এক হাজার বছর আগে আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়াই পৃথিবীর আকার মাপার চেষ্টা করেছিলেন মুসলিম পণ্ডিতেরা। তাঁদের মধ্যে আল-বিরুনির পদ্ধতি আজও বিজ্ঞান ও গণিতের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। মহাকাশ থেকে পৃথিবীর গোলাকার আকৃতি সহজেই বোঝা যায়। কিন্তু কল্পনা করুন এমন এক সময়, যখন কৃত্রিম উপগ্রহ, মহাকাশযান বা ডিজিটাল মানচিত্র কিছুই ছিল না। তখন মানুষ কীভাবে বুঝত পৃথিবীর আকৃতি কেমন? আর এর ব্যাসার্ধ কত, সেটিই বা মাপা হতো কীভাবে?
প্রায় এক হাজার বছর আগে মধ্যযুগীয় ইসলামী জ্ঞানচর্চার জগতে একদল গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ ও ভূগোলবিদ এসব প্রশ্ন নিয়ে কাজ করেছিলেন। তাঁরা প্রাচীন সভ্যতার জ্ঞান কাজে লাগিয়েছেন, নতুন গাণিতিক পদ্ধতি তৈরি করেছেন এবং পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পৃথিবী সম্পর্কে মানুষের ধারণা সমৃদ্ধ করেছেন। এই ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় আবু রাইহান আল-বিরুনি। তবে একটি কথা গোড়াতেই পরিষ্কার করা দরকার। পৃথিবী গোলাকার, এই ধারণা মুসলিম বিজ্ঞানীরা প্রথম আবিষ্কার করেননি। প্রাচীন গ্রিক চিন্তাবিদদের মধ্যে বহু শতাব্দী আগেই এ ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। মুসলিম পণ্ডিতদের বড় অবদান ছিল সেই জ্ঞানকে আরও উন্নত করা, গাণিতিকভাবে বিশ্লেষণ করা এবং নতুন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পৃথিবী মাপার চেষ্টা করা।
এক নজরে: আল-বিরুনির পৃথিবী মাপার পরীক্ষা
আধুনিক প্রযুক্তি, উপগ্রহ বা জিপিএস ছাড়াই মুসলিম পণ্ডিত আবু রাইহান আল-বিরুনি পৃথিবীর ব্যাসার্ধ নির্ণয়ের চেষ্টা করেছিলেন। পাহাড়ের উচ্চতা, দিগন্তের কোণ এবং ত্রিকোণমিতির সাহায্যে করা তাঁর এই গবেষণা মধ্যযুগীয় বিজ্ঞানের অন্যতম উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়। নিচের টেবিলে তাঁর পৃথিবী মাপার পরীক্ষার প্রধান তথ্যগুলো এক নজরে তুলে ধরা হলো।
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| বিজ্ঞানী | আবু রাইহান আল-বিরুনি |
| জন্ম | ৯৭৩ খ্রিস্টাব্দ |
| মৃত্যু | ১০৪৮ খ্রিস্টাব্দ |
| পরীক্ষার স্থান | নান্দানা, বর্তমান পাকিস্তান |
| ব্যবহৃত যন্ত্র | অ্যাস্ট্রোল্যাব |
| নির্ণীত ব্যাসার্ধ | প্রায় ৬,৩৪০ কিমি |
| আধুনিক গড় ব্যাসার্ধ | প্রায় ৬,৩৭১ কিমি |
| পার্থক্য | প্রায় ০.৫% |
পৃথিবী গোলাকার, এই ধারণার সূচনা কোথায়?
