সবুজ ওড়না

দেহলভীর লেখা হোমায়রা ও নূরজাহানের পর তৃতীয় নারী হচ্ছে সুস্মিতা। সুস্মিতার সবুজ ওড়নার সাথে কথাগুলো আমাদেরও কল্পনায় ভ্রমণ করায়। গীতিকার যখন দেহলভী আর সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী যখন জেমস, তখন সেই গানের শক্তি কতটা গভীর হতে পারে, ‘সুস্মিতা’ তার দারুণ উদাহরণ। এমন গান শুনতে শুনতে শ্রোতাও যেন সুস্মিতার সবুজ ওড়নার সঙ্গে অজানা কোনো জগতে ভ্রমণ করে আসে।

“সুস্মিতার সবুজ ওড়না উড়ে যায়,
ছুঁয়ে যায় নিঝুম মফস্বলের সবুজ মাঠ,
ছুঁয়ে যায় দুঃখিনী মায়ের দুঃখিনী ললাট,
দূর আঁধারে, দূর জঙ্গলে, ওই পাহাড়ে, ওই সাগরে,

আসাদুল্লাহ দেহলভীর লেখা গান জেমসের একক অ্যালবাম দু:খীনি দু:খ করো না কাভার

দেহলভীর লেখা ব্যান্ড মিক্সডে জেমসের গান

মাত্র তিনটি ব্যান্ড মিক্সড অ্যালবামে দেহলভী জেমসের জন্য গান লিখেছিলেন।  
  • গায়ের খবর
  • সোনালী বিকেলে
  • ধুন

গায়ের খবর

৯৯৭ সালের মিক্সড এলবাম গায়ের খবর-এ জেমসের জন্য দেহলভী লিখলেন দুটি গান: টাইটেল ট্র্যাক গায়ের খবর আর অধিকার নেইে আমার। গায়ের খবর ছিল বাংলার সংস্কৃতি ও গ্রামীণ জীবন নিয়ে দেহলভীর লেখা গান। গানটির মধ্যে রয়েছে গ্রাম থেকে শহরে পৌঁছে যাওয়া এক সংবাদ, এক স্মৃতি, এক আকুলতা। 

“যাও পাখি বলো তারে
সে যেন ভোলে না মোরে,
গায়ের খবর নগরে বলি,
পথের ধারে উড়ছে ধুলি।”

অধিকার নেই সাধারণ শ্রোতার কাছে বেশি পরিচিত। যাকে চাওয়া যায় তাকে পাওয়ার আশা, দাবি, এমনকি বলার ভাষাটুকুও না থাকার এক অসহায় স্বীকারোক্তি এটা, জেমসের সুরে যা আরও বেশি টানে।

“আজ কোন আশা নেই আমার,
আর কোন দাবি নেই,
আর কোন আশা নেই,
ভাষা নেই তোমাকে পাবার।”

‘সোনালী বিকেল’: জেগে আছি আমি একা

'সোনালী বিকেল' ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত মিক্সড অ্যালবাম, যার সুর ও সংগীত পরিচালনা করেছিলেন জেমস। যা জেমসের একমাত্র মিক্সড অ্যালবামে সুর ও সংগীত প্রকাশিত। এই অ্যালবামে তোমাকে বাঁশির মত বাজাই গানটি জেমস ও মিতালী মুখার্জী ডুয়েট ছিল। আরকেটি গান ছিল রইবোনা রে। আর জেগে আছি আমি একা গানটির গীতিকার ছিলেন দেহলভী।  

জেগে আছি একা আমি জেগে আছে রাত্রি 
যে আসে ফিরে জায় রেখে যায় সৃতি
শেষ রাতে খেয়া ঘাটে আমি
 শেষ রাতের শেষ যাত্রী 

ধুন’: জেমসের জন্য দেহলভীর শেষ দুটি গান

১৯৯৭ সালের ছয় ব্যান্ডের কিংবদন্তি মিক্সড এলবাম ধুন-এ ফিলিংস বা জেমসের জন্য দেহলভীর শেষ দুটি গান: চিরহরিৎ আর একের ভেতর তিন।

চিরহরিৎ শুনলে মনে হয়, দেহলভী যেন প্রমাণ করে দিলেন গানের কথাও কবিতা হতে পারে। অরণ্যের গভীরতা নেমে আসে, ঘুম ভাঙে চোখের সবুজ রাতে, দৃষ্টির শেষ পর্যন্ত চিরহরিৎ বন, প্রবাসী গাছের ডালে আলোকলতা, আর সবুজ কার্পেট জুড়ে পথ হেঁটে যাওয়া। প্রকৃতি, কল্পনা আর মানুষের ভেতরের জগৎকে এভাবে এক সুতোয় গাঁথার ক্ষমতা সবার থাকে না। 

