এক নজরে
- শেষ চন্দ্র-অবতরণ: অ্যাপোলো ১৭, ডিসেম্বর ১৯৭২
- চাঁদে হেঁটেছেন: মোট ১২ জন নভোচারী, ৬টি অভিযানে
- ২০২৬ সালের অর্জন: আর্টেমিস II (১ থেকে ১০ এপ্রিল) চাঁদের চারপাশ ঘুরে ফিরেছে, অবতরণ করেনি
- আর্টেমিস III: ২০২৭ সালের শেষ দিকে, পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে প্রযুক্তি পরীক্ষা
- আর্টেমিস IV: ২০২৮ সালে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অবতরণের লক্ষ্য (পরিকল্পনা, নিশ্চিত তারিখ নয়)
চাঁদে মানুষের প্রথম পদচিহ্ন: অ্যাপোলো যুগের ইতিহাস
কেন বন্ধ হয়ে গেল চাঁদে যাওয়ার অভিযান?
১. বিপুল খরচ
অ্যাপোলো কর্মসূচি ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সাধারণভাবে বলা হয়, পুরো কর্মসূচিতে খরচ হয়েছিল আনুমানিক ২৫ থেকে ২৬ বিলিয়ন ডলার, যা আজকের মূল্যে কয়েক শ বিলিয়ন ডলারের সমান। কর্মসূচির সর্বোচ্চ সময়ে নাসার বাজেট ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল বাজেটের প্রায় ৪ শতাংশের বেশি। বিশাল রকেট, মহাকাশযান, উৎক্ষেপণকেন্দ্র আর কয়েক লাখ মানুষের কর্মযজ্ঞ সামলাতে এত অর্থ লাগত।
২. রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের পরিবর্তন
১৯৬০-এর দশকে চাঁদে মানুষ পাঠানো ছিল স্নায়ুযুদ্ধে সক্ষমতা প্রমাণের উপায়। অ্যাপোলো ১১-এর সাফল্যের পর সেই রাজনৈতিক লক্ষ্য অনেকটাই পূরণ হয়ে যায়। তখন যুক্তরাষ্ট্রের সামনে ভিয়েতনাম যুদ্ধসহ আরও ব্যয়বহুল জাতীয় অগ্রাধিকার ছিল, ফলে মহাকাশ বাজেটে কাটছাঁট শুরু হয়।
৩. বাতিল হওয়া অভিযান
নাসা মূলত অ্যাপোলো ২০ পর্যন্ত পরিকল্পনা করেছিল। ১৯৭০ সালের জানুয়ারিতে অ্যাপোলো ২০ বাতিল হয়, আর একই বছরের সেপ্টেম্বরে বাতিল হয় অ্যাপোলো ১৮ ও ১৯। ফলে অ্যাপোলো ১৭-ই হয়ে যায় শেষ অভিযান। স্যাটার্ন ফাইভ রকেটের শেষ উৎক্ষেপণ হয় ১৯৭৩ সালে, স্কাইল্যাব মহাকাশ স্টেশন পাঠানোর সময়।
৪. ঝুঁকি
চাঁদে যাওয়া প্রতিটি অভিযানেই নভোচারীদের জীবনের ঝুঁকি ছিল। অ্যাপোলো ১৩-এর ঘটনা সেই ঝুঁকির কথা মনে করিয়ে দেয়। একবার ঐতিহাসিক লক্ষ্য অর্জিত হওয়ার পর একই ধরনের ঝুঁকি নেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অর্থাৎ প্রযুক্তি হারিয়ে যায়নি, মানুষ অক্ষমও হয়ে পড়েনি। অর্থনৈতিক বাস্তবতা, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, বৈজ্ঞানিক অগ্রাধিকারের বদল এবং ঝুঁকি বিবেচনা, সব মিলিয়ে মানববাহী চন্দ্রাভিযান থেমে যায়।
আধুনিক প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও চাঁদে ফেরা কঠিন কেন?