প্রাচীনকালে মানুষ দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা থেকে পৃথিবীকে সমতল মনে করত। বিস্তীর্ণ মাঠ বা সমুদ্রের দিকে তাকালে তা-ই মনে হয়। কিন্তু প্রকৃতির কিছু ঘটনা এই ধারণার সঙ্গে মেলে না। প্রাচীন গ্রিসে ঐতিহ্যগতভাবে পিথাগোরাসের সঙ্গে গোলাকার পৃথিবীর ধারণার সম্পর্ক উল্লেখ করা হয়। পরে প্লেটো ও অ্যারিস্টটলের আলোচনায় ধারণাটি স্পষ্ট হয়। অ্যারিস্টটল পর্যবেক্ষণভিত্তিক কয়েকটি যুক্তি দিয়েছিলেন:
- চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদের ওপর পৃথিবীর ছায়া সব সময় বাঁকা দেখায়।
- উত্তর বা দক্ষিণে ভ্রমণ করলে আকাশে নক্ষত্রের অবস্থান বদলে যায়।
- দূরে সরে যাওয়া জাহাজের নিচের অংশ আগে চোখের আড়ালে চলে যায়।
খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে গ্রিক গণিতবিদ এরাটোসথেনিস সূর্যের ছায়ার কোণ ও দুটি শহরের দূরত্ব ব্যবহার করে পৃথিবীর পরিধি নির্ণয়ের বিখ্যাত পরীক্ষা করেন। অর্থাৎ মুসলিম বিজ্ঞানীদের বহু আগে থেকেই পৃথিবীর আকৃতি ও পরিমাপ নিয়ে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান চলছিল। পরে এই জ্ঞান আরবিতে অনূদিত হয়। মুসলিম বিশ্বের পণ্ডিতেরা গ্রিক জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত ও ভূগোল অধ্যয়ন করেন। তাঁরা শুধু সংরক্ষণেই থেমে থাকেননি, হিসাব সংশোধন, নতুন পর্যবেক্ষণ ও নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবনেরও চেষ্টা করেছেন।
ইসলামের স্বর্ণযুগে জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিকাশ
অষ্টম থেকে ত্রয়োদশ শতকের মধ্যে (কেউ কেউ আরও পরবর্তী সময় পর্যন্ত ধরেন) মুসলিম-শাসিত অঞ্চলে গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসা, দর্শন ও ভূগোলের উল্লেখযোগ্য বিকাশ ঘটে। বাগদাদসহ বিভিন্ন জ্ঞানকেন্দ্রে গ্রিক, পারস্য ও ভারতীয় জ্ঞানভান্ডারের বহু রচনা অনুবাদ ও বিশ্লেষণ করা হয়। এর পেছনে বাস্তব প্রয়োজনও ছিল। নামাজের সময় নির্ণয়, রমজান ও অন্যান্য মাসের হিসাব, কিবলার দিক নির্ধারণ, দীর্ঘ ভ্রমণ ও মানচিত্র তৈরিতে সূর্য, চাঁদ ও নক্ষত্রের অবস্থান জানা জরুরি ছিল। ফলে পর্যবেক্ষণযন্ত্রের উন্নতি, জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সারণি তৈরি এবং গোলাকার পৃথিবীতে স্থানের অবস্থান নির্ণয়ের পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা এগিয়ে চলে।
এই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ পণ্ডিতদের মধ্যে ছিলেন আল-ফারগানি, আল-বাত্তানি ও আল-বিরুনি। কেউ জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক হিসাব নিয়ে, কেউ ত্রিকোণমিতি ও ভূগোল নিয়ে, আবার কেউ আকাশ পর্যবেক্ষণের তথ্য নির্ভুল করার কাজ করেছেন।
আল-বিরুনি কে ছিলেন? পৃথিবীর ব্যাসার্ধ মাপার পথিকৃৎ বিজ্ঞানী
আবু রাইহান মুহাম্মদ ইবনে আহমদ আল-বিরুনি ছিলেন মধ্যযুগের অন্যতম বহুমুখী পণ্ডিত। তিনি ৯৭৩ সালে খোয়ারেজম অঞ্চলের কাথ শহরে জন্মগ্রহণ করেন, যা বর্তমান উজবেকিস্তানের অংশ। তাঁর জীবনকাল ৯৭৩ থেকে ১০৪৮ সাল পর্যন্ত ধরা হয়। তাঁর অধিকাংশ রচনা আরবি ভাষায়। গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, ভূগোল, কালপঞ্জি ও পদার্থবিজ্ঞানে তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। তিনি ভারতীয় সমাজ, ধর্ম, দর্শন, গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ লিখেছেন।
তাঁর কাজের বিশেষত্ব ছিল পর্যবেক্ষণ ও গাণিতিক বিশ্লেষণকে একসঙ্গে ব্যবহার করা। প্রচলিত বিশ্বাসের ওপর নির্ভর না করে তিনি যুক্তি, তথ্য ও হিসাব খুঁজতেন।
আল-বিরুনি কীভাবে পাহাড় ব্যবহার করে পৃথিবীর ব্যাসার্ধ নির্ণয় করেছিলেন?