সহসাই নেমে পড়ে অরণ্যের গভীরতা,
ঘুম টুটে যায় চোখের সবুজ রাতে,
যতদূর দৃষ্টি যায় চিরহরিৎ,

একের ভেতর তিন একটা সংখ্যা নিয়ে খেলা। কৈশোর-যৌবন-বার্ধক্য, সচেতন-অচেতন-উদাসীন, অতীত-ভবিষ্যৎ-বর্তমান, তরল-জলীয়-কঠিন। "একের ভেতর তিন" কতভাবে হতে পারে, গানটা সেটাই দেখিয়ে দেয়, আর শেষে শ্রোতাকে বলে হিসেবটা দেখে নিতে, বুঝে নিতে, চিনে নিতে। শব্দের খেলা, ভাবনার বৈচিত্র্য আর দারুণ রক সুর মিলে এটি স্বতন্ত্র এক গান। 

“কৈশোর, যৌবন, বৃদ্ধ- এ তিন,
সচেতন, অচেতন, উদাসীন,
অতীত, ভবিষ্যৎ, বর্তমান,
তরল, জলীয় ও কঠিন।”

আসাদুল্লাহ দেহলভীর লেখা গান জেমসের মিক্সড অ্যালবাম কাভার

গানের আড়ালে থাকা স্রষ্টাকেও মনে রাখুক নতুন প্রজন্ম

জেমসের নব্বইয়ের দশকের গানগুলো আজও বহু শ্রোতার কাছে নস্টালজিয়া, আবেগ আর ফেলে আসা দিনের স্মৃতির নাম। তাঁর কণ্ঠ, গিটারের মূর্ছনা ও মঞ্চ মাতানো পরিবেশনার পাশাপাশি এসব গানের কথাও শ্রোতাদের মনে গভীর ছাপ রেখে গেছে। আর সেই গানের কথার সঙ্গে জড়িয়ে আছেন গীতিকার আসাদুল্লাহ দেহলভী, যাঁর নাম অ্যালবামের ক্রেডিটে অনেক সময় শুধু ‘দেহলভী’ হিসেবেই লেখা থাকত। একটি গান জনপ্রিয় হয়ে ওঠার পর শিল্পীর পরিচিতি যতটা ছড়িয়ে পড়ে, গীতিকারের নাম ততটা আলোচনায় আসে না।

অথচ গানের ভাষা, অনুভূতি ও ভাবনার জগৎ নির্মাণে গীতিকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই জেমসের গান নিয়ে আলোচনা করতে গেলে তাঁর কণ্ঠ ও সংগীতের পাশাপাশি দেহলভীর মতো গীতিকারদের অবদানও স্মরণ করা প্রয়োজন। পুরোনো গান ফিরে শোনার আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন গানের সুরের সঙ্গে তার স্রষ্টার পরিচয়ও আমাদের মনে থাকে। বাংলা ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হলে জনপ্রিয় শিল্পীদের পাশাপাশি আড়ালে থাকা গীতিকারদেরও সামনে আনতে হবে। কারণ, একটি গান শুধু শিল্পীর কণ্ঠে বেঁচে থাকে না- তার পেছনে থাকা শব্দের কারিগরের সৃষ্টিতেও বেঁচে থাকে।

শেষ কথা:গানের আড়ালে থাকা স্রষ্টাকে জানার আরও বাকি

জেমসের সঙ্গে কাজের বাইরেও আসাদুল্লাহ দেহলভীর গীতিকারজীবনের বিস্তৃতি রয়েছে। বিভিন্ন ব্যান্ড ও সংগীতশিল্পীর সঙ্গে কাজ করার মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর সৃষ্টিশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। এই লেখায় মূলত জেমসের সঙ্গে তাঁর সংগীত-সহযোগিতা এবং নব্বইয়ের দশকের স্মরণীয় গানগুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তবে দেহলভীর অন্যান্য ব্যান্ড ও শিল্পীর জন্য লেখা গান, তাঁদের সঙ্গে তাঁর কাজের অভিজ্ঞতা এবং সেসব সৃষ্টির গল্পও আলাদা করে আলোচনার দাবি রাখে।

সেই গল্পগুলোও একদিন উঠে আসবে বাউল পানকৌড়ির পাতায়। ভবিষ্যতে তাঁর অন্যান্য গান, বিভিন্ন ব্যান্ড ও সংগীতশিল্পীর সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা এবং সংগীতজগতের নানা অধ্যায় নিয়ে বিস্তারিত লেখার ইচ্ছা রইল। কারণ, একজন গীতিকারকে সম্পূর্ণভাবে জানতে হলে তাঁর জনপ্রিয় গানগুলোর পাশাপাশি তাঁর সৃষ্টির বিস্তৃত জগৎ সম্পর্কেও জানা প্রয়োজন।

3/related/default