আজকের কম্পিউটার অ্যাপোলো যুগের তুলনায় বহু গুণ শক্তিশালী। আমাদের হাতের স্মার্টফোনের ক্ষমতাও অ্যাপোলোর গাইডেন্স কম্পিউটারের চেয়ে অনেক বেশি। তবু মানুষকে চাঁদে পাঠানো সহজ কাজ নয়, কারণ শুধু মহাকাশযানকে চাঁদের কাছে পৌঁছে দিলেই অভিযান সফল হয় না। নভোচারীদের জীবন রক্ষা, কক্ষপথে সঠিক চলাচল, অবতরণ, চাঁদের মাটিতে কাজ, আবার উড্ডয়ন এবং নিরাপদে পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তন, প্রতিটি ধাপ আলাদাভাবে সফল হতে হয়।
১. বিশাল রকেট ও জটিল মহাকাশযান
পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ অতিক্রম করে চাঁদে যেতে প্রচুর শক্তি লাগে। অ্যাপোলো যুগের স্যাটার্ন ফাইভ ছিল মানুষের তৈরি সবচেয়ে শক্তিশালী রকেটগুলোর একটি। কিন্তু সেই রকেটের উৎপাদনব্যবস্থা বহু আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। নকশা ও নথি থাকলেও একই কারখানা, সরবরাহব্যবস্থা, যন্ত্রাংশ এবং দক্ষ কর্মীবাহিনী অক্ষত নেই। তাই নাসাকে নতুন করে বানাতে হয়েছে রকেট, মহাকাশযান ও উৎপাদনব্যবস্থা। বর্তমান আর্টেমিস কর্মসূচির জন্য তৈরি হয়েছে স্পেস লঞ্চ সিস্টেম (এসএলএস) রকেট এবং ওরিয়ন নভোযান। অতীতের সাফল্য থেকে শেখা যায়, কিন্তু পুরোনো অভিযানকে হুবহু আবার চালু করা যায় না।
২. চাঁদে অবতরণ ও আবার উড্ডয়ন
চাঁদে পৃথিবীর মতো ঘন বায়ুমণ্ডল নেই, তাই প্যারাসুটে ধীরে নামা সম্ভব নয়। অবতরণযানকে রকেট ইঞ্জিন চালিয়ে গতি নিয়ন্ত্রণ করে নামতে হয়। পাথর, গর্ত, ধুলা আর অসমতল ভূখণ্ডের কারণে অবতরণস্থল বাছাইও কঠিন। এরপর নভোচারীদের আবার চাঁদ থেকে উড্ডয়ন করে কক্ষপথের যানের সঙ্গে মিলিত হতে হয় এবং পৃথিবীতে ফিরতে হয়। প্রতিটি ধাপের জন্য আলাদা প্রযুক্তি ও কঠোর পরীক্ষা দরকার।
৩. বিকিরণ ও চরম তাপমাত্রা
পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ও চৌম্বকক্ষেত্র আমাদের মহাকাশের ক্ষতিকর বিকিরণ থেকে বাঁচায়। চাঁদে সেই প্রাকৃতিক সুরক্ষা প্রায় নেই। সৌরঝড় ও উচ্চশক্তির কণার ঝুঁকি তাই দীর্ঘ অবস্থানে আরও গুরুতর হয়ে ওঠে। চাঁদের তাপমাত্রার ব্যবধানও বিশাল। নাসার তথ্য অনুযায়ী, নিরক্ষীয় অঞ্চলে দিনের বেলায় তাপমাত্রা প্রায় ১২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ওঠে, আর রাতে নেমে যায় মাইনাস ১৭৩ ডিগ্রির কাছাকাছি। চাঁদের একটি দিন বা রাত পৃথিবীর প্রায় ১৪ দিনের সমান। উপযুক্ত তাপ নিয়ন্ত্রণ, অক্সিজেন, চাপ নিয়ন্ত্রণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ছাড়া সেখানে টিকে থাকা সম্ভব নয়।
৪. চাঁদের ধুলা ও জীবনরক্ষাকারী ব্যবস্থা
চাঁদের ধুলা দেখতে সাধারণ মাটির মতো হলেও অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও ধারালো। এটি স্পেসসুট, সিল ও বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির ক্ষতি করতে পারে। অ্যাপোলো নভোচারীরা জানিয়েছিলেন, ধুলা তাঁদের স্যুটে আঠার মতো লেগে যেত। পাশাপাশি অক্সিজেন, পানি, খাবার ও জরুরি যোগাযোগের নিশ্চয়তা দিতে হয়। এ কারণেই চাঁদে কয়েক দিনের অভিযান আর সেখানে দীর্ঘ সময় বসবাসের পরিকল্পনা এক বিষয় নয়।
অ্যাপোলো ও আর্টেমিস: দুটি কর্মসূচির লক্ষ্য কি এক?