এরাটোসথেনিসের পদ্ধতিতে দূরের দুটি শহরের মধ্যে দূরত্ব মাপতে হতো। আল-বিরুনির পদ্ধতির সুবিধা ছিল, এটি এক জায়গায় দাঁড়িয়েই প্রয়োগ করা যায়। ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী তিনি বর্তমান পাকিস্তানের পাঞ্জাবে সল্ট রেঞ্জের নান্দানা দুর্গের কাছাকাছি এ পদ্ধতি কাজে লাগান। মূল ধারণাটি জ্যামিতির। পৃথিবীকে বিশাল গোলক ধরলে উঁচু জায়গা থেকে দিগন্তের দিকে তাকালে দৃষ্টিরেখা অনুভূমিক রেখা থেকে সামান্য নিচে নামে। এই কোণ পৃথিবীর বক্রতার সঙ্গে সম্পর্কিত। জায়গাটি যত উঁচু, কোণটি তত বড় ও মাপা সহজ।
- প্রথম ধাপ: পাহাড়ের উচ্চতা নির্ণয়
একই সরলরেখায় থাকা দুটি স্থানের দূরত্ব মেপে সেখান থেকে পাহাড়ের চূড়ার উত্থান-কোণ মাপা হয় (অ্যাস্ট্রোল্যাব দিয়ে)। এরপর ত্রিকোণমিতি দিয়ে উচ্চতা বের করা হয়। বর্ণনা অনুযায়ী পাহাড়টির উচ্চতা প্রায় ৩২১.৫ মিটার পাওয়া গিয়েছিল।
- দ্বিতীয় ধাপ: দিগন্তের অবনমন-কোণ মাপা
পাহাড়ের চূড়ায় উঠে অনুভূমিক রেখা ও দিগন্তের দৃষ্টিরেখার মধ্যবর্তী কোণ মাপা হয়। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী এই কোণ ছিল প্রায় ৩৪ আর্কমিনিট, অর্থাৎ এক ডিগ্রির অর্ধেকের কিছু বেশি।
- তৃতীয় ধাপ: জ্যামিতিক হিসাব
পাহাড়ের উচ্চতা ও অবনমন-কোণ জানা থাকলে গোলকের জ্যামিতি ও ত্রিকোণমিতি দিয়ে পৃথিবীর ব্যাসার্ধ বের করা যায়। এখানে দিগন্ত পর্যন্ত দূরত্ব আলাদা করে মাপার দরকার হয় না।
ফলাফল কতটা নির্ভুল ছিল?
বিভিন্ন আধুনিক বিশ্লেষণে আল-বিরুনির ফলাফল প্রায় ৬,৩৪০ কিলোমিটারের কাছাকাছি বলা হয়। উৎসভেদে এই মান ৬,৩৩৫ থেকে ৬,৩৪০ কিলোমিটারের মধ্যে ওঠানামা করে। তুলনার জন্য, পৃথিবীর বিষুবীয় ব্যাসার্ধ প্রায় ৬,৩৭৮ কিমি, মেরু ব্যাসার্ধ প্রায় ৬,৩৫৭ কিমি এবং গড় ব্যাসার্ধ প্রায় ৬,৩৭১ কিমি। অর্থাৎ গড় মানের চেয়ে তাঁর ফল প্রায় ০.৫ শতাংশ কম।
তবে এই নির্ভুলতা নিয়ে সতর্ক থাকা ভালো। তাঁর ব্যবহৃত প্রাচীন এককের আধুনিক রূপান্তর কীভাবে করা হবে, তার ওপর ফল নির্ভর করে। বায়ুমণ্ডলে আলোর প্রতিসরণও দিগন্তের কোণকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই ফলাফলকে আধুনিক পরিমাপের সঙ্গে হুবহু এক বলা ঠিক হবে না। তবু সীমিত যন্ত্রপাতিতে এমন গাণিতিক পদ্ধতি তৈরি করা ছিল অসাধারণ বৈজ্ঞানিক কাজ।
আল-ফারগানি ও অন্য পণ্ডিতদের অবদান
পৃথিবীর আকার ও পরিমাপ নিয়ে মুসলিম বিশ্বের কাজ শুধু আল-বিরুনিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। নবম শতকের জ্যোতির্বিদ আল-ফারগানি ইউরোপে আলফ্রাগানুস নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানের মৌলিক বিষয় সহজভাবে ব্যাখ্যা করে একটি গ্রন্থ লেখেন। পরে সেটি লাতিনে অনূদিত হয়ে ইউরোপীয় জ্ঞানচর্চায় প্রভাব ফেলে।
আল-বাত্তানি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ ও গণনার উন্নতিতে অবদান রাখেন। আর খলিফা আল-মামুনের আমলে একদল পণ্ডিত মেরিডিয়ানের এক ডিগ্রির দৈর্ঘ্য মাপার উদ্যোগ নেন, যার মাধ্যমে পৃথিবীর পরিধি হিসাব করা সম্ভব। এসব কাজ দেখায়, পৃথিবীর পরিমাপ একটি দীর্ঘ জ্ঞানচর্চার ধারা। প্রত্যেক প্রজন্ম আগের ফলাফল ব্যবহার করেছে, নতুন পর্যবেক্ষণ যোগ করেছে এবং হিসাব আরও ভালো করার চেষ্টা করেছে।
মুসলিম বিজ্ঞানীরা কি গোলাকার পৃথিবীর ধারণা প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন?