প্রথম নজরে দুটির লক্ষ্য একই মনে হতে পারে, মানুষকে চাঁদে পাঠানো। কিন্তু উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনায় বড় পার্থক্য আছে।
| বিষয় | অ্যাপোলো | আর্টেমিস |
|---|---|---|
| মূল লক্ষ্য | চাঁদে মানুষ পাঠিয়ে নিরাপদে ফিরিয়ে আনা | চাঁদে ফেরা এবং দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতির ভিত্তি গড়া |
| রকেট | স্যাটার্ন ফাইভ | স্পেস লঞ্চ সিস্টেম (এসএলএস) |
| মহাকাশযান | কমান্ড মডিউল ও লুনার মডিউল | ওরিয়ন ও বাণিজ্যিক অবতরণযান |
| অংশীদার | মূলত নাসা ও মার্কিন শিল্পপ্রতিষ্ঠান | নাসা, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বেসরকারি কোম্পানি |
| গন্তব্য | চাঁদের নিরক্ষীয় অঞ্চলের কাছাকাছি স্থান | চাঁদের দক্ষিণ মেরু |
আর্টেমিসের আরেকটি বড় দিক আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বেসরকারি কোম্পানির অংশগ্রহণ। আর্টেমিস II-এ কানাডার মহাকাশ সংস্থার নভোচারী ছিলেন, আর আর্টেমিস III-এ থাকছেন ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ইএসএ)-র নভোচারী। চন্দ্র-অবতরণযান তৈরি করছে স্পেসএক্স ও ব্লু অরিজিন। এই পদ্ধতিতে খরচ কমানো ও নিয়মিত অভিযানের সুযোগ তৈরি হতে পারে, তবে নতুন প্রযুক্তির পরীক্ষার কারণে সময়সূচি পিছিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও আছে।
২০২৬ সালে চাঁদে ফেরার পথে কতটা এগোলো মানুষ?
আর্টেমিস কর্মসূচির প্রথম ধাপ ছিল ২০২২ সালের মানুষবিহীন আর্টেমিস I উড্ডয়ন। এরপর ২০২৬ সালে আসে বহু প্রতীক্ষিত আর্টেমিস II।
আর্টেমিস II: চাঁদের চারপাশে ১০ দিনের যাত্রা
আর্টেমিস II ১ এপ্রিল ২০২৬ ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে যাত্রা শুরু করে। ১০ এপ্রিল (মার্কিন প্রশান্ত মহাসাগরীয় সময়) ওরিয়ন ক্যাপসুল "ইন্টিগ্রিটি" ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো উপকূলের কাছে প্রশান্ত মহাসাগরে নিরাপদে নামে। চার নভোচারী ছিলেন কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান, পাইলট ভিক্টর গ্লোভার, মিশন বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিনা কখ এবং কানাডার জেরেমি হ্যানসেন।
এই অভিযানের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য তথ্য:
- ৬ এপ্রিল ছয় ঘণ্টার চন্দ্র-পরিক্রমণে নভোচারীরা অ্যাপোলো ১৩-এর রেকর্ড (পৃথিবী থেকে ৪,০০,১৭১ কিলোমিটার) ভেঙে পৃথিবী থেকে মানুষের ভ্রমণের সর্বোচ্চ দূরত্ব ছুঁয়েছেন, যা প্রায় ২,৫২,০০০ মাইল (প্রায় ৪ লাখ ৬ হাজার কিলোমিটার)।
- দুটি পৃথিবী-কক্ষপথ ও চন্দ্র-পরিক্রমণ মিলিয়ে মোট ভ্রমণ দূরত্ব ছিল প্রায় ৬,৯৪,০০০ মাইল (প্রায় ১১ লাখ ১৭ হাজার কিলোমিটার)।
- চাঁদের ওপাশ দিয়ে যাওয়ার সময় প্রায় ৪০ মিনিট পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল।
- ১৯৭২ সালের অ্যাপোলো ১৭-এর পর এটিই প্রথম মানববাহী চন্দ্র অভিযান।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার: নভোচারীরা চাঁদের মাটিতে নামেননি। তাঁরা চাঁদের চারপাশ ঘুরে পৃথিবীতে ফিরেছেন। অ্যাপোলো ৮ (১৯৬৮ সালের বড়দিনের আগের রাত) যেমন প্রথম মানুষকে চাঁদের কক্ষপথে নিয়েছিল, আর্টেমিস II তেমনি নতুন যুগের মহাকাশযান ও ব্যবস্থাকে মানুষসহ পরীক্ষা করেছে।
আর্টেমিস III ও IV: এরপর কী?