না। এ ধারণা মুসলিম সভ্যতার উত্থানের বহু শতাব্দী আগে থেকেই গ্রিক জ্ঞানচর্চায় ছিল। এরাটোসথেনিস খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে পরিধি মেপেছিলেন, আর পরে টলেমির কাজেও গোলাকার পৃথিবীর ধারণা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মুসলিম পণ্ডিতেরা সেই ঐতিহ্য অনুবাদ ও অধ্যয়ন করেন এবং ভারতীয় ও পারস্যের জ্ঞান থেকেও শিক্ষা নেন।
কোনো সভ্যতার অবদান বিচার করতে শুধু "কে প্রথম বলেছে" দেখলে চলে না। দেখতে হয়, আগের জ্ঞান কীভাবে সংরক্ষিত হলো, কোথায় সংশোধিত হলো, কী নতুন পদ্ধতি এলো এবং পরের প্রজন্ম তা থেকে কী শিখল। এই বিচারে ত্রিকোণমিতি, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গাণিতিক ভূগোলে মুসলিম বিজ্ঞানীদের অবদান অত্যন্ত মূল্যবান।
পৃথিবী গোলাকার, কিন্তু নিখুঁত গোলক নয়
আজ আমরা জানি, পৃথিবী নিখুঁত গোলক নয়। নিজ অক্ষের চারপাশে ঘূর্ণনের কারণে বিষুবীয় অঞ্চল সামান্য স্ফীত এবং মেরু অঞ্চল কিছুটা চাপা। এই আকৃতিকে oblate spheroid বা চ্যাপ্টা গোলক বলা হয়। আরও সূক্ষ্মভাবে বোঝাতে 'জিওয়েড' ধারণা ব্যবহার করা হয়, যা পৃথিবীর মহাকর্ষ ক্ষেত্র ও গড় সমুদ্রপৃষ্ঠের সঙ্গে সম্পর্কিত। উপগ্রহ, জিপিএস ও রাডারের সাহায্যে এখন পৃথিবীর আকার অত্যন্ত নির্ভুলভাবে জানা যায়। কিন্তু সেসব ছাড়াই গণিত, পর্যবেক্ষণ ও যুক্তি দিয়ে পৃথিবী মাপার যে চেষ্টা হয়েছিল, আল-বিরুনির কাজ তার অন্যতম উজ্জ্বল উদাহরণ।
এই ইতিহাস আমাদের কী শেখায়?
বৈজ্ঞানিক জ্ঞান কোনো একক ব্যক্তি বা সভ্যতা একবারে তৈরি করে না। এটি গড়ে ওঠে দীর্ঘ সময় ধরে, প্রশ্ন, পর্যবেক্ষণ, গণনা, ভুল সংশোধন ও নতুন ধারণা যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে। গ্রিক পণ্ডিতেরা গোলাকার পৃথিবীর যুক্তি দিয়েছিলেন। মুসলিম বিজ্ঞানীরা সেই জ্ঞান অধ্যয়ন করে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গাণিতিক ভূগোলকে এগিয়ে নিয়েছেন। পরে ইউরোপসহ বিভিন্ন অঞ্চলের পণ্ডিতেরা তা আরও বিস্তৃত করেছেন। আধুনিক বিজ্ঞান এই ধারাবাহিকতারই উত্তরসূরি। আগের গবেষণাকে সম্মান করা যেমন জরুরি, তেমনি তার সীমাবদ্ধতা যাচাই করে নতুন তথ্যে ভালো ব্যাখ্যা তৈরি করাও বিজ্ঞানের অংশ।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. মুসলিম বিজ্ঞানীরা কি প্রথম প্রমাণ করেছিলেন যে পৃথিবী গোলাকার?