মূল পরিকল্পনায় আর্টেমিস III-ই ছিল চাঁদে অবতরণের অভিযান। কিন্তু ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নাসা প্রধান জ্যারেড আইজ্যাকম্যান কর্মসূচিতে বড় পরিবর্তন ঘোষণা করেন। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী:
- আর্টেমিস III (২০২৭ সালের শেষ দিকে): পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে ওরিয়নের সঙ্গে স্পেসএক্স ও ব্লু অরিজিনের অবতরণযানের পরীক্ষামূলক সংস্করণের মিলন ও সংযোগের (রেন্ডেজভু ও ডকিং) পরীক্ষা। ক্রু: র্যান্ডি ব্রেসনিক (কমান্ডার), লুকা পারমিতানো (ইএসএ, পাইলট), ফ্র্যাঙ্ক রুবিও ও আন্দ্রে ডগলাস। এই অভিযান অ্যাপোলো ৯-এর মতো, যেখানে চাঁদে না গিয়ে পৃথিবীর কক্ষপথেই অবতরণযানের পরীক্ষা হয়েছিল।
- আর্টেমিস IV (২০২৮): চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে মানুষ নামানোর পরিকল্পিত অভিযান।
মহাকাশ অভিযানের সময়সূচি প্রযুক্তি পরীক্ষা, নিরাপত্তা যাচাই ও বাজেটের কারণে বদলাতে পারে। মার্কিন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরাও আরও পরীক্ষার প্রয়োজনের কথা বলেছেন। তাই ২০২৮-কে নিশ্চিত ঘটনা নয়, লক্ষ্য হিসেবেই দেখা উচিত।
নতুন চন্দ্র-প্রতিযোগিতা: শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়
এবারের প্রেক্ষাপট স্নায়ুযুদ্ধের চেয়ে আলাদা, তবে প্রতিযোগিতা আছে। চীন ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে মানুষ নামানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। ২০২৩ সালে ভারতের চন্দ্রযান-৩ চাঁদের দক্ষিণ মেরু অঞ্চলের কাছে সফলভাবে অবতরণ করেছে। চাঁদে এখন একাধিক দেশের রোবট-অভিযান চলছে, আর বেসরকারি কোম্পানিও অংশ নিচ্ছে।
চাঁদের দক্ষিণ মেরু এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
দক্ষিণ মেরুর স্থায়ী ছায়ায় থাকা কিছু গর্তে পানির বরফ থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই পানি ভবিষ্যতের অভিযানে পানীয়, শ্বাসের অক্সিজেন এবং (পানি ভেঙে হাইড্রোজেন পেলে) রকেটের জ্বালানির উৎস হতে পারে। তবে এগুলো এখনো প্রযুক্তি উন্নয়ন ও পরীক্ষার বিষয়। চাঁদে সহজেই বিপুল পানি পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
দ্বিতীয় কারণ বিজ্ঞান। চাঁদের প্রাচীন পাথর ও গর্ত সৌরজগতের অতীতের এমন তথ্য ধরে রেখেছে, যা পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনে অনেকটাই মুছে গেছে। এ ছাড়া মেরু অঞ্চলের কিছু উঁচু স্থানে দীর্ঘ সময় সূর্যের আলো থাকে, যা সৌরবিদ্যুতের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে।
চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি তৈরি কি সম্ভব?
চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটির ধারণা বহুদিনের, কিন্তু বাস্তবায়নে অনেক সমস্যার সমাধান করতে হবে:
- নিরাপদ আবাসন, যা বিকিরণ, ধুলা ও চরম তাপমাত্রা থেকে সুরক্ষা দেবে।
- পানি, অক্সিজেন, বিদ্যুৎ ও খাবারের নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা।
- পৃথিবী থেকে সবকিছু বহনের খরচ কমাতে চাঁদের নিজস্ব সম্পদ ব্যবহারের প্রযুক্তি।
- বিদ্যুতের জন্য সৌরশক্তি ব্যবহার করা গেলেও চাঁদের দীর্ঘ রাতের জন্য শক্তি সংরক্ষণ বা বিকল্প ব্যবস্থা।
- যন্ত্রপাতি মেরামত, চিকিৎসা সহায়তা, জরুরি উদ্ধার ও পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ।
তাই চাঁদে মানুষের প্রত্যাবর্তন গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের স্বপ্ন বাস্তবায়নে আরও বহু বছর গবেষণা ও বিনিয়োগ লাগতে পারে।
মানুষ কি সত্যিই চাঁদে গিয়েছিল, নাকি সবই সাজানো?
অ্যাপোলো অভিযান নিয়ে বহু ষড়যন্ত্রতত্ত্ব আছে। কেউ বলেন, সবই নাকি পৃথিবীর কোনো স্টুডিওতে বানানো। কিন্তু এসব দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। বিপরীতে প্রমাণ বিস্তর:
- অ্যাপোলো নভোচারীরা প্রায় ৩৮২ কেজি পাথর ও মাটির নমুনা এনেছেন, যা বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করেছেন।
- নভোচারীরা চাঁদে যে প্রতিফলক (রেট্রোরিফ্লেক্টর) রেখে এসেছেন, পৃথিবী থেকে লেজার পাঠিয়ে আজও তা দিয়ে চাঁদের দূরত্ব মাপা হয়।
- নাসার লুনার রিকনেসান্স অরবিটার চাঁদের কক্ষপথ থেকে অ্যাপোলোর অবতরণস্থল, যন্ত্রপাতি ও নভোচারীদের পায়ের ছাপের ছবি তুলেছে।
- স্নায়ুযুদ্ধের প্রতিদ্বন্দ্বী সোভিয়েত ইউনিয়ন অ্যাপোলোর যাত্রা নিজেরা নজরে রেখেছিল এবং অবতরণ নিয়ে কখনো প্রশ্ন তোলেনি।
মানুষ বহু বছর চাঁদে না যাওয়ার অর্থ এই নয় যে আগের অভিযান ঘটেনি। নতুন অভিযানের জন্য বিপুল অর্থ, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি এবং দক্ষ জনবল একসঙ্গে দরকার।
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
শেষবার মানুষ চাঁদের মাটিতে কবে নেমেছিল?
১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে অ্যাপোলো ১৭ অভিযানে। তখন থেকে আজ পর্যন্ত আর কেউ চাঁদের মাটিতে নামেননি।
আর্টেমিস II কি চাঁদে নেমেছিল?
না। এটি চাঁদের চারপাশ ঘুরে পৃথিবীতে ফিরে এসেছে। তবে পৃথিবী থেকে মানুষের ভ্রমণের দূরত্বের রেকর্ড ভেঙেছে।
আর্টেমিস III কি চাঁদে নামবে?
না। হালনাগাদ পরিকল্পনায় এটি পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে অবতরণযানের সঙ্গে সংযোগ পরীক্ষার অভিযান।
মানুষ আবার কবে চাঁদে নামতে পারে?
নাসার লক্ষ্য ২০২৮ সালে আর্টেমিস IV, তবে এটি পরিকল্পিত লক্ষ্য। প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা যাচাইয়ের কারণে সময় বদলাতে পারে।
চাঁদে যাওয়া বন্ধ হয়েছিল কেন?
বিপুল খরচ, রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের পরিবর্তন, অভিযান বাতিল এবং নভোচারীদের ঝুঁকি, এই সব মিলিয়ে।
শেষ কথা: চাঁদে ফেরা কি শুধু সময়ের অপেক্ষা?
১৯৭২ সালের পর এত দীর্ঘ বিরতির পেছনে ছিল অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের পরিবর্তন এবং মানববাহী অভিযানের ঝুঁকি। প্রযুক্তিগতভাবে চাঁদে যাওয়া সম্ভব হলেও নিরাপদে অবতরণ, কাজ করা এবং ফিরে আসার জন্য সম্পূর্ণ নতুন ব্যবস্থা তৈরি ও পরীক্ষা করতে হয়। আর্টেমিস II দেখিয়েছে, মানুষ আবার চাঁদের কাছাকাছি পৌঁছে নিরাপদে ফিরতে পারে। কিন্তু চাঁদের মাটিতে অবতরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি এখনো বাকি। এই অভিযানগুলো সফল হলে চাঁদের পানি, ভূতত্ত্ব ও সম্পদ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান বাড়বে, আর মঙ্গল গ্রহে ভবিষ্যৎ মানব অভিযানের প্রস্তুতিতেও কাজে লাগবে। পঞ্চাশ বছরের বিরতি তাই শুধু হারিয়ে যাওয়া একটি অভিযানের গল্প নয়। এটি মনে করিয়ে দেয়, মহাকাশে বড় সাফল্যের জন্য শুধু সাহস নয়, দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টা।