না। প্রাচীন গ্রিক চিন্তাবিদেরা মুসলিম সভ্যতার বহু আগেই এর পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন। মুসলিম বিজ্ঞানীরা এই জ্ঞান সম্প্রসারণ, পরীক্ষা ও গাণিতিকভাবে উন্নত করেছেন।
২. আল-বিরুনি কীভাবে পৃথিবীর ব্যাসার্ধ নির্ণয় করেছিলেন?
তিনি অ্যাস্ট্রোল্যাব দিয়ে একটি পাহাড়ের উচ্চতা ও চূড়া থেকে দিগন্তের অবনমন-কোণ মেপেছিলেন। এরপর ত্রিকোণমিতি ও গোলকের জ্যামিতি দিয়ে ব্যাসার্ধ হিসাব করেন।
৩. আল-বিরুনি কখন জন্মগ্রহণ করেন?
৯৭৩ সালে খোয়ারেজম অঞ্চলে। তাঁর জীবনকাল ধরা হয় ৯৭৩ থেকে ১০৪৮ সাল পর্যন্ত।
৪. আল-বিরুনির ফল কি আধুনিক মানের সমান ছিল?
হুবহু সমান নয়, তবে বেশ কাছাকাছি। তাঁর ফল প্রায় ৬,৩৪০ কিমি, আর আধুনিক গড় ব্যাসার্ধ প্রায় ৬,৩৭১ কিমি। এককের রূপান্তর, যন্ত্রের সীমাবদ্ধতা ও আলোর প্রতিসরণের কারণে পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক।
৫. আল-ফারগানি কে ছিলেন?
নবম শতকের গুরুত্বপূর্ণ জ্যোতির্বিদ। তাঁর জ্যোতির্বিজ্ঞানের গ্রন্থ লাতিনে অনূদিত হয়ে ইউরোপে প্রাচীন জ্যোতির্বিদ্যার জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে ভূমিকা রেখেছিল।
৬. পৃথিবী কি পুরোপুরি গোলাকার?
না। ঘূর্ণনের কারণে বিষুবীয় অঞ্চল কিছুটা স্ফীত এবং মেরু অঞ্চল কিছুটা চাপা। আরও নির্ভুলভাবে বোঝাতে জিওয়েডসহ বিভিন্ন মডেল ব্যবহার করা হয়।
উপসংহার:আল-বিরুনির উত্তরাধিকার
পৃথিবী গোলাকার, এই ধারণা প্রাচীন যুগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু সেই ধারণাকে গাণিতিকভাবে পরীক্ষা করা, ব্যাসার্ধ ও পরিধি মাপার নতুন পদ্ধতি তৈরি করা এবং জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে আরও নির্ভুল করার কাজে মুসলিম পণ্ডিতেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। আল-বিরুনির পাহাড় ও দিগন্তের কোণ ব্যবহারের পদ্ধতি তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
ইতিহাস বুঝতে হলে কোনো সভ্যতার অবদানকে বাড়িয়ে বলা বা কমিয়ে দেখা, দুটোই এড়ানো উচিত। কোন জ্ঞান কোথা থেকে এসেছে, কে তাকে এগিয়ে নিয়েছেন এবং পরের প্রজন্ম কীভাবে তা ব্যবহার করেছে, সেই ধারাবাহিকতা বোঝাই সবচেয়ে জরুরি।
আরও পড়ুন:
- পৃথিবীর ৭টি রহস্যময় লিপি: সিন্ধু থেকে ফাইস্টোস
- বিশ্বের ২০টি বৃহত্তম দেশ: আয়তনে সবার শীর্ষে?
- ভিনগ্রহীর প্রাচীন চিহ্ন? নাজকা লাইন ও অন্যান্য
- প্রাচীন বিশ্বের সপ্তাশ্চর্য: হারিয়ে যাওয়ার ইতিহাস
- ১৯৭২ সালের পর মানুষ চাঁদে যায়নি কেন?
- মঙ্গলের উপগ্রহ ফোবোস থেকে মাটি আনবে জাপান
- এলিয়েনরা কি ভাত, মাছ- ও চকলেট খেতে পারবে?

